ব্যালকনিতে বসে বিহান কবিতা লিখছিল, আর অন্যমনস্ক হয়ে কি যে বিড়বিড় করে বলছিল সেই জানে! হঠাৎ সচেতন হতেই শুনতে পেল "মাতলো রে ভুবন, বাজলো তোমার আলোর বেণু"। আজ সপ্তমী, রাস্তায় আজ খুব ভিড়। তিন তলার ব্যালকনিতে বসে গানের আওয়াজ বেশ শোনা যাচ্ছে। বিহান কলম দিয়ে 'অ' লিখল, এমন সময় নিচে রাস্তায় খুব জোরে একটা চেঁচামেচির আওয়াজ পাওয়া গেল। হুড়মুড়িয়ে তাড়াতাড়ি উঠে বিহান দুহাত দিয়ে শক্ত করে গ্রিল ধরল, আলতো করে মাথাটা লাগালো গ্রিলে, নিচে তাকিয়ে দেখল এক সুন্দরী বৃদ্ধাকে কিছু লোক ধরাধরি করে লালু জ্যেঠুর দোকানের সামনে বসালো। বৃদ্ধার বেশভূষা আলু-থালু হয়েছে, হাত-পা কাঁপছে থরথরিয়ে। নিচে লোকেদের অঙ্গভঙ্গি দেখে বিহানের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, বৃদ্ধাটি রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ি এলো, বৃদ্ধাকে ধরাধরি করে গাড়িতে বসানো হলো, তারপর যে গাড়িটি কোথায় চলে গেল কে জানে!? বিহান আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলো পৃথিবীতে কত ঘটনাই তো ঘটে, কতকটা জানতে পারি, কতকটা পারি না। আচ্ছা, মনুষ্যহীন জনমানবহীন কোন জায়গায় যদি বৃদ্ধাটির সাথে এমন ঘটনা ঘটতো, তাহলে সে কি করতো? বিহান আবার নিচে তাকিয়ে দেখল সবাই সবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বিহান গিয়ে চেয়ারে বসলো, এমন সময় বিহানের মা ভৈরবী বলে উঠলো "দুর্নিবার ফোন করেছে, বলছে তোর ফোন নাকি সুইচ অফ বলছে?"
বিহান- ও হ্যাঁ, চার্জ নেই বোধহয়।
ভৈরবী- যাবি ওদের সাথে?
বিহান- না মা, না করে দাও ওদের।
ভৈরবী- কেন রে, কি হল? এইতো গতকাল বললি যাবি!
বিহান- এখন ভালো লাগছে না, যেতে ইচ্ছে করছে না।
ভৈরবী- সৃজলা, সায়ক ওরা বলছে সিনেমা দেখতে যাবে।
বিহান- কি সিনেমা 'আমসত্ত্ব' ?
ভৈরবী- একটু দাঁড়া, শুনে বলি। হ্যাঁ হ্যাঁ 'আমসত্ত্ব'...
বিহান- না করে দাও।
ভৈরবী- আমি আর তোকে বোঝাতে পারবো না, আমি দুর্নিবারদের না করে দিচ্ছি।
বিহান কবিতা লেখার জন্য কলমটা আবার ধরতেই বিহানের মা ভৈরবী আবার বলে উঠলো "সোনা আসছি রে, দরজাটা লাগিয়ে বস, ফ্রিজে মিষ্টি রাখা আছে, ইচ্ছে হলে খাস। আসছি..."
বিহান- "এসো।"
নিচ থেকে আবার ভৈরবীর আওয়াজ পাওয়া গেল "আসছি রে সোনা, দরজাটা লাগিয়ে বস।"
কিছুদিন ধরে কি যে হয়েছে বিহানের কে জানে!? কারোর সাথে খুব একটা কথা বলছে না ছেলেটা, খেতে ইচ্ছে করে না, ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করে না, কোন কাজ করতে ইচ্ছে করেনা। আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যে ভাবে সারাদিন! হয়তো ভাবে, এ জীবনের কি সত্যি কোন উদ্দেশ্য আছে!? নাকি সবই খেলা! সবই মিছে! তাহলে এত আনন্দে মেতেই বা কি লাভ হচ্ছে? প্রত্যেকবার আমরা এত আয়োজন করে দুর্গাপুজো করি, দশমীতে প্রতিমাটিকে বিসর্জন দেওয়া হয়, বিসর্জন দেওয়ার পর হয়তো স্বল্প দুঃখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়, কিন্তু ভুলে যাই। আবার পরের বছর একইভাবে দুর্গা আসে, আবার আসে, আবার আসে, প্রত্যেকবার আসে। তারপর বিহান কবিতার শেষ লাইনটি লিখে ফেলল "প্রকৃতি প্রসূতির শরৎ এবং শারদীয়া উৎসব, যেন মনুষ্য জীবনেরই জীবনচক্র।" তারপর সে সম্পূর্ণ কবিতাটি পড়তে শুরু করল ---
"নিলাম্বরে বাজে আলোর বেনু;
সমিরনে ছোটে শিউলির রেনু।
কাশে কাশে ভরা প্রান্তর;
উচ্ছ্বাসে ভরা হৃদয় অন্তর।
বৃক্ষরা তাদের পুষ্পের সুবাসে ভুবন মাতায়।
শারদ রবির কিরণ যখন পরে শিশির ভেজা ঘাসে;
যখন সরোবরে পদ্ম প্রস্ফুটিত হয় এবং গগনে কাশ কুসুম উড়ে;
তখন পরিপূর্ণ ধরিত্রী শারদলক্ষ্মীকে আহবান জানায়।
জাতিরূপী দুর্গম অসুরকে বধ করে, দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার আগমন ,তথা এই শারদ উৎসব হয়ে ওঠে বাঙালি জাতির মিলন ক্ষেত্র।
কালচক্রে আগমনীর পরিবেশ ঘুরে ফিরে আসে প্রতিবার;
প্রতিবার মৃন্ময়ী মায়ের প্রতিমা অর্চিত হওয়ার পর পঞ্চভূতে বিলীন হয়;
মৃন্ময়ী মায়ের মত মৃন্ময় মানবও পঞ্চ ভূতে বিলীন হয়।
প্রকৃতি প্রসূতির শরৎ এবং শারদীয়া উৎসব, যেন মনুষ্য জীবনেরই জীবনচক্র।"
বিহান বলল "লিখে তো ফেললাম, মনে হচ্ছে আরেকটু সংশোধন করতে হবে। কিন্তু, কি নাম দেওয়া যায়!!"
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।