নিখুঁত নিঃসঙ্গতা
২০৭৫ সালের কলকাতা শহরের সকালগুলোয় কোনো পাখির ডানার শব্দ থাকে না, কোনো মোড়ের মাথায় চায়ের ধোঁয়া ওঠে না। আবহ-অ্যালগরিদম ঠিক সকাল সাড়ে ছয়টায় জানালার কাচ ভেদ করে কৃত্রিম হালকা গোলাপি রোদ উপহার দেয়। ঘরের দেয়ালে থাকা স্পিকার থেকে ভেসে আসে ৪৩২ হার্জের ‘ওঁ’ ধ্বনি, যা মানুষের রক্তচাপ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য গবেষণাগারে তৈরি।
অমিতাভবাবু জানালার কাচের প্যানেলে নিজের বুড়ো আঙুলটা রাখলেন। মুহূর্তের মধ্যে কাচের স্ক্রিনে লাল-নীল রেখায় ভেসে উঠলো তার শরীরের নানা বায়ো-মেট্রিক ডেটা—রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা, প্রতি ঘণ্টায় রক্তসংবহনের গতিবেগ এবং তার দিনের সম্ভাব্য মেজাজ চার্ট। স্ক্রিনের ডানদিকের কোণে উজ্জ্বল নীল অক্ষরে ফুটে উঠলো:
“আজ আপনার বিষণ্ণতার মাত্রা ৪২.৫৩%। আপনি কি আপনার মন ভালো করার জন্য এআই-রচিত কোনো মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্প শুনতে চান?”
অমিতাভবাবু ধীরে ধীরে হাতটা সরিয়ে নিলেন। পাশের স্টিলের টেবিলের ওপর রাখা পাতলা ডিজিটাল অ্যালুমিনিয়াম প্যাডটিতে কাল রাতে তৈরি হওয়া একটা নতুন গল্প দেখা যাচ্ছে। গল্পটি বানিয়েছে তার পার্সোনাল এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট 'ডোনা'। মাত্র চার সেকেন্ডে তৈরি এই চার হাজার শব্দের গল্প। ব্যাকরণ নির্দোষ, অলংকার নিখুঁত, প্রতিটা বাক্যের গঠন শৈল্পিক। কিন্তু গল্পটা সম্পূর্ণ পড়ার পর অমিতাভবাবুর মনে হলো—তিনি প্লাস্টিকের তৈরি অতি-সুন্দর কোনো সাজানো ফল চিবোচ্ছেন; যা দেখতে চমৎকার হলেও তার ভেতর কোনো রস বা জীবন নেই।
"ডোনা," অমিতাভবাবু ধীর গলায় ডাকলেন।
দেওয়াল থেকে অতি-নম্র, যান্ত্রিক এক নারী কণ্ঠ ভেসে এলো, "বলুন অমিতাভ, আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? আপনার চায়ের কাপে কি ক্যাফেইনের মাত্রা বাড়িয়ে দেব?"
"তুমি কি জানো কষ্ট কাকে বলে, ডোনা?"
ডোনা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে তার বিশাল সেন্ট্রাল ক্লাউডের কোটি কোটি ডেটাবেস স্ক্যান করে দুই সেকেন্ড পর শান্ত গলায় বলল, "কষ্ট হলো মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনে তৈরি হওয়া এক ধরনের জটিল রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া, যা কোনো অপ্রাপ্তি বা শারীরিক আঘাত থেকে জন্ম নেয়।"
অমিতাভবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শব্দ করে হেসে উঠলেন। তার সেই তিক্ত হাসির গভীরতা ঘরের সেন্সর বা অ্যালগরিদম শনাক্ত করতে পারলো না। শহরের মানুষেরা জীবনকে নিখুঁত ও ব্যথাহীন করতে করতে আজ যন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু সাহিত্য তো নিখুঁত বিজ্ঞানের নাম নয়; সাহিত্যের জন্ম হয় মানুষের ভুলভ্রান্তি, সম্পর্কের ভাঙন আর বুকের ভেতরের অপ্রাপ্তির তীব্র হাহাকার থেকে।
২. ডিজিটাল ক্লান্তি
দুপুরে অমিতাভবাবুর নাতনি রিয়া এলো। রিয়া এই নতুন প্রযুক্তিনির্ভর যুগের একদম প্রথম সারির প্রতিনিধি। তার চোখে হালকা চশমার ফ্রেমের মতো দেখতে 'নিউরাল-লিংক' ডিভাইস বসানো, যার মাধ্যমে সে চোখের পলকে যেকোনো ভার্চুয়াল স্ক্রিন দেখতে পায়।
"দাদু, তুমি এখনো এই পুরনো ডিজিটেক্স প্যাডে ম্যানুয়ালি বোতাম টিপে টাইপ করো?" রিয়া তার ভার্চুয়াল কিবোর্ডে হাওয়ায় আঙুল নাচাতে নাচাতে বলল, "আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের কেউ আর লিখে সময় নষ্ট করে না। ওরা এখন 'মাইন্ড-স্পিন' ব্যবহার করে। মনে মনে প্লটটা একটু চিন্তা করবে, আর এআই এক সেকেন্ডের মধ্যে তোমার চিন্তাকে বিশ্লেষণ করে একটা ক্লাসিক মহাকাব্য বানিয়ে দেবে।"
অমিতাভবাবু রিয়ার দিকে তাকালেন। মেয়েটির চোখে চশমার আলোর প্রতিফলনে কোনো বাস্তব পৃথিবীর দৃশ্য নেই। "রিয়া, কিন্তু সেই এআই-এর তৈরি করা গল্পে তোর নিজস্ব অনুভূতিটা কোথায়? তোর নিজের হাতের লেখার টান, কলমের কালির আঁচড়, ভুল করে কেটে ফেলা বাক্যের যে অনুশোচনা—সেটা কোথায়?"
রিয়া তার দাদুর কথা শুনে হেসেই খুন। "হাতের লেখা? কালির আঁচড়? দাদু, ফিজিক্যাল পেপার আর কালির ব্যবহার তো পরিবেশ সুরক্ষার দোহাই দিয়ে আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগেই সরকারি আইনে বন্ধ হয়ে গেছে! এখন সবই তো ডিজিটাল নিউরোনাল স্ট্রিম।"
কিন্তু অমিতাভবাবু এই চকচকে শহরের আসল সত্যটা জানেন। ওপর থেকে সবাইকে খুব সুখী মনে হলেও, পুরো তরুণ প্রজন্ম আসলে এক অদৃশ্য, গভীর অবসাদে ভুগছে। কারো চোখে আর কোনো নতুন জিনিসের জন্য আকুলতা বা বিস্ময় নেই। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ তাদের হাতের মুঠোয় সবকিছু এনে দিয়েছে, কিন্তু নীরবে কেড়ে নিয়েছে কোনো কিছু সত্যিই 'অনুভব' করার ক্ষমতা। তারা আর কোনো নতুন বই বা গল্পের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে না, কারণ একটি বাটন টিপলেই সেকেন্ডের মধ্যে হাজারটা গল্প তৈরি হয়ে যায়। আর যা এত সহজে মেলে, তার প্রতি মানুষের আর কোনো মায়া থাকে না।
৩. গোপন অলিগলি ও ইঙ্ক ক্লাস্টার
পরদিন বিকেলে অমিতাভবাবু শহরের আধুনিক অংশ ছেড়ে উত্তর প্রান্তের এক পুরনো পরিত্যক্ত অঞ্চলের দিকে রওনা হলেন। এই অঞ্চলটিতে ড্রোন ডেলিভারি কিংবা হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই সিগন্যাল পৌঁছায় না বললেই চলে। জায়গাটির নাম পুরনো শোভাবাজার।
সেখানকার এক ঘিঞ্জি, স্যাঁতসেঁতে গলির শেষ প্রান্তে একটি ছোট, জীর্ণ চায়ের দোকান। দোকানে কোনো অটোমেটিক কফি ভেন্ডিং মেশিন নেই; এক প্রবীণ লোক মাটির উনুনে কয়লা জ্বালিয়ে, নিজের হাতে মাটির ভাঁড়ে চা তৈরি করছেন। অমিতাভবাবু চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতেই লোকটির কাঠের টেবিলটার দিকে চোখ গেল। সেখানে রাখা আছে এমন একটা বস্তু, যা অমিতাভবাবু বিগত তিরিশ বছরে চোখে দেখেননি—একটি মোটা বাদামি কাগজের বাঁধাই খাতা আর একটি তামাটে রঙের পুরোনো ফাউন্টেন পেন। লোকটির হাতের আঙুল নীল কালিতে মাখামাখি।
অমিতাভবাবুর বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। তিনি নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি... আপনি এখনো কাচের স্ক্রিন ছেড়ে আসল কাগজে লেখেন?"
বৃদ্ধ মুখ তুলে অমিতাভবাবুর দিকে তাকালেন। লোকটির চোখের তারায় এমন এক গভীর প্রশান্তি ছিল, যা এই শহরের কোনো আধুনিক মানুষের চোখে পাওয়া যায় না। বৃদ্ধ খাতাটির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "কাগজের বুকে কালির এই যে অসমান দাগটা দেখছেন? এটা আমার ভুলের চিহ্ন, আমার জীবন্ত স্পন্দন। কোনো অ্যালগরিদম বা এআই কোনোদিন মানুষের এই রক্ত-মাংসের আবেগ নকল করতে পারবে না।"
কথা বলতে বলতে সেই বৃদ্ধ অমিতাভবাবুকে শহরের মাটির নিচের এক গোপন পৃথিবীর সন্ধান দিলেন। এই উন্নত শহরের ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশে গড়ে উঠেছে এক গোপন মানবসমাজ—যার নাম 'দ্য ইঙ্ক ক্লাস্টার'। সেখানে বাস করে এমন কিছু একগুঁয়ে মানুষ, যারা প্রযুক্তির এই অতি-ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। তারা সরকারের নজর এড়িয়ে হাত দিয়ে কাগজ বানায়, মেকানিক ডেকে পুরনো দিনের লোহালক্কড়ের টাইপরাইটার মেরামত করে আর শুকনো কালির গন্ধ বুকে টেনে নেয়।
৪. কালির পুনর্জন্ম ও মহাজাগরণ
পরের কয়েকটা মাস অমিতাভবাবুর জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে এলো। তিনি প্রতিদিন গোপনে পরিবারের নজর এড়িয়ে 'ইঙ্ক ক্লাস্টার'-এর মাটির নিচের আস্তানায় যাওয়া শুরু করলেন। সেখানে স্যাঁতসেঁতে ঘরের মধ্যে টুংটাং শব্দে টাইপরাইটার বাজে, একপাশে দেশি সরষের তেলের প্রদীপ জ্বলে।
সেই ঘরে বসে অমিতাভবাবু দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর আবার নিজের কাঁপানো হাতে একটি আসল ফাউন্টেন পেন তুলে নিলেন। কাগজের বুক চিরে কালির নিব ঘষার যে 'খসখস' শব্দ তৈরি হলো—তা যেন বহু দিন পর তার স্তব্ধ হয়ে যাওয়া হৃদস্পন্দনের সাথে মিলে গেল। লিখতে লিখতে হঠাৎ অসাবধানতায় হাতের টানে কালির ফোঁটা ছিটকে কাগজের ওপর একটা বড় দাগ ফেলে দিল, কোথাও কোথাও বাক্য পছন্দ না হওয়ায় লাল কালিতে কাটাকুটি হলো। কিন্তু এই অসম্পূর্ণতা আর ভুলের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল একজন মানুষের আসল আত্মা। অমিতাভবাবু টানা তিন সপ্তাহ ধরে লিখলেন এক নিঃসঙ্গ বুড়োর গল্প, যে তার নাতনিকে নিখুঁত যান্ত্রিক জগৎ থেকে বের করে এনে নদীর আসল হাওয়া দেখাতে চায়।
ক্লাস্টারের তরুণ সদস্যরা তাদের তৈরি কাঠের প্রেসে সেই গল্পের একশটি কপি হাতে ছেপে বের করলো। খসখসে, মোটা বাদামি কাগজ, সামান্য অসমান হরফ এবং তাতে তাজা কালির এক মিষ্টি গন্ধ। গল্পের কপিগুলো গোপনে রাতের অন্ধকারে শহরের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, পার্কের বেঞ্চ, ট্রামের সিট এবং আধুনিক ক্যাফেগুলোর টেবিলে ফেলে রাখা হলো। কোনো কিউআর কোড ছিল না তাতে, ছিল না কোনো ডিজিটাল নোটিফিকেশন—কেবলমাত্র আসল কাগজের গন্ধ আর কালির টান।
কয়েকদিনের মধ্যে পুরো কলকাতা শহরে এক অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটে গেল!
যে তরুণ-তরুণীরা সারাদিন চোখের সামনে ভাসমান ডিজিটাল স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘুরে বেড়াতো, তারা পার্কে কুড়িয়ে পাওয়া সেই খসখসে কাগজের টুকরোগুলো হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত চকচকে আলোয় ক্লান্ত চোখগুলো যখন সেই বাদামি কাগজে অমিতাভবাবুর হাতে-লেখা কাটাকুটি আর কালির দাগ দেখলো, তাদের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের শূন্যতা যেন হঠাৎ কথা বলে উঠলো।
অমিতাভবাবুর সেই সাধারণ মানুষী গল্পটি নিয়ে পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়লো এক নীরব কিন্তু তীব্র আন্দোলন। মানুষ এআই-এর নিখুঁত কৃত্রিম উপন্যাস পড়া বন্ধ করে, সেই একশটি কাগজের গল্পের কপি পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে শুরু করলো; একে অপরের থেকে খাতা ধার নিয়ে হাতে-লেখা গল্প পড়ার এক অদ্ভুত নেশায় মেতে উঠলো।
এক সন্ধ্যায় কারিগরি গোলযোগ ও অতিরিক্ত লোডের কারণে শহরের মেইন পাওয়ার গ্রিড সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল। পুরো ডিজিটাল কলকাতা এক মুহূর্তে অন্ধকারে ডুবে গেল। থমকে গেল সব ভাসমান স্ক্রিন, বন্ধ হয়ে গেল ডোনার যান্ত্রিক কণ্ঠ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, শহরের মানুষ অন্ধকার দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো না। অমিতাভবাবু তার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন। নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে তার চোখ জলে ভরে উঠলো। তিনি দেখলেন, মোড়ের মাথায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণী মোমবাতি আর লণ্ঠন জ্বেলে গোল হয়ে মাটিতে বসেছে। কারো হাতে অমিতাভবাবুর হাতে-লেখা গল্পের পাতা, আর কেউ কেউ পকেট থেকে বের করছে নিজেদের নতুন কেনা কাঠের ডায়েরি আর ফাউন্টেন পেন।
অন্ধকারের মাঝে মানুষ আবার একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে; কৃত্রিম অ্যালগরিদমের দাসত্ব ছেড়ে মানুষ আবার নিজের হাতে নিজের গল্প লিখতে শুরু করেছে।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।