মজানের পনেরোতম রাত।

ইফতারের আয়োজন শেষ হতে না হতেই পাহাড়ঘেরা অরণ্যপুর গ্রামের ওপর নেমে এসেছিল নরম জ্যোৎস্না। দূরের মসজিদ থেকে তারাবির শেষ কিরাত ভেসে আসছিল। বাতাসে ছিল ভেজা মাটি আর রাতের ফুলের গন্ধ।

ঝুমা জানালার পাশে বসে ছিল।

মামার বাড়িতে এসেছে আজ পনেরো দিন। অথচ গ্রামের আর কোনো কিছুই তাকে এতটা টানেনি, যতটা টেনেছে গ্রামের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ডাকঘরটি।

লাল ইটের দেয়াল। কালচে কাঠের দরজা। জানালায় মরচেধরা গ্রিল। দেয়ালের গায়ে শ্যাওলা।

দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বহু বছর ধরে কেউ সেখানে পা রাখেনি।

কিন্তু ঝুমা জানে—প্রতিদিন রাতেই সেখানে আলো জ্বলে।

অদ্ভুত আলো।

লালচে-কমলা।

যেন ঘরের ভেতর কেউ আগুন জ্বালিয়ে বসে আছে।

গত তিন রাত ধরে ঝুমা সেই আলো দেখেছে।

চতুর্থ রাতে আর থাকতে না পেরে সে রান্নাঘরে মামী মরিয়মের কাছে গিয়ে বলল,

"মামী, ওই ডাকঘরটা কি সত্যিই বন্ধ?"

মরিয়ম খালা থেমে গেলেন।

"কোন ডাকঘর?"

"গ্রামের শেষ মাথারটা।"

মামী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

"ওটা প্রায় বিশ বছর ধরে বন্ধ।"

"কেন?"

"পোস্টমাস্টার মারা যাওয়ার পর আর চালু হয়নি।"

"কে ছিলেন পোস্টমাস্টার?"

মরিয়ম খালা নিচু গলায় বললেন,

"আব্দুর রহমান সাহেব। খুব অদ্ভুত মানুষ ছিলেন।"

"অদ্ভুত?"

"ডাকঘরের কাজ করতেন, আবার রাতে কুরআন পড়তেন। আর একটা কাজ করতেন—যারা নিজের মনের কথা লিখতে পারত না, তাদের হয়ে চিঠি লিখে দিতেন।"

ঝুমার চোখ বড় হয়ে গেল।

"তারপর?"

মামী একটু ইতস্তত করে বললেন,

"লোকমুখে একটা কথা আছে। রমজানের শেষ দশকে ওই ডাকঘরে মাঝে মাঝে আলো দেখা যায়।"

"আপনি দেখেছেন?"

মামী সরাসরি উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

"সব আলো মানুষের জ্বালানো হয় না।"

সেদিন রাতে ঝুমার ঘুম এল না।

রাত গভীর হলে সে জানালার পর্দা সরিয়ে তাকাল।

দূরে—

ডাকঘরটি জ্বলছে।

আলোটি আগের চেয়ে উজ্জ্বল।

আর সেই আলোয় জানালার পর্দায় একটি মানুষের ছায়া দেখা গেল।

কেউ যেন টেবিলে বসে লিখছে।

ঝুমার বুক ধক করে উঠল।

ঠিক তখন পেছন থেকে ফিসফিস শব্দ—

"তুমিও দেখেছ?"

ঝুমা ঘুরে তাকাল।

আরমান দাঁড়িয়ে।

মামার বাড়ির পাশের বাড়ির ছেলে। গ্রামের ইমামের সন্তান। বয়সে ঝুমার সমান। রহস্যের প্রতি তার অদ্ভুত দুর্বলতা।

ঝুমা বলল,

"তুমি কখন এলে?"

"তুমি যখন ভূত দেখছিলে।"

"আমি ভূত দেখিনি।"

"তাহলে?"

ঝুমা জানালার বাইরে তাকাল।

"কেউ লিখছে।"

আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

"চলো।"

"কোথায়?"

"ডাকঘরে।"

রাত তখন প্রায় তিনটা।

তাহাজ্জুদের সময়।

দুজন নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বের হলো। পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তাদের মনে হলো, পুরো গ্রাম যেন শ্বাস বন্ধ করে আছে।

ডাকঘরের কাছে যেতেই ঝুমা থেমে গেল।

দরজাটি সামান্য খোলা।

ভেতর থেকে লালচে আলো বেরিয়ে আসছে।

আরমান ফিসফিস করে বলল,

"আমি বলেছিলাম, এখানে কিছু আছে।"

ঝুমা দরজায় হাত রাখল।

দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভেতরে পুরোনো কাঠের টেবিল। ধুলো জমা তাক। দেয়ালে বিবর্ণ ডাক বিভাগের মানচিত্র।

আর টেবিলের সামনে একজন যুবক বসে আছে।

সিজদা শেষ করে সে ধীরে ধীরে মুখ তুলল।

পরনে সাদা পাঞ্জাবি। সামনে খোলা কুরআন। পাশে একটি পুরোনো ডায়েরি, একটি কম্পাস এবং কয়েকটি হলদে খাম।

যুবকটি তাদের দেখে অবাক হলো না।

বরং বলল,

"তোমরা অবশেষে এলে।"

আরমান চমকে উঠল।

"তুমি কে?"

"ইয়াসিন।"

"এখানে কী করছ?"

"যে কাজটা আমার নানা শুরু করেছিলেন, সেটাই শেষ করার চেষ্টা করছি।"

"তোমার নানা?"

"আব্দুর রহমান।"

ঝুমার চোখ চলে গেল টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো ছবির দিকে।

ছবিতে একজন বৃদ্ধ মানুষ। মাথায় টুপি। চোখে গোল চশমা।

ছবির নিচে লেখা—

আব্দুর রহমান

পোস্টমাস্টার, অরণ্যপুর ডাকঘর

১৯৬৮–২০০৬

ইয়াসিন একটি হলুদ খাম তুলে নিল।

খামের ওপর কোনো নাম নেই।

কোনো ঠিকানাও নেই।

শুধু লেখা—

"যার কাছে পৌঁছানোর কথা, তার জন্য।"

ঝুমা বলল,

"এটা কী?"

"আমার নানার শেষ চিঠি।"

"প্রাপক কে?"

"জানি না।"

"তাহলে চিঠি লিখলেন কেন?"

ইয়াসিন জানালার বাইরে তাকাল।

"কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীতে কিছু বার্তা আছে যাদের ঠিকানা মানুষ আগে থেকে জানে না। সময় নিজেই একদিন ঠিকানা খুঁজে নেয়।"

আরমান হেসে বলল,

"এটা তো গল্পের মতো শোনাচ্ছে।"

"হয়তো।"

ইয়াসিন খামটি আবার রেখে দিল।

"কিন্তু গল্পের সবকিছু মিথ্যা হয় না।"

পরদিন দুপুরে ঝুমা আবার ডাকঘরে গেল।

ইয়াসিন তখন নানার ডায়েরি পড়ছিল।

"তুমি কি জানো," সে বলল, "নানা কেন এই ডাকঘর ছেড়ে যেতে পারেননি?"

"কেন?"

"একজন মানুষ এক রাতে তাঁর কাছে এসেছিল।"

"কে?"

"নানা তার নাম লিখে রাখেননি।"

"কেন?"

"কারণ লোকটি বলেছিল—তার নিজের কোনো পরিচয় নেই।"

ঝুমা ভ্রু কুঁচকাল।

ইয়াসিন ডায়েরির একটি পৃষ্ঠা খুলে দেখাল।

"লোকটি নানাকে একটি চিঠি লিখতে বলেছিল। কিন্তু চিঠির প্রাপক তখনো পৃথিবীতে আসেনি।"

"কী?"

"সে বলেছিল, ভবিষ্যতে এমন একজন মানুষ আসবে, যার পরিচয় সে জানে না। শুধু জানে—সেই মানুষ একদিন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করবে। তখন এই চিঠি তার হাতে পৌঁছাতে হবে।"

ঝুমা চুপ করে রইল।

"নানা কি চিঠি লিখেছিলেন?"

"হ্যাঁ।"

"লোকটা?"

"আর কখনো ফিরে আসেনি।"

"চিঠিটা?"

"এই যে।"

ইয়াসিন হলুদ খামটির দিকে তাকাল।

ঝুমার শরীরে কাঁটা দিল।

"তাহলে এত বছর ধরে চিঠিটা এখানে?"

"হ্যাঁ।"

"কেউ খুলেনি?"

"নানা নিষেধ করে গিয়েছিলেন।"

"কেন?"

ইয়াসিন ডায়েরির শেষ পাতাটি খুলল।

সেখানে কাঁপা হাতে লেখা—

"যে রাতে মানুষ পৃথিবীর সব শব্দের ওপরে উঠে তার রবের দিকে ফিরে যায়, সেই রাতেই এই চিঠির সময় হবে। কিন্তু চিঠি তখনই খুলবে, যখন দরজায় সেই মানুষটি দাঁড়াবে যার জন্য এটি লেখা।"

ঝুমা ফিসফিস করে বলল,

"লাইলাতুল কদর?"

ইয়াসিন মাথা নেড়ে বলল,

"নানা তাই মনে করতেন। তবে তিনি বলতেন, এ রাতের মাহাত্ম্য কোনো রহস্যের খেলায় পরিণত করা যাবে না। চিঠির সময় নির্ধারণের এই কথাগুলো ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও কল্পনার অংশ। আল্লাহর অদৃশ্য জগতের প্রকৃত রহস্য আমরা জানি না।"

আরমান বলল,

"কিন্তু তুমি কীভাবে জানবে সেই মানুষ কে?"

ইয়াসিন উত্তর দিল না।

রমজানের শেষ দশক শুরু হলো।

ডাকঘরের লালচে আলো এখন প্রায় প্রতি রাতেই দেখা যায়।

কেউ কেউ বলতে শুরু করল, আব্দুর রহমানের আত্মা ফিরে এসেছে।

ইয়াসিন এসব কথা শুনে শুধু বলত,

"আমার নানা জীবিত থাকতেই বলেছিলেন—মৃত মানুষের নামে ভয় ছড়িও না।"

এক রাতে ঝুমা আবার ডাকঘরে গেল।

দরজা খোলা।

ইয়াসিন ডায়েরি নিয়ে বসে আছে।

ঝুমা বলল,

"তুমি কি কখনো চিঠিটা খোলার চেষ্টা করেছ?"

"একবার।"

"তারপর?"

"খামটা ছিঁড়তে পারিনি।"

"কেন?"

"জানি না।"

"আবার চেষ্টা করবে?"

ইয়াসিন জানালার বাইরে তাকাল।

"আজ সাতাশে রমজান।"

ঝুমা বুঝল।

আজ সেই রাত।

তারাবির পর গ্রাম ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

কেউ তাহাজ্জুদের জন্য মসজিদে গেল। কেউ ঘরে ইবাদতে বসে রইল।

ইয়াসিন, ঝুমা ও আরমান ডাকঘরে পৌঁছাল।

ভেতরে অদ্ভুত নীরবতা।

মোমবাতি জ্বলছে।

লালচে আলোয় ঘরটি যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

ইয়াসিন খামটি টেবিলে রাখল।

"আজ যদি দরজা না খোলে?"

আরমান বলল,

"তাহলে?"

"তাহলে আমরা অপেক্ষা করব।"

ঠিক তখন—

ঠক।

দরজায় শব্দ হলো।

তিনজনই তাকাল।

আবার—

ঠক।

দরজা খুলে গেল।

বাইরে কেউ নেই।

শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি ছোট্ট খাম।

তার ওপর লেখা—

"আব্দুর রহমানের জন্য।"

ইয়াসিন স্থির হয়ে গেল।

"এটা কীভাবে এল?"

ঝুমা খামটি তুলে নিল।

পেছনে একটি পুরোনো তারিখ।

উনিশ বছর আগের।

ইয়াসিনের হাত কাঁপতে লাগল।

সে তার নানার চিঠিটি তুলে নিল।

দুটি খাম পাশাপাশি রাখতেই ঝুমা দেখল—দুটোর কাগজ একই ধরনের।

"খুলে দেখো।"

ইয়াসিন প্রথম খামটি খুলল।

ভেতরে মাত্র কয়েকটি লাইন—

"আপনি যে শিশুটির জন্য চিঠি লিখবেন, সে আপনার কাছে আসবে। তার কোনো নাম থাকবে না। আপনি তাকে নাম দেবেন না। শুধু তাকে বলবেন—সে কারও ভুল নয়। সে অপেক্ষার ফল।"

ইয়াসিন স্তব্ধ।

আরমান বলল,

"এর মানে কী?"

ইয়াসিন ধীরে ধীরে দ্বিতীয় খামটি খুলল।

ভেতরে একটি পুরোনো ছবি।

একটি শিশু।

তার পাশে দাঁড়িয়ে তরুণ আব্দুর রহমান।

ছবির পেছনে লেখা—

"এলিনা—যে শিশুটিকে আমি সেদিন পাহাড়ের পথের পাশে পেয়েছিলাম।"

ঝুমা তাকিয়ে রইল।

"এলিনা কে?"

ইয়াসিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

"আমি জানি না।"

ঠিক তখন ঘরের একমাত্র আয়নাটি কেঁপে উঠল।

তার পৃষ্ঠে যেন পানির ঢেউ উঠল।

তারপর—

একটি মেয়ের মুখ ভেসে উঠল।

বয়স প্রায় ঝুমার সমান।

চোখে অদ্ভুত শান্তি।

সে বলল,

"আমার নাম এলিনা।"

তিনজনের মুখে কোনো কথা নেই।

মেয়েটি বলল,

"ভয় পেয়ো না। আমি তোমাদের সময়ের মানুষ নই।"

আরমান পিছিয়ে গেল।

"তুমি কোথায়?"

"যেখানে সময়ের অন্য প্রান্তে মানুষ অপেক্ষা করে।"

ঝুমা সাহস করে জিজ্ঞেস করল,

"তুমি কি সেই চিঠির প্রাপক?"

মেয়েটি মৃদু হাসল।

"না। আমি সেই চিঠির কারণ।"

"মানে?"

"আব্দুর রহমান হুজুর আমাকে যখন পেয়েছিলেন, তখন আমার কোনো পরিচয় ছিল না। তিনি আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'তোমার জন্মের গল্প আমি জানি না। কিন্তু তোমার ভবিষ্যৎ তোমার নিজের।'"

মেয়েটির কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

"মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে একটি কথা বলেছিলেন—'একদিন তুমি জানতে পারবে, তোমাকে কেউ ভুলে যায়নি।'"

ঝুমার চোখে পানি এসে গেল।

"তারপর?"

"তারপর আমি তাঁকে হারাই।"

"তুমি এখন কোথায়?"

এলিনা উত্তর দিল,

"আমি সেই জায়গায়, যেখানে তাঁর রেখে যাওয়া কথাগুলো এখনো বেঁচে আছে।"

আয়নার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল।

ইয়াসিন হঠাৎ বলল,

"তাহলে আমার নানা তোমাকে চিনতেন?"

"হ্যাঁ।"

"তুমি কি আমার নানার চিঠি পেয়েছ?"

এলিনা হাসল।

"চিঠি কখনো শুধু কাগজে পৌঁছায় না, ইয়াসিন। কখনো একজন মানুষের জীবনই হয়ে ওঠে তার উত্তর।"

আয়নার ভেতর থেকে একটি খাম বেরিয়ে এল।

ইয়াসিন সেটি হাতে নিল।

খামের ওপর লেখা—

"আমার নাতির জন্য।"

ইয়াসিনের চোখ ভিজে উঠল।

সে খাম খুলল।

ভেতরে মাত্র একটি বাক্য—

"ইয়াসিন, তুমি আমার রক্তের উত্তরাধিকার নও; তুমি আমার বিশ্বাসের উত্তরাধিকার। মানুষকে তার জন্ম দিয়ে নয়, তার আলো দিয়ে চিনবে।"

ইয়াসিন চিঠিটি বুকে চেপে ধরল।

ঠিক তখন মসজিদের মিনার থেকে ফজরের আজান ভেসে এল।

আয়নার আলো নিভে গেল।

এলিনা নেই।

ঘর আবার পুরোনো, অন্ধকার ডাকঘর।

কিন্তু টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটি নতুন খাম।

ঝুমা সেটি তুলে নিল।

তার নাম লেখা।

"ঝুমার জন্য।"

তার হাত কাঁপছিল।

খাম খুলে সে পড়ল—

"প্রিয় শিশু,

তুমি যদি কখনো মনে করো, পৃথিবীতে তোমার জন্য কোনো দরজা খোলা নেই, তবে মনে রেখো—আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।

মানুষ কখনো কখনো নিজের পরিচয় খুঁজতে দূর দেশে যায়। অথচ তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে আল্লাহর সৃষ্টি, তাঁর বান্দা এবং পৃথিবীতে ভালো কিছু করার সুযোগ পাওয়া একজন মানুষ।

তুমি কারও অপেক্ষার শেষ নও। তুমি নিজেই কারও জন্য একটি ভালো খবর হয়ে ওঠো।

—আব্দুর রহমান"

ঝুমা চিঠিটি বুকের কাছে ধরে রাখল।

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।

লাল ইটের দেয়ালে সূর্যের প্রথম আলো পড়তেই অগ্নিবর্ণ ডাকঘরটি যেন নতুন করে জেগে উঠল।

পরদিন গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখল—ডাকঘরের দরজা খোলা।

বহু বছরের মরচেধরা তালা সরিয়ে ইয়াসিন পুরোনো টেবিল পরিষ্কার করছে।

আরমান তাক সাজাচ্ছে।

ঝুমা জানালার ধুলো মুছছে।

দেয়ালে নতুন একটি বোর্ড টাঙানো হলো—

"অরণ্যপুর ডাকঘর

চিঠি গ্রহণ করা হয়—

যাদের ঠিকানা জানা নেই, তাদেরও।"

তার নিচে ছোট করে লেখা—

"কিছু চিঠির ঠিকানা ডাকঘরে নয়, মানুষের হৃদয়ে।"

ঝুমা শহরে ফিরে যাওয়ার দিন শেষবার ডাকঘরটির দিকে তাকাল।

লাল ইটের দেয়াল সকালের রোদে অগ্নিবর্ণ হয়ে উঠেছে।

তার মনে হলো, ডাকঘরটি আসলে কখনো বন্ধ ছিল না।

বন্ধ ছিল শুধু মানুষের বিশ্বাসের একটি দরজা।

ট্রেন পাহাড় পেরিয়ে দূরে চলে গেল।

ঝুমা জানালার পাশে বসে চিঠিটা আবার খুলল।

শেষ লাইনটি পড়ল—

"তুমি সুন্দর ভবিষ্যতের একটি ঠিকানা হও।"

সে জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে পাহাড়।

তারও ওপারে অদৃশ্য কোনো পথ।

আর কোথাও, কোনো এক সময়ের ভেতর, হয়তো একজন মানুষ এখনো একটি চিঠি লিখছে।

কারণ কিছু চিঠি পৌঁছাতে এক দিন লাগে।

কিছু চিঠির লাগে উনিশ বছর।

আর কিছু চিঠি—

সময়েরও ওপারে গিয়ে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়।