কবিগুরু প্রতিটি অপরাজিতার মুখ দিয়েই যেন নারীহৃদয়ের গভীরতম চিরন্তন প্রত্যাশার কথাই বলিয়েছেন, 'রুক্ষদিনের দুঃখ পাই তো পাব/চাই না শান্তি, সান্ত্বনা নাহি চাব!' প্রতিটি নারীই আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চায়, সংগ্রাম করে হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনের আলো জ্বালিয়ে রাখে, আর বলে,

'পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে সে নহি,

হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি, নহি।

যদি পাশে রাখো মোরে 

আমি চিত্রাঙ্গদা, নহি সামান্যা নারী!'  

প্রতিবাদী কবি কবিতা সিংহের শ্রেষ্ঠ কবিতা 'আমিই সেই মেয়েটি', যেখানে জন্মদাত্রী মায়ের কথা কেউ বলেনি, খুনধর্ষণ কতকিছুই তাকে সহ্য করতে হয়। নারী চায় সম্মান, চায় সমানাধিকার। পুরুষতান্ত্রিক বেড়াজালকে ছিন্ন করে 'নারীর অন্তর্বয়ান-এ লিখেছেন, 

'হবো না শিমূল শস্য 

সোনালী বালিশের কবোষ্ণ গরম।'

কন্যা কখনই দানের নয়, মানের। অভাবের সংসারে এই নারীই শূন্য থালায় ভাতের সাদা ফুল ফোটায়। সন্তানকে মানুষ হবার শিক্ষা দেয়। নজরুল ইসলামের সোচ্চার কলম, 'সাম্যের গান গাই/ আমার চক্ষে নারীপুরুষের কোনো ভেদাভেদ নাই!' এই কথাগুলো নিছক সাহিত্যিক অলংকার নয়, যাপন থেকে উঠে আসা এক একটা চিত্রকল্প। সূতিকায় ভোগা পরিচারিকা শিবানীর সর্বাঙ্গে অপুষ্টি চিক্ চিক্ করছে। কোলের রিকেট বাচ্চাটা বাটি হাতে ফ্যাল্ ফ্যাল্। পেটের মধ্যে আগামীর আরো এক পদসঞ্চার। পঙ্গু স্বামী। বছর বারোর ছোট্ট দিশা গিয়েছে বাবুর বাড়ির ফাই-ফরমাইস খাটতে। দিনের শেষে এঁটো বাসনে পড়ে থাকা খানিকটা পচা পান্তাতেই ওর দু'চোখে সূর্যমুখীর আনন্দ। কত অল্পেতেই খুশি ওরা। তবু, নিষ্ঠুরতা ওদের ছাড়ে না। সমাজব্যাধির কোপে পড়ে এদেরই কেউ কেউ জঙ্গলে জ্বালানির সন্ধানে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। রাত্রি আরো গাঢ় হয়। নিখোঁজ ডায়েরি হয়, হয় খানাতল্লাশি। পরের দিন নিথর দেহটা মেলে দূরের কোনো ঘনজঙ্গলে। সাংবাদিকদের ভীড়। ক্যামেরার ঝলকানি। মুহূর্মুহু ছবি ওঠে। সংবাদপত্রে খবর হয়ে যায় এরা। হয়ে যায় ছাপার অক্ষর। কিন্তু এই আঘাতেও থেমে থাকে না জীবন। শিবানীর মতো মেয়েরা নিজেদের আরো দৃঢ় করে তোলে। 

আবার, এমনও কত অপরাজিতা আছে ভোরের লোকালে বেরিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে রাত্রিতে ঘরে ফেরে সংসারে একটু হাসি ফোটাতে। ঈশ্বরের বাগানে ফুটে থাকা আরো কত নীল অপরাজিতা, সন্ধ্যে হলেই যাদের হাজিরা দিতে হয় নিষিদ্ধ পল্লীর আলোআঁধারে ঘেরা রহস্যময় দরজায়, যেখানে সারারাত ধরে ওদের মুকুলিত স্বপ্নেরা মাথাকুটে মরে। এমনি করেই শহরের রাজপথে সর্বাঙ্গে ত্রিফলা আলোর মায়াকাজল মেখে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয় শরীরী সমর্পণে। সারাবছর ধরে যারা কাটমানি খায় এই অবৈধ ব্যবস্থায় ---- ধড়পাকড় হলে তারাই তুলে দেয় ওদের পুলিশ ভ্যানে। এ যেন অস্তিত্ব রক্ষার আরো এক অন্তর্মুখী লড়াই। নিজেদের রঙিন স্বপ্নকে কষ্টের টেরাকোটায় বন্দক রেখে নীরব নদীর মতো শতধারায় বয়ে চলে এইসব অপরাজিতারা। 

আবার, অনুভবী কবির লেখায় যখন পড়ি, 

'আমার দুগ্গা দুঃখী বড়ই চোখের জলে ভাসে 

বুকের মধ্যে কষ্ট চেপে ঠোঁটের কোণে হাসে।

আমার দুগ্গা অপাপবিদ্ধ, বড়ই সরলমতি 

কাজ করে যায় পল-অনুপল একটুও নেই যতি!

আমার দুগ্গা ধর্ষিতা হয় কালের লোলুপ লোভে 

আমার দুগ্গা গুমরে কাঁদে অসহায় এক ক্ষোভে।

আমার দুগ্গা দূর আকাশে শুধুই চেয়ে থাকে 

আমার দুগ্গা আনমনেতে দুর্গা মাকেই ডাকে।

আমার দুগ্গা রূপক মাত্র, সময়ের কলতান 

আমার দুগ্গা তাই গেয়ে যায় ঝরাপাতাদের গান!' 

----- তখন একজন নারী হিসেবে মনটা উথাল পাথাল করে। পরমুহূর্তেই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে এ কলম।

শেক্সপিয়ারের 'টেমপেস্ট' নাটকে ফার্দিনান্দের উদ্দেশ্যে মিরন্দার মুখে, 'I have no ambitions to see a goodlier man' ---- মিরন্দার সাহসী ব্যক্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। 'মেঘনাদ বধ' কাব্যে মাইকেল মধুসূদনও বীরাঙ্গনা প্রমীলার মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন, 

'দানবনন্দিনী আমি রক্ষকূলবধূ,

আমি কী ডরাই কভু ভিখারি রাঘবে?'

আমার কাছে নারীশক্তির শ্রেষ্ঠ আইকন অন্ধ-মূক-বধির মার্কিন লেখিকা রাজনীতিবিদ হেলেন কেলার, যিনি শিশুদের জন্য সারাজীবন লড়াই করে গিয়েছেন। শুধু হেলেন কেলার, বা জোয়ান অফ আর্ক্ই নন। স্বাধীন চিন্তায়, নিজস্ব মতপ্রকাশে, প্রতিদিনের কাঙ্খিত যাপিত জীবন ---- সবক্ষেত্রেই নারী আজ শতরূপা। একই নারী পরিবারে মা-মেয়ে, বোন-বধূ-পুত্রবধূ-মাসি-পিসি-ঠাকুমা-দিদা শতরূপে বিরাজিতা। আবার, বহির্বিশ্বে এই নারীই নানান দায়িত্বশীল পদ অলংকৃত করে আছেন। বিশ্বসভ্যতার ক্রমোন্নয়নের সিঁড়িটা সন্ত্রাসবাদ, নারীধর্ষণ, নারীভ্রূণ হত্যাতে সম্প্রসারিত হলেও পরনির্ভরতা নয়, অধিকাংশ নারীই আজ জীবনজয়ী।  

'সবলা' কবিতায় কবিগুরুর ------

'শুধু শূন্যে চেয়ে রব?

কেন নিজে নাহি লব চিনে সার্থকের পথ!' কিংবা,  

'যাব না বাসর কক্ষে বধূ বেশে বাজায়ে কিঙ্কিনি  

আমারে প্রেমের বীর্যে করো অশঙ্কিনী,

বীরহস্তে বরমাল্য লব একদিন,

সে লগ্ন কী একান্তে বিলীন 

ক্ষীণ দীপ্তি গোধূলিতে!

কভু তারে দিব না ভুলিতে মোর দৃপ্ত কঠিনতা!

বিনম্র দীনতা? সম্মানের যোগ্য নহে তার  

ফেলে দেব আচ্ছাদন দুর্বল লজ্জার!'                           সত্যিই, নারী যেন ঋতুচক্রের মতোই বৈচিত্র্যময়ী। কখনোও শান্তস্নিগ্ধ, কখনোও প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী, কখনোও ভাদ্রের ভরা নদী, আবার, কখনোওবা অসীম সহনশীলা। কবিগুরুও বলেছেন, 'নহ মাতা, নহ কন্যা.....!' কিংবা, 'একজনা সুন্দরী, বিশ্বের কামনা রাজ্যের রানি/অন্যজনা লক্ষ্মী, সে কল্যাণী, জগতের জননী তারে জানি!'

কামিনী রায়ের 'সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী/রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি!' অনুযোগের সুরে কবির দৃপ্ত শ্লেষ আমাদের নাড়িয়ে দেয়। 

প্রাচীন কবি কালি মির্জা যদিও বলেছেন, 'নারীর জনম কেবলই যন্ত্রণা সহিতে!' তবুও ওয়ার্ডসওয়ার্থের 'ড্যাফোডিল' কিংবা, মল্লিকা সেনগুপ্তের 'কন্যাশ্লোক'-এর 

'আমার দুর্গা ত্রিশূল ধরেছে স্বর্গে এবং মর্ত্যে 

আমার দুর্গা বাঁচতে শিখেছে নিজেই নিজের শর্তে '- র মতোই সমস্ত অপরাজিতারাই আজ স্বমহিমায় ভাস্বর।