"চুরি করা মহাবিদ্যা। যদি না পড়ো ধরা" বলতে বলতে খবরের কাগজটা এগিয়ে দিল জগার দিকে। মধু ও জগা এক পাড়ার বাসিন্দা। একসঙ্গে বড় হয়েছে, যদিও জগা মধুর থেকে বছর খানেকের ছোট। মধুর নাম মধুসূদন আর জগা হল জগন্নাথ। কিন্তু পাড়ায় তারা মধু আর জগা নামেই অধিক পরিচিত। ছোট বেলার খেলার সাথী, স্কুল যাত্রার সাথী ছিল, এখন প্রাতঃভ্রমনের সাথী। সেই কাজেই বেরিয়েছে সকাল সকাল। এখন বসেছে রবীন্দ্র সরোবরের বেঞ্চে।
খবরের কাগজে বড় বড় হেডিং এ লেখা-- খরদহে সোনার দোকানে চুরি। চোর ধরাও পড়েছে। উত্তম মধ্যমও জুটেছে তার কপালে। জগার পড়াশুনা প্রাইমারির পরে আর এগোয় নি। বাপের মুদির দোকানদারীই তার জীবিকা। মধু অবশ্য পড়াশুনায় ভালো ছিল। এখন সে হাইস্কুলের শিক্ষক। কিন্তু তাতে তাদের বাল্যবন্ধুত্বে কোন ফারাক পড়েনি।
জগা জানতে চায় এই প্রবাদে চুরিকে মহাবিদ্যা কেন বলা হয়েছে। বিদ্যা তো অর্জন করতে হয়। তার জন্য বইপত্র আছে, স্কুল কলেজ আছে, শিক্ষক অধ্যাপক আছে। চুরি শিক্ষার জন্যও সেরকম ব্যবস্থা আছে নাকি? আর ধরা পড়ার পরিণতি যখন এরকম দুঃখ জনক, তাহলে লোকে চুরি করেই বা কেন?
জগার সরলতা দেখে হাসি পায় মধুর। নিজেকে সংযত করে বলে।
...অবশ্যই আছে। গুরুশিষ্য পরম্পরাক্রমে শুনে শুনে এই শিক্ষা চলে। যদিও 'ষণ্মূখকল্পম' নামে চৌর্যশাস্ত্র ও চারজন গুরুরও উল্লেখ পাওয়া য়ায়। চৌর্যবিদ্যা একটা শিল্প, চৌষষ্টিকলার অন্যতম। গুরুর কাছে রীতিমতো তালিম নিয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হয়।
...চুরি করতেও দক্ষতা লাগে?
... লাগে বইকি! চোরের কতকগুলো গুণ থাকতে হবে।
যেমন, বিড়ালের মতো লঘুপদ হতে হবে যাতে পায়ের শব্দ শোনা না যায়। আবার হরিণের মতো দ্রুতপদ হওয়া দরকার, যাতে প্রয়োজনে জলদি সরে পড়া যায়। দৃষ্টি হবে শকুনের মতো, কেউ জেগে আছে কিনা তা পরীক্ষা করার ক্ষমতা থাকতে হবে, কুকুরের মতো। ছদ্মবেশ ধারণ করার ক্ষমতা,সিংহের মতো গায়ের জোর থাকতে হবে। সাপের ন্যায় বুকে হাঁটা, পশু পাখির ডাকের নকল করা, বিভিন্ন ভাষা উচ্চারণের দক্ষতা, স্থলে ঘোড়া, জলে নৌকার মতো চলার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। চোখ, কান প্রভৃতি ইন্দিয় প্রখর হতে হবে, আবার ইন্দিয় সংযমও করতে অভ্যস্ত হতে হবে। কাঞ্চনে লোভ অবশ্যই থাকবে,কিন্তু কামিনীতে নৈব চ, নৈব চ।
....ছিঁচকে চোর, সিঁদেল চোর তাদেরও এত গুণ থাকতে হবে?
...হাঁ, এতো সাধারণ গুণ। সিঁদ কাটাও একটা অসাধারণ শিল্প। মাটির দেওয়াল আর ইটের দেওয়াল কাটার যন্ত্র আলাদা। শ্মশানের লোহা তীক্ষ্ণ করে এই যন্ত্র তৈরি করতে হয়, জপ করে মন্ত্রপূত করতে হয়। সিঁদ হয় ছয় প্রকার-- অ্শ্বমুখ, সিংহমুখ, হস্তিমুখ ইত্যাদি। চোরের শরীরের মাপ অনুযায়ী সিঁদ কাটতে হবে। দেওয়াল কাটার সময় মাটি নিচে পড়তে দেওয়া যাবে না। কোন পাত্রে ধারণ করে অন্যত্র ফেলে আসতে হবে। দরজার আগল খোলার জন্য শক্ত সুতোও বঁড়শি রাখতে হবে। সুতোয় বঁড়শি বেঁধে আগল আস্তে আস্তে তুলে ফেলতে হবে। ভিতরে ঢুকে দরজা হালকা করে ভেজিয়ে রাখা জরুরী যাতে প্রয়োজনে তাড়াতাড়ি পালিয়ে যাওয়া যায়। ঘুম পাড়ানি মন্ত্র জানা চাই, গাছ গাছালির ব্যবহারও জানা প্রয়োজন। যদি গৃহস্বামী আধোঘুমে থাকে, কোন গাছের পাতা পুড়িয়ে ধোঁয়া দিলে নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে, সে জ্ঞান থাকা চাই।
...আর নয় দাদা! তুমিও কি এই লাইনে দীক্ষা নিয়েছো নাকি?
মধু বন্ধু হলেও তাকে তুই বলতে পারে না। যাই হোক,শিক্ষক বলে কথা।
... না, না। আমি দীক্ষা নিতে যাবো কোন দু্ঃখে! এতো সব গুণের কথা রাজা শূদ্রকের লেখা মৃচ্ছকটিকম নাটকে লেখা আছে যে।
...রাজা শূদ্রক! সে আবার কবেকার কোথাকার রাজা গো?
...সে অনেক যুগ আগের কথা। যিশু খৃষ্টের জন্মের তিনশো কি পাঁচশো বছর আগে হবে।
..ও, বা- বা! তখনো কি আজকের মতো চুরিটুরি হতো নাকি?
...তখন কি রে! তারও এক হাজার বছর আগে, ঋক্
বেদ যখন লেখা হয়, তখনো চুরি চামারি হতো। ঐ বেদের দশম মণ্ডলের ১০৮ নম্বর সূক্তে চুরির উল্লখ আছে।
...আচ্ছা! তখন কি এখনকার মতো ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ ছিল?
...না, ঘর বাড়ি হয়তো ছিল না, তবে মুনি ঋষিদের আশ্রম ছিল। দেবতারাও ছিল। তাঁদের সম্পত্তি বলতে ছিল গরু। "পনি" নামে বিদেশী দস্যুরা তাঁদের গরু চুরি করে লুকিয়ে রাখতো। দেবতারা তাদের হদিস পাওয়ার জন্য "সরমা" নামে কুক্করীকে নিযোগ করে। তারই খবরের ভিত্তিতে দেবতারা তাঁদের গরু পুনরুদ্ধার করে। সরমা থেকে কুকুরের আর এক নাম হয় সারমেয়।
...কঠিন শাস্তি। তাকে শূলে চড়ানো হতো।
..তবু লোকে চুরি করতো? তাদের কি আজকের মতো এত অভাব ছিল?
...হয়ত ছিল। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র এর একটা কারণ বাতলেছেন। " খাইতে পাইলে কে চোর হয় "। বিড়াল যেমন খেতে না পেলে চুরি করে, মানুষও তাই। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। তবে চুরির কারণ বহুবিধ। মূলত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্বিক এই চারটি কারণে মানুষের মনে চুরির প্রবণতা লক্ষ করা যায়। জনসংখ্যা আধিক্য, খাদ্যের অপর্যাপ্ত জোগান, কর্মসংস্থানের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শাসনব্যবস্থার অপব্যবহার ইত্যাদি। তবে রাজনৈতিক কারণসমূহ সামাজিক কারণরূপেই পরিগণিত হয়। আর মনস্তাত্বিক কারণের অন্তর্ভুক্ত বিষয় হল নিজের আর্থিক সংগতি থাকা সত্বেও কোন ব্যক্তি বার বার কোন কিছু চুরি করার অদম্য তাগিদ অনুভব করে। এটি কোন সাধারণ অপরাধ নয়, বরং চুরি করার আগে প্রচণ্ড মানসিক চাপ ও চুরির পরে স্বস্তি বা আনন্দ পাওয়ার একটি মনস্তাত্বিক অবস্থা। এটা কোন পরিকল্পনা করে হয় না। আবেগ নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতা থেকে এর জন্ম হয়। এ চুরি হয় স্বভাবে।এটাকে এক ধরণের বিরল মানসিক ব্যাধি বলা যেতে পারে।
এই প্রসঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত অভিঞ্জতাও আছে। বলি শোন্। আমি তখন স্কুলে পড়ি। ক্লাস ইলেভেন। টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে। স্পেশাল ক্লাসের জন্য তিনমাস হস্টেলে থাকতাম। ক্লাস এইটের একটা ছেলে থাকতো হস্টেলে। নাম শ্যামাপদ চৌধুরী। বড়লোকের ছেলে। বাবা গণ্যমান্য ব্যক্তি। মাঝে মাঝেই ছোটখাটো জিনিস চুরি যেত হস্টেলে। একদিন ওর ক্লাসের একটি ছেলের পাইলট পেন চুরি যায়।
তাতে শ্যামাপদ ধরা পড়ে। ইংরেজি শিক্ষক, এস চ্যাটার্জীও হস্টেলে থাকতেন। রেগে গিয়ে খুব মারধর করেন। পরে গার্জেন কল করা হয়। তার বাবা এসেক্ষমা চেয়ে আসল ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেন। তখন আমরা জানতে পারিশ্যামাপদ ছিল মানসিক ব্যাধির শিকার, যার নাম ক্লেপটোম্যানিয়া।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।