আভিধানিক অর্থে ধন্বন্তরি একটি বিশেষ্য পদ - দেব চিকিৎসক, অতি সু চিকিৎসক। ধন্বন্তরি থেকেই, বর্তমানে বহুল প্রচলিত ‘ধনতেরাস’ উৎসব এর জন্ম। অথর্ববেদ রচনা করেছিলেন স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মা। পরবর্তীকালে তা উপকথা অনুসারে মর্ত্যলোকে প্রচার ও প্রসার জরুরী হয়ে পরলে স্বয়ং বিষ্ণু ধন্বন্তরি রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হন। তাই হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুসারে বিষ্ণুর অবতার হলেন ধন্বন্তরী। এই অথর্ববেদ হইতেই আয়ুর্বেদের উদ্ভব। বেদ ও পুরাণে তিনি দেবতাদের চিকিৎসক এবং আয়ুর্বেদের দেবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।হিন্দুধর্মে উপাসকদের নিজেদের এবং / অথবা অন্যদের জন্য, বিশেষত ধনতেরাসে সুস্থ স্বাস্থ্যের জন্য তাঁর আশীর্বাদ চেয়ে ধন্বন্তরীর কাছে প্রার্থনা করাই ছিল সাধারণ নীতি। ধন্বন্তরী জন্মেছিলেন ত্রয়োদশী তিথির শেষ লগ্নে। চতুর্দশীর শুরুতে। তাই ধন্বন্তরির মতো আয়ুর্বেদাচার্য কে মর্যাদা দিয়ে চতুর্দশী তিথিতে বিশেষ চোদ্দটি পুষ্টি গুণযুক্ত শাক খেয়ে আপনার শরীরে এই শীতের শুরুতে প্রাকৃতিক ভেষজ প্রচলিত ছিল, বর্তমানে যা ‘চোদ্দ শাক’ খাওয়ার রীতি হিসাবে প্রচলিত আছে। সাথে সাথে জরাজীর্ণ দূর করার উদ্দেশ্যে, গৃহ থেকে অশুভ শক্তি বিনাশ করার উদ্দেশ্যে চোদ্দ প্রদীপ জ্বালাবার রীতি প্রচলিত হয়ে আসছে।

এমনটা মনে করা হয় যখন সমুদ্রমন্থন হচ্ছিল, তখন সাগরের নীচে ১৪ রকমের রত্ন পাওয়া গিয়েছিল। ধন্বন্তরি এইরকম একটি রত্ন। যখন দেবতা এবং দানব মন্দার পর্বতকে ধরে বাসুকি নাগের সাহায্যে সমুদ্রের মন্থন করছিল, তখন ১৩তম রত্নের পর, কার্তিক কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতে ১৪তম রত্ন রূপে ধন্বন্তরির আবির্ভাব হয়। তিনি অমৃত কলস সঙ্গে এনেছিলেন। ধন্বন্তরীর আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই দেবতা এবং দানবদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে যায়, কে সেই কলস নেবে, তা নিয়ে। তবে ভগবান বিষ্ণুর মোহিনী রূপ ধারণ করেন। আর অমৃত কলস হাসিল করে নেন নিজের কাছে। ধন্বন্তরি অমৃত মানে জীবনের আশীর্বাদ নিয়ে প্রকট হয়েছিলেন। এবং আয়ুর্বেদ সম্পর্কে জ্ঞান ছিল তাঁর। তাই তাঁকে আরোগ্যের দেবতাও মনে করা হয়।

কার্তিক কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতে ভগবান ধন্বন্তরি যেহেতু শ্বেত কমন্ডলু পূর্ণ অমৃত নিয়ে প্রকট হয়েছিলেন (সূত্র: মহাভারত, আদিপর্ব। সপ্তদশ - অষ্টাদশ অধ্যায়ে ), আর তাই এই তিথিতে বাসনপত্র কেনা শুরু হয়। মনে করা হয়, ধনতেরাসের দিন আপনি যত জিনিসপত্র কেনেন, তার গুণাগুণ ১৩ গুণ বৃদ্ধি হয়ে যাবে।

এই মতের একটি বিরোধী আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। ধন্বন্তরী নামে কাশীতে এক রাজা ছিলেন। যার নাম ছিল দিবোদাস। দিবোদাস ছিলেন আচার্য সুশ্রুতের গুরু এবং আয়ুর্বেদ ঐতিহ্য অনুযায়ী শল্যবিদ্যার জনক। তিনি তার রাজত্বের বাইরে গিয়েও আয়ুর্বেদ প্রচার করেন। তার প্রচারেই আয়ুর্বেদ আমাদের দেশে এতো প্রসিদ্ধ। তাই আয়ুর্বেদ ও মহৌষধের কথা উঠলেই বলা হয় ধন্বন্তরীর নাম। তিনি ত্রয়োদশী তিথিতে জন্ম গ্রহণ করেন, তাই তখন থেকেই আয়ুর্বেদ প্রেমিকরা তাঁর জন্ম তিথি ধন্বন্তরী ত্রয়োদশী হিসাবে পালন করে। হিন্দিতে এটাকে ধন্বন্তরী তেরস বা সংক্ষেপে ধনতেরস বলে। এর সাথে ধন বা অর্থের কোনো সম্পর্ক নেই।

মহর্ষি চরক ব্যাধি পীড়িত জনগনের কল্যানার্থে চরক সংহিতা রচনা করেন। যেখানেও দেববৈদ্য ধন্বন্তরির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যেমন লক্ষ্য করা যায় বিষ্ণু পুরাণে। এই পুরাণে ক্ষত্রিয় ধন্বন্তরিকে বৈদ্য ধন্বন্তরি ধরলে সেখানে আবার বিস্তর অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। 

বিষ্ণু ধর্মোত্তরো শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে ধন্বন্তরি ছিলেন একজন সুদর্শন, পীতাম্বর পুরুষ। যার চতুর্ভুজে অবস্থান করছে শঙ্খ, অমৃত ভান্ড, অথর্ববেদ এবং সবুজ লতা গুল্ম। কথিত আছে ধন্বন্তরি জন্মগ্রহণের পর সৃষ্টি পালন কর্তা দেব নারায়ণের স্তব করেন এবং নারায়ণ তাকে পুত্ররূপে স্বীকার করেন। নারায়ণ তাকে অব্জদেব নাম দিয়ে অভিহিত করেন। নারায়ণের বর প্রাপ্তি লাভ করে তিনি দ্বিতীয় জন্মে জনমানসে যশলাভ ও দেবত্ব লাভ করেন। সেই কারণে দক্ষিন ভারতে আজও চক্রমন্ত্র, ব্রত ও জল দ্বারা ধন্বন্তরি এই রূপে পূজিত হয়ে আসছে।অষ্টবিধ অঙ্গ সমন্বিত আয়ুর্ব্বেদ বিধান করে ধন্বন্তরি দ্বিতীয় দ্বাপর যুগে জন্ম পরিগ্রহ করে। দ্বাপর যুগে সোম বংশীয় রাজা দীর্ঘতপার প্রার্থনা অনুসারে ধন্বন্তরি অব্জদেব নাম ধরে তাঁর পুত্র রূপে জন্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি নারায়ণের বরে সর্ব্বরোগ বিনাশক কাশীরাজ ধন্বন্তরি নামে খ্যাত হন। Chapter 67 Section 3 Upodhghaatapaada of Bramhanda Purana ( Pg 857-852)

জগৎপতি বিষ্ণুর এক স্তবে পাওয়া যায়,

                  "নমো ধন্বন্তরি কায় অমৃতধারক ।

                  নমো যড়কায় হিরণ্যাক্ষবিদারক ।।

                   নমস্তে মোহিনীরূপ অসুরমোহন ।

                   নমস্তে নৃসিংহ মহাদৈত্য বিনাশন ।।

                  নমো রামকৃষ্ণ রূপ গোকুল বিহার ।

                  নমো নমো নমো জয় বুদ্ধ অবতার ।।

                  ভবিষ্যত অবতার নমঃ কলিকরূপ ।

নমো হরি অবতার নমো বিশ্বরূপ সচ্চিদানন্দ নমো বিশ্বপরায়ণ ।।

                 নমো নমো জগৎপতি ব্রহ্ম সনাতন ।।" 

চরক সংহিতা অনুসারে ধন্বন্তরি মহর্ষি ভরদ্বাজের থেকে আয়ুর্ব্বেদ শাস্ত্রে জ্ঞান লাভ করেন এবং তিনি সর্বপ্রথম আয়ুর্ব্বেদ শাস্ত্রকে আটটি ভাগে ভাগ করেন (কায়াচিকিতসা তন্ত্র, শল্য তন্ত্র, শালক্য তন্ত্র, কৌমারভৃত্য তন্ত্র, বিষ তন্ত্র, যৌনরোগ বাজিকরণতন্ত্র, রসায়নতন্ত্র, ভুতবিদ্যা )। চরক সংহিতায় উল্লেখিত আছে আদি ধন্বন্তরি নিজে বলেছেন - " আমি আদিদেব ধন্বন্তরি, অন্তান্ত রোগ এবং বিশেষ শল্যতন্ত্র শিক্ষা দিতে ভূতলে অবতীর্ণ হইয়াছি।"

শ্রীমদ ভাগবত পুরাণ-এর প্রথম স্কন্দের তৃতীয় অধ্যায়ে সংখ্যাক্রম অনুসারে বিষ্ণুর যে ২২ অবতারের বর্ণনা করা আছে সেখানে তালিকার ১২ নং-এ ধন্বন্তরির উল্লেখ আছে আয়ুর্বেদের জনক হিসাবে (ভাগবত ১।৩।১৭)

মার্কেন্ডেয় পুরাণ অনুসারে ভগবান ধন্বন্তরি ত্রেতা যুগের প্রারম্ভেও আভির্ভূত হয়েছিলেন। স্কন্দ পুরাণ অনুযায়ী ঋষি গালব এবং বীরভদ্রার আলোচনা প্রসঙ্গে কুশ নির্মিত এক কুমারের বেদ মন্ত্রে জীবন প্রাপ্ত হওয়া এবং মানব আকার ধারণ করার বর্ণনায় ধন্বন্তরির উল্লেখ পাওয়া যায়। বেদমতে - "....ঋষিবর্গ উক্ত শিশুর ধন্বন্তরি এই নাম রাখিয়া তপবন গমন করিলেন। লোকশ্রুতি এই ধন্বন্তরি হইতে বৈদ্যগণের উৎপত্তি। "

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য (সংস্কৃত: चन्द्रगुप्त विक्रमादित्य) (রাজত্বকাল: ৩৭৫ খ্রিষ্টাব্দ-৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ) একজন শক্তিশালী গুপ্ত সম্রাট ছিলেন। গুপ্ত বংশের যে কয়েকজন রাজা গুপ্ত সাম্রাজ্য স্থাপন ও বিস্তার ও সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তাদের মধ্যে অন্যতমl তার শাসনকালে গুপ্ত সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয় এবং প্রাচীন ভারতের কলা, ভাস্কর্য্য ও স্থাপত্য এক অন্যন্য উচ্চতায় পৌঁছয়। তার শাসনকালকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। বিক্রমাদিত্যের সভাসদদের একত্রে নবরত্ন নামে অভিহিত করা হতো । এই নবরত্নের মধ্যে অর্থাৎ ন জন সদস্যের মধ্যে অন্যতম রত্ন ছিলেন ধন্বন্তরি। এইভাবেও ধন্বন্তরির উল্লেখ ইতিহাসের পাতায় আমরা পাই । যেখানে তিনি রাজবৈদ্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন। ধন্বন্তরী ছিলেন একজন আয়ুর্বেদ ও শল্য চিকিৎসক।

আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বে, অর্থাৎ পঞ্চদশ শতকে বাংলাদেশের বরিশাল জেলায় ফুলশ্রী গ্রামে জন্ম জন্মগ্রহণ করেন কবি বিজয় গুপ্ত। কবি বিজয় গুপ্তের লেখা মনসা মঙ্গল বা পদ্ম পুরাণ মধ্যযুগে বাংলার এক অনবদ্য সৃষ্টি। বরিশালের রায়ান গায়েনেরা তার এই অমর সৃষ্টি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন প্রায় ৪০০ বছর। আর এই মানবীয় পদ্মপুরাণ এর এটি সহায়ক চরিত্র হলো ধন্বন্তরি। সেখানে উনিও ভেষজ ও জরিবুটির চিকিৎসা করতেন।

১৯৫১ - ১৯৫৫ সালের মধ্যে কে. পি. যশোয়াল কর্তৃক পাটলীপুত্র নগরের খননকার্য সম্পাদনকালে চিকিৎসক ধন্বন্তরির প্রতিষ্ঠিত একটি আরোগ্য বিহারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যেখান থেকে প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ চর্চার সূত্রের সন্ধান দেয়। 

আশ্চর্যের বিষয় বিভিন্ন পুরান উপনিষদে বারবার এই ধন্বন্তরি চরিত্রটি উঠে এসেছে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তিনি কখনো ব্রাহ্মণ বা কখনো ক্ষত্রিয় রূপে জরিবুটি ও ভেষজ চিকিৎসা করে গেছেন । বিষয়টি এখনো ধোঁয়াশা পরিপূর্ণ। 


তথ্যঋণ স্বীকার:

১) বেদ 

২)মহাভারত, আদিপর্ব। সপ্তদশ - অষ্টাদশ অধ্যায়

৩) শ্রীমদ ভাগবত পুরাণ

৪) মার্কেন্ডেয় পুরাণ

৫) চরক সংহিতা

৬) ধন্বন্তরি কথা - মৌ দাশগুপ্ত

৭) আন্তর্জালে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা পত্র 

৮) উইকিপিডিয়া 

৯) Chapter 67 Section 3 Upodhghaatapaada of Bramhanda Purana ( Pg 857-852)