প্রতিটি শহর তার আকাশরেখা দিয়ে চিহ্নিত হয়, কিন্তু কলকাতা সবসময়ই নিজেকে পরিচয় করিয়েছে এক অনন্য সাউন্ডট্র্যাক দিয়ে। এই বিশেষ সংবেদনশীল ভূদৃশ্য, বা "নগর সংবেদনা", উনিশ শতক থেকে শহরকে জানার, অনুভব করার এবং মনে রাখার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কলকাতার রাস্তার শব্দ কখনোই নিছক পটভূমির আওয়াজ ছিল না; বরং এগুলো শহরের ভৌত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের এক প্রবাহমান ঐতিহাসিক নথি। ঔপনিবেশিক যুগের ধীর, মানব-চালিত ছন্দ থেকে আধুনিক পরিবহণের যান্ত্রিক, দ্রুতগতির তাল পর্যন্ত—কলকাতার রাস্তার ধ্বনির বিবর্তন শহরের ব্যস্ত জীবনের পরিবর্তিত গতি প্রতিফলিত করেছে।
মানব-চালিত ভোর: পালকি, কুয়ার টানাটানি ও প্রাথমিক রাস্তার ডাক আঠারো ও উনিশ শতকের গোড়ায় কলকাতা—তখনকার ক্যালকাটা, ব্রিটিশ রাজের আমলাতান্ত্রিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র—মানবশক্তি নির্ভর গতিতে চলত। পাকা রাস্তা হওয়ার আগে শহরের পথঘাটে ছিল পথচারী, গরুর গাড়ি, আর পালকির ছন্দ। পালকি ছিল মর্যাদার প্রতীক, ব্রিটিশ আমলাদের, ধনী পরিবার ও নববধূদের জন্য শান্ত যাত্রার বাহন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শহরের জনজীবন আরও স্বরবহুল হয়ে ওঠে। ১৮৭৮ সালে শশীচন্দ্র দত্ত "নেটিভ পার্ট অফ টাউন"-এর উপর একটি গবেষণায় ৩২ প্রকারের রাস্তার ডাক নথিভুক্ত করেন। তাঁর এই ধ্বনি-মানচিত্রে উঠে আসে ধর্ম, জাতি ও জনপরিসরের সীমারেখা। যেমন—"কু-উ-উ-ও-ও-র ঘটি তো-ও-ও-লা" ছিল কুয়ার ভেতর পড়ে যাওয়া পিতলের ঘটি উদ্ধারকারীদের ডাক, যা শহরের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ ছিল। কিন্তু পৌরসভা যখন পাইপলাইনের জল সরবরাহ শুরু করল, এই ডাক ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
আন্দরমহল ও পাড়ার ধ্বনির ঘড়ি উত্তর কলকাতার আবাসিক গলিতে রাস্তার শব্দ ছিল এক প্রকার জনঘড়ি। ভোরে ট্রামের ঘণ্টা, আকাশবাণীর সুর, মসজিদের আজান বা মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি ছিল দিনের সূচনা।
তারপর আসত ফেরিওয়ালাদের ডাক—সবজি বিক্রেতার "এই...সবজি!", মোচির "সেলাউচি!", আর ছুরি ধারকারীর ধাতব ঘর্ষণের শব্দ। আন্দরমহল-এর নারীদের জন্য এরা ছিল বাইরের জগতের সেতু। সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা ছবিতে এই বাস্তব ডাকগুলোই নায়িকার নিঃসঙ্গ জগৎকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
পরিবহণের কোলাহল: ঘোড়ার খুর থেকে বৈদ্যুতিক ঝংকার উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঘোড়ার গাড়ি ও পালকি গাড়ি শহরে নতুন শব্দ যোগ করে। ১৮৭৩ সালে ট্রামলাইন চালু হয়, প্রথমে ঘোড়ায় টানা, পরে ১৯০২ সালে বৈদ্যুতিক। ট্রামের "টিং-টিং" ঘণ্টা হয়ে ওঠে শহরের অন্যতম সাউন্ড সিগনেচার।
বিশ শতকের শুরুতে বাস কন্ডাক্টরদের গলা ফাটানো ডাক—"ডালহৌসি! নিউ মার্কেট!"—শহরের ছন্দে যুক্ত হয়। হাতচালিত রিকশার ঘণ্টা আর ১৯৬২ সালে হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সির হর্ন শহরের শব্দকে আরও তীব্র করে তোলে।
বাণিজ্য ও উৎসবের ধ্বনি-বিস্ফোরণ দলহৌসির অফিসপাড়া একসময় ভরে থাকত টাইপরাইটারের "টক-টক-টক" শব্দে, হুগলি নদীর জাহাজের হর্নে, আর দুপুরে রোল-বিরিয়ানি দোকানের ধাতব ঝংকারে। কিন্তু কলকাতার সবচেয়ে বড় শব্দ-রূপান্তর আসে উৎসবের সময়ে। বিষ্ণুকর্মা পূজায় ছাদের উপর "ভোকাট্টা!"র হর্ষধ্বনি, আর দুর্গাপূজায় শহর ভরে ওঠে ঢাক, শঙ্খ, ভেপু, আর মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচারে।
নীরবতার আগমন ও আধুনিক যান্ত্রিক গর্জন আজ এই ঐতিহাসিক ধ্বনি-ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। ফ্রিজের আগমনে "চাই বরফ" বিক্রেতা হারিয়ে গেছে, বৈদ্যুতিক মিক্সার শিলপাটার ডাককে মুছে দিয়েছে। ট্রাম নেটওয়ার্কের পতন ও হকার উচ্ছেদ শহরের মানব-স্কেল শব্দকে ধ্বংস করছে।
তবু যারা শহর ছেড়ে যায়, তাদের মনে কলকাতাকে ফিরিয়ে আনে এই ধ্বনির স্মৃতি—দূর থেকে ভেসে আসা ট্রামের ঘণ্টা, ছাদের উপর "ভোকাট্টা!", কিংবা ঢাকের তালে শহরের প্রাণ।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।