আমার মতো বউ পেয়েছিলে বলে জীবনটা উতরে গেলো । কথাটা ত্রিশ বছর ধরে শুনে শুনে সুজিতের কানটা পচে গেছে । এটা কি সব স্ত্রীরা বলে ? না শুধু তার বউ দীপালি ? সুজিত একটু অলস বলে উঠতে বসতে কথাটা দীপালির কাছ থেকে শুনতে হয় ।

এখনও যেন চার বছরের শিশুর মতো তাকে শাসন করবে । মাঝে মাঝে নিজের ওপরে ধিক্কার এসে যায় । ব্যাংকের অফিসার হিসেবে এতকাল দায়িত্ব সামলে এলো । চাকরি জীবনে এতটুকু কালো দাগ পড়েনি ।সসম্মানে অবসর নিয়েছে ।

আগে অফিসে যেটুকু সময় সে থাকতো , সেইটুকু যা বিরতি । আর এখন রিটায়ার্ড করার পর ...সকাল থেকে রাত্রি । এই কোরো না আর সেই কোরো না ।

এতো চা খাবে না । ওকি ?.... এই তো একটু আগে সিগারেট খেলে ? ক্যান্সার হলে কে দেখবে ? ওঃ , সত্যি তুমি নোংরার ডিপো । দুদিনের বাসি পাজামাটা একটু গতর নাড়িয়ে কাচতে দিতে পারো না !!বাড়িতে দেখছি ঠাকুর দেবতা করে কোন লাভ নেই । ....দিলে তো ঠাকুরের বাসনগুলো এঁটো করে । সারাদিন চলে ভাঙা রেকর্ড ।

নিজেকে পাগল পাগল লাগে সুজিতের । এরপর যদি মুখ ফস্কে কোন কড়া কথা তার বেরিয়ে যায় ! ব্যাস , আগুনে ঘি পড়ে যাবে ।

খেতে বসেও নিস্তার নেই । দীপালির কথার চাষ চলতে থাকবেই  ..।

-- আচ্ছা তুমি কি গো ? এতো বয়স হলো , এখনও বাচ্চা ছেলের মতো টেবিলে ভাত ছড়াচ্ছো ? খেতে খেতে এক ঢোঁক জল খেয়েছো কি মরেছ ! জ্ঞানের বাণী শুরু হয়ে যাবে ।

-- এই এক বদ অভ্যেস লোকটার । এতে খাবার হজম হবে ? তারপরেই বলবে , অম্বল হয়েছে , ওষুধ দাও । আমার মতো বউ পেয়ে এ যাত্রায় বেঁচে গেলে ।

সুজিত অকম্মার ধাড়ি । সংসারের কাজ কিছু পারে না । পাশাপাশি বাড়ির স্বামীগুলোস্ত্রীকে কত হেল্প করে । আর আমার স্বামী...সারা জীবন লাট সাহেবের মতো দিন কাটাচ্ছে ।

একদিন ঘুম থেকে উঠে সুজিত ভাবলো , বউকে একটু সাহায্য করবে । বিছানাটা পরিপাটি করে নিচে গিয়ে গর্বের সঙ্গে বললো ।

-- আজ বিছানা করে দিয়ে এসেছি । তোমাকে আর করতে হবে না ।

বলার সঙ্গে সঙ্গে অবাক চোখে তাকালো দীপালি । পরক্ষণে ওপর থেকে বৌয়ের গলা পেলো ।

-- তোমাকে আর আমার কাজ বাড়াতে হবে না । যথেষ্ট হয়েছে । এটা বিছানা করা ?

সুজিত নিচে বসে শুনতে পাচ্ছে ... বিছানার ওপরে ঝাঁটার সপাসপ শব্দ । মনে হচ্ছে ওর পিঠ মনে করেই বোধহয় চালাচ্ছে ।এ কি জ্বালা ....কিছু করতেও দেবে না । আবার না করলে , কথার বৃষ্টি । আগে মেয়েও এর ভাগিদার ছিলো । এখন সে একাই খদ্দের ।   

সেদিন মেয়ে এসে বললো । -- মাকে সাত দিনের জন্যে নিয়ে যাবে । কেননা নতুন ফ্ল্যাট সাজানো গোছানো মা ছাড়া হবে না । মায়ের মতো সব দিক খেয়াল রেখে পরিপাটি করে গোছানো তার দ্বারাও সম্ভব নয় ।

মেয়ে জামাই দুজনে চাকরি করে । জামাইয়ের আবার বাবা মা নেই । দীপালি মেয়েকেও সংসারের কাজ কোনদিন করতে দেয় নি । কেননা পিয়ালী লেখা পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতো । তার মাঝেই মাকে হেল্প করতে যেত । দিপালী বলে উঠতো ।

--- ছেড়ে দে তুই । আমি করে নেবো ।

আসল কথা কারো কাজ ওর পছন্দ নয় । সেইজন্যে হয়তো মেয়ে ভেবেছে , মা গিয়ে যদি দেখে মনমতো সাজানো হয় নি ! নতুন করে গোছাতে বসবে । তার থেকে মায়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া ভালো ।

কথাগুলো শুনে সুজিতের প্রাণে বাতাস লাগে । শুধু শাসন থেকে বাঁচা নয় । একটু স্বাধীনতার হাওয়া শরীরে লাগবে ।যাক , মেয়ের সংসারে কিছুদিন কাটিয়ে আসুক । দীপালি কিন্তু কিন্তু করছে । কোনদিন সুজিতকে একা বাড়িতে ফেলে কোথাও যায় নি । একেই লোকটা হাঁদারাম । গ্যাসের নবটা পর্যন্ত ঠিক করে খুলতে পারে না । যদিও রান্নার লোক আছে ..। কিন্তু ভোরবেলা চা অন্তত করতে হবে ।এ ছাড়া আরও কত টুকিটাকি কাজ আছে ! সন্ধ্যে দেওয়া , গোপাল ঠাকুর শোয়ানো । মশারি টাঙানো । বাবু তো মশারির খুঁটগুলো পর্যন্ত চেনে না ।

মেয়েকে বলে । -- তোর বাবার একার ওপর বাড়ি সংসার ছেড়ে যাওয়া সম্ভব ? কোনদিন কুটোটি নাড়েনি ।

সুজিত সম্মতি দিয়ে বলে । --- তুমি গিয়ে দেখো না , পারি কিনা ? রাজা বিনা রাজ্য আটকায় না । কয়েকটা দিনের ব্যাপার । ঠিক ম্যানেজ করে নেবো ।

জোর গলায় বলে সুজিত । অনিচ্ছাসত্ত্বেও দীপালি তৈরী হয়ে নেয় । যাবার সময় সুজিতের দিকে দীপালি এমন ভাবে তাকায় যেন বিবাহ বিচ্ছেদ হতে চলেছে । সুজিত ভেবে পায় না ওই করুণ চাউনির মানে কি ?

খেয়ে দেয়ে দুপুরবেলা ওরা চলে যেতেই এক নিমেষে বাড়িতে অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে । -- আহা কানের শান্তি । বয়স কম থাকলে সুজিত হয়ত এক চক্কর নেচেই নিতো । সারা বাড়িতে এখন তার একছত্র অধিকার । নিজের মন মর্জির মালিক সে একা । এই কয়েক দিন কান ঝালাপালা করার জন্যে কেউ নেই । নিজেকে কিরকম ব্যাচিলার ব্যাচিলার মনে হচ্ছে ।

যাবার আগে অবশ্য দীপালি পই পই করে বলে গেছে । কি কি করতে হবে । সেসব কথা এখন মগজ থেকে এই কয়েক মিনিটেই উধাও হয়ে গেছে । সে এখন শুধু তারিয়ে তারিয়ে ব্যাচিলার লাইফ উপভোগ করবে । যেন জেল থেকে সদ্য মুক্তি পেয়েছে কোন কয়েদি । কিন্তু.....!

( শঙ্কর বলছি........এই কিন্তুটা ছোট্ট শব্দ ! আমাদের জীবনে এই শব্দটাই সবথেকে বেশি ব্যবহার হয় । সব ক্ষেত্রেকিন্তুটাই সব কিছু ওলোট পালোট করে দেয় । মানুষের চিন্তাধারা , জীবনধারা , ভবিষ্যৎ এই কিন্তু-র ওপর ঝুলে আছে । )

সুজিত প্রথমেই টিভির সুইচ অন করে দিলো । গিন্নির সিরিয়াল দেখার ঠেলায় ক্রিকেটের বিশ্বকাপটা অম্বল চাখার মতো দেখতে হয় । আজ কোন বাধা নেই । চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে মনের আনন্দে দেখতে লাগলো । সিগারেট খেতে গেলেও লুকিয়ে চুরিয়ে বাইরে গিয়ে টেনে আসতে হয় ..। আর এখন ? চোখ বুজে সুখটান দেয় । এই না হলে জীবন !

ভারত নিউজিল্যান্ডের খেলায় বুঁদ হয়ে যায় সে । এই সময় চা তেষ্টা পেয়ে যায় ।কিন্তু আবার ওঠো , গ্যাস জ্বালো । কে ঝামেলা করে ! বরংএকটু বাদে রান্নার লোক বুলা আসবে ।    

ভারতের ইনিংস শেষ হলো । সন্ধে ছটা বাজলো । বুলা আসতেই চায়ের অর্ডার দিলো । ওকে রান্নার ফিরিস্তি সকালেই দীপালি দিয়ে গিয়েছিলো । লম্বা করে চায়ে চুমুক দিলো সুজিত ।

এই সময় ফোন এলো । দীপালির ফোন ।

" পৌঁছে গেছো ? " সুজিত যেন কত চিন্তিত ।

" অনেকক্ষন । তোমার সন্ধ্যে দেওয়া হয়ে গেছে ? ঠাকুরকে ঠিক মতো শুইয়ে দিয়েছো ? " জিভ কাটলো সুজিত । বাইরে কখন সন্ধ্যের অন্ধকার নেমে গেছে । খেলা দেখতে গিয়ে ভুলেই গেছে । কিন্তু সে কথা স্বীকার করা মানেই ...।

" হ্যাঁ , হয়ে গেছে । ￰শাঁখ পর্যন্ত বাজিয়েছি । " ডাহা মিথ্যে কথাটা বলে দিলো ।

" তাহলে তোমাকে যতটা ভাবতাম , ততটা গোবরগণেশ নও তুমি । আমি মরে গেলে ঠিক চালিয়ে নিতে পারবে । "

" ..এ আবার কি অলুক্ষণে কথা । " কপট রাগ দেখায় সুজিত ।

" বুলা রান্না করতে এসেছে ? তোমাকে চা করে দিয়েছে ? না নিজেই করে খেয়েছো ? "

বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে বলে । " নিজেও একবার চা করে খেয়েছি । "

" তুমি তো ক্রমশ অবাক করে দিচ্ছো আমায় । কবে এসব শিখলে ? " সুজিত কথা শেষ করতে চায় । আবার কি মুখ ফস্কে বলে ফেলবে ! তাছাড়া সন্ধ্যেটা দিতে হবে । এদিকে খেলা শুরু হতে চললো ।

" শোন , মেয়ের সংসারে বেশি খাটা খাটুনি করতে যেও না । তোমার কোমরের ব্যাথার কথা মনে রেখো । "

ও প্রান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস নেবার শব্দ হলো । তারপর দীপালি বললো । " তুমি সাবধানে থেকো । ভোরের দিকে এসি বন্ধ করে দিও । খাবার আগে প্রেসারের ট্যাবলেট মনে করে খাবে । "

" Ok , ....কাল সময় পেলে ফোন করবে । " সুজিত কথা শেষ করতে চায় ।

এবার মুখ হাত ধুয়ে দোতলায় ঠাকুর ঘরে চললো । এই প্রথম ঠাকুরের মুখোমুখি । বাহ্ কি সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে দীপালি । ধুপ জ্বালিয়ে গঙ্গা জল ছেটালো । বুলা নিচে রান্না করছে । ওকে শোনাবার জন্যে শাঁখ বাজাবার প্রয়োজন । তাহলে স্বাক্ষী দিতে পারবে । কিন্তু হাজার চেষ্টাতেও বাজাতে পারলো না । বেসুরো , বিদকুটে আওয়াজ বেরোতে লাগলো । শেষে নিচ থেকে বুলা বললো ..।

" ছেড়ে দিন । আপনি পারবেন না । " প্রথম সাবজেক্টেই ফেল করলো সে । গোপালকে শুইয়ে , নেমে এলো । ততক্ষনে খেলা আরম্ভ হয়ে গেছে । এরপর থেকে শুরু হয়ে গেলো সুজিতের হারের পালা ।

টেবিলে বসে ডিনার সারতে সারতে খেলায় মশগুল হয়ে গেলো । রাত্রে শোবার সময় মনে পড়লো প্রেসারের ওষুধ খাওয়া হয় নি । মনে মনে ভাবলো , যাক একদিন না খেলে কিছু যায় আসবে না । মশারি ট্যারা ব্যাঁকা করে টাঙালো । আসলে দড়ির খুঁটিনাটি সে চেনেনা।

সকাল সাতটায় ঘুম ভেঙে চোখে পড়লো , এসি চলছে ..। ঘর বরফের মতো ঠান্ডা । ...ওঃ, দীপালি কি ভুলো ! তারপরেই মনে পড়ে গেলো ...সে এখন একা । তার মানে , ঘুম থেকে উঠে বিছানা করতে হবে । এরপর চা করে খেতে হবে । বাড়িতে তালা লাগিয়ে বাজার সেরে ফেরার পথে কোন দোকানে জল খাবার খেতে হবে । এদিকে সাড়ে আটটার মধ্যে ঘর দোর পরিষ্কার , বাসন মাজার লোক আসবে । তার মধ্যে ঠাকুর ঘরে গিয়ে গোপালকে তুলতে হবে । বাসি জামাকাপড়ে হাত দিলে চলবে না । বাগান থেকে ফুল তুলে নিতে হবে স্নান সেরে !

এদিকে সাতটা পনেরো বাজছে ! মাথাটা কিরকম ঘুরে যায় ওর ।￰ভ্যাবাকান্তের মতো বিছানায় বসে থাকে । কোনদিক থেকে শুরু করবে ? কিন্তু একদিনেই হার মানলে চলবে না । সে পুরুষ মানুষ । গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লো ।

প্রাতঃকৃত্য সেরে স্নান করে বেরোলো । সাজি নিয়ে ফুল তুলে যখন ঠাকুর ঘরে গেলো তখন আটটা বাজছে । এদিকে বউ যখন থাকে , এর মধ্যে দুবার লিকার চা খাওয়া হয়ে যায় । আর আজ ? এখনও চা জোটেনি । নাঃ কাল ভোর ভোর উঠতে হবে ।

ঠাকুরকে কোনরকমে ফুল ছুঁড়ে দিয়ে নিচে নেমে আসে । কাজের লোক আসার আগে কোনমতে বাজার সারা যাবে না । জল খাবার খাওয়া তো দূরের ব্যাপার । এই সময় ফোন বেজে উঠলো । নির্ঘাত স্ত্রী । আবার বাজে সময় নষ্ট যাবে । সময়ের কত দাম ...বুঝতে পারছে সুজিত.. ।

গলাটা যথা সম্ভব মোলায়েম করে সুজিত বলে ।

" গুড মর্নিং । " ও প্রান্ত একটু চুপ ।

" প্রথম তোমার মুখ থেকে এই শব্দটা শুনলাম । সবাই ঠিক বলে । দূরত্ব আকর্ষণ বাড়ায় । যাই হোক , এতক্ষনে পুজো হয়ে গেছে নিশ্চয়ই । কাল সন্ধ্যে বেলা গোপালকে যে বাটিতে আর গ্লাসে বাতাসা জল দিয়েছিলে , সেগুলো নামিয়ে নিয়ে এসেছো নিশ্চয়ই । ও গুলো যেন আবার এঁটো বাসনের সঙ্গে বার করে দিও না । "

কই , সুজিত তো সন্ধ্যেবেলা ঠাকুরকে কিছু খেতে দেয় নি ! এখন মনে পড়ে যায় , প্রতিদিন সকালে পাকা তেঁতুল দিয়ে দীপালি বেসিনে দাঁড়িয়ে ঠাকুরের বাসন মাজে ! ঠোঁট দিয়ে জিভ চাটে । তাহলে কাল সারা রাত্রি গোপাল অভুক্ত ছিলো ? নিজে এদিকে পেট পুরে রুটি মাংস খেয়েছে । নাস্তিক হলেও কেমন যেন মনটা করে উঠলো তার ।

সকালবেলাই মিথ্যে দিয়ে দিন শুরু হলো ।

" সে বুদ্ধি আমার আছে । আমি এইমাত্র মেজে নিয়েছি । তুমি এখন ফোন রাখো । বাসন মাজার দিদি এসেছে । দরজা খুলবো । পরে আমি ফোন করছি । " আসলে ও জানে , এই মিথ্যে এখুনি ধরা পড়ে যাবে । যদি স্ত্রী জিজ্ঞেস করে , তেঁতুল কোথা থেকে পেলে ? ও আদৌ জানেনা কোথায় তেঁতুল রাখা থাকে?

বাসন মাজার লোককে দরজা খুলে দিয়ে আবার ওপরে যায় ঠাকুর ঘরে । ছোট থালায় বাতাসা দিয়ে হাত জোড় করে বলে । " অপরাধ নিও না শ্যাম । আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল ক্ষমা করে দিও । "

সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় মাথাটা একটু ঘুরে উঠলো সুজিতের । মনে পড়লো কাল প্রেসারের ওষুধ খাওয়া হয় নি । সকাল থেকে এখনও পর্যন্ত পেটে এক ফোঁটা দানাপানি পড়েনি । তাহলে কি ঈশ্বর... কাল না খেতে পেয়ে তাকে শাস্তি দিচ্ছে ?

[ এরপর আমরা শেষ পর্বে যাবো । আমরা অনেক সময় ওই প্রবাদ বাক্যটা বলি বটে । রাজা বিনা রাজ্য আটকায় না ..। কিন্তু কখনো কখনো অল্প হলেও আটকায় । এরপর দেখা যাক শেষ পরিণতি কি ?? ]

সুজিত অপেক্ষা করে রইলো বুলার আসার জন্যে । এর মধ্যে গোটা চারেক বিস্কুট আর জল খেয়ে নিলো । নিয়মের মধ্যে এতো বছর বাস করে , সেটাই মজ্জায় ঢুকে গেছে । অনিয়মটা চোখে ও মনে লাগছে । কাল রাত্রে একা বিছানায় শুয়েও ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো ।

বুলা এসে জিজ্ঞেস করলো । " কি রান্না করবে ? " -- আকাশ থেকে পড়ে সুজিত । এতদিন শুধু খেয়ে এসেছে । কিন্তু কি কি খাবে ...মুখ ফুটে বলতে হয় নি ।

" তুমি তো জানো আমি কি খাই । সেইমতো রাঁধো । "

বুলা ফ্রিজ খুলে বলে । " ..বাজার করেন নি ? এতো দেখছি শুধু বেগুন আর কুমড়ো পড়ে আছে । মাছ দু পিস আছে । "   

" কাল বাজার করবো । তুমি বেগুন ভাতে আর মাছের ঝোল করে দাও । আগে চার কাপ চা করে ফ্লাস্কে রেখে দাও ..। " ব্যাজার মুখে বলে সুজিত ।

চা খেয়ে বেলা সাড়ে দশটার সময় খবরের কাগজ নিয়ে বসে । অন্য দিন এতক্ষনে খবর কাগজ মুখস্ত হয়ে যায় । নিজের মনকে বোঝায় , প্রথম দিনে যে কোন কাজে একটু অনিয়ম হয় । ইতিমধ্যে প্রেসারের ওষুধ খেয়ে নিয়েছে ।

নিজেই এবার দীপালিকে ফোন করে ।

" নতুন ফ্ল্যাটে একা একা কি করছেন দেবী ? " রসিকতা গলায় ।

" তোমার মেয়ে কাজ করতে দিলে তো ? খালি বলছে ...এতকাল একটানা খেটেছ । ছেলের বউ নেই যে সেবা করবে । আসলে তোমায় এখানে এনেছি কয়েকদিন রেস্ট দেবো বলে । একটা মেশিনেরও বিশ্রাম প্রয়োজন । বোঝো দেখি । চুপচাপ একা বসে বসে কত টিভি দেখবো ? "

সুজিতের রাগ এসে যায় । স্বামী এদিকে ঘোল খাচ্ছে , আর উনি একা বসে বসে মস্তি করছে ! সুজিত ভুলে যায় , সে নিজে জোর করে বউকে পাঠিয়েছে । মানুষ নিজের দোষ যদি দেখতে পেতো , তাহলে এতো অশান্তি , ভুল বোঝাবুঝি , শত্রুতা , প্রতিশোধ স্পৃহা মনে বাসা বাঁধতো না.. ।

" বাহ্ , ভালোই তো । কাজের রেস্ট , মুখেরও রেস্ট । " সুজিতের শ্লেষ মেশানো কণ্ঠ ।

" আজ কি রান্না করতে দিলে ? " লুকিয়ে লাভ নেই । বুলা বলে দেবে ।

" কাল মাংস খেয়েছি । পেট ভালো নেই । তাই আজ সিম্পল বেগুন ভাতে আর মাছের পাতলা ঝোল । "

" সে কি ? তুমি তো ঝোল পছন্দ করো না । সবে কয়েক ঘন্টা এসেছি এর মধ্যে পেট খারাপ হলো ? আমি কি আজ চলে যাবো ? " দীপালির গলায় উদ্বেগ !

এইতো , আবার পুরোনো রেকর্ড সুজিতের কানে শব্দ বর্ষণ শুরু করছে..।

" তুমি অত উতলা হয়ো না । বরং রেস্ট লাইফ উপভোগ করো । আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেবো । মেয়ে জামাই কেমন আছে ? " কথা ঘোরায় সুজিত । তারপর আর কথাবার্তা তেমন জমলো না ।

নিজে হাতে ভাত বেড়ে বহু বছর বাদে খেতে বসলো সে ..। একা একা নিস্তব্ধ বাড়িতে খেতে কেমন যেন লাগছে । অর্ধেক ভাত খেয়ে থালা বাসন নিয়ে উঠে পড়লো । প্রথম যে আনন্দ লেগেছিলো , এখন যেন কিছুটা ম্রিয়মান ।

বাজার করা হয় নি । সন্ধ্যেবেলা বুলা এসে কি ঘন্ট রাঁধবে কে জানে ? ফোন করে ওকে বারণ করে দিলো । আজ জমিয়ে রেস্টুরেন্টে বরং গুপ্ গাপ এটা সেটা সাঁটানো যাবে । বউ থাকলে বাধা দেয় । হোটেলের রান্না তোমার সইবে না । বাষট্টি বছরে তাকে বুড়ো বানিয়ে দিলো ।

রাতের খাবারটা জম্পেশ হলো । বাটার নান , চিলি পনির , কড়াই চিকেন । পরে টুটি ফ্রুটি নিয়েছিল । রাত্রে শোবার আগে একটা এন্টাসিড খেয়ে নিলো । বলা যায় না অম্বল হতে পারে ।

ঘুমটা যেভাবে হবে ভেবেছিলো । সেভাবে হলো না । খালি মাথায় ঘুরছে সকাল থেকে কি কি করতে হবে ? দীপালি থাকলে এসব ভাবনা থাকে না । শুধু ওর ফর্দ অনুযায়ী বাজার দোকান করেই সুজিত খালাস । একবার মনে হলো , ঠাকুর শুইয়েছে তো ? অগত্যা রাত সাড়ে এগারোটার সময় উঠে ঠাকুর ঘরে চললো । দেখলো ঠিকঠাক শুইয়েছে । ঘুম চটকে গেলো ।

রাগ উঠতে লাগলো বউয়ের ওপর । এখন তিনি দিব্যি মেয়ের বাড়িতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে । কিন্তু সে তো নিজেই পাঠিয়েছে ।

আসলে আমরা যদি দুদিক দেখতে পেতাম ....তাহলে সবথেকে ভালো হতো । মনের সব সন্দেহ দূর হয়ে যেত । সুজিত যদি দেখতে পেতো , ওখানে দীপালি কি করছে , কি ভাবছে ? তাহলে কি তার মনে এই রাগ আসতো ? দীপালির ক্ষেত্রেও সেই কথা খাটে ।

দীপালি কাল থেকে মেয়ের বাড়ি এসেছে । কিন্তু মন পড়ে আছে ওখানে । লোকটা সবকিছু পারছে তো ? সাত জন্মে অভ্যেস নেই । এখন মনে হয় , কিছুটা ছেড়ে দিলেই বোধহয় ভালো হতো । অভ্যেসটা থাকতো । কিন্তু সুজিত নিজেই ওকে পাঠালো । কবে ওখানে ফিরে যাবে সেটাই শুধু ভাবছে । কতদিন বাদে একা একা শুচ্ছে ।￰সুজিত হয়তো আরাম করে এখন ঘুমোচ্ছে । তার কথা ভাবতে বয়েই গেছে ..। বরং তার ক্যাচর ম্যাচর থেকে মুক্তি পেয়েছে । সত্যি ছেলেরা কত শক্ত । শুধু বউদের দোষ ত্রুটি দেখতে ব্যাস্ত । একবারও ভেবে দেখেনা আমরা তাদের কত খেয়াল রাখি । আর ওনারা ? পান থেকে চুন খসলেই ....। মনটা খারাপ হয়ে যায় । চোখের কোনে জল জমে ওঠে ।

....দুদিনেই জীবনের প্রতি বিরক্তি ধরে যায় সুজিতের । এর থেকে চাকরি করা অনেক সহজ । এতো শালা গাধার খাটুনি । বিছানার চাদর যতবার টান টান করার চেষ্টা করে , ততবার সমুদ্রের মতো ঢেউ খেলানো হয়ে যায় । দীপালি কি সুন্দর বিছানা করে ! ঠাকুর ঘরে ফুল সাজাতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে যায় । বাজার করতে গিয়ে এটা আনে তো ওটা বাদ পড়ে যায় । এক কাপ চা করতে গিয়ে চার চামচে গুঁড়ো চা দিয়ে দেয় । মুখে দিতেই মনে হয় করলার রস খাচ্ছে ! এর ওপর ছাদে জামা কাপড় শুকোতে দেওয়া ! গতকাল সারা রাত ছাদেই পড়েছিল । ভুলেই গেছে । নিজেকে পাগল পাগল লাগে । কিন্তু তাই বলে স্ত্রীর কাছে স্বীকার করা মানে , হার স্বীকার করা । এমনিতে বউ কোন কিছু বলতে ছাড়ে না । এরপর তাহলে আর দেখতে হবে না ।

তাই ফোন এলে , দুজন দুজনকেই মিথ্যের আড়ালে ঢাকে । আমরা বেশির ভাগ মানুষ এমনই । নিচু হবো না । কে আগে হার স্বীকার করবে , তার প্রতিযোগিতা চলে জীবন ভোর ।

চার দিনের মাথায় সুজিতের মস্তিষ্কে এক দুর্মতি চাপলো । ও ঠিক করলো একদম না জানিয়ে মেয়ের বাড়ি যাবে । গিয়ে দেখবে , দীপালি কি ভাবে অবসর জীবন কাটাচ্ছে ? বেলার দিকে যাবে । সেই সময় মেয়ে জামাই কেউ থাকে না । আসলে ওর পক্ষে সব দিক সামলানো আর হয়ে উঠছিলো না । খেলা দেখাটাও মাথায় উঠেছে । আর দীপালি একার হাতে সব সামলে কিরকম সুন্দর ভাবে বসে টিভি সিরিয়াল দেখতো ! সে ভাবতো ওর কাজ নেই !

........বেলা এগারোটা নাগাদ কলিং বেলের শব্দে দীপালি চমকে ওঠে । এই অসময়ে কে এলো ? এখানে কাউকে তেমন সে চেনেনা ! কাঁপা হাতে দরজাটা অল্প ফাঁক করে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো ! অপার বিস্ময়ে অস্ফুস্ট স্বরে বলে উঠলো ।

" ত.. তু--মি ! "

" এলাম । দরজাটা পুরো খোলো । " ঘরে ঢুকে দুজনে দুজনের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ।  সেই চোখে ...আনন্দ, প্রশ্ন , ভালোবাসা , হঠাৎ দেখার খুশি মিলে মিশে একাকার । যেন কত বছর বাদে দুজনের দেখা..! এক মিনিট বাদে দীপালি মুখ খুললো ।

" শরীর ভালো আছে তো ? " 

ঘাড় নাড়লো সুজিত । " তোমাকে দেখতে এলাম ! "যেন দুই প্রেমিক প্রেমিকা গোপনে দেখা করতে এসেছে । সেই রকম চোখে মুখের ভাষা !

মনে মনে দীপালিও বোধহয় এমনটি চাইছিলো । তাই সারা মুখে এক পরম প্রাপ্তির ছোঁয়া । সুজিতের মনেও খুশির স্পর্শ । যেন কতদিন বাদে তার মনের মানুষের দেখা পেয়েছে ।

ঘোর কাটতে দীপালি প্রশ্ন করে । " এই অবেলায় এসেছো ! সকাল থেকে কিছু খেয়েছো ? তাছাড়া কাজের লোক , বুলা ওরা কোথায় ? "

শুকনো মুখে সুজিত বলে । " ওদের ছুটি দিয়ে বলে দিয়েছি । আজ সন্ধ্যেবেলা তোমাদের বৌদি আসবে । নিয়ে আসতে যাচ্ছি । "

" ...সে কি কেন ? হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন ? " অবাকের পর অবাক হচ্ছে দীপালি !

সুজিত নিজের অজান্তেই বলে ওঠে । " ￰জগন্ময় মিত্রের পুরোনো গানটা মনে আছে তোমার ? ...মেনেছি গো মেনেছি ...। আমি হার মেনেছি । " স্বামীর মুখে কথাটা শুনে দীপালি চোখের জল আটকাতে পারে না । রস কষ বিহীন মানুষটার আজ কি হলো ?

" আমার মনের কথাটাই তুমি বললে । আমারও ভালো লাগছিলো না । খালি ভাবছি তুমি কি করছো ? কি খাচ্ছো ? কিন্তু মেয়েকে কি বলবো ? লজ্জায় পড়ে যাবো । "

" এদিকটা ভাবিনি তো ? " মুখটা কালো হয় সুজিতের ।

" দেখছি । তার আগে তোমার খাবার বন্দোবস্ত করি । "

" তোমার খাবার থেকেই দুজনে খেয়ে নেবো । বরং তার আগে ঠিক করো তোমার মেয়েকে কি বলবে ! "

" তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না । বরং গরমে এসেছো ..। সকাল থেকে খাওনি । স্নান সেরে এসো । এর মধ্যে আমি মেয়ের সঙ্গে কথা বলছি । " -- এইতো শুরু হয়ে গেছে বউয়ের শাসন । কিন্তু সুজিতের কানে এখন ততটা খারাপ লাগছে না । যেন এটাই চাইছিলো । তবে কি মানুষ অভ্যেসের দাস ?

দীপালিকাঁচুমাচু মুখে ফোন করে পিয়ালীকে ।

" তোর বাবা , আচমকা এসে হাজির হয়েছে ...। " -- এরপর আর কোন কথা বলতে হয় না তাকে ।

অপর প্রান্ত থেকে পিয়ালীর কণ্ঠ ভেসে আসে ।

" এসেছে ? সত্যি ? আমার চেষ্টা সফল । খালি সময় গুনছি আমি । " ওর কথা শুনে দীপালি বোবা হয়ে যায় ।

" মা তুমি বলতে , বাবার তোমার প্রতি কোন ভালোবাসার টান নেই । আমিও দেখতাম , অন্য বাবাদের মতো আমার বাবা হাসিখুশি নয় । সারাক্ষন তোমাদের দুজনে খিটিমিটি । আমারও খারাপ লাগতো । ভাবলাম দেখি , দূরত্ব তোমাদের মধ্যে কোন প্রভাব ফেলে কিনা ? কারণ দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায় না । কথাটা দু পক্ষের ব্যাপারেই খাটে । দেখো মিলে গেলো । মুখে মধু আর অন্তরে বিষের থেকে এ অনেক ভালো । আমি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরছি । তোমার জামাইকেও বলছি । কারণ এই প্ল্যানে ও সামিল আছে । বরং এই সময়ে তোমরা নিজেদের মধ্যে গল্প গুজব করো.... । "   --- ইস , লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে দীপালির । চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে ।

সুজিত টাওয়েল পরে বাথরুম থেকে বেরোয় । ড্রেস করে , ডাইনিং টেবিলে বসে একটা থালা থেকে দুজনে ভাগ করে খেতে খেতে মেয়ে জামাইয়ের কথা আলোচনা করে চলে । দু জনেই যেন ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধী !