ঠেছি শিয়ালদহ - বনগাঁ লোকালে। যাব বনগাঁ। একেবারে প্রান্তে। যাত্রা ছোটো মনে করলে ছোট আর বড়ো মনে করলে বড়ো, যার যেরকম সয়। আজকে যখনট্রেনে উঠেছি মনটা বিশেষ স্বতস্ফূর্ত ছিল না। স্থির এবং কিছুটা থমকে ছিল বলা যায়। বিগত বছরগুলোতে অনেককিছু দেখেছি, আজকেও ট্রেনে ওঠার পূর্বে কিছু জিনিস চোখের সামনে এসে ঝাপটা দিলো। চোখের পলক ভেদ করে চলে গেল মনির ভিতর, গভীরে। চোখের ভেতরেই যেনো একটি ভিডিওর ভিজ্যুয়ালাইজেশন ঘটছে বারবার। জীবনতো একটি খাপছাড়া ভিডিওই, কোনোটা আগে কোনোটা পরে, ক্রমান্বয়ের হিসেবের ঊর্ধ্বে। যেন একটা গোটা সিরিজের উলট-পালট এপিসোড। অজানা ক্লাইম্যাক্স ও বিদ্ধস্ত করে দেওয়া পূর্ববর্তী এপিসোডে তখন কিছুটা বিদ্ধস্ত, শান্ত, চুপচাপ। ট্রেনটি স্টেশন ছেড়েছে অনেকক্ষণ। সিরিজের অত্যাচারে কতটা সময় কাটল ও আমাগী স্টেশন কোনটি তার প্রতি বিশেষ ধ্যান ছিল না। হঠাৎ বোধহয় কেও ধাক্কা দিল, বাইরে চেয়ে দেখলাম ট্রেনটি দাঁড়িয়ে আছে বারাসাত স্টেশনে। এটি একটি জংশন তাই ট্রেন একটু বেশি সময় দেয় মানুষকে নিজের গন্তব্য বেছে নিতে। এতক্ষণ যেন ট্রেনের গতির কোনো খেয়ালই ছিলনা আমার মনে। জনবহুল প্লাটফর্মে হঠাৎ একজন ছেলেকে দেখলাম কোকড়া চুল, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, একটা কালো টি-শার্ট পড়ে দাঁড়িয়ে ফোন চালিয়ে যাচ্ছে, হয়তো কারো অপেক্ষা করছে, তখন ঠিক বুঝিনি। ওইযে বললাম জংশন তো, যাত্রীকে কিছুটা সময় দেয়। এত লোকজন থাকতে অচেনা ওই ছেলেটির দিকেই বারবার জানিনা কেন চোখ পড়ছিল। হঠাৎই যেন চোখের মধ্যে উলট-পালট, আগা মাথা না থাকা ওই সিরিজটার ভুল করে অনেক পুরানো এপিসোড চালু হয়ে গেল। কি যে বিরক্তিকর। সবে হুশে এসে স্টেশন আর একটা অজানা ছেলে দেখছিলাম, সেই দৃশ্য পণ্ড করলো। বাস্তবতায় আমাকে থাকতেই দেবে না মনে হয়। ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা ক্লিপ চলল। একটি ছেলে আর আমি, একটা তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছি, আমাদের পাঁচ মিনিটের গল্পে অনেক উল্লাস রয়েছে। অমরা পড়তে গেছি বনগাঁর আমলা পাড়ায়। পড়ার শেষে আমরা দুজন ছবি তুলছি। কখনো আবার মেলায় গিয়ে ব্রেক ড্যান্স চড়ছি। কিছুই মাত্র বছর আগের এসব ক্লিপ। হঠাৎ নিজেকে ওসব আজগুবি থেকে বার করে আনলাম। মাথা নেই, মুন্ডু নেই, কি দরকার ওসবের। এখন যা দেখছি তাই দেখি বরং। আবার বাইরে চোখ গেল, ওই ছেলেটি তখনও দাঁড়িয়ে, ফোনে কিসব করছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। হঠাৎ আমার চোখের লেন্সটা একটু বেশি স্পষ্ট হয়ে গেল। ফ্ল্যাশব্যাকে যাকে এক্ষুনি দেখলাম, এতো সেই, আমার বন্ধু। ভাই বলে ডাকতাম ওকে। চুলটা একটু বড়ো আর গোঁফটা একটু মোটা হয়ে গেছে। ২-৩ বছরের মাথায় সেই ভাইকে চিনতে যে এত সময় লাগবে ভাবতে পারিনি। কিছু সেকেন্ড থমকে গেলাম। তারপর ট্রেনটি আবার গতি ফেরালো। বারাসাত স্টেশন ছেড়ে দিল। ট্রেনটি ছুটছে।