অপেক্ষা শব্দটা খুব ছোট, মাত্র তিন অক্ষরের। কিন্তু এর ভেতরে একটা গোটা জীবন, একটা গোটা মহাবিশ্ব লুকিয়ে থাকে। আমরা সারাজীবন কিছু না কিছুর জন্য অপেক্ষা করি। এই অপেক্ষাই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে নির্ভেজাল সত্য। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যে অপেক্ষা করে না।

ছোটবেলায় অপেক্ষা করতাম কখন বড় হবো। মনে হতো বড় হলেই সব স্বাধীনতা পেয়ে যাব। স্কুলের গণ্ডি শেষ হলে অপেক্ষা করতাম কলেজের জন্য। কলেজ শেষ হলে অপেক্ষা করি কখন একটা ভালো চাকরি হবে, কখন জীবনে একটু শান্তি আসবে, কখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব। চাকরি পেলে অপেক্ষা করি কখন ছুটি পাব, কখন বাড়ি যাব, কখন প্রিয় মানুষের সাথে একটু সময় কাটাব। এই অপেক্ষার কোনো শেষ নেই। আমরা জন্ম থেকেই অপেক্ষা করতে শুরু করি এবং মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করেই যাই। মা তার সন্তানের জন্য অপেক্ষা করে, সন্তান তার ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করে। এই চক্র চলতেই থাকে।

আমার কাছে অপেক্ষা মানে কোনো ঘড়ির কাঁটা নয়, কোনো ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়। আমার কাছে অপেক্ষা মানে একটা মানুষ। যার ফোনের জন্য, যার একটা মেসেজের জন্য, যার একটা "কি করছো?" লেখার জন্য আমি সারাদিন মুঠোফোন হাতে নিয়ে বসে থাকি। সে যখন বলে "৫ মিনিটে আসছি", আমি জানি ওটা ৩০ মিনিট হবে। তবুও আমি জানালার দিকে তাকিয়ে থাকি। রাস্তার প্রতিটা রিকশা, প্রতিটা বাইকের শব্দে মনে হয় ওই বুঝি এলো। এই তাকিয়ে থাকার মধ্যে যে আনন্দ আছে, যে বুকের ভেতর ধুকপুকানি আছে, তা কেবল সেই বোঝে যে সত্যিকারের অপেক্ষা করতে জানে। যে কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করেনি, সে এই অনুভূতি বুঝবে না।

অনেকে বলে অপেক্ষা করা বোকামি। যে আসবে না তার জন্য কেন অপেক্ষা করব? সময় নষ্ট কেন করব? কিন্তু আমি মনে করি, অপেক্ষা করতে পারাটাও একটা ভালোবাসা, একটা সাধনা, একটা তপস্যা। যে মানুষ অপেক্ষা করতে জানে না, সে ভালোবাসতেও জানে না। কারণ ভালোবাসা মানেই হলো অপেক্ষা। একটি বীজ রোপণ করে ফুলের জন্য অপেক্ষা করা, একটি চিঠি পোস্ট করে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করা, একটি স্বপ্ন দেখে সেটা সত্যি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা - এটাই তো জীবন। তাড়াহুড়ো করে কি কখনো ফুল ফোটে? সব সুন্দর জিনিস সময় চায়, যত্ন চায়, অপেক্ষা চায়। আম গাছ লাগিয়ে পরের দিনই আম পাওয়া যায় না। তার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়।

এই শহরে সবাই খুব ব্যস্ত। সবাই ছুটছে। কেউ কারো জন্য দাঁড়ায় না। সবাই বলে "আমার সময় নেই"। এই ভিড়ের মাঝে যদি একজন মানুষ তোমার জন্য ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে, যদি একজন মানুষ তোমার দেরি হওয়া সত্ত্বেও রাগ না করে বলে "আছি, তুমি আস্তে ধীরে এসো, কোনো তাড়া নেই", বুঝবে সে তোমাকে সত্যিই চায়। কারণ এই যুগে সময় দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় উপহার। টাকা সবাই দিতে পারে, দামি উপহার সবাই দিতে পারে, কিন্তু নিজের সময়, নিজের অপেক্ষা - এটা কেবল সেই দেয় যে তোমাকে মন থেকে ভালোবাসে।

আমি পাকিয়ং-এর একটি ছোট ঘরে বসে এই কথাটা আরও বেশি বুঝি। এখানে সারা বছর মেঘ এবং কুয়াশা থাকে। এখানে ইন্টারনেট অনেক সময় থাকে না, ফোনের নেটওয়ার্ক চলে যায়। তখন একটা মেসেজের জন্য, একটা কলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। পাহাড়ের কুয়াশার মতোই অপেক্ষাটাও ধীরে ধীরে নামে, ধীরে ধীরে সব ঢেকে দেয়। এই ধীরে চলা অপেক্ষাই আমাকে শিখিয়েছে, জীবনের সবকিছু তাড়াহুড়ো করে হয় না। পাহাড় কখনো তাড়াহুড়ো করে না। সে হাজার বছর ধরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, অপেক্ষা করে।

*আমার কাছে সবচেয়ে বড় অপেক্ষা হলো দুর্গা পূজার অপেক্ষা।*

আমি পাকিয়ং-এর মতো ছোট পাহাড়ি শহরে বসে এই অপেক্ষাটা আরও বেশি অনুভব করি। বাঙালি সারা বছর এই একটা অপেক্ষা নিয়েই বাঁচে। মহালয়ার ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর" শোনা থেকে শুরু হয় সেই অপেক্ষার শেষ প্রহর। তখনই বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। কাশফুলের দোলা, শিউলি ফুলের গন্ধ, ভোরের শিশির, পাড়ার মোড়ে প্যান্ডেলের বাঁশ বাঁধার শব্দ, নতুন জামার গন্ধ, কুমোরটুলিতে মায়ের চক্ষুদান - সবকিছু জানান দেয় মা আসছে। আমাদের ছোটবেলার পূজা মানে ছিল নতুন জামা, বন্ধুদের সাথে ঠাকুর দেখা, আর অনেক আনন্দ।

আমরা তো সারা বছর মায়ের জন্যই অপেক্ষা করি। যে মা বছরে একবার আসে, দশ হাতে আমাদের সব দুঃখ, সব অশুভকে, সব অন্ধকারকে বিনাশ করে আবার চলে যায়। বিজয়া দশমীর দিনে যখন মা চলে যায়, যখন ঢাকের বাদ্যি থেমে যায়, যখন মণ্ডপ খালি হয়ে যায়, আলো নিভে যায়, তখন বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি হয়। কিন্তু তার চলে যাওয়ার পরদিন থেকেই আবার তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা শুরু। আমরা ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রাখি, আর কতদিন বাকি। এই অপেক্ষার মধ্যে কোনো ক্লান্তি নেই, আছে শুধু আনন্দ, আছে শুধু আশা। কারণ আমরা জানি, মা ফিরবেই। মা তার সন্তানদের কখনো ভোলে না।

আমি ভেবে দেখেছি, মায়ের জন্য অপেক্ষা আর মানুষের জন্য অপেক্ষা একই রকম। দুটোই পবিত্র। যে মানুষটা সঠিক, তার জন্য অপেক্ষা করাটা পূজার মতোই পবিত্র। দুটো অপেক্ষাই আমাদের মানুষ করে, আমাদের আরও ধৈর্যশীল করে, আমাদের আরও সুন্দর করে। মা যেমন তার সন্তানদের কখনো হতাশ করে না, তেমনি সঠিক মানুষটাও তার অপেক্ষার মূল্য দেয়, তার অপেক্ষার সম্মান রাখে।

আমি জীবন থেকে শিখেছি, অপেক্ষা করলে মানুষকে চেনা যায়। যে মানুষটা তোমাকে অপেক্ষা করায় না, যে সময় মতো আসে, যে তোমার সময়ের মূল্য দেয়, সে তোমাকে সম্মান করে। আর যে মানুষটা বারবার তোমাকে অপেক্ষা করিয়ে আনন্দ পায়, যে বলে "আরে ও তো অপেক্ষা করবেই, ওকে দাঁড় করিয়ে রাখি", তাকে ছেড়ে দিতে হয়। কারণ সে তোমার অপেক্ষার মূল্য বোঝে না, সে তোমার ভালোবাসার যোগ্য নয়।

অপেক্ষার দুটো রূপ আছে। একটি হলো বেদনার অপেক্ষা, আরেকটি হলো প্রেমের অপেক্ষা। বেদনার অপেক্ষায় মানুষ ক্লান্ত হয়, ভেঙে পড়ে, একা হয়ে যায়। যেমন হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা, পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা, চাকরির ইন্টারভিউয়ের পরের অপেক্ষা। আর প্রেমের অপেক্ষায় মানুষ সুন্দর হয়, সে নতুন করে বাঁচতে শেখে। সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, সে ভালো জামা পরে, চুল আঁচড়ায়, নিজেকে একটু গুছিয়ে নেয়। কারণ সে জানে, অপেক্ষার শেষে যে মানুষটা আসবে, তার চোখে তাকে সুন্দর লাগতে হবে। প্রেমের অপেক্ষায় মানুষ কবি হয়ে যায়, শিল্পী হয়ে যায়।

তাই এখন আর আমি অপেক্ষা নিয়ে কষ্ট পাই না। আমি অপেক্ষাকে ভালোবাসতে শিখেছি। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা, এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, পুরনো গান শোনা, বারবার ফোনের স্ক্রিন অন করা, রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকা - এই সবকিছুই অপেক্ষার অংশ। অপেক্ষা মানে শুধু শেষটা নয়, অপেক্ষা মানে পুরো যাত্রাটাই, পুরো সময়টাই।

এবং যখন অপেক্ষার শেষে সেই মানুষটা আসে, যখন সে দূর থেকে হাত নাড়ে, যখন সে দৌড়ে এসে বলে "সরি, দেরি হয়ে গেল, রাস্তায় খুব জ্যাম ছিল" - তখন তার সেই হাসিটা, তার কপালে জমে থাকা ঘামটা, তার হাঁপিয়ে যাওয়া নিঃশ্বাসটা সব ক্লান্তি, সব অভিমান, সব রাগ ভুলিয়ে দেয়। তখন মনে হয়, এই অপেক্ষাটা সার্থক। তখন মনে হয়, আরও একশো বছর অপেক্ষা করলেও ক্ষতি ছিল না, যদি শেষে তুমি আসো।

তাই আমার কাছে অপেক্ষা কোনো দুর্বলতা নয়। অপেক্ষা হলো শক্তি, বিশ্বাস, ধৈর্য, ভালোবাসা। যে মানুষটা সঠিক, তার জন্য অপেক্ষা করা কখনোই বৃথা যায় না। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই কোনো না কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করেই মারা যাব। কেউ সাফল্যের জন্য, কেউ ভালোবাসার জন্য, কেউ একটু শান্তির জন্য, কেউ মায়ের জন্য। তাই অপেক্ষাকে ঘৃণা কোরো না। অপেক্ষা করতে শেখো। কারণ অপেক্ষাই আমাদের মানুষ করে, আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আমাদের স্বপ্ন দেখায়।