"এই যে নদী, যায় সাগরে" নদী আমাদের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী আমাদের জীবনে সভ্যতা গড়ে দেয়, বাঁচিয়ে রাখে এবং বাঁচতে শেখায়। এই নদী পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে বিভিন্ন জনপদের মধ্য দিয়ে গিয়ে একসময় সাগরে মিশে যায়। নদী হল প্রকৃতি, নদী সভ্যতাকে গড়ে আবার সভ্যতা কে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। 

ইতিহাসে দেখেছি নদী কেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠতে। বর্তমানে সেই নদী কেন্দ্রিক সভ্যতায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। নদী তখন নদীমাতৃক নয়, সভ্যতার ওপরে ধ্বংসলীলা ঘটানোর একটা আস্ত উপাদান। নদীমাতৃক সভ্যতা সম্প্রসারিত হয়, যতক্ষণ মানুষ নদীর প্রকৃতিকে সসম্মানে গ্রহণ করে, সমাদর করে এবং নদী মাতা হিসেবে পূজিতা হন। 

নদী কেন্দ্রিক সাহিত্য রচনা বুদ্ধদেব গুহর কলম থেকে পাই। তিনি তার সাহিত্যরসে নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্যকে স্বর্গীয় রূপ দিয়েছেন। নদী তার পারিপার্শিক সৌন্দর্যকে এমন ভাবে চিত্রায়িত করেছেন, অন্য কিছুর দিকে দৃষ্টি যাওয়া খুব কঠিন। নদীর জলধারায় যে শব্দ, সেই শব্দ কানে না পৌঁছানোটাই অস্বাভাবিক। নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে আকর্ষণ করবেই। নদীর গতিপথ পরিবর্তনশীল, নদী কেন্দ্রিক জনপদ পরিবর্তিত হয়, যতক্ষণ মানুষ নদীর তীরে বসবাস করছেন। নদী খামখেয়ালি গতিতে ছুটে চলে, কোথাও খরস্রোতা, কোথাও শান্ত।

নদীর খামখেয়ালি গতি ধরে রেখেছিলেন দেবাদিদেব মহাদেব তার জটায় গঙ্গা নদীকে আবদ্ধ রেখেছিলেন। ভগীরথ সেই নদী পৃথিবীর বুকে আনতে গিয়ে অনেক সাধ্য সাধনার মাধ্যমে ধরনীর বুকে নিয়ে আসতে সফল হয়েছিলেন। গঙ্গার আরেক নাম সেজন্য ভাগীরথী। 

গঙ্গা নদীর মলিনতা নিয়ে ভূপেন হাজারিকার কন্ঠে "ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন", গানটি আমাদের হৃদয় মনকে খুব স্পর্শ করে যায়। গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে শিল্পাঞ্চল গঙ্গা নদীকে যেভাবে দূষিত করেছে তার দীর্ঘ ইতিহাস আমরা জানি এবং পরিচিত আছি। বর্তমান সময় দাঁড়িয়ে গঙ্গার নাব্যতা কমে যাওয়ার জন্য, কলকাতা বন্দরের অনেক জাহাজ প্রবেশ করা বন্ধ হয়ে গেছে। এই কারণে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে হলদিয়া বন্দরকে কাজে লাগানো হচ্ছে নদীর মোহনা তীরবর্তী অঞ্চল হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য কে সচল রাখতে।

সরস্বতী নদীর দশা একই। গঙ্গা শুধু এখানে নাব্যতা হারাচ্ছে না, মিষ্টি জলের কারণে ইলিশ মাছের ক্ষতি ও কম হচ্ছে না। বর্ষার সময় গঙ্গা নদীতে ইলিশের আগমন কমে যায় মিষ্টি জলের অভাবে।

 মূলত দূষণের কারণে এই মিষ্টি জলের অভাব ঘনীভূত হচ্ছে। নদী তীরবর্তী যে সমস্ত কলকারখানা রয়েছে তাদের বর্জ্য পদার্থ নদীর বুকে এসে সঞ্চিত হওয়ার কারণে, মিষ্টি জল বিলুপ্ত হওয়ার পথে। মিষ্টি জলের অভাবে ইলিশ মাছ এখানে তাদের অভিযোজন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবেই ইলিশ মাছের চাষ ব্যাহত হচ্ছে জল দূষণের কারণে।

এক সময় স্বরস্বতী নদী তীরবর্তী সপ্তগ্রাম বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য হতো নদীপথে। ইতিহাস বর্ণিত কাহিনী থেকে জানতে পারি চাঁদ সওদাগর এই সপ্তগ্রাম বন্দর দিয়ে সরস্বতী নদীতে বাণিজ্য করতে যেতেন। বর্তমানে সরস্বতী নদী নাব্যতা হারানোর কারণে, সেই সুদিন হারিয়ে ফেলেছে। 

নদীর এই একঘেয়ে কাহিনী থেকে আমরা একটু অন্যদিকে চোখ ঘোরালে দেখতে পাবো একসময় মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার ভালোবাসার কীর্তি স্থাপন করে গেছিলেন যমুনা নদীর তীরে। তাজমহলকে দেখতে দেখতেই তার বন্দী দশার জীবন কেটে যায়। 

সরযু নদীর তীরে একসময় মহাকাব্য রামায়ণের কিছু ছোঁয়া লেগেছে। সরযু নদী মিথ্যে সাক্ষ্য প্রমাণ দেওয়ার কারণে সীতার অভিশাপে তার প্রবাহ কলা স্তব্ধ হয়ে যায়। সম্রাট বা চন্ডাশোক অশোক তার রাজ্য জয় কালে রক্ত বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন নদী দিয়ে, শুধুমাত্র নিজের রাজ্য জয়ের নেশাকে রূপ দিতে। এরপরই তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যমুনা নদীতে কালীয় দমন করেছিলেন আবার তার সখিদের নিয়েও নানারকম স্বর্গীয় কীর্তিকলাপ পৃথিবীর বুকে সম্পন্ন করেছিলেন।

নদী আমাদের পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পনের সময়, আমাদের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। নদীর জল পিতৃপুরুষকে অর্পণ করতে হয়। পুজোর কাজেও এই নদীর জলই আমাদের প্রয়োজনীয়তা মেটায়। শিবের মাথায় জল ঢালতে গঙ্গা নদীর জলকেই ব্যবহার করি। মুনি ঋষিরা অভিশাপ প্রদান করতেন নদীর জল দিয়ে। 

গঙ্গা নদীর ধারে বাঙালির দুটি ধর্ম সাধনার ক্ষেত্রে দক্ষিণেশ্বর ও বেলুড় মঠ অবস্থিত। দক্ষিণেশ্বরে পরমহংস রামকৃষ্ণদেব মা ভবতারিণীর পূজা অর্চনার সাধ্য সাধনা করেছিলেন এবং সঙ্গে পঞ্চমুন্ডির আসন স্থাপন করে শাক্ত ধর্ম থেকে শুরু করে সমস্ত ধর্মের সাধনার পথ একই, এটা প্রমাণ করেছিলেন "যত মত, তত পথের" মধ্যে দিয়ে। এখানেই তিনি কল্পতরু হয়েছিলেন বাঙালি তথা পরাধীন ভারতবর্ষের সনাতন ধর্মের পথপ্রদর্শক হিসেবে। 

নদীকে ঘিরেও সেলুলয়েডের পর্দায় অনেক ইতিহাস রচিত হয়েছে। নদীর ওপর নৌকায় নায়ক নায়িকা হাওড়া ব্রিজের নিচে দিয়ে যেতে যেতে রোমাঞ্চ সৃষ্টিকারী গান তাদের লিপে গিয়েছেন। নদী যে বিনোদনের কারণ পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠবে এই রকম ধরনের চিন্তাভাবনা শুধু শিল্পী মনস্ক মানুষেরাই ভেবেছেন ভাবতে পেরেছেন এবং দর্শকদেরও ভাবিয়েছেন। নদী রোমান্টিক চিত্রনাট্যে কতটা মোহময়ী হয়ে উঠতে পারে তার নিখাদ প্রমাণ দিয়েছেন সেলুলোয়েডের পর্দায়। 

বর্তমান সময়ে অনাকন্ডা সিনেমাটিও নদীকে ঘিরেই বিরচিত হয়েছে। অ্যানাকন্ডার মতন একটি বিশাল সাপ কিভাবে তার ক্রিয়াকলাপ নদীকে ঘিরে করে চলেছে তার সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি আমরা এই সিনেমাতে দেখতে পেয়েছি পরিচালক ও কলাকুশলীদের দক্ষতায়।

নদী কেন্দ্রিক রাজধানী দেখা যায় ইতিহাসের পাতায়। আগ্রা এক সময় রাজধানী হিসেবে বিবেচিত হতো। যমুনা নদীর তীরে এই আগ্রার অবস্থান। একসময় কলকাতাও ব্রিটিশ শাসনের রাজধানী ছিল। কলকাতা হুগলি বা গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। থেমস নদীর তীরে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডন অবস্থিত। ব্রিটিশ শাসনের সময় লন্ডন থেকেই ভারতের ব্রিটিশ শাসনের নির্দেশিকা পাঠানো হতো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা রানী এলিজাবেথের কাছ থেকে। পরবর্তীকালে এই থিমস নদী দিয়ে প্রচুর জল বয়ে গেছে লন্ডনের উথাল পাতাল রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ডের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে যে গর্জন উঠেছিল, এটা সামাল দেওয়ার প্রশাসনিক নির্দেশিকা লন্ডন থেকেই আসতো। লন্ডনে বসেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্দেশিকা দিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। লন্ডন ও থেমস নদীর ইতিহাস ভারতের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সাথে ২০০ বছর জড়িয়ে ছিল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই লন্ডন ও থেমস নদীর কীর্তিকলাপ ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাভাবনার আঁতুর ঘর ছিল থেমস নদীর তীরবর্তী লন্ডন শহরে। ব্রিটিশ শাসনকালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লন্ডন থেকেই, লর্ড ক্লাইভ কে তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের গোড়াপত্তন করিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী শাসনের শেষে দেশভাগের মতন, কবরের শেষ পেরেকটি পোতার জন্য লর্ড মাউন্টব্যাটেন কে লন্ডন থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমান ইতিহাস বলছে মেট্রোপলিটন সিটির মধ্যে দিল্লি ও কলকাতা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। দিল্লি যমুনা নদীর তীরে এবং কলকাতা গঙ্গা বা হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত। কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী হওয়ায় এখানকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময় একটু আলাদা রকমের চোখে দেখা হয়েছে। চিত্র পরিচালকদের চোখে কলকাতার গুরুত্ব একরকম ছিল। কলকাতাকে ঘিরে অনেক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র পরিচালিত হয়েছে। এদের মধ্যে "কলকাতা ৭১", মৃণাল সেন পরিচালিত চলচ্চিত্রটি খুব সাড়া ফেলেছিল। নদী একটা শহরকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে প্রতিদিনের জনসমাগম না দেখলে বোঝা যাবে না। এখানে রাজ্যের সমস্ত প্রান্তর থেকে রুজি রোজগার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদ পরিবর্তনের নেশায়, জনজীবন পরিচালিত হয়। নদীকে কেন্দ্র করে কলকাতা শহরে গোয়েন্দা কাহিনী রচনা করেছিলেন শরবিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহাওয়া ব্যোমকেশ চরিত্র কে কেন্দ্র করে। নদী কেন্দ্রিক শহরগুলি মধ্যে কলকাতা- সিটি অফ জয়, কল্লোলিনি, তিলোত্তমা নামে পরিচিত। কলকাতা নিঃসন্দেহে ভারতের সবচেয়ে ধনী শহর, যদিও এর নানা সমস্যা তার সেই সমৃদ্ধিকে এক পতনশীল সম্পদে পরিণত করতে শুরু করেছে। এখানে সঞ্চিত ও উপস্থাপিত অর্থের নিরিখে এটি সম্ভবত রোম ও টোকিওর মধ্যবর্তী যেকোনো শহরের মধ্যে সবচেয়ে ধনী শহর।" - জিওফ্রে মুরহাউস

যেসব জায়গায় দুঃখ আর দুর্দশার ছড়াছড়ি, সেগুলোই ভূত-প্রেতের গল্পের জন্য পছন্দের পটভূমি হয়ে ওঠে। কলকাতার অন্ধকারে এমন অসংখ্য গল্প লুকিয়ে আছে; এমন সব গল্প যা বিশ্বাস করে বলে কেউ স্বীকার করতে চায় না, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিতে অতীতের একমাত্র ইতিবৃত্ত হয়ে টিকে থাকে।

নদী কেন্দ্রিক ধর্মীয় স্থান পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র হয়। হরিদ্বার ও বারানসি নদী কেন্দ্রিক ধর্মীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। নদীর ধারে সন্ধ্যা আরতি দেখতে পর্যটকরা যখন ভিড় করে, এই শহর গুলির বুকে, ধর্মীয় আবেগ নদীর জন্যই সজীব হয়ে ওঠে। নদীর ঘাটে সেই সময় জনসমাগম পর্যটন কে আরো উজ্জীবিত করে তোলে। বারানসিতে ঘাটের সন্ধ্যা আরতি দেখার জন্য ঘাটে যেমন ভিড় হয় ,কেউ আবার নৌকাবিহারে এই সন্ধ্যা আরতি দেখতে ভালোবাসেন। মার্ক টোয়েন যথার্থই বলেছেন, " বেনারস ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন, ঐতিহ্যের চেয়েও প্রাচীন, এমনকি কিংবদন্তির চেয়েও প্রাচীন, এবং এ সবকিছুর সম্মিলিত বয়সের চেয়েও দ্বিগুণ প্রাচীন বলে মনে হয় "। 

পাহাড়ি নদীতে rafting পর্যটকদের জন্য একটি অন্যতম বিনোদন। স্থানীয়দের কাছে এই বিনোদনের মাধ্যমে রুজি রোজগারের পথ খুলে যায়। নদী যখন ঝরনা হিসেবে উপর থেকে নিচে নেমে আসে তার নয়নাভি রাম শোভা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। নায়াগ্রা জলপ্রপাত তাদের মধ্যে অন্যতম।