ছোটবেলায় পড়া বইগুলোর মধ্যে ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়-এর পাণ্ডব গোয়েন্দা আমার কাছে ছিল এক আলাদা অনুভূতির নাম। তখন বই পড়া মানেই লাইব্রেরিতে ছুটে যাওয়া, আর সোজা পৌঁছে যাওয়া পাণ্ডব গোয়েন্দার তাকের সামনে—নতুন কোনো খণ্ড এসেছে কি না সেই খোঁজে। আজ সেই দিনগুলো শুধুই স্মৃতির ভাঁজে জমে থাকা গল্প।

সম্প্রতি কিশোর সাহিত্যিক প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়-এর বেতালপুরের লাশ পড়ে যেন আবার ফিরে গেলাম সেই ছোটবেলার দিনগুলিতে। কেন জানি না, তাঁর গল্পগুলোর মধ্যে আমি বারবার খুঁজে পাই সেই পুরোনো কিশোর রোমাঞ্চের স্বাদ, যা একসময় পাণ্ডব গোয়েন্দা পড়তে গিয়ে অনুভব করতাম। অবশ্যই আমি তাঁকে ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা করছি না—সেই আস্পর্ধা আমার নেই। তবে তাঁর লেখায় যে সহজ, আন্তরিক ও রোমাঞ্চময় আবহ রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সেই স্মৃতিগুলিকে আবার জীবন্ত করে তোলে।

টিপস

এশিয়া পাবলিশিং কোম্পানি থেকে প্রকাশিত এই বইটিতে রয়েছে দুটি গল্প—বেতালপুরের লাশ এবং রহস্য ওখানে

প্রথম গল্প বেতালপুরের লাশ শুরু হয়েছে দোলগোবিন্দবাবু ও নেপাল ভট্টাচার্যের কথোপকথনের মাধ্যমে, যেখানে একটি রহস্যময় লাশকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে ভৌতিক আবহ ও টানটান উত্তেজনা। গল্পের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে রহস্যের নতুন মোড়, অথচ ভাষা অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল। বর্তমান সময়ে অনেক লেখাতেই অযথা মানসিক উত্তেজনা বা অবসাদের ছাপ দেখা যায়, সেখানে এই গল্প এক নির্মল মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। বিশেষত কিশোর পাঠকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক মূল্যবান সম্পদ।

গল্পের শেষে জানা যায়, সমগ্র ঘটনাই আসলে গুপ্তধন উদ্ধারের এক জটিল গোলকধাঁধার অংশ। বদন, মদন, কেলে ভূত—এইসব চরিত্র ও মাঝরাতের ভূতপুকুরকে ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত রহস্যের সমাধান ও গুপ্তধনের আবিষ্কার গল্পটিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। অসাধারণ পটভূমি ও রোমাঞ্চকর উপস্থাপনা আমাকে সত্যিই গভীর মানসিক তৃপ্তি দিয়েছে।

দ্বিতীয় গল্প রহস্য ওখানে পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে যেন পুরোনো দিনের কোনো কিশোর গোয়েন্দা অভিযানের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। বর্তমান সময়ের একটি বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে চারজন খুদের অভিযান, বিপদের মুখোমুখি হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত দু’জনকে উদ্ধার করার ঘটনাপ্রবাহ লেখকের গল্প বলার দক্ষতারই প্রমাণ। ছোটদের চোখ দিয়ে বাস্তবকে দেখানোর যে ক্ষমতা, তা এই গল্পে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

তবে বইটির একটি দিক আমাকে কিছুটা হতাশ করেছে—প্রুফ রিডিং। বইজুড়ে বেশ কিছু বানানগত ভুল চোখে পড়েছে, যা পড়ার সময় বারবার ছন্দপতন ঘটিয়েছে। আশা করব, ভবিষ্যতে পুনর্মুদ্রণের সময় এই ত্রুটিগুলি সংশোধন করা হবে।

সবশেষে, আমার আন্তরিক ইচ্ছা—প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় এই চার খুদে গোয়েন্দাকে নিয়ে আরও নতুন গল্প লিখুন এবং তাদের চোখ দিয়ে আমাদের সমাজ ও বাস্তবতাকে আরও সুন্দরভাবে তুলে ধরুন।


বেতালপুরের লাশ

বেতালপুরের লাশ

(4.5)

আমার বইটা পড়ে যেটা মনে হয়েছে সেটাই লিখলাম ...

লেখকের আরো লেখা পড়ুন

বিষয় সংক্ৰান্তআমার মতামত
প্রকাশকএশিয়া পাবলিশিং কোম্পানি
প্রথম প্রকাশ১৪৩৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা১৬০
বইয়ের মূল্য২০০ টাকা
বাঁধাইপেপারবোর্ড
প্রুফ রিডিং৫/১০
বইয়ের ধরণভৌতিক, অলৌকিক, কিশোর উপযোগী