শুভ তখন জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আহেরী স্থবির হয়ে ছিল নার্সিংহোমের উল্টোদিকের ফুটপাথে। দুটো হাত জড়ো করে কেবল দাঁড়িয়েছিল নিজের বুকের কাছে। যেন বুকের মধ্যে একটা ছোট্ট পাখি আছে। খুব ভয় পেয়েছে সে, তাকে শান্ত করতে হবে।
অষ্টমীর বিকেল। শহরের গায়ে উৎসবের রঙিন প্রলেপ। প্যান্ডেলের সামনে মানুষের ঢল, ঢাকের আওয়াজ, বাতাসে ধূপ আর কাশফুলের গন্ধ অথচ নার্সিংহোমের জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা শুভর মুখে কোনও উৎসবের ছায়া ছিল না। ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা। পৃথিবীর সমস্ত শব্দ তার কাছে এসে পৌঁছনোর আগেই কোথায় যেন থেমে যাচ্ছে।
আহেরী জানত, শুভ আর বেশিদিন বাঁচবে না।
ডাক্তাররা কথাটা সরাসরি বলেননি। তাঁরা কেবল কয়েকটা শব্দ ব্যবহার করেছিলেন—‘সময়’, ‘সাড়া’, ‘পরবর্তী কয়েকটা দিন’। কিন্তু মৃত্যুরও একটা নিজস্ব ব্যাকরণ আছে। আহেরী সেই ব্যাকরণ পড়তে শিখে গিয়েছিল।
শুভর চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝেছিল, ছেলেটি নিজের মৃত্যুকে আর ভয় পায় না। ভয় পায় পৃথিবীটা একদিন তার অনুপস্থিতিতেও ঠিক আগের মতো চলতে থাকবে।
আহেরী তাকে ভালোবাসত। কথাটা সে কোনওদিন বলেনি। কারণ ভালোবাসার কথাটা বলার জন্য যে অবকাশটুকু লাগে, শুভর জীবনে সেই অবকাশ কোনদিনই ছিল না। হাসপাতালের করিডর ছিল, ওষুধের গন্ধ ছিল, রিপোর্টের কাগজ ছিল, আর মাঝেমধ্যে ছিল একটু সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষণিক প্রতিশ্রুতি। আর কিচ্ছু না।
কিন্তু আজ অষ্টমী। আজ শুভর জন্য কিছু একটা করা দরকার।
আহেরী হঠাৎ রাস্তা পেরিয়ে গেল।
নার্সিংহোমের সামনে এসে সে দেখল, গেটের পাশে একটা ছোট্ট ছেলে প্লাস্টিকের নৌকা বিক্রি করছে। নৌকাগুলোর গায়ে লাল, নীল, হলুদ রং। আহেরী একটা নৌকা কিনে নিল। তারপর গেটের নিরাপত্তারক্ষীকে বলল, “শুভ বিশ্বাসের কাছে দেবেন? বলবেন, অষ্টমীর উপহার।”
লোকটা নৌকাটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ফুলটুল হলে ভালো হত।”
আহেরী হেসে ফেলল।
“ফুল তো শুকিয়ে যায়। নৌকাটা কোথাও না কোথাও ঠিক যাবে।”
কথাটা বলে সে আবার ফুটপাথে ফিরে এল। জানালার কাছে শুভ তখনও দাঁড়িয়ে।
একটু পরে দেখা গেল, শুভ নৌকাটা হাতে নিয়েছে।
তারপর কী আশ্চর্য, ছেলেটি নৌকাটাকে জানালার কাচে ঠেকিয়ে রাখল। যেন বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে আর সে নৌকাটাকে জলে নামানোর আগে শেষবারের মতো আকাশ জলে ফেলে দেখাচ্ছে।
আহেরীর মনে হল, এখনও পৃথিবীতে কিছু কিছু উপহার আছে যেগুলোর কোনও ব্যবহার নেই। অথচ সেগুলো ছাড়া পৃথিবীটা একেবারে অসম্পূর্ণ।
শুভর সঙ্গে আহেরীর প্রথম দেখা হয়েছিল কলেজের লাইব্রেরিতে। শুভ তখন একটা পুরোনো বইয়ের পাতার মধ্যে শুকনো শিউলি রেখে দিয়েছিল। আহেরী বইটা নিতে গিয়ে ফুলটা মেঝেতে পড়ে যেতে দেখে তুলে দিয়েছিল।
শুভ বলেছিল, “ফুলটা কিন্তু আমার নয়।”
“তাহলে?”
“যে বইটা পড়বে, তার।”
আহেরী হেসে বলেছিল, “তাহলে তো ফুলটা আমার হয়ে গেল।”
সেই প্রথম। তারপর থেকে শুভর সঙ্গে আহেরীর আলাপ বাড়তে থাকে। কলেজের ক্যান্টিনে চা, বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখা, বইমেলায় অকারণে ঘুরে বেড়ানো — সবকিছুর মধ্যেই ছিল একটা অদ্ভুত অনায়াস ।
শুভ খুব বেশি কথা বলত না। কিন্তু যখন বলত মনে হত, কথাগুলো সে অনেকক্ষণ ধরে নিজের মধ্যে রেখে দিয়েছে। একদিন আহেরীকে বলেছিল, “জানো, আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে একটা জিনিস খুব মিস করব।”
“কী?”
“বিকেলবেলা জানালার কাচে রোদ পড়া।”
আহেরী হেসে বলেছিল, “এত কিছু থাকতে রোদ?”
“রোদটা তো প্রতিদিন আসে। অথচ কোনওদিন একই রকম হয় না।”
আহেরী সেদিন কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি। আজ বুঝতে পারছে। শুভর অসুখটা ধরা পড়ার পর সবকিছু বদলে গেল। প্রথমদিকে সে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করত। আহেরীকে বলত, “দেখো, আমার কিন্তু কোনওদিন চুল পড়বে না।”
আহেরী বলত, “তোমার চুল নিয়ে এত চিন্তা কেন?”
“তোমার পছন্দ বলে।”
আহেরী মুখ ফিরিয়ে নিত। তারপর একদিন শুভর মাথায় চুলের ফাঁক দেখা গেল। আর একদিন তার হাতের শিরাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। শরীরের ভিতর থেকে যেন কেউ ধীরে ধীরে আলো সরিয়ে নিচ্ছিল।
আহেরী প্রতিদিন দেখা করতে যেত। কখনও বই নিয়ে, কখনও কমলালেবু আবার কখনও কোনও অকারণ গল্প। শুভর সামনে বসে সে পৃথিবীর সমস্ত ছোটখাটো খবর বলত। কোন রাস্তায় নতুন গাছ লাগানো হয়েছে, কোন দোকানে ভালো ফুচকা পাওয়া যাচ্ছে, কোন কবিতার বইটা পড়ে তার কান্না পেয়েছে।
শুভ মন দিয়ে শুনত। মাঝে মাঝে বলত, “তুমি এত কিছু মনে রাখো কী করে?”
আহেরী বলত, “কেউ তো রাখবে।”
শুভ তখন জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত।
একদিন আহেরী বলেছিল, “তুমি সুস্থ হয়ে গেলে আমরা কোথাও বেড়াতে যাব।”
“কোথায়?”
“যেখানে কোনও নার্সিংহোম নেই।”
শুভ হেসেছিল।
“এমন জায়গা আছে?”
“আছে। আমি খুঁজে রেখেছি।”
“কোথায়?”
আহেরী উত্তর দিতে পারেনি। আসলে সে কোনও জায়গা খুঁজে রাখেনি। সে শুধু একটা ভবিষ্যৎ খুঁজে রেখেছিল। যেখানে শুভ থাকবে।
অষ্টমীর রাতটা নার্সিংহোমের ভিতরে অদ্ভুত সুন্দর ছিল। দূরে কোথায় যেন ঢাক বাজছিল। হাসপাতালের জানালার বাইরে জ্বলছিল আলোর মালা। শুভ বিছানায় শুয়ে। পাশে রাখা কাগজের নৌকাটা তার বালিশের কাছে।
আহেরী এসে বসতেই শুভ বলল, “তুমি আজ পুজো দেখোনি?”
“দেখেছি।”
“মিথ্যে বলছ।”
“কী করে বুঝলে?”
“তোমার চোখে এখনও আলো লাগেনি।”
আহেরী একটু চুপ করে থেকে বলল, “তোমাকে একটা কথা বলব?”
শুভ তার দিকে তাকাল।
“বলো।”
আহেরী অনেকক্ষণ ধরে নিজের ভিতর শব্দ খুঁজল অথচ শব্দগুলো যেন সব একে অন্যের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।
সে বলতে চেয়েছিল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। বলতে চেয়েছিল, তোমার চলে যাওয়ার পরে আমার কাছে আর আগের মতো থাকবে না এই পৃথিবীটা। বলতে চেয়েছিল, তুমি একটু থেকে যাও।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বলল, “তুমি জানো, আজ শহরে কত আলো?”
শুভ মৃদু হেসে বলল, “জানি।”
“কী করে?”
“তোমার চোখে দেখছি।”
আহেরী মুখ নামিয়ে ফেলল। তারপর শুভ বলল, “আহেরী, একটা অদ্ভুত কথা বলব?”
“বলো।”
“আমার মনে হয়, মানুষ আসলে পুরোপুরি কোথাও যায় না।”
আহেরী বিস্ময়ে তাকাল।
“কোথায় থাকে?”
“যেখানে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে।”
কথাটা শুনে আহেরীর মনে হল, তার বুকের মধ্যে জমে থাকা সমস্ত জল একসঙ্গে নড়ে উঠল। সে শুভর হাত ধরল।
শুভর হাত ঠান্ডা। সেই ঠান্ডার মধ্যেও তবুও একটা ক্ষীণ উষ্ণতা ছিল। যেমন শীতের সকালে জানালার কাচে রোদ পড়ার আগে আকাশের গায়ে একটু আলো জমে থাকে, সেইরকম।
রাত বাড়ল।
নার্সিংহোমের করিডরে আলো কমিয়ে দেওয়া হল। দূরের ঘর থেকে কোনও শিশুর কান্না শোনা যাচ্ছে। শুভ ঘুমিয়ে পড়েছে।
আহেরী জানালার কাছে এসে দাঁড়াল ধীর পায়ে।
বাইরে তখনও শহর জেগে আছে। মানুষ ঠাকুর দেখছে, ছবি তুলছে, হাসছে। একটা ছেলে তার মাকে বলছে, “আর একটু থাকি না!”
আহেরী জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছিল। তার মনে হল, এই কাচটাই পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য জিনিস। এটা একদিকে যেমন মানুষকে বাইরে যেতে দেয় না, অন্যদিকে তেমনই বাইরে থাকা পৃথিবীটাকে ভিতরে নিয়ে আসে।
শুভর সঙ্গে তার সম্পর্কটাও কি এমন নয়?
তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে অথচ মাঝখানে একটা অদৃশ্য কাচ রয়ে গেছে। আহেরী কখনও সেই কাচ ভাঙতে পারেনি। শুভও পারেনি। কিন্তু কাচের ওপারে দাঁড়িয়েও তো মানুষ একে অন্যকে দেখতে পায়। কখনও কখনও দেখতে পাওয়াটাই বেঁচে থাকার অন্য নাম।
পরদিন সকালে আহেরী আবার এল। শুভ তখন ঘুমোচ্ছিল। জানালার ধারে কাগজের নৌকাটা রাখা। রাতের বাতাসে তার এক কোণ একটু ভাঁজ হয়ে গেছে।
আহেরী নৌকাটাকে হাতে তুলে নিল। তারপর নৌকার ভিতরে খুব ছোট্ট করে একটা কথা লিখল—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
কথাটা লিখে সে থেমে গেল। তারপর নৌকাটাকে আবার ভাঁজ করে শুভর বালিশের পাশে রেখে দিল।
শুভ ঘুম ভাঙার পর নৌকাটা দেখবে। হয়তো পড়বে। হয়তো পড়বে না। কিন্তু কোনও কোনও কথা বলার জন্য শ্রোতার জেগে থাকা জরুরি নয়। জরুরি শুধু কথাটার পৃথিবীতে এসে পৌঁছনো।
আহেরী জানত, শুভর হাতে আর কতটা সময় আছে। তবে সে এটুকু জানত, ভালোবাসারও একটা নিজস্ব সময় আছে। সে সময় কখনও ঘড়িতে ধরা পড়ে না। কখনও একটা বিকেলের মধ্যে, কখনও একটা জানালার পাশে, কখনও একটা কাগজের নৌকার ভিতরে সে চুপচাপ থেকে যায়।
সেদিন দুপুরে শুভর চোখ খুলেছিল। আহেরী তখনও জানালার পাশে স্তব্ধ হয়ে বসে। শুভ নৌকাটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিল।
“এটা কে দিল?”
আহেরী বলেছিল, “কেউ না।”
“কেউ না আবার কে?”
“যে তোমাকে ভালোবাসে।”
শুভ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “তাকে বলো, আমি জানি।”
আহেরীর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
“কী জানো?”
শুভ জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “যে সে এখনও এখানে আছে।”
আহেরী আর কিছু বলল না। বাইরে তখন নবমীর সকাল। বাতাসে ক্ষীণ ভেসে আছে বিদায়ের মনকেমন। শহরের সমস্ত আলো নিভে গেছে কিন্তু আকাশে রয়ে গেছে রাতের সামান্য স্নিগ্ধ নীলিমা। নার্সিংহোমের জানালায় রোদ এসে পড়েছে।
শুভর হাতের কাছে কাগজের নৌকা।
আহেরীর হাতের কাছে শুভর হাত।
আর তাদের মাঝখানে খুব অল্প একটু দূরত্বে পড়ে আছে একটা অনুচ্চারিত শব্দ।
শব্দের নাম ভালোবাসা।
যে শব্দটি উচ্চারণ করা হয়নি বলেই হয়তো, এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সেই মুহূর্তে আহেরীর মনে হল, পৃথিবীতে সব গল্পের শেষ হয় না। কিছু গল্প কেবল একটা জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়।
তারপর একদিকে থাকে মানুষ, অন্যদিকে থাকে পৃথিবী।
আর মাঝখানে—
একটা নৌকা।
একটু আলো।
আর দুজন মানুষের না-বলা কথা।
যারা কেউ কাউকে ছেড়ে যায়নি। আবার কেউ কারও কাছে পৌঁছতেও পারেনি। শুধু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেছে।
যতক্ষণ না আলোটা খুব আস্তে দুজনের মাঝখান থেকে সরে গিয়ে দুজনেরই হয়ে যায়।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।