শহরের ওপর তখন বিকেল নামছিল খুব ধীরে।

সূর্যটা পশ্চিম আকাশের দিকে হেলে পড়েছে। তার গায়ে যেন কেউ হলুদ, কমলা আর একটু লাল রং মিশিয়ে দিয়েছে। বাতাসে শরতের গন্ধ। দূরে কোথাও শিউলি ঝরছে, কোথাও আবার কোনো অচেনা বাড়ির রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ।

আর সেই আকাশের বুকজুড়ে—

শুধু ঘুড়ি।

লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কালো, সাদা— কত রঙের ঘুড়ি যে উড়ছিল তার কোনো হিসাব ছিল না।

কেউ ঘুড়ি কাটার আনন্দে চিৎকার করছে—

“ভোকাট্টা!”

কেউ ছুটছে কাটা ঘুড়ির পিছনে।

কেউ ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে সুতোয় মাঞ্জা দিচ্ছে।

আর কেউ হয়তো নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ তার ঘুড়ির চেয়েও বেশি কিছু উড়ছে তার বুকের ভিতর।

সেদিন অয়নের বয়স ছিল সতেরো।

আর মীরার ষোলো।

তখনও তারা জানত না, মানুষের জীবনে কিছু বিকেল থাকে, যেগুলো দেখতে অন্য সব বিকেলের মতো হলেও পরে বুঝতে হয়—সেদিনই হয়তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটা শুরু হয়েছিল।

অয়ন তাদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল।

তার হাতে ছিল একটা লাল ঘুড়ি।

ঘুড়িটা খুব সাধারণ।

বাজার থেকে কেনা দশ টাকার ঘুড়ি।

কিন্তু অয়নের কাছে সেটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ঘুড়ি।

কারণ ঘুড়িটা মীরা পছন্দ করেছিল।

দুপুরে মীরা পাশের বাড়ির ছাদ থেকে বলেছিল,

“লাল ঘুড়ি ওড়াবে?”

অয়ন জিজ্ঞেস করেছিল,

“তুমি বললে লাল ওড়াব।”

মীরা হেসে বলেছিল,

“তাহলে লালই ওড়াও।”

ব্যস।

সেই কথাটুকুই অয়নের কাছে যথেষ্ট ছিল।

সে সেদিন নিজের জন্য ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল না।

মীরার জন্য ওড়াচ্ছিল।

মীরাদের বাড়িটা ছিল অয়নদের বাড়ির ঠিক পাশের বাড়ি।

দুই বাড়ির ছাদ এত কাছাকাছি ছিল যে ছোটবেলায় তারা দুজন মাঝখানে একটা বাঁশ রেখে তার ওপর দিয়ে এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে চলে যেত।

মীরার মা বহুবার বকেছেন।

অয়নের মা-ও কম বকেননি।

কিন্তু তাদের বন্ধুত্ব থামেনি।

বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের মধ্যে এমন কিছু জন্ম নিতে শুরু করেছিল যার নাম কেউ মুখে আনত না।

তারা তখনও নিজেদের বোঝাতে চাইত—

“আমরা শুধু বন্ধু।”

কিন্তু বন্ধুত্বের মধ্যে যদি কারও জন্য অপেক্ষা থাকে?

যদি সেই মানুষটা ছাদে না এলে বিকেলটা অসম্পূর্ণ লাগে?

যদি সে অন্য কারও সঙ্গে বেশি কথা বললে বুকের ভিতর অদ্ভুত একটা ব্যথা হয়?

যদি তার হাসি দেখলে নিজের অজান্তেই হাসি চলে আসে?

তাহলে তাকে শুধু বন্ধুত্ব বলা যায়?

অয়ন পারত না।

মীরা হয়তো পারত না।

তবুও কেউ কিছু বলত না।

কারণ কিছু সম্পর্ককে নাম দিলে ভয় হয়।

নাম দিলে দায়িত্ব আসে।

আর তারা তখনও খুব ছোট।

তাদের কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—

একসঙ্গে ছাদে বসা।

একজনের জন্য অন্যজনের ফুচকা রেখে দেওয়া।

পরীক্ষার আগের রাতে ফোন করে বলা,

“পড়েছ?”

অথচ দুজনেই জানত, পড়াশোনার কথা বলার জন্য ফোন করা হয়নি।

কখনো মীরা অভিমান করলে অয়ন পরদিন তার ছাদের কার্নিশে একটা কাগজ রেখে যেত।

কাগজে লেখা থাকত—

“রাগ কমেছে?”

মীরা লিখে ফেরত দিত—

“না।”

অয়ন আবার লিখত—

“চকলেট দিলে?”

উত্তর আসত—

“দুইটা।”

অয়ন লিখত—

“তিনটা দেব।”

তারপর পরদিন মীরা হাসিমুখে ছাদে আসত।

এই ছিল তাদের প্রেম।

কেউ কাউকে “ভালোবাসি” বলেনি।

তবুও দুজনেই জানত।


সেদিন ঘুড়ি ওড়ানোর সময় হঠাৎ মীরার নীল ঘুড়িটা অয়নের লাল ঘুড়ির কাছে চলে এল।

মীরা চিৎকার করে বলল,

“এই! সাবধানে! আমার ঘুড়ি কাটবে না কিন্তু!”

অয়ন হাসল।

“আমি কি এত নিষ্ঠুর?”

“তুমি সবসময় সুযোগ খোঁজো।”

“কীসের সুযোগ?”

“আমার ঘুড়ি কাটার।”

“ঘুড়ি কাটার সুযোগ পাই না বলেই তো তোমার সঙ্গে কথা বলি।”

মীরা চোখ ছোট করে তাকাল।

“বেশি কথা বলো আজকাল।”

“তুমি শুনছ বলেই বলছি।”

মীরা কিছু বলল না।

তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

দুই ঘুড়ি তখন পাশাপাশি উড়ছিল।

একটা লাল।

একটা নীল।

হাওয়া কখনো তাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল, আবার কখনো কাছে এনে দিচ্ছিল।

অয়ন তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে।

মীরা তাকিয়ে ছিল অয়নের দিকে।

অয়ন সেটা বুঝতে পেরে বলল,

“কী দেখছ?”

মীরা দ্রুত আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ঘুড়ি।”

“ঘুড়ি তো আকাশে।”

“তাই তো দেখছি।”

“তাহলে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে কেন?”

মীরা এবার একটু লজ্জা পেল।

“তুমি নিজেকে ঘুড়ি ভাবো নাকি?”

অয়ন হাসল।

“না। তবে তুমি যদি সুতো ধরো, উড়তে রাজি আছি।”

মীরা আর কিছু বলল না।

কিন্তু সেদিন রাতে সে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বারবার অয়নের কথাটা মনে করেছিল।


কয়েকদিন পর মীরা অয়নকে একটা ছোট্ট ডায়েরি দিল।

নীল রঙের ডায়েরি।

অয়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“এটা কী?”

“তোমার জন্য।”

“কেন?”

“তুমি সবকিছু ভুলে যাও।”

“আমি কী ভুলেছি?”

“অনেক কিছু।”

“যেমন?”

মীরা ডায়েরিটা তার হাতে দিয়ে বলল,

“যা যা মনে রাখতে চাও, লিখে রাখবে।”

অয়ন ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় মীরা লিখেছিল—

“কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় না, মনে পাওয়া যায়। আর মনে পাওয়া মানুষকে হারানো যায় না।”

অয়ন অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

তারপর বলল,

“তুমি কি আমাকে হারানোর ভয় পাও?”

মীরা হেসে বলল,

“তুমি তো কোথাও যাচ্ছ না।”

অয়ন তখনও জানত না—

কয়েক মাস পর সত্যিই তাকে চলে যেতে হবে।


অয়নের বাবা চাকরির কারণে অন্য শহরে বদলি হলেন।

পুরো পরিবারকে চলে যেতে হবে।

খবরটা যখন অয়ন মীরাকে বলল, তখন বিকেল।

ছাদে বসে দুজন আকাশ দেখছিল।

অয়ন বলল,

“আমরা চলে যাচ্ছি।”

মীরা প্রথমে বুঝতে পারেনি।

“কোথায়?”

“অনেক দূরে।”

“কত দূরে?”

“এখান থেকে ট্রেনে প্রায় আট ঘণ্টা।”

মীরা চুপ করে গেল।

অয়ন বলল,

“কিছুদিনের ব্যাপার।”

মীরা মাথা নাড়ল।

“হুম।”

“ফোন করব।”

“হুম।”

“প্রতিদিন।”

“হুম।”

“তুমি কাঁদছ?”

“না।”

“মিথ্যে বলছ।”

“না।”

“মীরা…”

মীরা মুখ ঘুরিয়ে নিল।

তার চোখে জল জমে ছিল।

অয়ন কিছু বলতে পারছিল না।

কিছু বিদায়ের আগে মানুষ অনেক কথা বলতে চায়।

কিন্তু মুখ খুললে কান্না বেরিয়ে আসে বলে চুপ করে থাকে।

অয়ন সেদিন তার পকেট থেকে সেই পুরোনো লাল ঘুড়িটা বের করল।

“এটা রাখো।”

মীরা ঘুড়িটা হাতে নিয়ে বলল,

“তুমি?”

“আমার কাছে আরেকটা আছে।”

“কেন দিচ্ছ?”

“যেদিন আমাকে খুব মনে পড়বে, সেদিন এটা উড়াবে।”

মীরা ঘুড়িটা বুকের কাছে ধরে বলল,

“তুমি কি তখন বুঝবে?”

অয়ন একটু থেমে বলল,

“হাওয়া যদি ঠিক থাকে, বুঝব।”

মীরা মৃদু হেসে বলল,

“তাহলে হাওয়া খারাপ হলে?”

অয়ন বলল,

“তাহলে আমি নিজেই ফিরে আসব।”

পরদিন তারা চলে গেল।

মীরা ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছিল অয়নদের বাড়ির দরজা বন্ধ হচ্ছে।

একটা গাড়ি ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে চলে গেল।

গাড়িটা চোখের আড়াল হওয়ার পরও মীরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হাতে সেই লাল ঘুড়ি।

সেদিন আকাশে কোনো ঘুড়ি ছিল না।

অথচ মীরার মনে হচ্ছিল—

তার নিজের আকাশটাই যেন কেটে গিয়েছে।


প্রথম কয়েক মাস তারা নিয়মিত কথা বলত।

সকালে—

“ঘুম থেকে উঠেছ?”

দুপুরে—

“খেয়েছ?”

রাতে—

“আজ কী করলে?”

তারপর—

“কাল কথা হবে।”

এই ছোট ছোট কথাগুলোই তাদের দূরত্বকে কমিয়ে রাখত।

কিন্তু সময়ের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে।

সে মানুষকে ব্যস্ত করে দেয়।

অয়নের পড়াশোনা বাড়ল।

মীরার পরীক্ষার চাপ বাড়ল।

ফোনের সময় কমে গেল।

আগে যেখানে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হতো, সেখানে এখন পাঁচ মিনিট।

তারপর তিন মিনিট।

তারপর—

“আজ খুব ব্যস্ত। কাল কথা বলব।”

মীরা অপেক্ষা করত।

অয়নও হয়তো অপেক্ষা করত।

কিন্তু কেউ কাউকে ঠিক করে বলত না।

একদিন মীরা ফোন করে বলল,

“তুমি বদলে গিয়েছ।”

অয়ন বলল,

“না তো।”

“আগে তুমি নিজে ফোন করতে।”

“এখনও করি।”

“কতদিন পর?”

অয়ন চুপ।

মীরা বলল,

“থাক।”

“রাগ করেছ?”

“না।”

“মীরা…”

“আমি পড়তে যাচ্ছি।”

ফোন কেটে গেল।

সেদিন অয়ন অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।

সে ফোন করতে চেয়েছিল।

কিন্তু করেনি।

অভিমান কখনো কখনো ভালোবাসার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে যায়।


তারপর একদিন মীরার জীবনে একটা নতুন মানুষ এল।

নাম রিশভ।

কলেজের সহপাঠী।

রিশভ মীরার সঙ্গে অনেক কথা বলত।

মীরা প্রথমে শুধু বন্ধুত্ব করেছিল।

কিন্তু অয়নের কাছে খবরটা পৌঁছতেই তার ভিতরে অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হল।

সে নিজেকে বোঝাল—

“মীরা স্বাধীন।”

“তার নিজের জীবন আছে।”

“আমার কোনো অধিকার নেই।”

কিন্তু হৃদয় যুক্তি বোঝে না।

এক রাতে মীরা ফোন করে বলল,

“আজ রিশভ একটা সুন্দর কবিতা পাঠিয়েছে।”

অয়ন বলল,

“ভালো।”

“তুমি এমন শুকনো গলায় কথা বলছ কেন?”

“কিছু না।”

“তুমি কি রাগ করেছ?”

“না।”

“তাহলে?”

অয়ন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

“তোমার নতুন বন্ধু হয়েছে, ভালোই তো।”

মীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“নতুন?”

অয়ন বুঝতে পারল কথাটা ভুল হয়েছে।

“আমি ওইভাবে বলিনি।”

“কীভাবে বলেছ?”

“মীরা…”

“তুমি কি মনে করো আমি তোমাকে ভুলে গিয়েছি?”

অয়ন উত্তর দিতে পারল না।

মীরা ধীরে বলল,

“তুমি কখনো আমাকে তোমার করে রাখোনি, অয়ন। তাই হারানোর ভয়ও দেখাতে পারো না।”

ফোন কেটে গেল।

সেদিন অয়ন প্রথমবার বুঝল—

কিছু সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা দূরত্ব নয়।

না বলা কথা।


দুই বছর কেটে গেল।

তারা কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিল।

মাঝে মাঝে উৎসবের শুভেচ্ছা।

জন্মদিনে একটা মেসেজ।

ব্যস।

কিন্তু অয়ন তার নীল ডায়েরিটা এখনও রেখে দিয়েছিল।

মীরার দেওয়া ডায়েরি।

প্রথম পাতায় সেই একই কথা—

“কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় না, মনে পাওয়া যায়।”

অয়ন মাঝে মাঝে ডায়েরিটা খুলে বসত।

পুরোনো দিনের কথা পড়ত।

কখনো হাসত।

কখনো চোখ মুছত।

আর প্রতিবারই মনে হতো—

“একদিন ফিরে যাব।”

কিন্তু জীবন তখন তাকে অন্যদিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।


একদিন হঠাৎ অয়নের মা ফোন করলেন।

“তুই কি মীরার খবর রাখিস?”

অয়ন চুপ করে গেল।

“না।”

“ওদের নাকি বাড়ি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।”

অয়নের বুকের ভিতর কেমন যেন ধক করে উঠল।

“কোথায় যাবে?”

“জানি না।”

অয়ন ফোন রেখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তারপর আলমারি খুলে নীল ডায়েরিটা বের করল।

শেষ পাতায় সে লিখল—

“আমি ফিরছি।”

পরদিনই সে ট্রেনে উঠল।

আট ঘণ্টার পথ।

কিন্তু অয়নের কাছে মনে হচ্ছিল—

সে যেন আট বছরের পথ পেরোচ্ছে।


শহরে ফিরে এসে সে প্রথমে নিজের পুরোনো বাড়িতে গেল।

বাড়িটা বদলে গিয়েছে।

দেয়ালে নতুন রং।

পুরোনো ছাদে নতুন টব।

কিন্তু পাশের বাড়িটা—

মীরাদের বাড়ি—

দরজা বন্ধ।

দরজায় তালা।

বাড়ির সামনে “বিক্রয়ের জন্য” লেখা একটা বোর্ড।

অয়নের বুকটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।

সে পাশের মুদি দোকানের কাকুকে জিজ্ঞেস করল,

“মীরারা কোথায় গিয়েছে?”

কাকু বললেন,

“ওরা তো মাসখানেক আগে চলে গিয়েছে।”

“কোথায়?”

“শুনেছি কলকাতায়।”

অয়ন থমকে গেল।

কলকাতা?

এত বড় শহর।

কোথায় খুঁজবে?

তারপর কাকু বললেন,

“তবে যাওয়ার আগে মেয়েটা একটা জিনিস রেখে গিয়েছিল।”

“কী?”

কাকু দোকানের ভিতর থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করে দিলেন।

অয়নের হাত কাঁপছিল।

কাগজে লেখা ছিল—

“যদি অয়ন কখনো ফিরে আসে, তাকে বলবেন—

 আমি শেষবারও ছাদে দাঁড়িয়ে তার ঘুড়ির অপেক্ষা করেছিলাম।”

অয়নের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।


সেদিন সন্ধ্যায় অয়ন ছাদে উঠল।

আকাশে খুব কম ঘুড়ি।

শীতের শুরু।

বাতাস ঠান্ডা।

সে ব্যাগ থেকে একটা লাল ঘুড়ি বের করল।

ঘুড়িটা ঠিক সেই রকম, যেটা মীরা তাকে একদিন দিয়েছিল।

সে সুতো বাঁধল।

ঘুড়ি আকাশে উঠল।

কিন্তু অয়নের চোখ আকাশে ছিল না।

তার চোখ ছিল পাশের খালি ছাদে।

যেখানে একসময় মীরা দাঁড়িয়ে বলত—

“সাবধানে!”

“আমার ঘুড়ি কাটবে না!”

“বেশি উড়িও না!”

“সুতো ছেড়ে দিও না!”

আজ কেউ নেই।

শুধু বাতাস।

হঠাৎ একটা ছোট্ট কাগজ তার ঘুড়ির সুতোয় এসে আটকে গেল।

অয়ন অবাক হয়ে কাগজটা খুলল।

লেখা—

“তুমি সত্যিই ফিরবে বলেছিলে?”

অয়নের বুকের ভিতর যেন বজ্রপাত হল।

এই হাতের লেখা সে চেনে।

মীরা!

সে চারদিকে তাকাল।

কেউ নেই।

তারপর নীচের রাস্তার দিকে তাকাতেই দেখল—

একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নীল শাড়ি।

চুল খোলা।

হাতে একটা নীল ঘুড়ি।

মীরা।

অয়নের হাত থেকে সুতো প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

মীরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠল।

দুজন মুখোমুখি দাঁড়াল।

দুই বছর পর।

কত কথা জমে ছিল।

কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছিল না।

শেষ পর্যন্ত মীরাই বলল,

“অনেক দেরি করলে।”

অয়ন মৃদু হেসে বলল,

“তুমি অপেক্ষা করছিলে?”

“না।”

“মিথ্যে।”

“হ্যাঁ।”

অয়নের চোখে জল চলে এল।

“আমি তোমাকে অনেকবার ফোন করতে চেয়েছিলাম।”

মীরা বলল,

“করোনি।”

“ভয় পেয়েছিলাম।”

“কীসের?”

“তুমি হয়তো আর আমাকে চাইবে না।”

মীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“তুমি জানো, সবচেয়ে বেশি কষ্ট কীসে হয়েছিল?”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“তুমি আমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলে। কিন্তু আমাকে ধরে রাখার চেষ্টা করোনি।”

অয়ন নিচু গলায় বলল,

“আমি ভেবেছিলাম তোমাকে স্বাধীনতা দেওয়াই ভালোবাসা।”

মীরা মৃদু হেসে বলল,

“কখনো কখনো ভালোবাসা মানে স্বাধীনতা দেওয়া। আবার কখনো ভালোবাসা মানে পাশে দাঁড়িয়ে বলা—‘আমি আছি।’”

অয়ন কিছু বলল না।

মীরা তার হাতে নীল ঘুড়িটা তুলে দিল।

“মনে আছে?”

“সব মনে আছে।”

“তাহলে আজ উড়াবে?”

“দুটো?”

“হ্যাঁ।”

“পাশাপাশি?”

“হ্যাঁ।”


দুজন ছাদের মাঝখানে দাঁড়াল।

অয়নের হাতে লাল ঘুড়ি।

মীরার হাতে নীল।

হাওয়া তখন ঠিকঠাক।

দুজন একসঙ্গে ঘুড়ি ছাড়ল।

ঘুড়ি উঠতে লাগল।

ধীরে।

তারপর আরও ওপরে।

আরও ওপরে।

দুই ঘুড়ির সুতো একসময় কাছাকাছি এসে গেল।

মীরা বলল,

“দেখেছ?”

“কী?”

“এত বছর পরও পাশাপাশি।”

অয়ন হেসে বলল,

“হাওয়া যতই বদলাক, কিছু ঘুড়ি নিজের আকাশ চিনে নেয়।”

মীরা তার দিকে তাকাল।

“আর মানুষ?”

অয়ন বলল,

“মানুষও।”

“তুমি কি আমাকে এখনও ভালোবাসো?”

প্রশ্নটা খুব সহজ ছিল।

কিন্তু উত্তরটা দিতে অয়নের এত বছর লেগে গিয়েছিল।

সে মীরার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি জানি না ভালোবাসার সংজ্ঞা কী। তবে এত বছর ধরে যতবার সুখী হয়েছি, তোমাকে বলতে ইচ্ছে করেছে। যতবার কেঁদেছি, তোমাকে খুঁজেছি। যতবার আকাশে ঘুড়ি দেখেছি, তোমাকে মনে পড়েছে। আর যতবার নতুন কাউকে দেখেছি, মনে হয়েছে—সে তুমি নয়।”

মীরার চোখ ভিজে গেল।

“এটাই কি ভালোবাসা?”

অয়ন মৃদু হেসে বলল,

“আমার কাছে এটাই।”

মীরা চোখ মুছে বলল,

“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে?”

“তোমার কাছেই।”

“কোথায়?”

“তোমার দেওয়া ডায়েরির পাতায়।”


সেদিন তারা অনেকক্ষণ ছাদে বসে ছিল।

সূর্য ডুবে গেল।

আকাশের রং বদলে গেল।

ঘুড়িগুলো অন্ধকারে আর দেখা যাচ্ছিল না।

কিন্তু তারা সুতো ছাড়েনি।

মীরা বলল,

“জানো, আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম তুমি আর ফিরবে না।”

অয়ন বলল,

“আমি ভাবতাম তুমি অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলেছ।”

“রিশভকে?”

“হুম।”

মীরা হেসে ফেলল।

“ও আমার ভালো বন্ধু ছিল।”

অয়ন একটু লজ্জা পেল।

“আমি খুব বোকা ছিলাম।”

“ছিলে?”

“আছি।”

মীরা হেসে মাথা নাড়ল।

“তুমি জানো, আমি তোমার জন্য কত ঘুড়ি জমিয়ে রেখেছিলাম?”

“কত?”

“গুনিনি।”

“কেন?”

“কারণ প্রতিবার ভাবতাম, তুমি এলে একসঙ্গে উড়াব।”

অয়ন চুপ করে রইল।

মীরা বলল,

“কিন্তু তুমি এলে এত দেরিতে।”

অয়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“দেরি হয়েছে।”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু এবার?”

মীরা কিছু বলল না।

অয়ন বলল,

“এবার যদি বলি, আর কোথাও যাব না?”

মীরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কথা দিও না।”

“কেন?”

“কথা ভেঙে গেলে মানুষ ঘুড়ির মতো কেটে যায়।”

অয়ন মৃদু স্বরে বলল,

“তাহলে কথা নয়। পাশে থাকব।”

মীরা তার দিকে তাকাল।

“কতদিন?”

অয়ন বলল,

“যতদিন আকাশ থাকবে।”

মীরা হেসে বলল,

“আকাশ তো চিরদিন থাকবে না।”

অয়ন একটু ভেবে বলল,

“তাহলে যতদিন তুমি থাকবে।”

মীরা চোখ নামিয়ে ফেলল।

তার ঠোঁটে সেই পুরোনো হাসি।

যে হাসির জন্য অয়ন এত বছর অপেক্ষা করেছে।


কয়েক মাস পর তাদের বিয়ে হল।

খুব বড় অনুষ্ঠান নয়।

পরিবারের মানুষ।

কয়েকজন বন্ধু।

আর তাদের পুরোনো ছাদ।

বিয়ের দিন সন্ধ্যায় মীরা অয়নকে একটা উপহার দিল।

একটা ডায়েরি।

নীল রঙের।

অয়ন ডায়েরিটা খুলে প্রথম পাতায় দেখল—

“প্রথম ডায়েরির গল্প শেষ হয়নি।

 শুধু দ্বিতীয় খাতা শুরু হল।”

অয়নের চোখ ভিজে গেল।

সে বলল,

“এবার কী লিখব?”

মীরা বলল,

“আমাদের গল্প।”

“কত পৃষ্ঠা?”

“যতদিন লাগে।”

“শেষ?”

মীরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভালোবাসার গল্পের শেষ থাকে?”

অয়ন হাসল।

“না।”


বিয়ের পর বহু বছর কেটে গেল।

তাদের একটা মেয়ে হল।

নাম রাখল—

“আকাশী।”

মেয়েটা ছোট থেকেই ঘুড়ি খুব ভালোবাসত।

একদিন শরতের বিকেলে আকাশী বাবার হাত ধরে ছাদে উঠল।

তার হাতে একটা ছোট্ট লাল ঘুড়ি।

সে বলল,

“বাবা, ঘুড়ি উড়াতে পারি?”

অয়ন বলল,

“অবশ্যই।”

মীরা পাশ থেকে হাসতে হাসতে বলল,

“কিন্তু সাবধানে। সুতো ছেড়ে দিও না।”

আকাশী জিজ্ঞেস করল,

“কেন?”

মীরা অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কারণ সুতো ছেড়ে দিলে ঘুড়ি দূরে চলে যায়।”

অয়ন হেসে বলল,

“সব ঘুড়ি না।”

মীরা বলল,

“সব মানুষও না।”

আকাশী কিছুই বুঝল না।

সে শুধু ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে হাসল।

ঘুড়ি আকাশে উঠল।

লাল ঘুড়ি।

ঠিক সেই লাল ঘুড়ির মতো, যেটা অয়ন একদিন মীরাকে দিয়েছিল।


সন্ধ্যার পর আকাশী ঘুমিয়ে পড়লে অয়ন আর মীরা ছাদে বসে ছিল।

মীরা বলল,

“তুমি কি কখনো সেই দিনগুলোর কথা ভাবো?”

“প্রতিদিন।”

“কোন দিনটা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?”

অয়ন একটু চুপ করে বলল,

“যেদিন তুমি বলেছিলে—‘আমার ঘুড়ি কাটবে না।’”

মীরা হেসে বলল,

“আমি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম?”

অয়ন বলল,

“তখন বুঝিনি।”

“এখন?”

“এখন বুঝি, আমার জীবনের সব ঘুড়ি আসলে তোমার আকাশেই উড়েছে।”

মীরা তার মাথাটা অয়নের কাঁধে রাখল।

“তুমি জানো, আমি তোমাকে কেন ভালোবেসেছিলাম?”

“কেন?”

“কারণ তুমি কখনো আমার আকাশ ছোট করতে চাওনি।”

অয়ন বলল,

“আর তুমি?”

“আমি?”

“তুমি আমাকে কেন ভালোবেসেছিলে?”

মীরা একটু হেসে বলল,

“কারণ তুমি আমার ঘুড়ি কাটোনি।”

অয়ন হেসে ফেলল।

“এই জন্য?”

“না।”

“তাহলে?”

মীরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কারণ তুমি বুঝেছিলে—ঘুড়িকে ভালোবাসতে হলে তাকে উড়তে দিতে হয়। কিন্তু সুতোটা যত্ন করে হাতে রাখতে হয়।”

অয়ন তার হাতটা ধরল।

দুজন অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।

উপরে অসংখ্য তারা।

নীচে ঘুমন্ত শহর।

আর তাদের মাঝখানে সেই পুরোনো আকাশ।


বহু বছর পর একদিন অয়নের চুলে পাক ধরেছে।

মীরার চুলেও সাদা রং।

আকাশী তখন বিদেশে পড়াশোনা করে।

বাড়ি অনেকটা ফাঁকা।

শরতের এক বিকেলে মীরা পুরোনো আলমারি খুলতে গিয়ে সেই প্রথম ডায়েরিটা পেল।

পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছে।

মলাটে ধুলো।

সে ডায়েরিটা নিয়ে অয়নের কাছে এল।

“এটা দেখো।”

অয়ন ডায়েরিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

প্রথম পাতাটা খুলল।

সেই পুরোনো লেখা—

“কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় না, মনে পাওয়া যায়।”

মীরা বলল,

“ভুল লিখেছিলাম।”

অয়ন অবাক হয়ে তাকাল।

“কেন?”

মীরা মৃদু হেসে বলল,

“তোমাকে মনে পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত জীবনেও পেয়ে গিয়েছি।”

অয়নের চোখ ভিজে উঠল।

সে ডায়েরিটা বন্ধ করে বলল,

“তুমি কি জানো, আমি একটা জিনিস এখনও রেখে দিয়েছি?”

“কী?”

অয়ন আলমারির ওপর থেকে একটা পুরোনো বাক্স নামাল।

বাক্স খুলতেই বেরিয়ে এল—

একটা লাল ঘুড়ি।

পুরোনো।

কাগজ একটু ছিঁড়ে গিয়েছে।

সুতো শুকিয়ে শক্ত হয়ে গিয়েছে।

মীরা অবাক হয়ে বলল,

“তুমি এটা এখনও রেখেছ?”

অয়ন বলল,

“তুমি দিয়েছিলে।”

“এত বছর?”

“কিছু জিনিস পুরোনো হয়। মূল্যবান হয় না কম।”

মীরা ঘুড়িটা হাতে নিল।

চোখে জল।

“চলো।”

“কোথায়?”

“ছাদে।”

“এখন?”

“হ্যাঁ।”

“এই বয়সে?”

মীরা হেসে বলল,

“ঘুড়ি ওড়ানোর বয়স হয় নাকি?”


দুজন ধীরে ধীরে ছাদে উঠল।

বাতাস আগের মতোই।

আকাশ আগের মতোই।

শুধু তারা বদলে গিয়েছে।

অয়ন ঘুড়িটা হাতে নিল।

মীরা সুতো ধরল।

অয়ন বলল,

“প্রস্তুত?”

“হ্যাঁ।”

ঘুড়ি উঠল।

প্রথমে একটু কাঁপল।

তারপর বাতাস পেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।

মীরা বলল,

“দেখো।”

অয়ন তাকাল।

লাল ঘুড়িটা আকাশের অনেক ওপরে।

তার পাশে একটা নীল ঘুড়ি।

দুজনেই অবাক হয়ে গেল।

“ওটা কোথা থেকে এল?”

মীরা হাসল।

“হয়তো কেউ আমাদের গল্পটা জানে।”

অয়ন মীরার হাত ধরল।

“না।”

“তাহলে?”

“হয়তো আকাশও কিছু গল্প মনে রাখে।”

মীরা চুপ করে রইল।

দুজন ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে থাকল।

সেদিন তাদের আর কিছু বলার দরকার ছিল না।


কিছু ভালোবাসা খুব বড় কোনো ঘটনা দিয়ে শুরু হয় না।

কোনো সিনেমার মতো বৃষ্টির মধ্যে প্রস্তাব থাকে না।

কোনো গোলাপের বাগান থাকে না।

কোনো দামি উপহার থাকে না।

কখনো কখনো ভালোবাসা শুরু হয় খুব সাধারণ একটা বিকেলে।

একটা ছাদে।

দুটো ঘুড়ির মাঝে।

একটা ছোট্ট কথায়—

“আমার ঘুড়ি কাটবে না কিন্তু।”

আর কেউ একজন উত্তর দেয়—

“তোমার ঘুড়ি কাটার সাহস আমার নেই।”

তারপর সময় চলে যায়।

মানুষ দূরে চলে যায়।

ভুল বোঝাবুঝি হয়।

অভিমান হয়।

কেউ কাউকে হারিয়ে ফেলে।

কেউ আবার ফিরে আসে।

কেউ অপেক্ষা করে।

কেউ অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়।

তবুও সত্যিকারের কিছু সম্পর্কের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে—

তারা দূরত্বের মধ্যেও বেঁচে থাকে।

যেমন আকাশে উড়তে থাকা ঘুড়ি।

হাওয়া তাকে কখনো ডানে নিয়ে যায়, কখনো বাঁয়ে।

কখনো মাটির খুব কাছে নামিয়ে আনে।

কখনো এত ওপরে তোলে যে মনে হয়, এবার বুঝি চোখের আড়াল হয়ে যাবে।

কিন্তু নীচে কেউ একজন সুতো ধরে থাকে।

অপেক্ষা করে।

সামলে রাখে।

আর হাওয়া একটু শান্ত হলে ঘুড়িটা আবার ফিরে আসে নিজের আকাশে।

অয়ন আর মীরার গল্পও ঠিক তেমন ছিল।

তাদের ভালোবাসা কখনো নিখুঁত ছিল না।

তাদের মধ্যেও ঝগড়া হয়েছে।

অভিমান হয়েছে।

ভুল হয়েছে।

কখনো দূরত্ব এসেছে।

কিন্তু তারা একটা জিনিস শিখেছিল—

ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়।

ভালোবাসা মানে এমন একটা আকাশ হয়ে ওঠা, যেখানে প্রিয় মানুষটা নিজের মতো করে উড়তে পারে।

আর একই সঙ্গে এমন একটা হাত হয়ে থাকা—

যে হাতটা দূর থেকেও সুতোটা ধরে রাখে।

যাতে মানুষটা হারিয়ে গেলে একদিন ফিরে আসার পথটা অন্তত থাকে।

সেদিন সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যাচ্ছিল।

অয়ন আর মীরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

তাদের মাথার ওপর লাল আর নীল ঘুড়ি।

মীরা আস্তে করে বলল,

“অয়ন?”

“হুম?”

“যদি আবার জন্ম হয়?”

অয়ন হেসে বলল,

“আবার তোমার পাশের বাড়িতে থাকব।”

“তারপর?”

“আবার তোমার ঘুড়ি কাটব না।”

মীরা বলল,

“আর যদি আমি তোমাকে চিনতে না পারি?”

অয়ন একটু চুপ করে তার হাতটা শক্ত করে ধরল।

তারপর বলল,

“তাহলে আবার নতুন করে পরিচয় দেব।”

“কী নামে?”

অয়ন আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“যে মানুষটা তোমার ঘুড়ির সুতো ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে।”

মীরার চোখ ভিজে উঠল।

সে মাথাটা অয়নের কাঁধে রাখল।

আকাশে তখন সন্ধ্যার শেষ আলো।

লাল ঘুড়িটা নীল ঘুড়ির পাশে।

দুটো সুতো পাশাপাশি।

দুটো মানুষ পাশাপাশি।

আর তাদের নীচে দীর্ঘ জীবনের সমস্ত স্মৃতি।

শৈশব।

অভিমান।

অপেক্ষা।

বিচ্ছেদ।

ফিরে আসা।

ভালোবাসা।

সবকিছু যেন একসঙ্গে মিশে গেল সেই আকাশে।

হঠাৎ বাতাস একটু জোরে এল।

ঘুড়ি দুটো কেঁপে উঠল।

মীরা অয়নের হাত চেপে ধরল।

অয়ন বলল,

“ভয় পেও না।”

মীরা বলল,

“ঘুড়ির জন্য না।”

“তাহলে?”

মীরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“এত সুন্দর একটা গল্প যেন একদিন শেষ হয়ে না যায়।”

অয়ন মৃদু হেসে বলল,

“গল্প শেষ হয়।”

“তাহলে?”

“গল্প শেষ হলেও ভালোবাসা থেকে যায়।”

মীরা কিছু বলল না।

শুধু তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

আর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।

লাল আর নীল ঘুড়ি তখনও উড়ছিল।

অনেক ওপরে।

অনেক দূরে।

কিন্তু তাদের সুতো ছিল একই হাতে।

আর সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল—

আকাশ যত বড়ই হোক, সত্যিকারের ভালোবাসার জন্য একটা মানুষের হাতই যথেষ্ট।

কারণ পৃথিবীর সব ঘুড়ি একদিন না একদিন কেটে যায়।

সব সুতো একদিন ছিঁড়ে যায়।

সব বিকেল একদিন সন্ধ্যা হয়।

সব মানুষ একদিন বুড়ো হয়।

কিন্তু কিছু ভালোবাসা—

কোনো ঘুড়ির মতো আকাশে হারিয়ে যায় না।

তারা থেকে যায়।

একটা পুরোনো ডায়েরির পাতায়।

একটা লাল ঘুড়ির ভাঁজে।

একটা নীল ঘুড়ির সুতোয়।

একটা ছাদের নীরবতায়।

একটা বিকেলের বাতাসে।

আর সবচেয়ে বেশি—

দুজন মানুষের মনের ভিতর।

যেখানে সময়ও পৌঁছাতে পারে না।

যেখানে দূরত্বের কোনো মানে নেই।

যেখানে কেউ একজন আজীবন চুপচাপ বলে যায়—

“তুমি যত দূরেই উড়ো,

তোমার সুতোটা আমার হাতেই থাকবে।”

আর সেই কারণেই হয়তো—

কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে না শুধু ভালোবাসার জন্য।

তারা আসে—

আমাদের আকাশের অর্থ বদলে দিতে।

মীরা ছিল অয়নের সেই আকাশ।

আর অয়ন ছিল মীরার সেই সুতো—

যেটা তাকে কখনো বেঁধে রাখেনি,

শুধু হারিয়ে যেতে দেয়নি।