পিসিমণি'র কাছে আবদার করলো ছোট্ট বিট্টু-- পিসিমণি আমাকে পাঁচটা টাকা দাওনা, চড়ক মেলায় যাবো। পিসি দাঁত খেঁছিয়ে,মুখবাঁকিয়ে বলল-- আরে মোর কি মেলা দেখন বাবুরে,
যাযা আগে গরু ছাগলগুলো ঘরে ঢোকা তারপর মেলা, বুঝলি।
বাবা-ছেড়ে গিয়ে ভীন গাঁয়ে সংসার পেতেছে সুখের আশায়, আর মাটা মরে গিয়ে আমার ঘাড়ে ভুত চাপিয়ে গেছে।আমার হয়েছে যত জ্বালা।রাগে গদগদকণ্ঠে কথাগুলো বলে চললো নিজের মনেই পিসিমা বিমলা।
অগত্যা মুখখানা কালো করে, পিসির হুকুম অনুযায়ী কাজ করতে লাগলো ছোট্ট বিট্টু। বিট্টুর মা যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিল বিট্টুকে নিয়ে ওর পিসিমণি দেখতে গিয়েছিল। বিট্টুর মা কেঁদে কেঁদে ননদের হাতদুটো ধরে ব'লে ছিল, দিদিগো আমি আর বাঁচবো না, আমার বিট্টু রইলো ওকে তুমি দেখো তোমার হাতে ওকে তুলে দিয়ে গেলাম, নিজের ছেলের মতো দেখ....! ডাক্তার বলেছে আমি আর...বলতে পারলো না দুচোখ ভরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো ! এরপরে বিট্টু আর মাকে দেখতে পায়নি।হাসপাতাল থেকে সোজা শ্মশান ঘাটে নিয়ে যায় ডেড বডি।
কাজ শেষ করে বিট্টু বলল-- পিসিমণি গো, এবার আমি একটুকু ঘুরে আসি না,মেলা থেকে ।
পিসি নির্দ্ধিধায় সম্মতি জানালো কিন্তু এক টাকাও দিল না।
দড়ি দেওয়া পেন্ট,বোতাম ছেঁড়া জামা পড়ে বিট্টু চলল চড়ক মেলা দেখতে। মা থাকলে সাজিয়ে গুছিয়ে, তেলমাখিয়ে চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়ে কোলে করে নিয়ে যেত। আর আজ........ নিজেই নিজের গার্জেন।সাত বছরের শিশু বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে চলল চড়ক মেলার দিকে---এক দরিদ্র হা-ঘরের ছেলের মতো। কেউ কেউ দেখে মুখ টিপে হাসছে। ওর সে-সব দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ঈশ্বরের বিধানে ও এখন সবচেয়ে বড় অভাবি ও দরিদ্র। তারউপর এত ছোট বাচ্চা... ভালো-মন্দেরই বা কি বোঝে ? লজ্জা- সরমের কোন ধারধারে না সে। জামা- প্যান্ট ফর্সা এই যথেষ্ট। পয়সাতো পকেটে নেই, বাবুআনা দেখিয়ে কি লাভ বলো ?
মেলায় কত দোকান,কত জিনিস, খেলনা, পুতুল, বাঁশি--- বেলুন,নাগরদোলা, খাবারের দোকান। ও মনেমনে ভাবছে, মা থাকলে কত আদর করতো,কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে মেলা দেখাতো,জিলিপি, পাঁপড় ভাজা ফুঁ দেওয়া বাঁশি কিনে দিত।এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দেখলো পিসতুতো দাদা বন্ধুদের সাথে পাঁপড় ভাজা খাচ্ছে আর হাসি-- ঠাট্টায় মশগুল। ওকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল যেন দেখেও দেখে নি।
শুকনো মুখে বিট্টু একা মেলা ঘুরে দেখে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
তখনই দেখা হলো গাঁয়ের রামকাকুর সাথে। সে দেখে বলল--কি বিট্টুবাবু, মেলা দেখা শেষ হলো।কি কিনে খেলে ?
--কাকু, আমার কাছে তো পয়সা নেই যে কিছু কিনে খাবো।
--আচ্ছা ঠিক আছে, তোর কাছে নাই থাক,আমার কাছে তো আছে, আয় আমার সাথে---
রামের খুব দয়া হলো,এই টুকুন বাচ্চা, ছয় সাত বছর বয়েস হবে বাবা মা হারা,এর কি দোষ ঈশ্বর, একে তুমি দেখো।
রামকাকু-- বেগুনি ও পাঁপড় ভাজা,এবং জিলাপি ও একটি বাঁশি কিনে দিল। নে এগুলো তুই, সবগুলো তোর।সাবধানে
যেতে পারবি তো বাড়ি ?
হ্যাঁ, কাকু তুমি কি ভালো । বলে রামকাকুকে পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করলো। রাম ওর মাথায় হাত রেখে কপালে একটা চুমু খেল।
আচ্ছা ঠিক আছে, তুই সাবধানে যাবি বাবা।
হ্যাঁগো কাকু, তুমি ভয় পেওনা,আমি ঠিক চলে যাবো বলে বিট্টু বাড়ির রাস্তা ধরলো। রাস্তা দিয়ে একলা হাঁটলে ওর মনে হোত কেযেন পিছনে আসছে,আলতোভাবে তার পায়ের শব্দ শুনতে পেত।পেছনে ঘুরে দেখলে, দেখতো কেউ নেই। এ-ওর মনের ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয় !
বিট্টু পাঁপড় ভাজা খেতে খেতে বাড়ি এসে পৌঁছালো।তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। পিসি চিন্তা করছে এখনো ওরা দু'ভাই এলো না কেন? এমন সময় বিট্টু এসে হাজির এবং পিসির হাতে বেগুনি ও জিলাপির ঠোঙ্গা দিয়ে বলল-- এগুলো তুমি খাও পিসি। সব সব তোমার।
আনন্দের সাথে কথা গুলো বলল-- বিট্টু যেন যুদ্ধ জয় করে এসেছে, এবং বাঁশি হাতে নিয়ে আনন্দে জোরে ফুঁ দিলো।
কে দিলো এগুলো ? কোথায় পেয়েছিস ? কাউকে চেয়েছিস বুঝি, ভিখারির মতো, না চুরি করে এনেছিস ?এত লোভী তুই ! আর তোর ভাগের --? নানা পিসি আমি চাইনি--চুরিও করিনি--
মেলায় রাম কাকুর সাথে দেখা, সেই কিনে দিয়েছে।
আমি একটা পাঁপড় ভাজা খেয়েছি,এগুলো তুমি খাও পিসি। মা যদি থাকতো সেও খেতো---
মায়ের কথা মন পড়তেই-- পিসি দেখলো ওর চোখে জল চিকচিক করছে। সর্বোপরি সেওতো সন্তানের মা, ওকে কাছে বসিয়ে বেগুনি আর জিলাপি দিল, তুই আগে খা বাবা, তারপর আমরা খাবো!
এতটুকু একরত্তি ছেলে তার মাথায় এতবুদ্ধি এলো কোত্থেকে ? পিসি মনেমনে ভাবছে আর ভাইটাকে সবদোষের দোষী বলে চিন্হিত করছে। এমন যার সন্তান তাকে ফেলে কি সুখে অন্য জায়গায় সংসার পাতছে। অমানুষ কোথাকার !
রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, ধীরে ধীরে নেমে এসেছে তার নিস্তব্ধতা। অনেক পরে এলো তার নিজের ছেলে উদয়।মায়ের জন্য বা ছোট্ট মামাতো ভাইয়ের জন্য কোন কিছুই কিনে নিয়ে আসেনি। খালি হাত দেখে মা মিনতি বলল-- কি রে, কিছুই কিনে আনিস নি যে---া
মুখ কালো করে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠলো-- কত এমন টাকা দিয়েছো যে কিছু কিনে আনবো ?
থাক থাক ঘাট হয়েছে আমার। ভুল তো আমারি। হাত-মুখ ধূয়ে আয়, জিলাপি ও বেগুনি খাবি আয়।
কে এনেছে ওগুলো ?
কেন বিট্টু।
ওরে মূর্খ, ও আমাকে পাঁচ টাকা চেয়েছিল ;তাও আমি ওকে দিতে পারি নি। ও কত ছোটো, টাকা হারিয়ে ফেলবে ভেবে ওকে আমি কোন টাকা-পয়সা দেইনি আর তুই একটা গন্ডমুর্খ কি ধরনের প্রশ্ন করলি মাকে? নিজের মাকে কেউ এরকম প্রশ্ন করে? সন্দেহ করে , ছিঃ, ছিঃ....
তাহলে ?
রাম ঠাকুরপো মানে তোদের রামকাকু ওকে কিনে দিয়েছে। ও না খেয়ে বাড়ি নিয়ে চলে এসেছে আমাদের সকলের জন্য।
ভীষণ লজ্জিত হলো অভয় ! মনে মনে রেগেও গেল বিট্টুর উপর কারণ ওর জন্য আজ মা আমাকে খারাপ ভাবছে। এর প্রতিশোধ আমি নেবো।
কি আর প্রতিশোধ নিবে ? ওপর ওয়ালা যে আগে থেকেই নিয়ে নিয়েছে প্রতিশোধ। এরপরে ওর জীবনে যে ধরনের দুঃখ দুর্দশা আসবে তার জন্য সে তৈরি আছে। ঈশ্বরই তো ওর কপাল পুড়িয়েছে আর কি পোড়াবে মানুষে ? এক'বছর বয়সে বাবা গেল ছেড়ে, সাত বছর বয়সে মা চলেগেল না ফেরার দেশে, এর চোখের জলের দাম কে দেবে? সকলের মা আছে, ওর কেবল মা নাই। প্রতি ক্ষণে ক্ষণে মায়ের চিন্তা করে।
, মনে পড়ে যায় মায়ের কথা। অন্যেরা উপলব্ধি করতে পারবে না।
মা ছাড়া এত ছোট ছেলের বেঁচে থাকাটাই ভীষণ কষ্টকর।
বিট্টু সন্ধ্যা হলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতো--
মা তুমি আর কতদিন ওই আকাশে তারাদের মাঝে থাকবে ? আমার যে ভীষণ কষ্ট হয়,ঝড়ের রাতে একলা ঘুমাতে ভয়করে; মেঘ ডাকে বিদ্যুৎ চমকায় ! সবাই বলে তুমি নাকি ওই আকাশের তারাদের কাছে আছো, অথচ আমার কথা একবার ভাবলেনা।কত কষ্টে আমি আছি। তুমি তাড়াতাড়ি এসো না মা।আগের মতো একসাথে আমরা থাকবো,তোমাকে ছাড়া আমার একটুও ভালো লাগেনা মা। জানো মা কাল চড়ক মেলায় গিয়েছিলাম,ওই যে রাম কাকু না মা-- পাঁপড়ভাজা,বেগুনিভাজা,জিলাপি কিনে দিয়েছিল একটা তালপাতার ভেঁপুবাঁশিও। দাদা সেটা নিয়ে কেবল বাজাতে চায় ! কি করি বলোতো ! না দিলে আমার ওপর রাগ করে,ভয় দেখায়। মারবে বলে---
তুমি এলে আর পিসিমণিদের ঘরে থাকবো না, আমাদের ঘরে চলে যাবো। বুঝলে মামণি ! তাড়াতাড়ি এসো আমার সোনা মা যে----কতো ভালো তুমি মা।
এটুকু বাচ্চা বোঝে না মরন কি জিনিস ! যে মানুষ মারা যায় সে আর কখনো রক্তমাংসের শরীর নিয়ে এই পৃথিবীর বুকে ফিরে আসতে পারেনা। কেবল মাত্র সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এই কথাগুলো বলতে হয় ! পার্থিব--অপার্থিব ভাবধারা ছোট্ট শিশুর মনে এখনো আসনি। এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে একসময় ঘরে এসে শুয়ে পড়ে।রাতে খুব ভয় লাগে ! ভূত-প্রেতের, দত্যিদানবের---!
মাঝে মাঝে সে তার মাকে আবছা কুয়াশায় ঢাকা ছায়ামূর্তির মধ্যে দেখতে পায় কিন্তু আগের মতো মায়ের স্পর্শ পায়না।গন্ধ পায়না,পায়ের শব্দ পায়না।
তার মাও সন্তান স্নেহের চক্রে এখনো ঘুরে বেড়ায় বাড়ির আসে--পাশে ! অনেকের নজরে এই দৃশ্য ধরা পড়েছে।
কেউ কেউ বলে সন্তান শাবালোক হলে তবেই তার পুণর্জন্ম সম্ভব।
মায়ের মুখাগ্নির জন্য বিট্টুকে কোলে করে শ্মশানে নিয়ে গিয়েছিল পিসেমশাই বিবেক রায়।আর বিট্টুর হাত ধরে বিবেক রায়-ই মুখাগ্নি করেছিল, ওর সেসব কথা এখন মনে নেই। চিতার আগুন জ্বলতে দেখে একবার মা বলে চিৎকার করে উঠেছিল তখন ওকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ওর মায়ের জলপান্ডুর রোগ হয়েছিল, কিডনি ও লিভারের সমস্যা। এরোগে সাধারনত মানুষ বাঁচে না, তারউপর চরম দরিদ্র সীমারেখার নীচে বাস করতো। স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আরও কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতো।বেশির ভাগ দিন নিজে না খেয়ে ছেলেটাকে খাইয়ে, দু'গ্লাস জল খেয়ে শুয়ে পড়তো। তার ফল স্বরূপ এই রোগ।লোকের ঘরে কাজ করতো, যা পেত সব ঘরে নিয়ে আসতো ছেলের জন্য।একেবলা হয় সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ!
কখনো কখনো বিট্টু মনে মনে ভাবে একবার বাবার কাছে যাই কিন্তু সে তো তার বাবাকে চোখেও দেখেনি। কেমন দেখতে সে, কোথায় বাড়ি। শুনেছে পিসিমণির মুখে ভিনগাঁয়ে ঘর। সে-তো চিনে না, জানেনা।তাহলে যাবে কি করে ? মাও নেই, বাবাও নেই, তার যে কি ভীষণ কষ্ট, কেউ বোঝে না।কেউ কিছু বললেই, দুঃখ পেলেই দু-চোখ দিয়ে কেবল জল ঝরে ! কেঁদে কেঁদে বলতো - মা তুমি তাড়াতাড়ি এসো।
দোষে অদোষে দাদা যখন তখন কানমলা দেয়, মারে বলে-- পালা আমাদের ঘর থেকে। তোদের ঘরতো আছে সেখানে যা।অনেক দুঃখে,ব্যাথা বেদনায়---
বিট্টু মাঝে মাঝে দিনের বেলায় নিজেদের ঘরে যায়, গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদে , আর মা-বাবাকে খুঁজতে থাকে। ঘরের কোনা,দরজার পাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, কোথাও যদি দেখতে পায় বা
লুকিয়ে থাকে ! হায়রে, তার কি পোড়া কপাল ! কে নিবে তার এই দুঃখের বোঝা ! এমন কেউ নেই পৃথিবীতে---
কয়েক বছর হলো,ও এখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। সরকার থেকে বৃত্তি পেয়েছে। খুব ভালো মাথা,স্কুলের শিক্ষক--শিক্ষিকাদের নয়ন মণি বিট্টু ওরপে অজয়।এখন সে বুঝে উঠতে পেরেছে মা আর নেই, সে অনাথ। পিসেমশাই ও পিসিমণি তার বর্তমান গার্জেন, বাবা--মা ! ওদের সবকথা শোনে, সবকাজ করে, এভাবেই চলতে থাকলো অনাথ বিট্টুর চালক বিহীন জীবন গাড়ি। মায়েরগায়ের গন্ধ আর সেরকম পায়না। মা শব্দ যে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট সম্পদ এখন সে বুঝতে পেরেছে। তাই সে কাউকে মা বলেনা, সবাইকে পিসিমণি,মাসিমণি,কাকিমণি,জেঠিমণি, দিদিমণি, ইত্যাদি শব্দে ডাকে। পৃথিবীতে পবিত্র মা শব্দ , কেবল স্বর্গীয়া মায়ের জন্যই তুলে রাখলো ছোট্ট বিট্টু !!
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।