লেজ স্ট্রীটে হিন্দু হোস্টেলের পিছনে সুবোধ যাদবের চায়ের দোকানটা বোধ হয় এবার হেরিতেজ সাইট হিসাবে স্বীকৃতি পেতে চলেছে। এখানে প্রাক স্বাধীনতা যুগ থেকে বিপ্লবী, কবি, সাহিত্যিক, সুরকার, ফুটবলের কোচ, রাজনৈতিক নেতা সবারই পদধূলি পড়েছে। ইংরেজ হটাও থেকে মার্ক্স বাদ সব কিছুরই ব্লু প্রিন্ট এখানে তৈরি। শোনা যায় বিহার থেকে বাপ ঠাকুরদার সঙ্গে আসা বালক সুবোধের মাধ্যমে বিপ্লবীদের হাটে অস্ত্র তুলে দেওয়া হত। কোন জরুরী সংবাদ দেবার থাকলে সুবোধ সেটা ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে টুং টুং করে সাইকেলে করে পৌঁছে দিত। অনেক ইংরেজ পুলিশ অফিসার এখানে চা খাবার আছিলায় বিপ্লবীদের গোপন দেড়ার খোঁজ নিতে আসতো। সুবোধ ক্লাস ফাইভের বেশি পড়েনি, কিন্তু শুনে শুনে প্রচুর ফান্ডা করে ফেলেছিল। এখন সুবোধ আর দোকানে বসেনা। ওর ছেলে বিনোদ আর নাতি প্রমোদ দেখাশুনা করে। সুবোধ তাকিয়ায় বসে বলে দেয় কাকে কেশর চা দিতে হবে, কাকে লাল চা, কাকে চিনি ছাড়া এবং কে মশলা চা পছন্দ করে। ইশারায় দেখিয়ে দেয় সামনের বেঞ্চে যিনি কাগজে মুখ গুঁজে বসে আছেন উনি দুধ বেশি দিয়ে চা খেতেই ভালোবাসেন। তবে সব চাইতে বেশি ডিম্যান্ড লাল চায়ের। বসার জন্য হাটে গোনা দুটো বেঞ্চ। তাতেই গা ঘেঁষা ঘেঁষি করে দিনের কাগজে একটু চোখ বুলিয়ে নিত অনেকেই। আগে চায়ের দাম ছিল দু টাকা, এখন বেড়ে হয়েছে পাঁচ টাকা। চা খাওয়া হয়ে গেলে যে যার মত টিনের বাক্সে দাম রেখে চলে জেত।সুবোধ কোনদিন গুনে দেখত না। কেউ ঠকিয়েছে বলে অভিযোগ ও ওঠেনি কখনো। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।

এখানে এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে স্নেহার আলাপ হয়েছিল এক সাহেবের সঙ্গে। স্নেহা, বাবলি, কোয়েল কলকাতার একটা নামী স্কুলে শিকতা করত। স্কুল ছুটির পর ওরা সবাই মিলে সুবোধ ডার দোকানে লাল চা খেয়ে যে যার বাড়ি ফিরে যেত। সেদিন দ্যাখে এক সাহেব বার বার জিজ্ঞাসা করছে- মে অ্যাই হ্যাভ এ পেগ অফ লিকার? আর এই কথা শুনে সবাই হাসতে থাকে। সাহেব হয়ত এটাকে এনার্জি ড্রিংক, ইন্ডিয়ান ব্র্যান্ড অফ লিকার ভেবেছিলেন। ছোট গ্লাসে দেওয়া হচ্ছিল বলে এক পেগ মনে করেছিলেন। স্নেহা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে অন্যদের থামতে বলে। তারপর সাহেবকে বোঝায় এটা এনার্জি ড্রিংক বটে তবে ওয়াইন নয়। এটাকে র-টি বা লাল চা বলে। সুবোধ দা ওকে এক কাপ লাল চা দিন তো। ও টেস্ট করে দেখুক। সুবোধ একটু লেবু চিপে দিতে বলল। সাহেব খেয়ে বলে –গুড। নাইস টু সি সো মেনি পিপল এঞ্জয়িং দা ড্রিংক। থ্যাংক ইউ ম্যাম ফোর হেল্পিং মি। সাহেব টাকা দিতে গেলে স্নেহা বলে আই’ভ পেইড অলরেডি। সাহেব হাত জোর করে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নেয়। স্নেহারা আরও কিছুক্ষণ গল্প করে যে যার পথে পা বাড়ায়।

স্নেহারা এক ভাই এক বোন। স্নেহাই বর।বাবা স্টেট ব্যাংকে ম্যানেজার ছিলেন। বছর খানেক আগে অবসর নিয়েছেন। আগে কাকিনারায় ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। পরে ব্যারাকপুরে জমি কিনে দোতলা বাড়ি বানিয়েছেন।স্নেহার কাকারাও কাছাকাছি প্লট কিনে যে যার মত বাড়ি করে থাকেন। ফলে একান্নবর্তী না হলেও বিপদে আপদে একে অপরের পাশে থাকেন। স্নেহা এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে স্নেহা এই চাকরিটা পেয়েছে। এর সঙ্গে রিসার্চ টাও চালিয়ে যেতে চায়। বাড়িতে বিয়ের জন্য চাপাচাপি করলেও স্নেহা রাজী হয় না। সেদিন স্কুল ছুটির পর তিন বন্ধু বইমেলায় যাবে ঠিক করে। যাবার আগে সুবোধদার দোকানে লাল চা খেয়ে বেরোতে যাবে এমন সময় সেই সাহেবের সঙ্গে দেখা।

  1. আজ আমি আপনাকে লাল চা খাইবা।

সবাই হেসে ফেলল।স্নেহা বলে বেচারা কত কষ্ট করে বাংলা ভাষাটা শেখার চেষ্টা করছে আর তোরা হাসছিস ! দিস ইজ নট ফেয়ার। স্নেহা সাহেবকে বলে – থ্যাংকস।

  1. আপনি এখন কোথা যাইতেছে? আমি বুক ফেয়ার ভিজিট করিতে চাই। কীভাবে যাইবে?
  2. আমরাও ওখানেই যাচ্ছি। চলুন।

একটা উবার ভাড়া করে সল্ট লেক করুণাময়ীর কাছে সেন্ট্রাল পার্কে বই মেলার গেটের সামনে নামল। বাই দি বাই হোয়াটস ইউর নেম?

  1. অ্যাই অ্যাম জন অ্যান্ডারসন। ইউ মে কল মি জন।
  2. অ্যাই অ্যাম স্নেহা পল। ইউ মে কল মি স্নেহা।
  3. স্নেহা! নাইস নেম। আই’ম লুকিং ফর সাম ওল্ড বুকস অন নকশাল মুভমেন্ট। অ্যাকচুয়ালি আমি এর উপর রিসার্চ করিটেছি।
  4. আই সি। আমি ‘ডেভেলপমেন্ট ইন আর্ট অফ বেঙ্গল ফ্রম অবনীন্দ্রনাথ টু প্রেজেনট ডে’ এর উপর গবেষণা করছি।
  5. এক্সেলেন্ত। বাই। 

জন নিজের মত স্টল খুঁজতে লাগলে স্নেহারা আনন্দ পাবলিশার্স থেকে দু একটা বই কিনে ফুচকা খেয়ে বাস ধরে সেদিনের মত ফিরে এল। বাসে আসতে আসতে স্নেহা চিন্তা করছিল তাহলে জন সাধারণ ছেলে নয়। রাজনৈতিক চিন্তাধারা আছে। অজান্তেই জনের প্রতি স্নেহার মনে একটা শ্রদ্ধা তৈরি হল।

এর কয়েকদিন পরে আবার সুবোধের দোকানে জনের সঙ্গে স্নেহার দেখা হয়। এবার স্নেহা এগিয়ে গিয়ে শুধোয় –হে জন, ডিড ইউ গেট এনি বুক অফ ইওর চয়েস?

  1. আমি ডুটা বুক কিনেছি অন নকশাল মুভমেন্ট। একটা ইংলিশে লেখা। রিটন বাই সাম আজিজুর রহমান। আর একটা বাংলা। আপনার একটু হেল্প চাই।
  2. ওহ সিওর।
  3. তুমি মানে আপনি কিছু পেলে?
  4. তুমিটাই ভাল শোনাচ্ছে। উই আর ফ্রেন্ডস। হ্যাঁ আমি একটা কবিতার বই, রিটন বাই শঙ্খ ঘোষ, আ ফেমাস পোয়েট অফ আওয়ার টাইম।
  5. তুমি বুঝি পোয়েম খুব ভালবাস! আই’ল প্রেজেন্ত ইউ ‘এ বুক অফ পোয়েমস’ বাই উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস।

ওরা চা খেয়ে ট্রাম লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে চলে এসেছে। আজ কেন জানিনা স্নেহার বাড়ি ফেরার কোন তাড়া নেই। সে জনকে করে কোন ইম্পরট্যান্ট কাজ আছে কিনা।নেই জেনে বলে –দেন কাম টু আওয়ার কফি হাউজ- অ্যান ইনটালেকচুয়াল হাব। এখানে বসে কফি খেতে খেতে একটু গল্প করা যাবে। দোতলায় একটা কনের টেবিলে বসে ওরা একে অপরকে জানার, বোঝার চেষ্টা করে। জন বলে যে সে বাবা মা’র একমাত্র সন্তান। বাবা ডাক্তার, ক্যান্সার স্পেশ্যালিসট, আর মা লেবার পার্টির অ্যাকটিভ মেম্বার। আমরা ইয়রকশায়ার কাউনটি তে থাকি। স্বচ্ছল পরিবার। ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির আলোচনা শুনে বড় হয়েছি। তাই সোশিয়লজি নিয়ে পড়াশুনা করার পর একটা বুক আমার হাতে আসে ‘রিজনস ফর ফেইলিওর অফ নকশাল মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল’। এটা পড়ে আমি এই বিষয়ে ইন ডেপথ স্টাডি করবো ডিসাইড করি। তাই পাসপোর্ট ভিসা করে কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি প্রোগ্রামে জয়েন করি। তারপর সুবোধের লাল চা এবং তোমার মত ফ্রেন্ড পাওয়া। স্নেহা এবার তোমার কথা শুনি। আমি জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বড় হয়েছি। আমার বাবা ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজার হিসাবে রিটায়ার করেছেন। আমার মা হাউজয়াইফ। আমরা এক ভাই এক বোন। আমিই বড়। ভাই স্টিল স্টাডিং ইন কলেজ। আমি এম.এ পাশ করার পর পিএসসি পরীক্ষা দিয়ে সরকারি স্কুলে বাংলার শিক্ষকের পদে জয়েন করি। রিসার্চের কথা তো আগেই জানিয়েছি।

  1. রিয়েলি কালচারড ফ্যামিলি। আই লাভ টু মিট ইওর পেরেন্তস। উইল ইউ ইন্ট্রোডিউস মি?
  2. মাই প্লেজার।নেক্সট স্যাটারডে ইউ ক্যান কাম উইদ মি।
  3. থ্যাংকস। হোয়াই আর’ন্ত উ ভিজিটিং আওয়ার কাউন্তি ইয়র্কশায়ার ইন সামার?
  4. ইফ উ টেক মি আই ক্যান গো টু ইংল্যান্ড অ্যান্ড ইয়র্কশায়ার ফর ফিফটিন ডেজ।


স্নেহা বাড়িতে জনের কথা সব জানাল। এও জানাল যে জন অ্যান্ডারসন ছেলেটিকে তার বেশ ভাল লেগেছে। এখানে গবেষণা করতে এসেছে ইয়র্কশায়ার থেকে। ওর বাবা ডাক্তার। জন একমাত্র সন্তান। জন তোমাদের সঙ্গে আলাপ করতে চায়। যদি আপত্তি না থাকে তাহলে সামনের শনিবার স্কুল থেকে ফেরার সময় সে জনকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।বাবা সৈকত পাল বলেন –ঠিক আছে নিয়ে আয়। দেখি কি বলে। কথামত পরের শনিবার ঠিক আড়াইটার সময়ে সুবোধ দার চায়ের দোকানে জন এসে অপেক্ষা করে। স্নেহা এসে সরি বললে জন সঙ্গে সঙ্গে বলে –ইটস ওকে। কাম হ্যাভ আ কাপ অফ রেড টি অ্যান্ড লেটস গো।

ওরা শিয়ালদহ থেকে ব্যারাকপুর লোকাল ধরে চলে এল। তারপর স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে সোজা বাড়ির সামনে গিয়ে থামল। স্নেহার বাবা গেট খুলে দিলে স্নেহা বলে –কাম জন, উ’র ওয়েলকাম। ড্রয়িং রুমে বসতে বলে এসি টা চালিয়ে দিল। তারপর মা-বাবা, ভাইয়ের সঙ্গে একে একে আলাপ করিয়ে দিল। জন টক উইদ মাই ফাদার। আই’ম কামিং ইন আ মিনিট।

-গুড আফটারনুন জন। হোয়ার আর ইউ স্তেইং ইন কলকাতা? হাউ লং উইল উ বি হিয়ার? ডু ইউ হ্যাভ এনি রিলেটিভ অর অ্যাকয়েন্তেন্স ইন ইনডিয়া? পাশের ঘর থেকে স্নেহা বলে বাবা জন ভালই বাংলা বোঝে এবং মোটামুটি বলতেও পারে। শুধু বাংলা পড়তে পারেনা।

-(জন হাসে) আমি বালিগঞ্জে একটা ফ্ল্যাটে পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকি। কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর ইউ বোসের কাছে নকশাল মুভমেন্ট নিয়ে রিসার্চ করিতেছি। এখানে ভাল কাজ পেয়ে গেলে থেকে যেতেও পারি। সরি, আপনারা ছাড়া ইনডিয়াতে আমার কোন অ্যাকএন্তেন্স নাই।

কয়েক মিনিটের মধ্যে স্নেহার মা লুচি, আলুরদম, চার রকমের মিষ্টি প্লেটে সাজিয়ে নিয়ে এলেন। পিছু পিছু স্নেহা এক কাপ লিকার চা নিয়ে ঢুকল। জন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেলে স্নেহার মা আভা রাণী পাল নিষেধ করেন- থাক বাবা, প্রণাম করতে হবে না। জন রাখঢাক না করেই বলে ফেলল- আই লাভ স্নেহা। আই ওয়ানট টু গেট ম্যারেড টু হার। আই ইনভাইট ইউ অল টু কাম টু আওয়ার কাউন্তি ইয়র্কশায়ার দিস সামার। টক উইদ মাই পেরেন্তস বিফোর দা ফাইনাল ডিসিশন ইজ টেকেন। ঘণ্টা দুই সময় কাটানোর পরে জন বলে- আপনাদের সঙ্গে কথা বলে খুব আনন্দ হল। বাট নাউ আই মাস্ট লিভ, অর আই’ল বি লেট। স্নেহা জনকে স্টেশনে ছাড়তে এসে জনের ফোন নম্বর নেয় এবং নিজের মোবাইল নম্বর জনকে দেয়।

  1. জন, ডোন্ট হেজিটেট টু কল মি, ইফ ইউ ফেস এনি ট্রাবল অন দা ওয়ে।
  2. ওকে। থ্যাংকস আ লট।

ব্যারাকপুর লোকাল ছেড়ে দেয়। স্নেহা তবু ও হাত নাড়তে থাকে।


বাড়িতে ফিরে দ্যাখে বাবা কাকারা মিলে আলোচনা করছে ছেলেটা মন্দ নয়।আমাদের কালচার সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল এবং বারবার ওদের দেশে গিয়ে কথা বলে ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিতে বলছে। ওর বাবা ডাক্তার, মা প্রগ্রেসিভ লেবার পার্টির সদস্যা। কাকা বলে –দাদা তুমি বরং স্নেহাকে নিয়ে একবার ঘুরে সব দেখেই এসো। তারপর বিয়ের কথা ভাবা যাবে। আড়াল থেকে সব শুনে স্নেহা মনে মনে খুব খুশি হয়। রবিবার স্নেহা ফোন করে জনকে। ফিরতে কোন অসুবিধা হয়েছিল কিনা জানতে চায়। স্নেহাদের বাড়ির লোকজনদের জনের কেমন লাগল? উত্তরে জন বলে – আই অ্যাম ওভারহয়েল্মড বাই দা হস্পিটালিটি। স্নেহা পাল্টা জানায় যে তার বাড়ির সবার জনকে পছন্দ হয়েছে। কামিং সামারে সে এবং তার বাবা হয়ত ইয়র্কশায়ার যাবে টু মিট ইওর পেরেনটস। জন আনন্দে লাফিয়ে ওঠে- ইজ ইট ট্রু! আই’ল শো ইউ হাউ বিউটিফুল আওয়ার কাউন্তি ইজ। তোমাদের তো পাসপোর্ট আছে বলেছিলে। দেন অ্যাপ্লাই ফর ভিসা ইমিদিয়েতলি।

সোমবার স্কুলে গেলে বন্ধুরা ছেঁকে ধরে। স্নেহা তোকে আজ এত খুশি দেখাচ্ছে কেন রে। কিছু এগোল! হ্যাঁ। আমার বাড়ি থেকে সবাই জনকে একসেপ্ট করেছে। এবার সামার ভ্যাকেশনে আমি আর বাবা জনের দেশে জাব।ওর বাবা মায়ের সঙ্গে কথা বলতে। তাই নাকি! দারুন খবর। ট্রিট দিতে হবে কিন্তু। আচ্ছা এখন পাঁচ কান করিস না। স্নেহা অ্যাতেন্দেন্স খাতা নিয়ে ক্লাস টেনে ঢুকে পড়ে।


"
সেখানে শঙ্খ ঘোষের লেখা একটা কবিতা পড়ায়, যার শেষ দুটি লাইন ছিল-

“আয় আরো হাতে হাত রেখে/ আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি”।


স্নেহা সুন্দর করে বোঝায় আজকের এই ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীতে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে আরও বেশি একাত্ম হয়ে থাকাটা ভীষণ জরুরী। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যুদ্ধবাজ দেশ সব সময় চাইবে আমাদের মত অসহায় গরিব মানুষদের বিচ্ছিন্ন, পদদলিত করতে। কিন্তু মানুষ প্রেম, প্রিতির বন্ধনে দেশ, কাল, জাতি বর্ণ ভেদ ভুলে যদি বেঁধে রাখতে পারে তবেই এই সভ্যতা বাঁচবে। শক্তিধর দেশ গুলো নানা সময়ে পরমানু শক্তির আস্ফালন দেখাবে। তাদের বিরুদ্ধে গনতান্রিক শক্তিকে রুখে দাঁড়াতেই হবে। তাই কবি আরও বেশি বেঁধে বেঁধে থাকার কথা বলেছেন। ছাত্ররা বেঞ্চ বাজিয়ে অভিনন্দিত করলে স্নেহা তাদের থামত বলে এবং লজ্জা পেয়ে যায়।

ছুটির পরে সুবোধদার দোকানে লাল চায়ের সঙ্গে প্যাটিস খেয়ে বাবলি, কোয়েল, স্বপ্না শুভেচ্ছা জানাল।


যথাসময়ে ভিসা পাওয়া গেল। হিথরো বিমান বন্দরে জনের বাবা ডেভিড অ্যান্ডারসন নিজে রিসিভ করতে আসেন। প্রায় চার ঘণ্টার পথ জন ড্রাইভ করে নিয়ে এল। বিশাল আলিশান বাংলো। জনের মা একটা জরুরী মিটিংয়ে আছেন। জন খাবারের বন্দোবস্ত করতে গেলে স্নেহা জানালার কাঁচ দিয়ে দুরের পাহাড়টার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে।এটাকেই বোধ হয় কবি আপহিল জার্নি বলেছেন। বিকালে মা বারবারা অ্যান্ডারসন চায়ের আসরে জানালেন –লিসন মিঃ পল, উই হ্যাভ নো অবজেকশন টু আওয়ার সন’স চয়েস। ইফ লাইক উই মে কাম টু ইনডিয়া টু গেট দেম ম্যারেড। সৈকত বাবু থ্যাংকস জানালেন। ঠিক হল নভেম্বর মাসে কলকাতায় ওদের আনুষ্ঠানিক বিয়ে হবে। জন খুব খুশি।সে স্নেহাকে জানায় এখানেও দুর্গা পূজা হয়। ওরা কলকাতা ফিরে আসে। দেখতে দেখতে দিন চলে গেল। ইতিমধ্যে স্নেহা ওর থিসিস জমা দিয়ে দিয়েছে।

স্নেহা এখুনি স্কুলে রিজাইন করতে চায়না। উইদ আউট পে তে একবছরের জন্য ছুটির আবেদন করল। যদি মানাতে না পারে যাতে আবার স্কুলে জয়েন করতে পারে। দেশ ছাড়ার আগে সুবোধ দার দোকানে লাল চা খেয়ে ওর আশীর্বাদ নিল।– স্নেহা ইংল্যান্ড জয় করে এসো। বাবা মা ভাইকে ছেড়ে এত দূরে থাকতে হবে কোনদিন ভাবেনি। তবু মন শক্ত করে। জন স্নেহার জন্য একটা স্কুলে বেঙ্গলি লিটারেচার পড়ানর ব্যবস্থা করে। জন নিজে একটা মিউজিয়ামে গাইডের কাজ করে।বাড়ি ফিরতে প্রতিদিনই রাত হয়ে যায়। স্নেহা বড় কাঁচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে জনের জন্য পথের দিকে চেয়ে থাকে। সপ্তাহান্তে স্নেহাকে নিয়ে নানা জায়গা দেখায় জন। স্নেহা আবদার করে টেমস নদীতে বোট রাইড করবে এবং বাকিংহ্যাম প্যালেস দেখবে। জনের সংক্ষিপ্ত উত্তর- ওকে।

                                

ন্যাশনাল মিউজিয়ামেই জনের সঙ্গে আলাপ ও ঘনিষ্ঠতা হয় সারা রবিনসনের সঙ্গে। স্নেহা প্রথম দিকে কিছু ভাবেনি। পরে ব্যাপারটা অনেকদূর গড়ায়। মাঝে মাঝে জন রাতে বাড়ি ফেরে না। সে একদিন জনকে জিজ্ঞাসা করে। জন এবং ওর মা বারবারা একই কথা বলে- দে আর জাস্ট ফ্রেন্ডস।ডোন্ট লুক অ্যাট হিম ইন দ্যাট নেটিভ, জন্ডিসড আই।দিস ইজ নট পুওর ইনডিয়া। স্নেহা মেনে নিতে পারেনা। তার তৃতীয় নয়ন খুলে গেছে।তার প্রতি জনের আর বিশেষ টান নেই। সংশয় আর অবিশ্বাস নিয়ে এক ছাদের তলায় থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়।এক বছরের মাথায় সে ইংল্যান্ডের পাততাড়ি গুটিয়ে দেশে ফিরে আসে। বাড়িতে কিছু জানায় না। এখানে এসে কলেজ সার্ভিস কমিশনে ইন্টার্ভিউ দেয়। কেরিয়ার ভাল বলে শহরতলির একটা কলেজে কন্ত্র্যাকচুয়াল লেকচারার হিসাবে জয়েন করে।

আজ সকাল থেকে আকাশ মেঘলা। স্নেহা বেশ কয়েকবার জনকে ফোন করে কিন্তু জন সারা দেয়নি। স্নেহার মনে হল সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে।টেবিলের উপর রাখা ঘুমের ওষুধের শিশিটার দিকে চোখ পড়ল। তাহলে কী এতেই মুক্তি! এমন সময় মা ঘরে ঢুকলে স্নেহা নিজেকে সামলে নেয়।- ওঠ মা, জলখাবারটা খেয়ে নে। কি চেহারা করেছিস নিজের একবার আয়নাতে দেখেছিস? তুমি যাও মা, আমি আসছি। স্নেহা প্রতিজ্ঞা করে কিছুতেই লড়াই থেকে পিছিয়ে আসবে না। ছাত্রছাত্রী পড়ান আর লেখা লেখির মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রেখে ভুলে থাকার চেষ্টা করে। যদিও আজও সে জনের নামে সিঁথিতে সিঁদুর পড়ে।

বেশ কিছুদিন পড়ে স্নেহা একদিন ওর পুরনো স্কুলে দেখা করতে যায়। সবাই ছেঁকে ধরে- এই যে মেমসাহেব আমাদের একদম ভুলে গেলে, মা। কেমন আছিস স্নেহা, কোয়েল বলে। আমি বিন্দাস আছি, স্নেহা জানায়। একটি ছাত্র স্নেহাকে দেখে দৌড়ে এসে প্রণাম করে বলে – ম্যাম ভাল আছেন? আপনি কি আবার আমাদের ক্লাস নেবেন?- নারে আমি এখন অন্য এক জায়গায় পড়াই। স্কুল শেষে সুবোধদার দোকানে লাল চা খেতে গিয়ে স্নেহার কাছে সব বৃত্তান্ত শুনে কোয়েল বলে – দ্যাখ যা হবার হয়ে গেছে। তুই আবার নতুন করে সব শুরু কর। বাবলি বলে –তোদের কি ডিভোর্স হয়ে গেছে? –না। তাহলে আর সিঁদুর পড়ব কেন? –ও সরি। বাড়িতে এখনো খুলে বলিনি। ওরা খুব আঘাত পাবে। কোয়েল তোর বর কি করে? –ও মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ।বর্তমানে উড়িষ্যায় থাকে। কে জানে সেখানে আবার সংসার পেতেছে কি না। -আহা কচি খুকি! আজ উঠি রে।- মাঝে মাঝে এখানে চা খেতে আসবি তো। - নিশ্চয়ই।


দু বছর হয়ে গেল জনের কোন ফোন বা মেসেজ কিম্বা মেইল আসেনি। এটা ডিসেম্বর মাস। স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। স্নেহা স্কুলে এলে কোয়েল, স্বপ্না, বাবলি সবাই মিলে খাতা বগল দাওয়া করে সুবোধ দার দোকানে লাল চা খাবে বলে বেঞ্চে বসে গল্প করছে। এমন সময় পিছন থেকে কে যেন বলল- সুবোড ডা আমাকেও এক কাপ লাল চা ডেবেন? সবাই চমকে উঠল। স্নেহা ঘাড় ঘুরিয়ে দ্যাখে জন। খুব রোগা হয়ে গেছে। স্নেহাকে দেখে জন বলে –তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার মুখ আমার নেই। আই’ভ ডান রং টু ইউ। গিভ মি পানিশমেন্ট স্নেহা। কিন্তু ডুরে ঠেলে ডিও না। আমি সব ছেড়ে তোমার কাছে চিরদিনের মত থাকটে চলে এসেছি। আমি একদিনের জন্য ভুলতে পারিনি তোমার মুখ আর সুবোড ডার লাল চা। স্নেহার দুগাল বেয়ে তখন আনন্দাশ্রু নায়গ্রার মত নেমে আসছে। জন জড়িয়ে ধরে স্নেহাকে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয়।