কুমোরটুলির গলি পথে হাঁটতে হাঁটতে নানা স্মৃতি ভিড় করে আসে। পুরাকাল থেকে বাঙালির হৃদয় বয়ে নিয়ে চলে স্মৃতি, সাবেকিয়ানা। আর তাতে মিশে থাকে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। এ বাঙালির এক নস্টালজিক ঐতিহ্য, যা ডাকের সাজ ছাড়া বড্ড খাপছাড়া, অসম্পূর্ণ। বাগবাজারের মা'কে দেখলেই প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। সেই পুজো একশ' বছরেরও বেশি সময় ধরে হয়ে আসছে।

দুর্গাপুজো আজ আর কেবল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ এক কার্যক্রম নয়, শিল্প ও লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল মেলবন্ধন। শরৎকালে কাশের ছোঁয়ায় বিভুতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালির অপু দুর্গার মতো কাশ ফুলের বনে হারিয়ে যায়, তখনি মা মৃৎশিল্পীর হাতে সেজে ওঠেন চিন্ময়ী থেকে মৃন্ময়ী রূপে।

ডাকের সাজ ও তার বৈচিত্র শুধুমাত্র দুর্গা মায়ের মূর্তি নয়, তাঁর সন্তান গণেশ, লক্ষী, কার্তিক, সরস্বতীর ক্ষেত্রেও লক্ষ্যণীয়।

ডাকের সাজের নামকরণের এক জোরালো ইতিহাস রয়েছে। মূলত তা এক চমকপ্রদ গল্প। প্রাচীন বঙ্গাব্দের ইতিহাসের পাতার গন্ধ শুঁকে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা থেকে জানা যায়, মায়ের মূর্তি সাজানো হত আসল সোনা ও রুপোর গয়নাতে। পরবর্তীকালে দেবীকে রাজকীয় কৃত্রিম রূপ দেওয়া শুরু হয়। তার উপাদান একধরণের বিশেষ রুপোলি ফয়েল, রাংতা ও জরি ইত্যাদি। এভাবেই ডাকের সাজের প্রচলন হয়। বাগবাজারের লাটু বাবু, ছাতুবাবু সহ শোভাবাজার রাজবাড়ী - সব জায়গায় ডাকের সাজের প্রচলন শুরু হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে রুপোলি রাংতা ও পাতলা ধাতব তার ভারতে তৈরী হ'তই না। জার্মানি থেকে আমদানি হত নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে। ডাকবিভাগের মাধ্যমে পোস্ট বা ডাকে সাজসজ্জার সামগ্রী পৌঁছাতো এক দেশ থেকে আরেক দেশে। ডাকের মাধ্যমে আসা জিনিসপত্রই হয়ে উঠত দেবীর সাজের অঙ্গ। তাই ডাকের সাজ কথাটা প্রচলিত হয় লোকমুখে।

ডাকের সাজের আঙ্গিক তুলে ধরতে গেলে আরেকটা নাম আমাদের মনে উঁকি দিয়ে যায়, তা হল শোলা। খুব ছোটবেলায় শোলার নৌকো, খেলার সরঞ্জাম ধবধবে সাদা প্রকৃতির শোলা দিয়ে তৈরী হত। ডাকের সাজের সঙ্গে এই শোলা গুলিয়ে ফেললে চলবে না। শোলা অনেক হালকা, ধবধবে আর ডাকের সাজ জাঁক জমকপূর্ণ ও চকচকে। সাবেকিয়ানার গন্ধ যার পরতে পরতে ঘিরে রয়েছে।

ডাকের সাজ মূলত যে উপাদানের সাযুজ্য রেখে ডাকের সাজ তৈরী হয় রুপোলি রাংতা, রুপোলি ও সোনালী চুমকি ও কাঁচের চুমকি। দেবী দুর্গার বিশাল আকারের মুকুট কখনো তাহ ৮ থেকে ১০ ফুট হয় কখনো তার থেকে বড় হয়। গলার হার, কানের দুল, বাজুবন্ধ সব ই ডাকের সাজে ফুটিয়ে তোলা হয়।

শিল্পীদের চোখে ডাকের সাজের এক আলাদা মাত্রাই ধরা পড়ে। বংশানু ক্রমিক ধরে কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা নিষ্ঠার সাথে এই কাজটা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন ছাপ রেখে চলেছেন ইতিহাসের পাতায় বনেদি বাড়ির পুজোর গন্ধে ডাকের সাজের আলো মায়ের মুখেও ঝলমল করে।

শিল্পীরা নিখুঁত হাতে থার্মোকল কেটে জ্যামিতিক ও নকশা দার আকৃতি তৈরী করেন তারপর তার ওপর চকচকে রাংতা আঠা দিয়ে বসিয়ে অলংকার গড়ে তোলেন।

পুরাকালে এত ঝা চকচকে লেজর আলো থ্রিডি প্রদর্শনীর চল ছিল না তখন মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলতো পিকোলাবারেটিভ ঝাড়বাতি যা মূলত রাজবাড়ীর আভিজাত্যের প্রতীক। শান ও  সন্মানের প্রতীক।

এই ডাকের সাজ শিল্পীরা আজ একটু কষ্টই পান যখন তাদের সাথে ইতিহাস ঘেঁটে পুরোনো থেকে এখনকার তত্ত্ব কথার জাল বুনি তাদের মন খারাপের সুর ডাকের সাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপুজোয় আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। থিম নির্ভর পুজোয় বাঙালির ঝোঁক বেড়েছে। সেই ট্রেন্ডের দিকে তাকিয়ে সাবেকিয়ানা তার গন্ধ যেন কোথাও একটু ম্লান।

ঠাকুরের সাজে আশির দশকের পর থেকেই এসেছে চোখে পড়ার মতন পরিবর্তন। কাপড়ের শাড়ী, ফাইবার মূর্তি ঝালাই করা স্প্রে পেইন্টিং, পিতলের গয়না এইসব থাকায় পাল্লা দিয়ে কমেছে ডাকের সাজের চাহিদা। শিল্পীরা লাভের মুখ দেখছেন কম কাঁচামালের আকাশ ছোঁয়া দাম, এই সব শিল্পকর্মতে অনেকখানি সময় ও পরিশ্রম প্রয়োজন। যা ট্রেন্ড অনুযায়ী অন্য অনেক ধরনের সাজে বেশ তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। তবুও কৃষ্ণনগর, কাটোয়া আর কুমোরটুলির প্রবীণ শিল্পীরা আজও পরম মমতায় এই ভালোবাসা, ও ঐতিহ্যকে আপ্রাণ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

বর্তমানে ডাকের সাজ সামাজিক এক থ্রেটের মুখে দাঁড়িয়ে সেই জায়গা থেকে আসুন আমরা আরেকটু সাবেকি শিল্প কে তুলে ধরি নিজের আঙ্গিকে। এত প্রযুক্তির ভিড়ে থিম পুজোর জোয়ারে ডাকের সাজ স্বমহিমায়স্বীয় আসনে অধিষ্ঠান করার চেষ্টা করছে। বাগবাজার সার্বজনীন ও বনেদি বাড়ির একচালা দুর্গা প্রতিমায় ডাকের সাজের গুরুত্ব কমেনি। দেবী দুর্গার মহিষাসুর মর্দিনী রূপ সেই সাথে ডাকের সাজের মেলবন্ধন, সাজের মুকুট ও চালচিত্র যেন বাঙালির হৃদয়ে ভক্তি ও সংস্কৃতির চিরন্তন উজ্জ্বলতার এক প্রতিচ্ছবি হয়ে বেঁচে থাকবে। যা হয়তো আগামী ১০০ বছর পরেও থেকে যাবে কাজে ও ইতিহাসের পাতায় তার জৌলুস নিয়ে।।