ভোর চারটের সময় যখন পুরো শহর এক গভীর ও নিশ্চিন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনো তুষারের ঘরের ছোট টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে একগাদা পুরনো চিঠিপত্র, ধূলিমলিন কিছু ডায়েরি আর একটা পিতলের ছোট চাবি। চাবিটার গায়ে একটা অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা—দুটো একমুখী নদী যেন কোনো এক অজানা বিন্দুতে এসে মিলে গেছে। তুষার বিগত তিন মাস ধরে এই চাবি আর চিহ্নটার রহস্য উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করছে।
তুষার পেশায় একজন তরুণ সাংবাদিক। গত বছর তার দাদু, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অমিয়ভূষণ দে মারা যাওয়ার পর তাদের কলকাতার পুরনো বাড়িটা পরিষ্কার করতে গিয়ে এই চাবিটা পাওয়া যায়। দাদুর পড়ার ঘরের একটা গোপন ড্রয়ারে রাখা ছিল একটা কালো রঙের ডায়েরি আর তার ভেতর যত্ন করে লুকোনো এই পিতলের চাবি। ডায়েরির শেষ পাতায় দাদুর কাঁপাকাঁপা হাতের লেখায় লেখা ছিল: "যে সত্য আমি সারা জীবন লুকিয়ে রেখেছি, তা রয়ে গেছে নদীর ওপারে, রূপপুর গ্রামের পুরনো জমিদার বাড়ির পাতকুয়োর নিচে। চাবিটা যাকে খুঁজছে, সে-ই এর সঠিক উত্তর পাবে।"
তুষার জানত, এই রহস্য সমাধান না করা পর্যন্ত সে শান্তিতে ঘুমোতে পারবে না। তাই সকালের প্রথম ট্রেনেই সে রওনা হলো রূপপুরের উদ্দেশ্যে। ট্রেন যখন গ্রামীণ বাংলার সবুজ ধানক্ষেত আর ছোট ছোট নদী পেরিয়ে এগিয়ে চলছিল, তুষারের মনে নানাবিধ প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল। দাদু কেন রূপপুরের কথা কখনো তাদের বলেননি? আর সেই পাতকুয়োর নিচে এমন কী লুকোনো আছে, যা প্রকাশ পাওয়া এত জরুরি?
রূপপুর স্টেশনে নামার পর চারপাশের পরিবেশটা তুষারের কাছে বেশ থমথমে মনে হলো। গ্রামটা দেখতে খুব শান্ত হলেও যেন একটা অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে আছে বাতাস জুড়ে। স্থানীয় এক প্রবীণ চা-বিক্রেতা হরিশাকাকাকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি চমকে উঠলেন। তুষার যখন জমিদার বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করল, হরিশাকাকা চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "বাবু, ওদিকে যাবেন না। ওই বাড়িটার ওপর অভিশাপ আছে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এক ঝড়ের রাতে পুরো জমিদার পরিবার রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। তারপর থেকে ওটা এক পরিত্যক্ত জায়গা। সেখানে যাওয়ার সাহস কেউ করে না।"
কিন্তু তুষার দমবার পাত্র নয়। ভয় তাকে পেছাতে পারল না, বরং তার কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিল। গ্রাম পেরিয়ে মেঠো পথ ধরে প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটার পর সে পৌঁছাল সেই পুরনো জমিদার বাড়ির সামনে। বিশালাকার খিলান, শেওলা ধরা ইটের দেয়াল আর লতাপাতায় ঢেকে যাওয়া বিশাল বিশাল স্তম্ভগুলো এককালের ঐশ্বর্যের সাক্ষী দিচ্ছে। বাড়িটার ভেতরে প্রবেশ করতেই এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আর বাতাসের মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ তুষারকে স্বাগত জানাল।
উঠোনের এক কোণে জঙ্গল কেটে এগোতেই তুষার দেখতে পেল সেই পুরনো পাতকুয়োটি। সেটির ওপর একটা ভারী লোহার ঢাকনা চাপানো ছিল। অনেক কষ্টে, গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে তুষার ঢাকনাটা সরাল। ভেতরে অন্ধকার, নিঃসীম গভীরতা। পকেট থেকে শক্তিশালী টর্চ বের করে নিচে আলো ফেলতেই সে দেখতে পেল কুয়োর দেয়ালের গায়ে একটা ছোট লোহার সিন্ধুক বসানো রয়েছে। আর সেই সিন্ধুকের গায়ে রয়েছে ঠিক একই চিহ্ন—দুটো নদী এক জায়গায় মিলে যাওয়ার সেই নকশা!
তুষার দড়ি ধরে সাবধানে কুয়োর ভেতরে নামল। তার বুক দুরুদুরু কাঁপছিল। পকেট থেকে চাবিটা বের করে সে সিন্ধুকের তালাটায় ঢোকাল। হালকা একটা মোচড় দিতেই 'ক্লিক' করে শব্দ হলো এবং হাজার বছরের জং ধরা তালাটা খুলে গেল। ভেতরে ছিল চামড়ায় বাঁধানো একটা ফাইল আর কিছু পুরনো আলোকচিত্র।
কুয়ো থেকে উঠে এসে তুষার খোলা বাতাসে ফাইলটা খুলল। আর পাতাগুলো ওল্টাতেই তার চোখ কপালে উঠল। যা সে দেখল, তার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।
ফাইলে থাকা দলিল আর চিঠিগুলো থেকে জানা গেল এক আলোড়ন সৃষ্টি করা ইতিহাস। তুষারের দাদু অমিয়ভূষণ আসলে কোনো সাধারণ পরিবারের সন্তান ছিলেন না; তিনি ছিলেন রূপপুরের এই শেষ জমিদারের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন চারদিকে অস্থিরতা আর হানাহানি চলছিল, তখন জমিদারের কিছু বিশ্বস্ত লোক এই পরিবারের সমস্ত সম্পত্তি আর ঐতিহাসিক গবেষণার মূল্যবান নথি রক্ষা করার জন্য এই কুয়োর নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পরিবারের বাকি সদস্যরা মারা যান। অমিয়ভূষণ তখন অনেক ছোট ছিলেন, তাকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অন্য এক পরিচয়ে বড় করে তোলা হয়।
পরবর্তী জীবনে অমিয়ভূষণ যখন নিজের আসল পরিচয় জানতে পারেন, ততদিনে তিনি সাধারণ শিক্ষাবিদ হিসেবে সমাজ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। তিনি চাননি সেই অতীত রাজকীয় সম্পত্তি আর জমিদারি রক্ত তার বর্তমান শান্ত জীবনকে অশান্ত করে তুলুক। কিন্তু ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। তাই তিনি সমস্ত প্রমাণ এই কুয়োর ভেতরে নিরাপদে রেখে এসেছিলেন এবং চাবিটা রেখে গিয়েছিলেন তার একমাত্র নাতি তুষারের জন্য—যাতে সঠিক সময়ে সত্যিটা উন্মোচিত হতে পারে।
ফাইলের একদম শেষে দাদুর নিজের হাতে লেখা একটা চিরকুট ছিল। তাতে লেখা: "তুষার, তুমি যদি আজ এই চিঠিটা পড়ে থাকো, তবে জেনে রেখো—রক্তের পরিচয় মানুষকে বড় করে না, মানুষের কর্মই তার আসল পরিচয়। কিন্তু সত্যকে কখনো লুকিয়ে রাখা যায় না। এই সম্পত্তির মালিক আমি বা তুমি নই, এই বিশাল সম্পদ রূপপুরের সাধারণ মানুষের শিক্ষার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হোক।"
চিঠিটা পড়ার পর তুষারের চোখের কোণে জল জমে উঠল। দাদুর মহানুভবতা আর দূরদর্শিতা তাকে স্তব্ধ করে দিল। সে বুঝতে পারল, কেন দাদু তাকে এত দূর টেনে এনেছেন। এটা শুধু একটা গুপ্তধন খোঁজার ভ্রমণ ছিল না, এটা ছিল এক সত্যের মুখোমুখি হওয়ার এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরীক্ষা।
তুষার আর দেরি করল না। সে গ্রামে ফিরে এসে হরিশাকাকা এবং গ্রামের গুণীজনদের একত্রিত করল। দাদুর ইচ্ছা অনুযায়ী সে সমস্ত সম্পত্তি রূপপুর ট্রাস্টের নামে হস্তান্তর করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করল। সেই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি সংস্কার করে গড়ে তোলা হলো একটি বিশাল পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র, যার নাম রাখা হলো 'অমিয়ভূষণ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট'।
কয়েক মাস পর, নতুন পাঠাগারের উদ্বোধনের দিন তুষার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। বিকেলের রোদ এসে পড়েছিল নতুন রঙ করা দেয়ালগুলোতে। গ্রামবাসী আর শিশুরা হাসিমুখে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুষার পকেট থেকে সেই পিতলের চাবিটা বের করে হাতের তালুতে নিল। চাবিটা এখন আর কোনো বন্ধ দরজার রহস্য নয়, বরং শত শত মানুষের আলোয় ফেরার পথ। তুষার আকাশ পানে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "দাদু, আপনার রেখে যাওয়া দায়িত্ব আমি পালন করেছি।" হালকা বাতাসে যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ভেসে এলো, আর দূরে বয়ে যাওয়া নদীটার বুকে তখন সূর্যাস্তের আলো ঝিকমিক করছিল।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।