প্রথম অধ্যায়
কালিম্পঙের আকাশটা আজ যেন কোনো এক বিষণ্ণ মহাকাব্যের মুখবন্ধের মতো ধূসর আর রহস্যময়। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জমে থাকা কুয়াশাগুলো কেবল জলীয় বাষ্প নয়, মনে হয় যেন এক একটি অতৃপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাস। এই কুয়াশার গোলকধাঁধায় প্রায় একাকী দাঁড়িয়ে আছে ‘মায়ালোক’ বাংলোটি। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য, লাল টালির ছাদ আর পাথরের দেওয়ালগুলোতে শ্যাওলার আস্তরণ পড়লেও তার আভিজাত্য বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। বরং পাইন আর ঝাউবনের ছায়ায় ঘেরা এই বাংলোটি আজ এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ধারণ করেছে। ঠিক যেমন প্রদোষ চন্দ্র মিত্র বা আমাদের প্রিয় ফেলুদা বলতেন, রহস্যের জন্য পরিবেশটা হতে হয় একদম খাপে খাপ—মায়ালোক যেন সেই সংজ্ঞাকে সার্থক করতে কোনো কার্পণ্য করেনি।
এই বাংলোর বিশাল ড্রয়িংরুমের ভেতর আজ দশজন মানুষের সমাবেশ। একেকটি চরিত্র যেন একেকটি আলাদা ধাঁধা। কক্ষের মাঝখানে রাখা ফায়ারপ্লেসে পাইন কাঠের গুড়ি পুড়ছে চটচট শব্দে। আগুনের সেই লালচে আভা ঘরের আসবাবপত্র আর দেওয়ালের বিশাল তিব্বতি থাংকাগুলোতে এক অতিপ্রাকৃত ছায়ার জন্ম দিচ্ছে। ঘরের এক কোণে আয়েশ করে বসে চারমিনারে অগ্নিসংযোগ করলেন অর্কপ্রতিম সান্যাল। পরনে তাঁর ঘিয়ে রঙের আদ্দির পাঞ্জাবি আর কালো রঙের মিহি ধুতি, কাঁধে একটি কাশ্মীরি শাল। তাঁর তীক্ষ্ণ নাসা আর উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টিতে এক অনন্য ধীশক্তি খেলা করে। পাশে বসে নীলু, যে ঠিক তোপসের মতোই চটপটে, আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং মামার প্রতিটি পদক্ষেপের নীরব পর্যবেক্ষক।
আড্ডার মধ্যমণি হলেন তপোব্রত চৌধুরী। বয়স আশির কাছাকাছি হলেও তাঁর ঋজু দেহভঙ্গি আর কন্ঠস্বর এখনও কমান্ডিং। তপোব্রত বাবু পেশায় ছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক, কিন্তু নেশায় তিনি এক দুষ্প্রাপ্য সংগ্রাহক। আজ রাতে তিনি যে জিনিসটি সবাইকে দেখাতে চলেছেন, তা শুধু ভারতবর্ষ নয়, সারা বিশ্বের ঐতিহাসিক মহলে এক বিস্ময়— ‘নীলকণ্ঠ পালক’। এটি মূলত আঠারো শতকের পারস্যের এক বাদশাহের পান্না ও হীরা খচিত রাজকীয় ব্রোচ। কিংবদন্তি আছে, নাদির শাহ যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন ময়ূর সিংহাসনের একটি গুপ্ত কুঠুরিতে এই পালকটি ছিল। এটি দেখতে অবিকল একটি নীলকণ্ঠ পাখির ডানার মতো, যার প্রতিটি পালকে বসানো আছে দুর্লভ নীল হীরা।
বাকি আটজন অতিথির দিকে তাকালে এক মনস্তাত্ত্বিক দাবার ছক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তপোব্রতর ব্যক্তিগত সচিব অনির্বাণ বসু, যার চশমার পুরু কাঁচের আড়ালে চোখগুলো সারাক্ষণ তটস্থ হয়ে থাকে। তপোব্রতর কন্যা বিদিশা, যাঁর গাম্ভীর্য আর মিতবাক স্বভাব তাঁকে যেন এই ঘরের সবচেয়ে রহস্যময়ী চরিত্রে পরিণত করেছে। লন্ডন ফেরত প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ হিমাংশু রায়, যিনি মনে করেন মানুষের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্ধকারই হলো আসল রহস্য। তরুণ ও খ্যাপাটে শিল্পী সৃজন মল্লিক, যার লম্বা আঙ্গুলে সব সময় রঙের দাগ লেগে থাকে এবং যার কথা বলার ভঙ্গি অত্যন্ত রূপকধর্মী। মরমী লেখিকা মায়া সেন, যিনি প্রতিটি বাস্তব ঘটনাকে তাঁর পরবর্তী উপন্যাসের প্লট হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। স্থানীয় পুলিশ অফিসার সোমনাথ দত্ত, যিনি অর্কপ্রতিমের বুদ্ধির পরম ভক্ত এবং সবশেষে বাংলোর পুরনো পাচক রতন ঠাকুর, যে নিঃশব্দে কফি পরিবেশন করে যাচ্ছিল, অথচ যার চোখের দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে এক হিংস্র দ্যুতি ঝিলিক দিয়ে উঠছিল।
তপোব্রত বাবু তাঁর পকেটে হাত দিলেন। পুরো ড্রয়িংরুমে এক নিশ্ছিদ্র নীরবতা। আগুনের শিখার শব্দটুকুও তখন যেন অনেক বেশি জোরালো মনে হচ্ছিল। তিনি বের করলেন এক মখমলের ছোট নীল রঙের বাক্স। “সান্যাল মশাই,” তপোব্রত বাবুর গলার স্বর কিছুটা আবেগে রুদ্ধ হয়ে এল, “এই নীলকণ্ঠ পালক আমাদের পরিবারের এক দীর্ঘদিনের গোপনীয়তা। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি, এই ধরনের ঐশ্বর্য ব্যক্তিমানুষের কাছে থাকা পাপ। আমি ঠিক করেছি কাল সকালেই এটি জাতীয় যাদুঘরে দান করে দেব। কিন্তু আজ রাতে আপনারা আমার আমন্ত্রিত অতিথি, তাই আপনাদের সামনে এটি শেষবারের মতো উন্মোচন করছি।”
বাক্সটির ডালা খোলার ঠিক আগের মূহুর্তে, পাহাড়ের বুকে এক প্রলয়ঙ্কারী বিদ্যুৎ চমকালো। জানলার ভারী পর্দাগুলো বাতাসের তোড়ে কাঁপতে শুরু করল। ঠিক সেই মূহুর্তে বাইরে এক বিশাল ঝাউগাছ উপড়ে পড়ার প্রচণ্ড শব্দ হলো আর সাথে সাথে বাংলোর প্রধান বিদ্যুৎ সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেবল ফায়ারপ্লেসের শেষ হয়ে আসা কয়লার ধিকিধিকি লাল আলোটুকু কোনোমতে জেগে আছে। ঠিক দশ সেকেন্ড—পুরো ঘর যেন এক দমচাপা উত্তেজনায় স্থির হয়ে রইল। হঠাৎ তপোব্রত বাবুর এক যন্ত্রণাকাতর অস্ফুট আর্তনাদ শোনা গেল। নীলু তৎক্ষণাৎ তার কোট থেকে হাই-পাওয়ার টর্চটি বের করে জ্বালাল।
আলোর রেখাটি যখন টেবিলের ওপর গিয়ে পড়ল, উপস্থিত সবার হৃৎপিণ্ড যেন একবারের জন্য থমকে গেল। টেবিলের ওপর মখমলের বাক্সটি উল্টে পড়ে আছে, কিন্তু তার ভেতরে সেই অমূল্য ‘নীলকণ্ঠ পালক’ নেই! তপোব্রত চৌধুরী তাঁর ইজিচেয়ারে মাথা এলিয়ে অচেতন। তাঁর গলার ঠিক নিচে একটি সূক্ষ্ম নীল রঙের দাগ ফুটে উঠেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে কোনো বিষাক্ত কিছুর সংস্পর্শে তিনি এসেছেন। অর্কপ্রতিম সান্যাল এক মুহূর্তের জন্য বিচলিত হলেন না। তিনি ধীর পায়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে এলেন। ঘরের প্রতিটি দরজা-জানলা আগে থেকেই বন্ধ ছিল। এর অর্থ পরিষ্কার—অপরাধী এই দশজনের মধ্যেই কেউ একজন।
অর্কপ্রতিম নিচু হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা একটি দেশলাই কাঠি পরীক্ষা করলেন। তারপর অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বললেন, “সোমনাথ বাবু, বাংলোর প্রধান ফটকটি এখনই তালাবদ্ধ করুন। রতন ঠাকুর, তুমি রান্নাঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করো। এই ঘরের ভেতরে যারা আছেন, তাদের কারোর জন্য আজ রাতের ছুটি নেই। নীলু, তোমার স্মার্টফোন থেকে ইনফ্রারেড মোডে ঘরের চারপাশের ছবি তোলো তো। আমি দেখতে চাই, অন্ধকারে কে কোথায় নিজের অবস্থান বদলেছে।”
ঘরভর্তি মানুষের মুখে আতঙ্কের ছাপ। লেখিকা মায়া সেনের হাত থেকে কফির কাপটি পড়ে ভেঙে গেল। সৃজন মল্লিক দেয়ালের সাথে সেঁটে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছেন। ডঃ হিমাংশু রায় তপোব্রত বাবুর নাড়ি পরীক্ষা করতে এগিয়ে গেলেন, কিন্তু অর্কপ্রতিম তাঁকে হাত দিয়ে থামিয়ে দিলেন। “ডাক্তার বাবু, ওঁর জ্ঞান ফেরার আগে আপনি ওঁর গায়ে হাত দেবেন না। আমি জানতে চাই, আপনার কোটের পকেটে ওই যে শিশিটা দেখা যাচ্ছে, ওতে কী আছে?”
হিমাংশু রায় কিছুটা বিব্রত হয়ে বললেন, “ওটা... ওটা আমার ইনহেলার, সান্যাল মশাই। আমার হাঁপানি আছে।”
অর্কপ্রতিম হাসলেন না। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত কুটিল রেখা ফুটে উঠল। তিনি বললেন, “রহস্য যখন ঘন হয়, তখন প্রতিটি ছোট জিনিসই অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই অন্ধকার দশ সেকেন্ডে যা ঘটেছে, তা কেবল চুরি নয়, তা এক নিখুঁত পরিকল্পনা। কেউ একজন জানতেন ঠিক কোন মূহুর্তে গাছটি পড়বে আর বিদ্যুৎ চলে যাবে। অর্থাৎ, এই বাংলোর বাইরের পৃথিবীর সাথেও কারোর যোগাযোগ রয়েছে।”
মায়ালোকের ড্রয়িংরুমে তখন বাতাসের বেগ বেড়েছে। ঝাউবনের সেই শব্দ এখন অনেকটা কান্নার মতো শোনাচ্ছে। অর্কপ্রতিম সান্যাল তাঁর সিগারের শেষ অংশটুকু অ্যাশট্রেতে পিষে দিলেন। শুরু হলো এক দীর্ঘ দাবার চাল, যেখানে বুদ্ধির চেয়েও বেশি প্রয়োজন ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান। তপোব্রত বাবুর অচেতন দেহটি যেন এক নিঃশব্দ প্রশ্নচিহ্ন হয়ে সবার সামনে পড়ে রইল। নীলকণ্ঠ পাখির পালকটি কি তবে চিরতরে হারিয়ে গেল পাহাড়ের এই কুয়াশার গভীরে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো পারিবারিক প্রতিশোধের গল্প?
দ্বিতীয় অধ্যায়
বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে ঘরের ভেতরের মানুষের স্নায়বিক উত্তেজনা। অর্কপ্রতিম সান্যাল ড্রয়িংরুমের মাঝখানে পায়চারি করছেন। তাঁর হাঁটার ছন্দে এক ধরণের গাণিতিক পরিমিতি রয়েছে। নীলু তখন ঘরের প্রতিটি কোণ তার হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা দিয়ে বন্দি করছিল। তপোব্রত চৌধুরীকে পাশের একটি ডিভানে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে, ডঃ হিমাংশু রায় তাঁর প্রাথমিক শুশ্রূষা করলেও অর্কপ্রতিমের কড়া নির্দেশ ছিল—তপোব্রত বাবুর গলার সেই নীল দাগটিতে কেউ যেন স্পর্শ না করে।
অর্কপ্রতিম স্থির হয়ে দাঁড়ালেন মায়া সেনের সামনে। মায়া সেনের চোখেমুখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক, তাঁর লম্বা আঙুলগুলো অনবরত তাঁর শাড়ির আঁচল নিয়ে খেলছে। অর্কপ্রতিম বললেন, "মায়া দেবী, আপনি তো গোয়েন্দা গল্প লেখেন। আচ্ছা, আপনার কোনো গল্পে কি এমন পরিস্থিতি আছে যেখানে দশজন মানুষ একটি ঘরে বন্দি, বাইরে প্রবল ঝড়, আর ভেতরে একটি অমূল্য সম্পদ চুরি হয়ে গেল? এই দৃশ্যপট কি আপনার চেনা মনে হচ্ছে না?"
মায়া সেন একটু কাঁপা গলায় উত্তর দিলেন, "সান্যাল মশাই, গল্প লেখা আর বাস্তবের মুখোমুখি হওয়া এক নয়। আমি... আমি জাস্ট স্তম্ভিত হয়ে গেছি। আমি তখন সোফার ডান দিকে বসেছিলাম, অন্ধকারের মধ্যে আমি শুধু একটা পশমি কাপড়ের ঘর্ষণ শুনতে পেয়েছিলাম।"
অর্কপ্রতিম ভ্রু কুঁচকালেন। "পশমি কাপড়ের ঘর্ষণ? ইন্টারেস্টিং। কিন্তু আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, এখানে উপস্থিত দশজনের মধ্যে ছয়জনই পশমি বা উলের পোশাক পরে আছেন? আপনার এই তথ্যটি যতটুকু না ইঙ্গিতবাহী, তার চেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর। ঠিক যেমনটি আধুনিক উত্তরাধুনিক সাহিত্যে দেখা যায়—অনেক শব্দ, কিন্তু অর্থের হদিশ মেলা ভার।"
এরপর তিনি ঘুরলেন অনির্বাণ বসুর দিকে। তপোব্রত বাবুর সচিব অনির্বাণ তখন থেকে ঘামছিলেন। অর্কপ্রতিম তাঁর একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। "অনির্বাণ বাবু, তপোব্রত বাবুর এই 'নীলকণ্ঠ পালক' প্রদর্শনের পরিকল্পনাটি আপনার আর তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না কি অন্য কেউ জানত?"
অনির্বাণ বাবু চশমাটা একবার মুছে নিলেন। "স্যার, তপোব্রত বাবু গত সাতদিন ধরে এই প্রদর্শনীর কথা বলছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সবাই জানুক। এমনকি শিল্পী সৃজনকেও তিনি ডেকেছিলেন যাতে সৃজন এই ব্রোচটির একটি স্কেচ করতে পারে। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি, আমি আলমারির চাবি সবসময় নিজের কাছেই রাখি।"
"অথচ চাবি ছাড়াই বাক্সটি খোলা হয়েছে," অর্কপ্রতিম তাঁর গলার স্বর কিছুটা নিচু করলেন, "এবং বাক্সটি খোলা হয়েছে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে। কোনো ধস্তাধস্তি হয়নি। অনির্বাণ বাবু, আপনার পকেটে যে কলমটি গোঁজা আছে, সেটি থেকে কালির গন্ধ আসছে না, আসছে এক ধরণের রাসায়নিকের গন্ধ। ওটি কি সত্যিই কলম, নাকি অন্য কিছু?"
অনির্বাণ ফ্যাকাসে হয়ে গেলেন। তিনি পকেট থেকে কলমটি বের করে দেখালেন, "এটা একটা সাধারণ ফাউন্টেন পেন, স্যার। আমি লেখালেখি করি বলে সবসময় সাথে রাখি।" নীলু পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, "মামা, কলমের নিবটা একবার দেখবে? ওটা যেন একটু বেশিই চওড়া।" অর্কপ্রতিম কলমটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করলেন এবং মৃদু হাসলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।
ঠিক সেই মূহুর্তে সৃজন মল্লিক হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, "এসব বন্ধ করুন! আমরা কি কয়েদি? আমি একজন শিল্পী, আমি এখানে এসেছিলাম সুন্দরের আরাধনা করতে। চুরির অপবাদ সইবার জন্য নয়। বিদিশা দিদি, আপনি চুপ করে আছেন কেন? আপনার বাবার এই দশা হলো, আর আপনি একটি শব্দও খরচ করছেন না?"
বিদিশা দেবী এতক্ষণ জানলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখাবয়ব পাথরের মতো শক্ত। তিনি শান্ত গলায় বললেন, "বাবা সবসময় বলতেন, অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। এই ব্রোচটির পেছনে যে রক্ত লেগে আছে, তা বাবা জানতেন। আমি চাইনি এই অভিশপ্ত বস্তু আমাদের ঘরে থাকুক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি এটি চুরি করেছি। আমি তো কেবল জানলার পাল্লাটা বন্ধ করতে গিয়েছিলাম।"
পুরো ঘরে যেন একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেল। সবাই বিদিশার হাতের দিকে তাকাল। বিদিশা হাতটা শাড়ির আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করলেন। ডঃ হিমাংশু রায় তখন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "সান্যাল মশাই, একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি একটা কথা বলতে চাই। তপোব্রত বাবুর গলায় যে নীল দাগটা দেখা যাচ্ছে, ওটা কোনো বিষ নয়। ওটা এক ধরণের রিঅ্যাকটিভ ডাই (Reactive Dye)। সাধারণত কোনো প্রাচীন ধাতুর গায়ে যদি দীর্ঘকাল প্রলেপ দেওয়া থাকে, তবে তা ঘাম বা তেলের সংস্পর্শে এসে এমন রঙ ছাড়তে পারে। কিন্তু এতে কেউ অচেতন হয় না। তপোব্রত বাবু সম্ভবত হার্ট অ্যাটাক করেছেন বা কোনো কিছুর আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়েছেন।"
অর্কপ্রতিম সোফায় ফিরে এসে বসলেন। তাঁর চিন্তার জটগুলো যেন ধীরে ধীরে খুলছে, আবার জট পাকিয়ে যাচ্ছে। তিনি নীলুকে বললেন, "নীলু, রতন ঠাকুরকে একবার ডেকে আনো তো। আর ডঃ রায়ের কোটটা ভালো করে পরীক্ষা করো। আমার মনে হচ্ছে, এই দশজন মানুষের মধ্যে একজন এমন আছেন, যিনি এখানে উপস্থিত থেকেও আসলে নেই। তিনি এক অদৃশ্য সুতোয় সবাইকে নাচাতে চাইছেন।"
মায়ালোকের পুরনো ঘড়িতে তখন এগারোটার ঘন্টা বাজল। অর্কপ্রতিম সান্যালের চোখে এক রহস্যময় দ্যুতি। তিনি জানতেন, চোরটি অত্যন্ত সুচতুর। সে কেবল ব্রোচটি চুরি করেনি, সে প্রত্যেকের মনের মধ্যে এক একটি সন্দেহের বীজ পুঁতে দিয়েছে। সৃজনের শিল্পসত্তা, বিদিশার নীরবতা, অনির্বাণের অস্থিরতা—সবই কি এক বিশাল নাটকের অংশ?
অর্কপ্রতিম এবার ডঃ হিমাংশু রায়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, "ডাক্তার বাবু, আপনি লন্ডনে যখন প্র্যাকটিস করতেন, তখন আপনার একটি থিসিস খুব জনপ্রিয় হয়েছিল—'দ্য সাইকোলজি অফ মাস হ্যালুসিনেশন'। আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন না যে আমাদের এই ঘরে যা যা ঘটছে, তার অনেকটা আমাদের মনের ভুলও হতে পারে? ধরুন, সেই ব্রোচটি যদি বাক্সটিতে আদৌ না থেকে থাকে? যদি তপোব্রত বাবু একটি শূন্য বাক্স খুলে আমাদের দেখাতে চেয়েছিলেন?"
সবাই চমকে উঠল। তপোব্রত বাবু কি তবে সবাইকে প্রতারিত করছিলেন? নাকি অর্কপ্রতিম সান্যাল কোনো নতুন মগজাস্ত্রের চাল চালছেন? বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ড্রয়িংরুমে তখন দশটি হৃদপিণ্ডের ধুকপুকুনি শোনা যাচ্ছে। রহস্যের এই গোলকধাঁধায় সত্যটা কোথায়, তা কেবল ওই নীলকণ্ঠ পাখির পালকই জানে।
তৃতীয় অধ্যায়
রাত যখন মাঝগগন পেরিয়ে রহস্যের আঁধারে মিশছে, তখন মায়ালোক বাংলোর ভেতরটা এক রুদ্ধশ্বাস রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়েছে। অর্কপ্রতিম সান্যাল ডঃ হিমাংশু রায়ের দিকে তাকিয়ে যে প্রশ্নটি ছুড়ে দিলেন, তা উপস্থিত সবার মনে এক প্রলয়ংকরী আলোড়ন সৃষ্টি করল। 'শূন্য বাক্স'! সত্যিই কি তপোব্রত বাবু এক অলীক ঐশ্বর্য প্রদর্শনের মোহজাল বিস্তার করেছিলেন?
নীলু তখন মামার ইশারায় অনির্বাণ বাবুর সেই সন্দেহজনক কলমটি একটি সাদা রুমালের ওপর রেখে পরীক্ষা করছিল। অর্কপ্রতিম একবার ডঃ রায়ের দিকে চোখ ফেরালেন, তারপর সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন পুরনো পাচক রতন ঠাকুরের সামনে। রতন ঠাকুর ঘরের এক কোণে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। অর্কপ্রতিম মৃদু স্বরে বললেন, "রতন, তুমি এই বাংলোয় কত বছর ধরে আছ?"
রতন মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় উত্তর দিল, "প্রায় চল্লিশ বছর সান্যাল মশাই। বড় বাবু যখন ছোট ছিলেন, তখন থেকে আমি এই বাড়ির নুন খেয়েছি।"
অর্কপ্রতিম ওর একদম চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "নুন খেয়েছ ঠিকই, কিন্তু আজ রাতে তুমি কফির সাথে কী খাইয়েছ সবাইকে? আমি লক্ষ্য করেছি, কফি খাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে তপোব্রত বাবুর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। আর মজার ব্যাপার হলো, তুমি নিজেও সেই কফি খেয়েছিলে, অথচ তোমার কিছুই হয়নি। কেন রতন? তোমার পাকস্থলী কি লোহা দিয়ে তৈরি?"
রতন ঠাকুর থতমত খেয়ে গেল। তার চোখের মণি কাঁপতে শুরু করল। ঠিক সেই মূহুর্তে পুলিশ অফিসার সোমনাথ বাবু বললেন, "সান্যাল মশাই, আমি রান্নাঘর তল্লাশি করে একটা অদ্ভুত জিনিস পেয়েছি। একটা ছোট নীল রঙের কাঁচের শিশি, যার গায়ে কোনো লেবেল নেই। আর সেটা পাওয়া গেছে রতনের মশলার কৌটোর আড়ালে।"
সোমনাথ বাবু শিশিটি অর্কপ্রতিমের হাতে দিলেন। অর্কপ্রতিম সেটি শুঁকে দেখলেন, তারপর সেটি ডঃ হিমাংশু রায়ের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। "ডাক্তার বাবু, আপনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হলেও কেমিস্ট্রিতে আপনার জ্ঞান অগাধ। দেখুন তো, এটা কি সেই তিব্বতি ভেষজ নির্যাস নয়, যা মানুষকে সাময়িকভাবে হ্যালুসিনেশন বা মতিভ্রমের শিকার করে? এই নির্যাসটি বাতাসে মিশলে মানুষ যা দেখতে চায়, তাকেই সত্য বলে ভ্রম হয়।"
হিমাংশু রায় শিশিটি হাতে নিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন। ঘরভর্তি দশজন মানুষের মধ্যে তখন এক আতঙ্কের হিল্লোল বয়ে গেল। লেখিকা মায়া সেন হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, "তার মানে কি আমরা যা দেখলাম—সেই নীলকণ্ঠ পালক—ওটা কি আমাদের মনের ভুল? ওই বাক্সটা কি সত্যিই খালি ছিল?"
অর্কপ্রতিম হাসলেন। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর শ্লেষ মিশে ছিল। তিনি বললেন, "মায়া দেবী, গোয়েন্দা গল্পে যেমন হয়—সবচেয়ে সহজ সত্যটা আমরা সবচেয়ে শেষে দেখি। তপোব্রত বাবু আজ রাতে কাউকে কোনো ব্রোচ দেখাতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন চোরকে ধরতে। তিনি জানতেন তাঁর সচিব বা তাঁর কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এই বহুমূল্য পালকটির ওপর নজর রেখেছেন। তাই তিনি ডঃ রায়ের সাথে পরামর্শ করে এই 'মাস হ্যালুসিনেশন'-এর ফাঁদ পেতেছিলেন।"
অর্কপ্রতিম বিদিশার কাছে গিয়ে তাঁর হাতটা ধরলেন। "বিদিশা দেবী, আপনার হাতের এই দাগটা কোনো বিষ নয়। এটা হলো 'ইনভিজিবল ডাই' বা অদৃশ্য কালি। তপোব্রত বাবু যখনই আপনাকে বা অন্য কাউকে সেই মখমলের বাক্সটি স্পর্শ করতে বলেছিলেন, তখনই সেই কালি আপনাদের হাতে লেগে গিয়েছিল। এই কালিটি কেবল অতিবেগুনি রশ্মিতে দেখা যাওয়ার কথা, কিন্তু কোনো কারণে এই ঘরের বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় তা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে নীল বর্ণ ধারণ করেছে।"
তিনি এবার ঘুরে দাঁড়ালেন সৃজন মল্লিকের দিকে। সৃজন তখন থেকে অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেছেন। তাঁর হাতে থাকা স্কেচবুকটি তিনি শক্ত করে ধরে আছেন। অর্কপ্রতিম বললেন, "সৃজন, তুমি তো শিল্পী। তুমি অন্ধকারের মধ্যে ওই ব্রোচটির একটি স্কেচ করছিলে। তোমার স্কেচবুকে কি আমি একবার নজর দিতে পারি?"
সৃজন একটু ইতস্তত করে বইটি এগিয়ে দিলেন। অর্কপ্রতিম পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ থমকে গেলেন। একটি পাতায় আঁকা আছে সেই নীলকণ্ঠ পালকের এক নিখুঁত ছবি, কিন্তু পালকের খাঁজে খাঁজে লেখা আছে কিছু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংখ্যা। অর্কপ্রতিম একটি আতশ কাঁচ বের করে সেগুলো দেখলেন। "নীলু, দেখেছ? এগুলো কোনো সংখ্যার সারি নয়, এগুলো হলো লন্ডনের একটি ভল্টের কোড। অনির্বাণ বাবু, আপনি কি এই কোডগুলোর অর্থ জানেন?"
অনির্বাণ বাবু তখন কার্যত মেঝেতে বসে পড়েছেন। তিনি স্বীকার করলেন যে, তপোব্রত বাবুর অজান্তেই তিনি এই ব্রোচটি বিক্রি করার জন্য এক বিদেশি স্মাগলারের সাথে চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু তিনি চুরির সুযোগ পাননি, কারণ বিদ্যুৎ যাওয়ার আগেই কেউ একজন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল।
অর্কপ্রতিম ড্রয়িংরুমের লাইটগুলো আবার জ্বালানোর নির্দেশ দিলেন। জেনারেটর চালু হওয়ায় ঘরে আবার জোরালো আলো ফিরল। অর্কপ্রতিম এবার টেবিলের ওপর রাখা সেই শূন্য বাক্সটি তুললেন। "বন্ধুগণ, এই রহস্যের সমাধান প্রায় আমাদের দোরগোড়ায়। কিন্তু একটি জিনিস এখনও মিলছে না। যদি তপোব্রত বাবু নিজে এই ফাঁদ পেতে থাকেন, তবে তিনি অচেতন কেন? তাঁর গলায় সেই নীল দাগটি কীভাবে এল? কারণ তিনি তো নিজে বাক্সটি স্পর্শ করার কথা নয়।"
নীলু হঠাৎ বলে উঠল, "মামা! তপোব্রত বাবুর পকেটে ওটা কী?"
অর্কপ্রতিম তপোব্রত বাবুর পকেট থেকে বের করলেন একটি ছোট রিমোট কন্ট্রোল। তিনি সেটা টিপতেই ড্রয়িংরুমের একটি দেওয়াল আলমারি নিঃশব্দে সরে গেল। ভেতরে দেখা গেল একটি ছোট ল্যাবরেটরি। সেখানে সারি সারি নীল কাঁচের শিশি। অর্কপ্রতিম বুঝলেন, তপোব্রত চৌধুরী কেবল একজন সংগ্রাহক নন, তিনি আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রাচীন বস্তুর রহস্য উন্মোচন করতে চাইছিলেন।
রহস্যের এই সন্ধিক্ষণে অর্কপ্রতিম সান্যাল এক নতুন তত্ত্ব খাড়া করলেন। তিনি বললেন, "এই ঘরে উপস্থিত দশজনের মধ্যে একজন এমন আছেন, যিনি ডঃ রায়ের থিসিস পড়েছেন, অনির্বাণের লোভের কথা জানেন এবং বিদিশার ক্ষোভকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন। তিনি হলেন সেই নীরব দর্শক, যিনি মায়া সেনের লেখনীতে নয়, বরং বাস্তবে একটি নিখুঁত অপরাধের চিত্রনাট্য লিখেছেন।"
অর্কপ্রতিমের দৃষ্টি এবার গিয়ে স্থির হলো এমন একজনের ওপর, যাকে কেউ সন্দেহের তালিকায় রাখেনি। মায়ালোকের বাতাস তখন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। বাইরে ঝড়ের তান্ডব কমে এলেও মনের ভেতরের ঝড় তখন তুঙ্গে। কে সেই জন? রতন ঠাকুর? নাকি স্বয়ং পুলিশ অফিসার সোমনাথ? নাকি মায়া সেনের গল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো পরিচয়?
অর্কপ্রতিম সান্যাল তাঁর তর্জনী উঁচিয়ে বললেন, "রহস্য যখন শিল্পের রূপ নেয়, তখন শিল্পীকেও একটু সাবধান হতে হয়।" তিনি সৃজন মল্লিকের স্কেচবুকের সেই কোডগুলোর দিকে ইশারা করে বললেন, "সৃজন, তুমি কোডগুলো পেলে কোথায়? তপোব্রত বাবু তো ভল্টের কোড কাউকে বলেননি।"
সৃজন মল্লিক এক অদ্ভুত হাসি হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক ধরণের জয়ের আনন্দ। রহস্যের তৃতীয় অধ্যায়টি শেষ হলো এক চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে।
চতুর্থ অধ্যায়
সৃজন মল্লিকের সেই অট্টহাসি ড্রয়িংরুমের গাম্ভীর্যকে মুহূর্তেই চুরমার করে দিল। অর্কপ্রতিম সান্যাল এক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। ঘরের বাকি অতিথিরা—বিদিশা থেকে শুরু করে ডঃ হিমাংশু—সবাই যেন পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ। সৃজন তাঁর স্কেচবুকটি দু-হাতে জাপটে ধরে বললেন, "সান্যাল মশাই, আপনি ঠিকই ধরেছেন। শিল্পীর চোখ দিয়ে যা দেখা যায়, সাধারণ মানুষের মগজ তা কল্পনাও করতে পারে না। কোডগুলো আমি পেয়েছি তপোব্রত বাবুর সেই নীলকণ্ঠ পালকের গায়েই। লেন্স দিয়ে না দেখলে ওই সূক্ষ্ম খোদাই করা সংখ্যাগুলো কারোর চোখে পড়ার কথা নয়।"
অর্কপ্রতিম স্থির গলায় বললেন, "কিন্তু সৃজন, তুমি একটা জিনিস ভুল করছ। তপোব্রত বাবু যখন বাক্সটা খুলতে যাচ্ছিলেন, তখনও আলো ছিল। তুমি স্কেচ করছিলে দূর থেকে। অত দূর থেকে পালকের গায়ে খোদাই করা মাইক্রো-কোড পড়া কি সম্ভব? যদি না তোমার কাছে আগে থেকেই ওই পালকটি থাকে।"
নীলু সাথে সাথে সৃজনের ব্যাগটি তল্লাশি করতে এগিয়ে গেল। সৃজন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেন না, কেবল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততায় জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নীলু ব্যাগের ভেতর থেকে বের করে আনল একটি রেশমি রুমাল, যাতে মোড়ানো রয়েছে একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি—আরেকটি নীলকণ্ঠ পালক! কিন্তু সেটি আসল হীরা-পান্নার নয়, বরং অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি প্লাস্টার অফ প্যারিস আর সিন্থেটিক রঙের এক চমৎকার রেপ্লিকা।
অর্কপ্রতিম সেই রেপ্লিকাটি হাতে নিলেন। "চমৎকার কাজ! সৃজন, তোমার হাতের জাদু আছে মানতেই হয়। তুমি কি চেয়েছিলে আসলের বদলে এই নকলটি রেখে দিতে? কিন্তু বিদ্যুৎ যাওয়ার আগে তপোব্রত বাবু তো বাক্সটি খুলতেই পারেননি। তবে কি তুমি অন্ধকারে হাতের কারসাজিতে বাক্স বদলেছিলে?"
ঠিক এই মূহুর্তে তপোব্রত চৌধুরী একটু উসখুস করে উঠলেন। তাঁর চেতনার পর্দাটা ধীরে ধীরে সরছে। ডঃ হিমাংশু রায় এগিয়ে গিয়ে তাঁর নাড়ি পরীক্ষা করলেন। "সান্যাল মশাই, ওঁর জ্ঞান ফিরছে। তবে উনি এখনও অত্যন্ত দুর্বল।" তপোব্রত বাবু চোখ মেললেন। তাঁর দৃষ্টি ঝাপসা। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, "নীল... নীলকণ্ঠ... ওটা আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিল কেউ..."
অর্কপ্রতিম তপোব্রত বাবুর কাছে ঝুঁকে বসলেন। "তপোব্রত বাবু, আপনি শান্ত হোন। আপনি কি কাউকে দেখেছিলেন অন্ধকারে?"
তপোব্রত বাবু তাঁর কম্পিত হাতটা তুললেন। তিনি আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন মায়া সেনের দিকে। মায়া সেন চিৎকার করে উঠলেন, "না! আমি কিছু করিনি! আমি কেন করতে যাব? আমি তো কেবল একজন লেখিকা!"
অর্কপ্রতিম মায়া সেনের দিকে ফিরলেন। "মায়া দেবী, আপনি লেখিকা হতে পারেন, কিন্তু আপনার আসল পরিচয় কি ডঃ হিমাংশু রায়ের প্রাক্তন স্ত্রী নয়? লন্ডনের সেই কুখ্যাত আর্ট হেইস্ট বা শিল্প-চুরির মামলায় আপনার নাম কি জড়িয়ে ছিল না? হিমাংশু বাবু, আপনি কি ভেবেছিলেন মায়ালোকের এই নির্জনতায় আপনারা দুজনে মিলে তপোব্রত বাবুর শ্রেষ্ঠ সম্পদটি হাতিয়ে নেবেন?"
ডঃ হিমাংশু রায়ের চেহারা মুহূর্তেই পাল্টে গেল। তাঁর সেই চিকিৎসকসুলভ সৌম্যভাব উধাও হয়ে সেখানে এক ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। "অর্কপ্রতিম বাবু, আপনি সত্যিই জিনিয়াস! কিন্তু আপনি একটা হিসেব মেলাতে পারছেন না। আমরা যদি চুরিই করব, তবে তপোব্রত বাবুকে কেন মারতে যাব? উনি তো আমাদের বন্ধু।"
"মারতে নয়," অর্কপ্রতিম সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, "আপনারা চেয়েছিলেন ওঁর স্মৃতিভ্রষ্ট করতে। ওই নীল বিষ বা রিঅ্যাকটিভ ডাই, যা তপোব্রত বাবুর গলায় লেগে আছে, ওটা আসলে এক ধরণের নিউরোটক্সিন। যা চামড়ার সংস্পর্শে এলে মানুষ কয়েক ঘণ্টার জন্য সাময়িকভাবে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে। আপনারা চেয়েছিলেন উনি যখন জ্ঞান ফিরে পাবেন, তখন তিনি যেন ভুলেই যান যে তাঁর কাছে আদতে কোনো পালক ছিল কি না।"
কিন্তু আসল রহস্যটা তখনও বাকি। অর্কপ্রতিম অনির্বাণ বাবুর দিকে তাকালেন। "অনির্বাণ বাবু, আপনি তো স্মাগলারের সাথে চুক্তি করেছিলেন। আপনি কি জানতেন যে আপনার চুক্তির সেই পালকটি আগেই বদল হয়ে গেছে? রতন ঠাকুর, তুমি যখন কফি দিতে আসছিলে, তখন তুমি ট্রের তলায় কী লুকিয়ে এনেছিলে?"
রতন ঠাকুর থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে বসে পড়ল। "বড় বাবু... আমাকে মাফ করবেন। আমাকে সৃজন বাবু টাকা দিয়েছিলেন ওই চাবিটা নকল করার জন্য। আমি শুধু চাবিটা দিয়েছিলাম, বাকি কিছু আমি জানি না।"
অর্কপ্রতিম এবার ঘরভর্তি মানুষের দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই অমল হাসিটি হাসলেন। "বন্ধুগণ, এই রহস্যের খেলাটা বড়ই জটিল। এখানে তিনটে আলাদা দল কাজ করছিল। অনির্বাণ চাইছিল বিক্রি করতে, হিমাংশু আর মায়া চাইছিলেন স্মৃতি মুছে দিয়ে হাতিয়ে নিতে, আর সৃজন চাইছিল নিজের হাতের তৈরি নকলটি দিয়ে আসলটি বদলে ফেলতে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নীলকণ্ঠ পালকটি এখন কারোর কাছেই নেই। কারণ সেটি এই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে বিদ্যুৎ যাওয়ার সেই দশ সেকেন্ডের মধ্যেই।"
অর্কপ্রতিম জানলার দিকে ইশারা করলেন। জানলার একটি কাঁচ ভাঙা ছিল না, কিন্তু জানলার পাল্লাটি সামান্য ফাঁক হয়ে ছিল। "নীলু, বাইরে ঝাউগাছতলায় একবার গিয়ে দেখো তো। পাহাড়ের সেই প্রকাণ্ড ঝাউগাছটি যা উপড়ে পড়েছিল, ওটা কি সত্যিই বাতাসের তোড়ে পড়েছিল, নাকি কেউ ওটাকে আগে থেকেই আলগা করে রেখেছিল?"
নীলু টর্চ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। বৃষ্টির জল কাদা মাখিয়ে সে যখন ফিরে এল, তার হাতে ছিল একটি ছোট সিল্কের সুতো আর একটি অদ্ভুত বাঁশি। অর্কপ্রতিম বাঁশিটি হাতে নিলেন। "এটা তিব্বতি শিকারিদের বাঁশি। এই বাঁশির আওয়াজে এক ধরণের বিশেষ প্রশিক্ষিত বাজপাখি নেমে আসে। তপোব্রত বাবু যখনই বাক্সটি খুললেন, ঠিক সেই মূহুর্তে ঝাউগাছটি পড়ে বিদ্যুৎ গেল, আর সেই অন্ধকারের সুযোগে জানলার ফাঁক দিয়ে আসা একটি পোষা পাখি ছোঁ মেরে পালকটি নিয়ে উড়ে গেল।"
সবার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এল। এমন এক অভাবনীয় উপায়ে চুরি হতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। অর্কপ্রতিম এবার ঘুরে দাঁড়ালেন দশম চরিত্রটির দিকে—যাকে কেউ এতক্ষণ আমলই দেয়নি। বিদিশা দেবীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর ব্যক্তিগত আয়া বা পরিচারিকা, যে এতক্ষণ আড়ালে ছিল।
"আপনি কে?" অর্কপ্রতিমের প্রশ্নটি বজ্রের মতো শোনাল।
পরিচারিকাটি ঘোমটা সরালেন। তাঁর চোখে এক অসীম ঘৃণা। তিনি বললেন, "আমি সেই অভাগীর মেয়ে, যার বাবাকে এই নীলকণ্ঠ পালকের জন্য তপোব্রত চৌধুরী চল্লিশ বছর আগে জেল খাটিয়েছিলেন। আমি এখানে কাজ করতে আসিনি, আমি এসেছি আমার বাবার অপমানের প্রতিশোধ নিতে। ওই পালকটি এখন পাহাড়ের চূড়ায় আমার বাবার কবরের ওপর রাখা আছে। আপনারা আমাকে ধরতে পারেন, কিন্তু পালকটি আর কোনোদিন কোনো মানুষের হাতে যাবে না।"
মায়ালোকের ড্রয়িংরুমের বাতাস তখন হিমশীতল হয়ে গেছে। অপরাধী ধরা পড়েছে, কিন্তু অপরাধের কারণটি ছিল অনেক গভীরে প্রোথিত। অর্কপ্রতিম সান্যাল বিড়বিড় করে বললেন, "শব্দশৈলী আর অলংকারের চেয়েও মানুষের জেদ অনেক বড় সত্য, নীলু।"
পঞ্চম অধ্যায়
বাইরে বৃষ্টির তীব্রতা কমে এসেছে, কেবল ঝাউপাতা থেকে জল চুইয়ে পড়ার একটা একঘেয়ে শব্দ নির্জনতাকে আরও গভীর করে তুলছে। অর্কপ্রতিম সান্যাল তাঁর কাশ্মীরি শালটি কাঁধে টেনে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন বিদিশা দেবীর পরিচারিকা সাবিত্রীর দিকে। সাবিত্রী এখন আর কোনো সামান্য পরিচারিকা নয়; তাঁর ঋজু দেহভঙ্গি আর চোখের জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে এক অপার্থিব দৃঢ়তা।
অর্কপ্রতিম বললেন, "সাবিত্রী দেবী, আপনি যে কৌশলে বাজপাখি ব্যবহার করে এই কাজ করেছেন, তা কোনো দুর্ধর্ষ রোমাঞ্চ কাহিনীর চেয়ে কম নয়। কিন্তু আপনি ভুলে গেছেন, আইন আবেগ বোঝে না। আপনি কি জানেন এর পরিণতি কী হতে পারে?"
সাবিত্রী একটি ম্লান হাসি হাসলেন। "সান্যাল মশাই, যারা হারাবার কিছু রাখে না, তারা পরিণতির ভয় পায় না। তপোব্রত চৌধুরী যখন পারস্যের সেই পালকটি মিউজিয়ামে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন, তখন কি তিনি একবারও ভেবেছিলেন যে এই পালকের আদি মালিকের বংশধররা আজও পাহাড়ের ফুটপাতে ভিক্ষা করে? আমার বাবা ছিলেন তপোব্রত বাবুর সহকর্মী। ল্যাবরেটরিতে এই পালকের রাসায়নিক পরীক্ষা করার সময় একটি ভুল হয়েছিল, আর সেই ভুলের সব দায় বাবার ওপর চাপিয়ে ওনাকে জেলে পাঠিয়েছিলেন এই লোকটা।"
তপোব্রত চৌধুরী তখন পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন। তিনি অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে রইলেন। ঘরের বাকি সদস্যরা—অনির্বাণ, সৃজন, হিমাংশু—সবাই যেন হঠাৎ নিজেদের ক্ষুদ্রতা অনুভব করতে শুরু করলেন। তাঁদের লোভ, শিল্প-তৃষ্ণা বা প্রতিপত্তি লাভের আকাঙ্ক্ষা সাবিত্রীর এই দীর্ঘ চল্লিশ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সামনে বড্ড ফিকে হয়ে গেছে।
অর্কপ্রতিম এবার পুলিশ অফিসার সোমনাথ দত্তর দিকে ফিরলেন। "সোমনাথ বাবু, সাবিত্রী দেবীর জবানবন্দি আপনি রেকর্ড করেছেন। কিন্তু আমাদের আগে ওই নীলকণ্ঠ পালকটি উদ্ধার করতে হবে। ওটি কোনো ব্যক্তির নয়, ওটি ইতিহাসের সম্পদ। সাবিত্রী দেবী, আপনি কি আমাদের নিয়ে যাবেন সেই সমাধিস্তম্ভের কাছে?"
পাহাড়ের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অর্কপ্রতিম, নীলু, সোমনাথ বাবু আর সাবিত্রী চললেন কুয়াশার বুক চিরে। টর্চের আলোয় পাইন বনের ছায়াগুলো যেন ভূতের মতো নাচছিল। পাহাড়ের এক নির্জন ঢালে, যেখানে প্রাচীন এক বৌদ্ধ স্তূপের পাশে পুরনো কবরখানা, সেখানে গিয়ে সাবিত্রী থামলেন। একটি সাধারণ পাথরের কবরের ওপর রাখা ছিল সেই বিমূর্ত ঐশ্বর্য—নীলকণ্ঠ পালক। চাঁদের আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসে যখন সেই পালকের হীরা-পান্নায় পড়ল, তখন মনে হলো স্বয়ং মহাকাল নীলকণ্ঠ বিষ পান করে জগতের অমৃতকে রক্ষা করছেন।
নীলু এগিয়ে গিয়ে পালকটি হাতে তুলে নিল। সে অবাক হয়ে দেখল, পালকটির রঙ আগের চেয়েও গাঢ় নীল হয়ে গেছে। অর্কপ্রতিম ওর মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, "নীলু, বিজ্ঞান আর আবেগ যখন মিশে যায়, তখন তাকেই লোকে মিরাকল বলে। আসলে এই পালকের গায়ে যে রিঅ্যাকটিভ ডাই ছিল, তা পাহাড়ের ঠান্ডা আর আর্দ্রতায় জারিত হয়ে এই রূপ নিয়েছে। মানুষ একে অলৌকিক ভাববে, কিন্তু এ কেবল প্রকৃতির খেলা।"
বাংলোয় ফেরার পথে অর্কপ্রতিম সান্যাল অদ্ভুতভাবে চুপচাপ ছিলেন। নীলু জিজ্ঞেস করল, "মামা, ফেলুদা হলে এই কেসটাকে কী নাম দিতেন?" অর্কপ্রতিম একটু ভেবে বললেন, "হয়তো 'কালিম্পঙের কুয়াশা' বা 'পারস্যের অভিশাপ'। কিন্তু আমার কাছে এটা শব্দশৈলী আর অলঙ্কারের আড়ালে থাকা এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প।"
পরের দিন ভোরে যখন কালিম্পঙের আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরে প্রথম রোদ আছড়ে পড়ল, তখন মায়ালোক বাংলো থেকে বিদায় নিচ্ছেন অর্কপ্রতিম। তপোব্রত চৌধুরী দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চোখের কোণে জল। তিনি বললেন, "সান্যাল মশাই, আমি আজই সাবিত্রীর বাবার নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করব। আর এই পালকটি? এটি আমি চাই না।"
অর্কপ্রতিম মৃদু হেসে বললেন, "পালকটি এখন থেকে সরকারি হেফজতে থাকবে। ইতিহাসের ভার বড় বেশি ভারী হয়, তপোব্রত বাবু। সাধারণ মানুষ তা বইতে পারে না।"
ট্যাক্সিতে ওঠার সময় নীলু তার ফোনে তোলা ছবিগুলো দেখছিল। হঠাৎ সে বলে উঠল, "মামা, একটা প্রশ্ন থেকে গেল। ডঃ হিমাংশু আর মায়া সেনের কী হবে?" অর্কপ্রতিম জানলার বাইরে পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে বললেন, "সোমনাথ বাবু ওদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ পেয়েছেন। শিল্পের প্রতি অন্ধ মোহ আর ব্যক্তিগত লোভ যখন মানুষকে অপরাধী বানায়, তখন সমাজ তাকে ক্ষমা করে না। তবে সৃজন মল্লিককে আমি ছেড়ে দিতে বলেছি। ওর মতো শিল্পী এই পৃথিবীতে কম আছে। ও কেবল সৌন্দর্যের কাঙাল ছিল, চোর নয়।"
গাড়ি যখন পাহাড়ের বাঁক নিয়ে নিচে নামতে শুরু করল, তখন অর্কপ্রতিম সান্যাল তাঁর ডায়েরিতে শেষ বাক্যটি লিখলেন: "রহস্যের শেষ আছে, কিন্তু অনুতাপের কোনো সীমানা নেই।"
কালিম্পঙের সেই কুয়াশা তখন ধীরে ধীরে কাটছে। দূরে নীলকণ্ঠ পাখির একটি ডাক প্রতিধ্বনিত হলো শৈলশিখরে। সত্যের জয় হয়েছে, কিন্তু সেই জয়ের মধ্যে এক বিষণ্ণ আভিজাত্য লেপ্টে ছিল, যা কেবল অর্কপ্রতিম সান্যালের মতো মননশীল মানুষের পক্ষেই অনুভব করা সম্ভব।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।