দূরপাল্লার ট্রেনে কোথাও গেলে, বিশেষত সেই যাওয়াটা যদি রাতের জার্নি হয়, হোক না সে এক রাতের জন্য ,অগ্রিম টিকিট কেটে সিট রিজার্ভ করার সময় সাইড লোয়ার বার্থটাপ্রেফার করে ইন্দ্র, ইন্দ্রনীল সেন। কারণ ট্রেন জার্নিতে রাতের ঘুমটা ইন্দ্রের ধাতে নেই ।রাতের ট্রেন ছুটে চলে অন্ধকারের পর্দা ফুঁড়ে দুরন্ত গতিতে হু হু করে ।পেরিয়ে যায় গ্রাম, শহর ,ফসলের ক্ষেত, বাগান, নদী ,ফাঁকা মাঠ ,জঙ্গল আরো কত কি ।ছুটন্ত ট্রেনের জানালার পাশে বসে এসব দেখতে ভালো লাগে ইন্দ্রের ।আর রাতটা যদি জ্যোৎস্না প্লাবিত হয় তবে তো সোনায় সোহাগা ।জোৎস্না ভেজা মাঠ জঙ্গল নদী এসব দেখে মনে হয় যেন এক রূপকথার জগৎ। এক্ষুনি বুঝি ধবধবে সাদা ঘোড়ার পিঠে চেপে হাজির হবে কোন এক অচিন দেশের রাজ পুত্তুর। ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে হয়তো এই চলন্ত ট্রেনের কোন কামরা থেকেই উদ্ধার করবে দুষ্টু লোকের হাতে বন্দী এক অপরূপা রাজকন্যাকে।
তারপর তাকে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে জ্যোৎস্নায় ভিজে ভিজে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যাবে চোখের আড়ালে ।আর হঠাৎই দূরের আকাশ থেকে খসে পরবে একটা তারা ।না ,এতটা পড়ে মোটেই কিন্তু ভেবে নেবেন না যে ,ইন্দ্রনীল সেন একজন কবি।
স্কুল -কলেজ লাইফে অবশ্য কবিতা লিখতো। সেগুলো ছাপাও হয়েছে দু'চারটা । এইরকম কবিতা শতকরা নব্বই জন বাঙালি স্কুল বা কলেজ জীবনে লেখে ।পরে সেই অভ্যাসটা অধিকাংশেরই জীবন থেকে একসময় টুপ করে খসে পড়ে ঘাসের ডগায় লেগে থাকা শিশির বিন্দুর মত ।যারা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার শারদ সংখ্যা পড়েন ,তারা প্রাইভেট ডিটেকটিভ বা শখের গোয়েন্দার ভূমিকায় রহস্য সমাধান করে অপরাধী কে চিহ্নিত করতে দেখেছেন ইন্দ্র কে। হ্যাঁ ,ইন্দ্র একজন রহস্যভেদী বা গোয়েন্দা ।যদিও এই প্রাইভেট ডিটেকটিভ বা রহস্যসন্ধানী বা শখের গোয়েন্দা শব্দগুলি ইন্দ্রনীলের অপছন্দের ।কারণ শব্দগুলো বহুল ব্যবহারে গুরুত্ব হারিয়েছে বলে তার ধারণা। বিশেষত সিনেমাওয়ালারা ইদানিং রহস্যগল্প ভিত্তিক সিনেমা তৈরিতে বেশি মনোযোগী হওয়ার পরে তো বটেই।
খুব ছোটবেলায় ভয়ঙ্কর এক পথ দুর্ঘটনায় মা ও বাবা দু'জনকেই হারিয়েছিল ইন্দ্র। সেই থেকে পিসিমা রমলা সেনের আদর যত্ন ভালোবাসায় বড় হয়েছে ইন্দ্র। পিসীমার নয়নের মনি সে ।ভাইপোর আদর যত্নে ত্রুটি হবে ভেবে অবিবাহিত রয়ে গেলেন রমলা সেন ।ভাইপো ইন্দ্রের অবশ্য বিয়ে দিয়েছেন ইন্দ্রের নিজের পছন্দ করা পাত্রী নীলা ওরফে নীলাঞ্জনার সঙ্গে ।যদিও নীলাঞ্জনা কে তার নিজেরও খুব পছন্দ।
দমদমে নামি প্রাইভেট স্কুল সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন রমলা সেন ।নীলাঞ্জনা ওই স্কুলের শিক্ষিকা। নীলাঞ্জনা ডানা কাটা পরী না হলেও সুশ্রী ।ভালো গান গায়।নীলা স্মার্ট ,বিনয়ী ,সৎ, নির্লোভ ও আদর্শবাদী ।নীলাঞ্জনার বাবা ধনী ব্যবসায়ী জীবনকৃষ্ণ রায় খুন হয়েছিলেন নিজের বাড়িতে।
সেই হত্যা রহস্য সমাধান করতে কলকাতা থেকে সুদূর ঝাড়গ্রামে গেছিল ইন্দ্র। পথে এক অদ্ভুত ঘটনার মধ্যে দিয়ে নীলাঞ্জনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ইন্দ্রের ।পরে সেই পরিচয় পরিবর্তিত হয়েছিল প্রণয় এবং অবশেষে পিসীমার উদ্যোগে ব্যাপারটা বিয়ের পিঁড়ি অব্দি গড়িয়েছিল।
যাক সেসব কথা ।আপাতত ইন্দ্রের দূরপাল্লার ট্রেনে সাইড লোয়ার বার্থ চয়েজ করার যে কথাটা বলছিলাম ,সেটাই শেষ করি।
দিনকয়েক আগে ইন্দ্র হঠাৎ যখন তার কলেজ জীবনের প্রিয় বন্ধু ফরেস্ট অফিসার সোমেন্দুর কাছ থেকে অত্যন্ত জরুরী প্রয়োজনে নর্থ বেঙ্গলে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেল ,সে একাই যাবে স্থির করেছিল। সোমেনের, হ্যাঁ ওই নামেই ওকে সবাই ডাকে বন্ধুবান্ধব মহলে ,বাড়ি যে উত্তর বঙ্গের কোন এক জায়গায় আর ও যে লেখাপড়া শেষ করে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট চাকরি নিয়েছে- এদুটো তথ্যই ইন্দ্রজিৎ ফেসবুকের সৌজন্যে জেনেছে।ফেসবুকে ইন্দ্রনীল নিয়মিত না বসলেও মাঝে মাঝে বসে। সোমেন তার বাবার হঠাৎ গুরুতর অসুস্থতার কারণে কলকাতায় এসে ইন্দ্রের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেনি। যদিও তার জন্য বারবার বিভিন্নভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে সে এবং এও জানিয়েছে যে সময় সুযোগ পেলেই কলকাতায় এসে নববধূর সঙ্গে পরিচয় করে যাবে ।তবুও পেশাগত কারণে কিছু সমস্যা এড়াবার জন্যই সোমেন্দুর আহবানে সে একাই উত্তরবঙ্গ যাবে বলে স্থির করেছিল। কিন্তু সেই ইচ্ছায় বাঁধ সাধলেন স্বয়ং পিসিমা।
ইন্দ্র দিন কয়েকের জন্য নর্থ বেঙ্গলে যাচ্ছে শুনে পিসিমা বললেন ,একা একা যাস না, নীলাকে ও সঙ্গে নিয়ে যা।
------- আমি কাজে যাব পিমা।তাছাড়া সৌমেনের সমস্যাটা ঠিক কি আমি এখনও জানি না ।এই অবস্থায় নীলা গেলে যদি কোনো অসুবিধা হয় তো...
পিসিমা কে 'পিমা' বলে ইন্দ্র সেই ছোট থেকেই। এবারে হাল ধরলেন পিসিমা ।একটু জোরেই বললেন ,কি হবেনীলা গেলে? ওকি বাচ্চা মেয়ে যে হারিয়ে যাবে!
---- কিন্তু ...
----না, কোন কিন্তু নয়। তুই একবার সোমেনকে ফোন করতো ,আমি কথা বলব । নীলাকে নিয়ে গেলে ওদের কোন অসুবিধা হবে কিনা জানতে চাইব।
সোমেন্দু যখন কলেজে পড়তো কলকাতায় তখন মাঝে মাঝেই ইন্দ্রের বাড়িতে বিভিন্ন উপলক্ষে নিয়মিত আসত ।সোমেন্দুর ভদ্র ব্যবহার আর মার্জিত স্বভাবের জন্য পিসিমা খুব ভালোবাসতেন সোমেনকে। এখন ফোনে অনিয়মিত হলেও যোগাযোগ আছে পিসিমার সঙ্গে। কাজেই পিসিমা কোন অনুরোধ করলে তা সোমেনের কাছে যে গুরুত্ব পাবে এটা ইন্দ্র ভালোভাবেই জানতো ।কিন্তু তার মন দ্বিধাগ্রস্ত ছিল অন্য কারণে।সোমেন্দু তার সমস্যা টা খুলেবলেনি।কিন্তু সোমেন্দুর সঙ্গে ফোনে কথাবার্তা বলে ইন্দ্রের মনে হয়েছে যে ,সমস্যাটা খুব সাধারণ নয়, বরঞ্চ বেশ গুরুতর ।কাজেই এহেন সময়ে নীলাঞ্জনা কে নিয়ে গেলে বড় কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে কিনা এটা ভেবেই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল ইন্দ্র ।পিসিমা লক্ষ্য করছিলেন ইন্দ্রকে । ভাইপোর দ্বিধান্বিত ভাব রমলা দেবীর নজর এড়ায় না। তিনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন ,কি হলো রে ,সোমেন কে ফোনটা করছিস না কেন?
------- না না ,মানে হ্যাঁ ,আমি করছি ,এক্ষুণি করছি ।
---তাড়াতাড়ি কর।সমস্যা হলে ফোনটা আমাকে দিস। সোমেন্দু কে কথাটা বলতেই সে একেবারে হই হই করে উঠলো ।উচ্ছ্বসিত গলায় বলল ,না না না ,কোন অসুবিধা হবে না ।আমি তোকে কতবার বলেছি যে ,বৌদিকে নিয়ে একবার নর্থ বেঙ্গলে বেড়াতে আয় ।তুইতো কোলকাতা ছেড়ে নড়তেই চাসনা।
---ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নয় বন্ধু। আসলে.. -----------কোন আসল-নকলের গল্প নয় বন্ধু ।মোদ্দা কথাটা হলো এই যে ,কলকাতার লোকেরা ভ্রমণ করতে দূরে বাইরে যায় ,সারা ভারত বর্ষ ঘুরে বেড়ায়, বিদেশেও যায়। কিন্তু নর্থ বেঙ্গলে বেড়াতে যাবার কথা শুনলেই তাদের মনে অনীহা আসে । তারা নর্থ বেঙ্গলকে পাহাড় জঙ্গল দিয়ে ঘেরা গন্ডগ্রাম ভাবে ।
----ছি ছি ছি! এসব কথা বলিস না ভাই।আমি মোটেই ওরকম ভাবি না ।
------দেখ ইন্দ্র ,তুই হয়তো অনেক জায়গায় বেড়াতে গেছিস ,অনেকখরচাপাতি করেছিস, একবার সামান্য খরচ করে নর্থ বেঙ্গল এলে বুঝবি যে, এই জায়গাটা ফেলনা নয় ।পাহাড়- অরণ্য -নদী -ঝোরা -ঝরনা -ফুল -পাখি আর হরেক জীবজন্তুর আবাসস্থল আদিম প্রকৃতির লীলাভূমি এই উত্তরবঙ্গ !
----ও বাবা তুই যে একেবারে কবি হয়ে উঠলি !--------না না ঠাট্টা নয় ,একবার শুধু কাজের জন্য না এসে বেড়াবার মানসিকতা নিয়ে আয়।আমার সমস্যা সমাধানের ফাঁকে উত্তরবঙ্গের রূপ দেখে যা একবার ।
---তোর সমস্যাটাই তো এখনো জানতে পারলাম না, তারপর তো সমাধানের কথা ।
------আমি জানি যে,ইন্দ্রনীল সেন হাত দিলে সমস্যার সমাধান হবেই ।
---ধন্যবাদ ভাই ।ফোনটা রাখতেই পিসিমা জিজ্ঞাসা করলেন, কিরে কি বলল সোমেন? ___ওতো নীলাকে নিয়ে যেতে বলল ।
----যা এবার রিজার্ভেশন টা করে ফেল দেখি চট করে। এখন তো অনলাইনেই হবে।
---- না পিসিমা, আমি কাউন্টার থেকে করব ।আমার একটু কাজ আছে শিয়ালদার ওদিকে ।-------বেশ, তাই করিস ।
এবার ও কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে নিজের জন্য সাইড লোয়ার বার্থ টাই রিজার্ভ করলো ইন্দ্রনীল। কিন্তু মুশকিল হল নীলার জন্য ঠিক ওর উপরের আপার বার্থ টা পাওয়া গেল না ।ওটা নাকি আগে থেকেই কে যেন বুক করে রেখেছে ।ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত লাগলো ইন্দ্রের। লোয়ার বার্থ ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও আপার বার্থ বুক করেছে এমন কেউ আছে ভেবেই অবাক হলো সে ।অগত্যা নীলার জন্য একরকম বাধ্য হয়েই একটা লোয়ার বার্থ বুক করল সে ।ব্যাপারটা তার একদম ভালো লাগছিল না ।বাড়িতে ফিরতেই টিকিটটা দেখে বিরক্ত হলেন রমলা সেন ।একটু রাগত স্বরে ভাইপো কে মৃদু ভর্ৎসনা করে বললেন, ছি ছি !এটা তুই কি করলি ইন্দ্র ?
---কি করলাম !
-----কি করলাম মানে টা কি? এই তো শুনি রহস্যভেদী ইন্দ্রনীল সেনের অপার বুদ্ধি! এটা কি বুদ্ধির নমুনা হল?
কি উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে ইন্দ্র চুপ করে রইল।পিসিমা গলা চড়িয়ে বললেন ,কি চুপ করে আছিস কেন ?এত বড় ভুলটা তুই করলি কি করে?
--- কি ভুল করলাম পিমা ?
---হা কপাল! এখনো বুঝলে না! বলি, যাবি তো রাতের ট্রেনে- কি তাইতো?
-- হ্যাঁ ।
---তাহলে তোর এক জায়গায় আর নীলার অন্য জায়গায় সিট বুক করলি কি করে?
-- না না পিমা, এক জায়গাতেই দুজন। মানে, কাছাকাছি ।শুধু আমার সাইড লোয়ার বার্থ আর ওর লোয়ার বার্থ ।এক জায়গাতেই মানে কাছাকাছি- ই।
-----নীলার জন্য উপরের মিডল বার্থ টা নিলেই তো পারতিস ।
---হ্যাঁ, হয়তো পেতাম।কিন্তু.......
----- কিসের কিন্তু ?
-----তুমি তো জানো পিমা,সাইড লোয়ার বার্থের উপর আমার দুর্বলতা আছে।
রমলা সেন হয়তো আরো কিছু বলতেন।
কিন্তু তার আগেই চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে নীলা বললো, একটা রাতের ব্যাপার তো পিমা , কোন অসুবিধা হবে না। তাছাড়া শুনেছি, রাতের ট্রেনে ও নাকি ঘুমোতে পারে না ।আমি ওর সাইড লোয়ার বার্থে প্রথম রাতটা বসে কাটাবো। পরে ঘুম পেলে আমার সিটে শুয়ে পড়বো ।রমলা নীলার কথার কোন জবাব না দিয়ে ইন্দ্রকে বললেন ,হ্যাঁরে, তোর বার্থের উপরের বার্থ টা ফাঁকা ছিল না ?
----না পিমা ,ওটা আগে থেকেইবুকড্ হয়ে গেছে।
--- সেকিরে !দেখ সেই লোকটা আবার কেমন হয়। প্রথম রাত্তিরে সেও তো তোর লোয়ার বার্থে বসবে ।
-----দেখাই যাক না কি হয় !আপনি একদম ভাববেন না পিমা ,সব ম্যানেজ হয়ে যাবে !নীলার কথা শুনে মৃদু হাসেন রমলা সেন ।পিসিমার বকুনির হাত থেকে স্বামীকে যে বাঁচাতে চাইছে নীলা এটা বুঝতে কোন অসুবিধা হয়না তার ।ব্যাপারটা উপভোগ করে মুচকি হাসেন তিনি।
শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাড়ার সময় রাত সাড়ে আটটা নাগাদ। কিন্তু পিসীমার ক্রমাগত তাগাদায় অনেক আগেই স্টেশনে পৌঁছে যায় ইন্দ্রনীল ও নীলাঞ্জনা ।ওদের কম্পার্টমেন্ট টা কোথায় পড়তে পারে মোটামুটি অনুমান করে এবং দুই একজনকে জিজ্ঞাসা করে তার কাছাকাছি একটা বেঞ্চে বসে ওরা দুজনে ।পাশেই বসে এক প্রৌঢ় ও এক প্রৌঢ়া। ওরাও সম্ভবত ট্রেন ধরবেন। উত্তরবঙ্গে বেড়াতে যাবার কথা যেদিন ফাইনাল হয়েছে, সেদিন থেকেই নীলা ভীষণ এক্সাইটেড ।নানারকম ভ্রমণের বই ও ম্যাগাজিন পড়ে বিভিন্ন স্পট সম্পর্কে অনেক কিছু নোট করেছে ।মাঝে মাঝেই অনেক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে ইন্দ্রনীলের উদ্দেশ্যে । ইন্দ্র সাধ্যমত জবাব দিয়েছে ।আজকেও ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ নীলা জিজ্ঞাসা করে, তোমার কাজটা মিটতে কদিন সময় লাগবে বলে মনে হয় তোমার?
---কি করে বলি বলো তো! সমস্যাটা তো জানি না এখনো।
-- না, যদি তাড়াতাড়ি মিটে যায়, তাহলে......
----- কি ?
----ওখান থেকে সিকিম আর ভুটান তো খুব কাছে...
--- হ্যাঁ। তো?
--- তাই ভাবছিলাম যদি একবার....
---- কি?
--- যদি এই সুযোগে একবার ঘুরে দেখা যায়, ,মানে যদি সম্ভব হয়,ঔ তাহলে....
---- দেখো, এখন থেকে এই বিষয়টা স্থির করা খুব মুশকিল। সোমের সমস্যাটা না জানা পর্যন্ত কোন ডিসিশন নেওয়া যাবে না ।
-----সেটা তো ঠিকই। তোমার কাজ তাড়াতাড়ি মিটে যাবে বলেই আমার মনে হয়।
নীলার কথা শেষ হতে না হতেই পাশে বসা প্রৌঢ়া মহিলা বলেন, আপনারা কি নর্থ বেঙ্গলে বেড়াতে যাচ্ছেন ?
----না ,শুধু বেড়াতে নয় ।আমার হাজবেন্ডের কিছু কাজ আছে ওখানে ।ওটা শেষ হয়ে গেলে ঘোরার প্ল্যান আছে আমাদের ।
----কি করেন তোমার হাজব্যান্ড, ব্যবসা?
---- না ,ওতো গো..….. উঃ!
নীলাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ইন্দ্র জোরে চিমটি কাটে ওর হাতে ।ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে কথাটা মাঝপথে থামিয়ে দেয় নীলা । প্রৌঢ়া সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেন, কি হলো ?
---কিছু না, আসলে একটা পোকা ....
----পোকা !কি পোকা?
----ওই যে আলোর চারিপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে পোকাগুলো, ওর মধ্যেই বোধহয় কেউ হঠাৎ কামড়ে দিলো হাতে!
----- কোন বিষাক্ত পোকা নয়তো!
প্রৌঢ়ার কন্ঠে উদ্বেগ ।
-----না না, বিষাক্ত নয়। আপনি কিছু ভাববেন না মাসিমা, অভ্যাস আছে আমার।
----- মানে? কি বলছো তুমি ঠিক বুঝতে পারলাম না তো!
---- ও কিছু নয়। আচ্ছা মাসিমা, আপনারাও কি বেড়াতে যাচ্ছেন ?
----না না, ওখানেইথাকি আমরা। কলকাতায় মেয়ের বাড়িতে এসেছিলাম ,এখন ফিরে যাচ্ছি।
--- বাহ !নর্থ বেঙ্গলে থাকেন আপনারা! কোথায় ?----আমরা যে জায়গাটায় থাকি তার নাম ঝালং।---
---ঝালং! মানে যেখানে জলঢাকা হাইডেল প্রজেক্ট আছে?
--- বাহ ! তুমি তো জানো দেখছি।
কথাটা বলেন প্রৌঢ়।
নীলা বলে, জানি মানে ওইটুকুই। খুব বেশি কিছু জানিনা।
---- ভারতের প্রথম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নাম 'জলঢাকা হাইডেল প্রজেক্ট'। আর ওই প্রোজেক্টের উপনগরী ঝালং। বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীদের বসতি ওখানে। অন্য লোকজন ও কিছু আছে ।
----আপনি কি ওখানে?
----- হ্যাঁ ,?আমার হাজব্যান্ড ওখানে চাকরি করেন।খুব সুন্দর জায়গা ওটা ।প্রৌঢ়া বলেন।
--- ওখানে কি কি দেখার আছে মাসিমা ?নীলা কৌতুহলী হয়।
--- ঝালং আর জলঢাকা নদীর অবিরাম বয়ে চলা দেখলেই তো ভরে যায় মন। পাহাড়ে ঘেরা সবুজে ভরা অপরূপা ঝালং জুড়ে সারাদিন খেলা করে হাজার হাজার প্রজাপতি। অজস্র রংবেরঙের পাখির কাকলিতে মুখরিত হয় ঝালং এর আকাশ বাতাস ।ঝালং এ আছে বৌদ্ধ মঠ, চিনা রেস্তোরাঁ, বনবাংলো, আরো কত কি ! ঝালং থেকে তেরো কিলোমিটার দূরে বিন্দু। -----বিন্দু !
---------হ্যাঁ, ভারতের শেষ জনপদ বিন্দু। তারপরই শুরু হচ্ছে ভুটান।
--- ওয়াও!
উচ্ছ্বসিত নীলা বলে, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো মাসীমা? কিছু মনে করবেন না তো?
--- না না,' মনে করবো কেন....
---- আপনি কি কবিতা লেখেন?
---- না না, সেরকম কিছু নয়! আসলে ওই জায়গাটা এত সুন্দর যে, তার কথা বলতে গেলেই কবিতা হয়ে যায়। ওখানে যে যাবে সেই কবি হয়ে উঠবে।
প্রৌঢ়ার কথায়বাধা দিয়ে প্রৌঢ় বলেন, ওকে মিথ্যে কথা বলছ কেন? তুমি তো ভালো কবিতা লেখ!
--- সত্যি! বিস্মিত নীলা।
----- আরে, কখন একটু-আধটু লিখতাম, উনি এখনো সেটাই ধরে বসে আছেন! ইন্দ্র অবাক হয়। নীলার স্বভাবের এই দিকটা জানা ছিলনা তার। ও কি সুন্দর অপরিচিত দম্পতির সঙ্গে সহজেই মেতে উঠেছে গল্পে। এতটা পারেনা ইন্দ্র। । হঠাৎ প্ল্যাটফর্ম জুড়ে শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা। ইন্দ্র প্ল্যাটফর্মের ধারে গিয়ে দূরে তাকিয়ে কিছু দেখে ফিরে এসে বলে, ট্রেন ইন করছে নিলা। প্রৌঢ়স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, নাও এবারে ওঠো মৃন্ময়ী। ট্রেন ঢুকছে।
প্রৌঢ়া নীলাকে বলেন, আমাদের রিজার্ভেশন B2 তে।
----- আমাদেরও তো তাই।
--- বাহ বাহ! তাহলে তো আবার দেখা হচ্ছেই! এখন ট্রেনে ওঠা যাক।
কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ইন করে স্টেশনে। প্ল্যাটফর্ম জুড়ে হইচই, ব্যস্ততা। এই প্রৌঢ়া
মহিলাকে কে বেশ ভালো লেগেছে নীলার। তাই ওনার সিট ও এক কামরাতেই পড়েছে শুনে খুব খুশি হয় নিলা। নিলা মনে মনে ঠিক করে নেয়, কামরায় উঠে সুযোগমতো প্রৌঢ়ার সঙ্গে আরো কিছুক্ষন গল্প করে উত্তরবঙ্গের দর্শনীয় স্থানগুলি সম্পর্কে আরও তথ্য জেনে নেবে।
নীলা তার সিট নম্বর খুঁজে বার করতেই সবিস্ময়ে দেখে, তার লোয়ার বার্থ এর উল্টো দিকে প্রৌঢ়ার লোয়ার বার্থ ।
নিজের ইচ্ছা পূর্ণ হবার সম্ভাবনা দেখে আনন্দিত নিলা উচ্ছ্বাসে হাততালি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে ,মাসীমা, আপনার বার্থ তো আমার উল্টোদিকে!
-- হ্যাঁ ,তাইতো দেখছি।
নীলার ছেলেমানুষের মত উচ্ছ্বাস দেখে প্রৌঢ়া অর্থাৎ মৃন্ময়ী দেবী হেসে ফেলেন। নীলার হাততালি দেওয়া দেখে কামরার ভিতর চারজন অত্যুৎসাহী যাত্রী উঁকি দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে। ইন্দ্রনীল একটু বুঝি বিরক্ত হয়েই বলে ,চেইন আর তালাটা কোথায় রাখলে নীলা? খুঁজে না পেলে লাগেজ গুলো বাধবো কি কোরে?
----সেকি! ওগুলো তো তোমার কাঁধের ব্যাগেই আছে। তুমিই তো রাখলে ।এর মধ্যে ভুলে গেলে!
সত্যিই ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিল ইন্দ্র। নীলার কথা শুনে মনে পড়ে যেতেই সিটের ওপরে নামানো ব্যাগটার পকেট খুলে লোহার চেইন আর চাবি লাগানো তালা খুঁজে পেতেই নীলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ইন্দ্র বলে, থ্যাংকস!
ইন্দ্র লাগেজগুলো সিটের নিচে ঢুকিয়ে চেইন আর তালা দিয়ে ভালো করে সুরক্ষিত করে ওগুলো।নিশ্চিন্ত হয়ে সিটে বসে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে ,নীলা তার সদ্য পরিচিত মাসিমার সঙ্গে জোর গল্প জুড়ে দিয়েছে।ইন্দ্র কিন্তু বেশ চিন্তিত । সোমেনের সমস্যাটা না জানা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছে না সে। অথচ নীলা ওদিকে বেড়ানোর পরিকল্পনা করতেই ব্যস্ত ।আর ওই মৃন্ময়ী দেবী ও বোধ হয় গল্প করতে বেশ ভালোবাসেন ।তাই প্রাণ খুলে গল্প জমিয়েছেন নীলার সঙ্গে ।প্রৌঢ় ভদ্র লোক মাঝে মাঝেই টুকটাক কথা বলছেন। ঘড়ির দিকে তাকায় ইন্দ্র ট্রেন ছাড়তে আর মিনিট পাঁচেক বাকি, কিন্তু আপারবার্থের প্যাসেঞ্জার তো এখনো এলেন না। তবে কি আর কেউ আসবে না ? ভালোই হলো, নিলাকে এখানে ডেকে এনে বসানো যাবে প্রথম রাতটায়।আলাদা জায়গায় সিট বুক করার জন্য পিসীমার বারবার বলা সাবধান বাণী মনে পড়ে ইন্দ্রের । তবে নীলা যেভাবে ওর মাসিমার সঙ্গে গল্প জুড়েছে তাতে ও চট করে এদিকে আসবে বলে মনে হয় না ।ইন্দ্র পা থেকে স্যু খুলে সিটের ওপরে পা মেলে আরাম করে বসে ।।জানলার কাঁচের ভিতর দিয়ে বাইরে তাকায়।
-এক্সকিউজ মি! এটা কি সিট নাম্বার থারটি টু ? উল্টোদিকের সিটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক সুন্দরী যুবতী। বেশ লম্বা। পরনে ব্ল্যাক জিন্সের প্যান্ট আর মিল্ক হোয়াইট শার্ট। পায়ের কাছে নামানো একটা মাঝারি সাইজের ট্রলি ব্যাগ। যুবতী আবার জিজ্ঞাসা করে ,ইজ ইট সিট নাম্বার থার্টি টু?
না, এটা থার্টি ওয়ান, ও পাশেরটা থার্টি টু। আপনি বুঝি আপার বার্থ বুক করেছেন?
--- ইয়েস !এনি প্রবলেম?
--নো ,নাথিং ।
কথা শেষ করেই ইন্দ্র ওধারের সিট পর্যন্ত প্রসারিত পদযুগল গুটিয়ে নিচে নামিয়ে নেয়। যুবতীটি প্যান্টেরপকেট থেকে রুমাল বের করে সিটটা একটু ঝেড়ে নিয়ে বসে।
ইন্দ্র এতক্ষন জানলার কাঁচের ফাঁক দিয়ে একটা মজার দৃশ্য দেখছিল ।একটু আগে প্লাটফর্মে যে বেঞ্চিতে বসে ছিল তারা, ঠিক তার নিচেই কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে চারটে কুকুরের বাচ্চা। বেশ ছোট। ওদের মধ্যে একটা বাচ্চা ঘুম ভেঙে উঠে আড়িমুড়ি ভেঙ্গে পাশে শুয়ে থাকা বাচ্চাটার লেজে কামড়ে মারলো একটা। দ্বিতীয় বাচ্চাটির ঘুম ভাঙেনি তখনো। ও ভয় পেয়ে প্রথমটায় মনে হল কুঁইকুঁই করতে শুরু করলেও, একটু পরে বোধ হয় সমস্যার আসল কারণটা বুঝতে পারল। তাই হঠাৎ সে প্রথম বাচ্চাটির কানে কামড়ে ধরে টানতে শুরু করলো। এবারে প্রথম বাচ্চাটিও চিৎকার করতে শুরু করল। হঠাৎ কোত্থেকে ছুটে এলো ওদের মা ,একটা খোঁড়াকুক্কুরী। ওর মুখে ধরা একটা বড় পাঁউরুটি। ও পাঁউরুটিটা বেঞ্চের নিচে নামিয়ে রাখল। তারপর সামনের ডান পাকে হাতের মতো ব্যবহার করে বিবাদমান বাচ্চা দুটোর গালে ঠাস ঠাস করে চড় মারার মত করে আঘাত করলো। বাচ্চা দুটো কুঁইকুঁই করতে করতে দূরে সরে গেল। ততক্ষণে অন্য বাচ্চা দুটোর ঘুম হয়ে গেছে। তারা মায়ের কাছে আসতেই মা কুক্কুরী তাদের গা চেটে দিতে শুরু করলো। দূরে সরে যাওয়া বাচ্চা দুটোকে এবার সে কাছে ডেকে নিল। ওরা কাছে আসতেই কুক্কুরী পাঁউরুটিটাকে দাঁত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে বাচ্চাগুলোকে খেতে দিল। বাচ্চা গুলো খেতে শুরু করল আর মা কুক্কুরী পরম যত্নে বাচ্চাদের চাটতে শুরু করলো পালাক্রমে। মাতৃস্নেহের এই অপূর্ব প্রকাশ দেখে চোখে জল চলে আসে ইন্দ্রনীলের ।এসি থ্রি টায়ার কম্পার্টমেন্টের ভেতর থেকে কোনো শব্দ শোনা যায় না বলে সে কুকুরের বাচ্চা গুলোর আনন্দ প্রকাশের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল না সে। কিন্তু ওদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলে দিচ্ছিল যে, মায়ের আদর পেয়ে ওরা কতটা খুশি ।মায়ের কথা মনে পড়ে যায় ইন্দ্রের ।মাকে মনে নেই ।কিন্তু ছোটবেলায় মা বাবাকে হারাবার পর ঠিক ঐরকম স্নেহ আর যত্ন দিয়ে তাকে বড় করে তুলেছে তার পিসিমা ।হঠাৎ বাড়িতে একলা রেখে আসা পিসিমার জন্য খুব মন খারাপ খারাপ লাগলো ইন্দ্রের ।এই অবস্থাতেই হঠাৎ যুবতীটি এসে তাকে প্রশ্ন করায় সে প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেছিল। যদিও পরে সে অবস্থা কাটিয়ে যুবতীর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল সে। লোয়ার বার্থ বুক না করে যুবতীটি কেন আপার বার্থ বুক করল ,এই প্রশ্নটা ইন্দ্রকে মাঝে মাঝেই খোঁচা মারলেও ভদ্রতার খাতিরে অপরিচিতা কে সেই প্রশ্নটা করতে পারছিলো না। ।যুবতীটি চোখের সামনে মেলে ধরেছে একটা ইংরেজি পেপার ব্যাক বই ।হাত ঘড়ির দিকে তাকায় ইন্দ্র। একি! ট্রেন ছাড়ার সময় তো পার হয়ে গেছে। তাহলে ?গাড়িটা ছাড়ছে না কেন?
গরম চা --গরম চা --কফি---- হাঁকতে হাঁকতে একজন হকারআসতেই ইন্দ্র জিজ্ঞাসা করে, কি হল দাদা, গাড়ি ছাড়ছে না কেন ?
কাপে চা ঢালতে ঢালতে হকারটি জবাব দেয়, ইঞ্জিন খারাপ হয়েছে দাদা।
হকারের কথা শুনে বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে যুবতীটি জিজ্ঞাসা করল, গাড়ি কি তাহলে যাবে না?
হকারটি জবাব দেয়, কাজ চলছে ।
যুবতীটি এদিক ওদিক বারকয়েক দৃষ্টি নিক্ষেপ করার পর আবার বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করে ।হঠাৎ নিলা জিজ্ঞাসা করে ইন্দ্রকে ,এই, সোমেন দার বাড়িটা কোথায় গো?
-- কেন ?
---মাসিমা জানতে চাইছেন। ওনারা ওদিকেই থাকেন কিনা।
-- সৌমেন্দুরা সামসিংয়ে থাকে। ইন্দ্র জবাব দেয়। প্রৌঢ়া হাসিমুখে নীলাকে বলেন, তার মানে তোমরা তো চালসা হয়ে যাবে।
---চালসা!
--হ্যাঁ, চালসা। ডুয়ার্সের টুরিস্ট জংশন হল চালসা ।শিলিগুড়ি- গুয়াহাটি সড়কে পাহাড়ি পথের বাঁকে হিল টপে প্রায় পঁচিশ একর জায়গা জুড়ে সুন্দর প্রকৃতির মাঝে গড়ে তোলা এক অনুপম টুরিস্ট স্পট। কটেজ ,ভিলা, রেস্তোরাঁ, কফিশপ, শপিং সেন্টার, সুইমিংপুল - এমনকি গলফ এর আসর ও বসে চালসায়!
-- বাহ! দারুন তো!
--- ওই চালসা থেকে 'খুনিয়া মোড়' হয়ে যাওয়া যায় চাপড়ামারি অভয়ারণ্য।
--- চাপড়ামারি অভয়ারণ্য !
---হ্যাঁ ,জলদাপাড়া গরুমারা আর চাপড়ামারি এই তিন বিখ্যাত অরণ্য ডুয়ার্সে। পর্ণমোচী বৃক্ষের অভয়ারণ্যে চাপড়ামারি তে শতাধিক অর্কিড । প্রায় একশত ধরনের ঘাসের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় হরিণ, হাতি ,বন্য শুয়োর ,সম্বর ,নীলগাই আরো কত বনচর। সারা অরণ্য জুড়ে খেলা করে প্রায় দুই শতাধিক বিচিত্র বর্ণের পাখি আর চিত্র-বিচিত্র অসংখ্য প্রজাপতি ।ওই চাপড়ামারি অরন্যের ভিতর একটা ছোট্ট টিলার উপরে আছে একটা ফরেস্ট বাংলো ।মজার কথা কি জানো, ওই বাংলা থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা।
-- বাহ বাহ বাহ !অসাধারণ !আপনারা কখনো দেখেছেন ওই বাংলো?
---- হ্যাঁ, একবার থেকেছিলাম ওখানে। আসলে ওই চাপড়ামারি রিজার্ভ ফরেস্টের থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরে আমাদের ঝালং। তোমার মেসোমশাই তো জলঢাকা হাইডেল প্রজেক্ট এর ইঞ্জিনিয়ার ।তাই চট করে ছুটিছাটা পায় না ।এই যে দিন সাতেকের জন্য কলকাতায় মেয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম, তার জন্য ছ'মাস আগে থেকে দরখাস্ত কর অনুমোদন নিতে হয়েছে ।তবু বিয়ের আগে থেকেই চাপড়ামারি বাংলো সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছিলাম বলে বিয়ের মাস ছয়েক পরে তোমার মেসোমশাই কে নিয়ে ওখানে বেড়াতে গেছিলাম। ছিলামও এক রাত। সেই রাতটা ছিল পূর্ণিমার রাত। তোমার মেসোমশাই কে একরকম জোর করে বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে ছিলাম। টিলার মাথায় চাঁদনী রাত ।দূরে জ্যোৎস্না মাখা কাঞ্চনজঙ্ঘার যে রূপ আমি সেদিন দেখেছিলাম, তা আজো ভুলিনি।
--- মেসোমশাই কে জোর করে বের করতে হয়েছিল কেন ? উনি কি প্রকৃতি ভালোবাসেন না?
--- না, তা ঠিক নয়। আসলে তোমার মেসোমশাই লোকটা খুব ঘুম কাতুরে!
-- আহ !তুমি কি শুরু করলে মৃন্ময়ী?
--- তুমি থামো তো বাপু !একটু মন খুলে কথা বলতে দাও তো মেয়েটার সঙ্গে। ওখানে গিয়ে সেই তো আবার 'হ্যাঁ জি ' 'হ্যাঁয়' করতে হবে
------মানে?
------আর বলিস না,ওখানে হিন্দী কথাই বেশি চলে।
-----কেন ,হাইডেল প্রজেক্টে বাঙ্গালী স্টাফ নেই?
--- আছে তো ।তবে নেপালি গোর্খা আর হিন্দুস্থানী বেশি। ওদের সঙ্গে সারাদিন কথা বলে বলে বাঙালিরাও 'হাই' 'হূই করে। তা বুঝলি ওই একবারই তোর মেসো মশায়ের সঙ্গে চাপরামারী বেড়াতে গেছি। এমা, আমি তোমার সঙ্গে তুইতোকারি করে কথা বলতে শুরু করে দিলাম! কিছু মনে করলে না তো মা?
--- হ্যাঁ ,করেছি।
--- মানে ?বিস্মিত জিজ্ঞাসা প্রৌঢ়ার। প্রৌঢ় ও ঘুরে তাকান।
নীলা বলে ,বেশ করেছেন তুই-তোকারি করেছেন ।কিন্তু ওই যে শেষে আবার 'তুমি' করে কথা বললেন, ওটার জন্যই মনে করেছি!
হো হো করে হেসে ওঠেন প্রৌঢ়।হাসতে হাসতেই বলেন ,এ মেয়ে তো তোমাকেও কথায় হারিয়ে দিল !
--- তাই তো দেখছি
প্রৌঢ় নীলাকে বলেন, শোনো মা, চালসা চৌমাথা- চাপড়ামারি পেরিয়ে আমরা যাবো ঝালং আর তোমরা চালসা থেকে বাঁয়ে ঘুরে যাবে। আঁকাবাঁকা পথে মেটেলি চা বাগান ছাড়িয়ে চা ও কমলালেবুর জনপদ সামসিংয়ে যাবে। এলাচ, শাল ও পাইনে ঘেরা নদী- পাহাড় অরন্যের মিতালি ওখানে।
--- ও বাবা, তুমিও তো দেখছি কবি হয়ে উঠছো গো! প্রৌঢ়ার সরস মন্তব্য। প্রৌঢ় চট করে উত্তর দেন, হবেই তো ।তোমার সঙ্গে আছি না !
প্রৌঢ়ের উত্তর শুনে হেসে ফেলে নীলা। কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে মাসিমা বলেন, তোর সঙ্গে আর কথা কইব নারে নীলা।
--- কেন ?কি দোষ আমার?
---- তুই তোর মেসো মশায়ের কথায় হেসে ওকে সাপোর্ট করলি কেন? বুঝলি না যে ও আমাকে ঠাট্টা করছে!
--- না না, ঠাট্টা করছি না মোটেই। সত্যি বলছি নিলা, তোমার মাসিমা খুব সুন্দর কবিতা লেখেন। মৃন্ময়ী তোমার ব্যাগে কবিতার খাতাটা আছে তো, একটা কবিতা পড়ে শুনিয়ে দাও না নিলাকে।
-----ধ্যাৎ,কি যে বলোনা তুমি! এখানে কবিতা পড়া যায় নাকি ?নীলাযখন আমাদের কোয়ার্টারে বেড়াতে যাবে তখন ওকে কবিতা পড়ে শোনাবো। কিরে আসবি তো?
--- আমার তো খুব ইচ্ছা আছে, কিন্তু ওর প্রোগ্রাম যে ঠিক কি হবে আমি জানিনা।
প্রৌঢ়বলেন, তোমরা তো সামসিংয়ে যাবে। ওখান থেকে চালসা মোড় হয়ে চলে এসো না একদিন আমাদের কোয়ার্টারে। খুব ভালো লাগবে তোমাদের ।
ইন্দ্র নীলার সঙ্গে প্রৌঢ়ের কথাবার্তার মন দিয়ে শুনছিল আর খেয়াল করছিল যে, ওপাশে বসা যুবতীটি চোখের সামনে বই খুলে রাখলেও বইয়ের পাতায় ঠিক যেন মনোনিবেশ করতে পারছে না।
হঠাৎ সে বইয়ের পাতা বন্ধ করে ইন্দ্রনীল কে জিজ্ঞাসা করে, আপনারা কি সামসিং যাচ্ছেন ?--------হ্যাঁ ।
---ওখানে কি আপনাদের বাড়ি?
----- না না, আমরা কলকাতায় থাকি ।সামসিং এ বেড়াতে যাচ্ছি বন্ধুর বাড়িতে।
-- ও। আমি আসলে সামসিং জায়গাটা ঠিক চিনিনা, তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম ।আমি ওখানে যাচ্ছি আমার বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে। ওখানের একটা স্কুলে আমার চাকরির ইন্টারভিউ ও আছে ।
--কোথায়?
--মেটে লিতে ।আমার কলেজ জীবনের এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর বাড়ি সামসিং ।ওকে ফোনে সব জানিয়ে স্কুলটা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেই ও বলেছিলো ,ওদের বাড়ি চলে যেতে। মেটেলি জায়গাটা ওদের বাড়ির কাছেই। ওদের বাড়িতে পৌঁছে গেলে ও সব ব্যবস্থা করে দেবে।
---- আপনি কোথায় পড়তেন ?
,-----প্রেসিডেন্সি কলেজ ।
---- ওটা তো আমারও কলেজ ।
-----আপনি ও বুঝি প্রেসিডেন্সিতে পড়তেন ?
-----হ্যাঁ, সে অনেকঅনেক কাল আগে । টু থাউজেন্ড সিক্স।
----- টু থাউজেন্ড সিক্স !কি সাবজেক্ট আপনার ?--------কেমিস্ট্রি ।
------আরে ,তারমানে আপনি সোমদাদের ব্যাচ -------কে সোম দা ?
------আমি যে বান্ধবীর বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছি, তার দাদাও প্রেসিডেন্সিতে পড়তেন ।উনিএখন চাকরি করেন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ।
------আপনার বান্ধবীর দাদার পুরো নামটা কি বলুন তো ।
-----সৌমেন্দু চক্রবর্তী ।
----আর আপনার বান্ধবীর পুরো নাম সোমা চক্রবর্তী -কি তাইতো ?ইংলিশ নিয়ে প্রেসিডেন্সিতে পড়তো সোমা!
------হ্যাঁ ।কিন্তু আপনি জানলেন কি করে ?
যুবতীর কথা শেষ হতে না হতেই হো হো করে হেসে ওঠে ইন্দ্রনীল। বিস্মিত যুবতীটি জিজ্ঞাসা করে, আপনি হাসছেন কেন?
----- তার কারণটা খুব মজার।আর সেটা জানতে পারলে আপনিও হাসবেন ।
-----বলুন তো, শুনি ।
---আমি আর আমার স্ত্রী সামসিং যাচ্ছি আমার বন্ধু ফরেস্ট অফিসার সৌমেন্দু চক্রবর্তীর বাড়িতে আর আপনি যাচ্ছেন আপনার কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সৌমেন্দুর বোন সোমা চক্রবর্তীর বাড়িতে ।আসলে কিন্তু একই বাড়িতে যাচ্ছি আমরা
---- অ্যাঁ!
---- হ্যাঁ ম্যাডাম।
যুবতীটি হাত বাড়িয়ে বলে, নো ম্যাডাম। আমি শকুন্তলা, শকুন্তলা রায় ।
ইন্দ্র হাত মিলিয়ে বলে, আমি ইন্দ্র, ইন্দ্রনীল সেন।
নীলাঞ্জনা ইন্দ্রনীলের হাসির শব্দে আকৃষ্ট হয়ে মুখ ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কারণটা বোঝার চেষ্টা করছিল । কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে ইন্দ্রের কাছে উঠে এসে বলল,নীল ব্যাগটা খুলে একটা চাদর বের করে দাও না ।
----কেন ?
-----আমার ঘুম পেয়েছে, আমি শোবো।
নীলার কথা শেষ হতে না হতেই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছেড়ে দিলো ট্রেনটা। আচমকা ঝাঁকুনিতে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিল নীলা ।শকুন্তলা ধরে ফেলল তাকে।
হু হু করে ছুটে চলেছে ট্রেন অন্ধকার রাতের পর্দা ভেদ করে।জানলার পাশে বসে আছে ইন্দ্র।
অদূরে লোয়ার বার্থ এ আপাদমস্তক ঢেকে শুয়ে আছে নীলাঞ্জনা ।তার মুখোমুখি নীচের সিটে শুয়ে আছেন মৃন্ময়ী মাসিমা ।ঠিক তার উপরের মিডিল বার্থ টায় শুয়ে আছেন মেসো মশাই ,মানে মৃন্ময়ী দেবীর স্বামী, জলঢাকা হাইডেল প্রজেক্ট এর ইঞ্জিনিয়ার চিন্ময় সেনগুপ্ত। শকুন্তলা এতক্ষনে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে ।কিছুক্ষণ আগেও সাইড লাইট জ্বালিয়ে বই পড়ছিল ও। আর ঠিক সেই কারণেই বোধহয় শকুন্তলা আপার বার্থ বেছে নিয়েছে ।কাউকে ডিস্টার্ব না করে সাইডের ছোট্ট লাইটটা জ্বালিয়ে বই পড়লে কেউ আপত্তি করতে পারবে না, তাই।সেটা তো ঠিকই আছে। কিন্তু উপরের বার্থে ওঠার আগে কথা প্রসঙ্গে হঠাৎ যে ঘটনা বলল শকুন্তলা, তা যথেষ্ট চিন্তান্বিত করে তুলেছে ইন্দ্র কে।
স্কুলের পড়া শেষ করে মফঃস্বল থেকে তিনটি ছেলে মেয়ে কলকাতা এসেছিল পড়তে। বিনয় বিশ্বাস, তিমির রায় আর অনসূয়া মাইতি ।বিনয়ের বাড়ি উত্তরবঙ্গের কোন একটা গ্রামে। তিমিরের বাড়ি পুরুলিয়ায় ।আর অনসূয়ার বাড়ি ছিল ঝাড়গ্রামের কাছেই বেলপাহাড়ীতে ।ওরা তিনজনেই হায়ার সেকেন্ডারি তে ভালো রেজাল্ট করার সুবাদে কলকাতা একটা নামী কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ পেল। তিনজনেরই অনার্স সাবজেক্ট এক। প্রাণিবিদ্যা।
অনসূয়ার বাবা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ।কোনরকমে টানাটানি করে সংসার চালান। কিন্তু অনসূয়ার ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট দেখে এগিয়ে আসেন তার দাদু, মাতামহ। তার আগ্রহী এবং সক্রিয় ভূমিকাতেই কলকাতায় পড়তে আসে অনুসূয়া। বিনয়ের বাড়ির অবস্থা সচ্ছল। বাবা বড় চা বাগানের ম্যানেজার। এই তিনজনের মধ্যে তিমিরের রেজাল্ট ছিলো ছিল সবচেয়ে ভালো ।সেই রেজাল্টের জোরেই নামি কলেজে ভর্তি হবার চান্স পেলেও অর্থের সংস্থান ছিলনা তার ।পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত এলাকায় সামান্য জমির আয়ে টেনেটুনে সংসার চালাতো তার বাবা। তাই কলেজের ভর্তি তালিকায় তার নাম উপরের দিকে থাকলেও ভর্তির টাকা কোনভাবেই জোগাড় করা সম্ভব হলো নাতার পক্ষে ।কলকাতায় ভালো কলেজে ভর্তি হতে আসার তীব্র বাসনায় সে ভালো কলেজের ফরম পূরণ করে এডমিশন টেষ্টে বসেছিল ।কিন্তু ভর্তি হতে কত টাকা খরচ হবে এ বিষয়ে তার কোনো ধারণাই ছিল না ।তাই কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে পুরুলিয়া ফিরে যাওয়া স্থির করে সে। এই ব্যাপারটা হঠাৎই জানতে পারে বিনয় আর অনসূয়া ।কলেজের ফরম তোলার দিনেই পরিচয় হয়েছিল ওদের তিনজনের ।আর মজার ব্যাপার হল যে ,ভর্তি তালিকায় ওদের তিনজনের নাম ছিল যথাক্রমে প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে। না ,পুরুলিয়াতে ফিরে যেতে হলোনা তিমির কে ।বিনয়আর অনসূয়ার আর্থিক সাহায্যে কলেজে ভর্তি হল তিমির। সেই শুরু বন্ধুত্বের। দুটি ছেলে ও একটি মেয়ের এমন অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো যে, কেউ যেন কাউকে এক মুহূর্তও ছেড়ে থাকতে পারে না ।কলেজে ওদের সহপাঠীদের কাছে ওরা পরিচিত হলো 'ত্রিমূর্তি' নামে।
রাতে ঘুমোতে যাবার সময় ছাড়া ওরা তিনজনেই একসাথেই থাকতো দিনের বাকি সময়টা। মুশকিল এল লাস্ট ইয়ারে একসাথে খাওয়া লেখাপড়া করা সিনেমা থিয়েটার দেখার ফাঁকে বিনয় মনে মনে ভালোবেসে ফেলল অনসূয়া কে। কিন্তু ততদিনে অনুসূয়া মন দিয়ে ফেলেছে ভদ্র বিনয়ী ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র তিমির কে ।এসব ব্যাপারে কিছু জানত না তিমির। সমস্যাটা সামনে এল তিনজন কলেজের পাট চুকিয়ে ইউনিভার্সিটির ফরম তোলার পরে ।সেদিন ফর্ম তোলার পরে ওদের তিনজনের বেড়াতে যাবার প্ল্যান ছিল ডায়মন্ড হারবারে ।কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল তিমির। হঠাৎ হাই ফিভার আর তীব্র মাথার যন্ত্রনা শুরু হল ওর ।বিনয় আর অনসূয়া ওকে নিয়ে গেল হাসপাতালে ।ডাক্তার বাবু পরীক্ষার পরেজানালেন ,ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে তিমির ।কথাটা শুনে হঠাৎ যেন পাগলের মত আচরণ করতে লাগল অনসূয়া ।হাসপাতালে চিকিৎসা যদি ভালো না হয় ,এই আশঙ্কায় ওকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে নিয়ে এসে একটা দামী নার্সিংহোমে ভর্তি করলো অনুসূয়া ।অবশ্য এ ব্যাপারে সে বিনয়ের মতামত নিয়েছিল। অনুসুয়া কে খুশি করার জন্য বিনয় শুধু তার প্রস্তাবে মত ই দিল না, নার্সিংহোম এর যাবতীয় খরচ খরচার যোগান ও দিল সে। দিন দশেক পরে ছাড়া পেল তিমির। তখন খুবই দুর্বল ছিল সে।
লেখা পড়ার সুবিধার জন্য কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়াকালীন বিনয় ও তিমির যাদবপুরে একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেছিল। তিমিরের সব রকম আপত্তি অগ্রাহ্য করে সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে থাকতে শুরু করলো অনসূয়া। শুধু রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সে ফিরে যেত তার লেডিস হোস্টেল । তিমির এই কথাটা বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছিল বিনয়। তিমিরের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ অনসূয়ার অনুরোধে বিনা বাক্যব্যয়ে যোগান দিল বিনয়। তাই বিনয়ের প্রতি যথেষ্ট কৃতজ্ঞ ছিল অনসূয়া। যদিও সে বিনয় কে বলেছিল যে, বাড়িতে গেলেই দাদুর কাছ থেকে টাকা এনে সব টাকা ফেরত দিয়ে দেবে বিনয় কে। তাই বিনয়ের হাবভাব ইঙ্গিতে অনসূয়া বিস্মিত হলেও পাত্তা দেয়নি প্রথমটায়।কিন্তু যেদিন বিনয় অনসূয়ার হাত ধরে প্রেম নিবেদন করে বসলো এবং জানালো যে সে অনসূয়াকে বিয়ে করতে চায় ,সেই দিনই অনুসূয়া দৃঢ় ভাষায় বিনয়কে জানিয়ে দিল সত্যিটা। সত্যিটা বিনয় বহু আগে থেকেই অনুমান করতে পারলেও মেনে নিতে পারছিল না কিছুতেই ।সে দীর্ঘদেহী ,সুপুরুষ, বিত্তশালী। কিন্তু কি আছে ওই কালো রোগা খর্বাকৃতি গরিব ছেলের মধ্যে? কেন ওর জন্য অনসূয়া প্রত্যাখ্যান করবে তার ভালবাসা? রাগে-ক্ষোভে উত্তরবঙ্গে নিজের বাড়িতে ফিরে গেল বিনয়। এসব ঘটনার বিন্দুবিসর্গও জানতো না তিমির। তাই বিনয় যেদিন তার জিনিসপত্র সব গুছিয়ে বাড়ি ফিরে যাবার তোড়জোড় করছে, তিমির বন্ধু কে বলেছিল ,কিরে বিনয়, তুই এভাবে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিস কেন ? তুই ফিরবি কবে ?
-----আর ফিরবো না কলকাতায়।
---- মানে ?ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি হবি না?
------ আমি কলকাতায় পড়বো না।
---- কিন্তু কেন?
এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে ট্যাক্সি ডেকে বেরিয়ে গেছিল বিনয়।
একটু পরেই অনসূয়া এসে এই ঘটনা শুনে অবাক হয়ে গেছিলো সে।প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিনয় কে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফেরত আনার জন্য সে রওনা হয়েছিল হাওড়া স্টেশন
এর উদ্দেশ্য। তিমির জিজ্ঞাসা করেছিলো, কি হয়েছে?
ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে অনুসূয়া জবাব দিয়েছিল, ফিরে এসে সব বলবো তিমির ।এক্ষুনি বেরিয়ে না গেলে বিনয় আমাদের ভুল বুঝে দূরে সরে যাবে ।
কিন্তু না, বিনয়ের সঙ্গে আর দেখা হয়নি অনসূয়ার। রাস্তার জ্যাম কাটিয়ে সে যখন হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেছিল, ততক্ষনে বেরিয়ে গেছে বিনয়ের ট্রেন । অনসূয়া ফিরে এসেছিল তিমিরের কাছে। সমস্ত ঘটনা খুলে বলেছিল তিমিরকে ।হতবাক হয়ে গেছিল তিমির। তার মত হতদরিদ্র, কালো, শ্রীহীন ছেলেকে অনসূয়ার মতো সুন্দরী মেয়ে যে ভালবাসতে পারে তা তার কল্পনার অতীত ছিল। হ্যাঁ, ওর মত মেয়েকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করত তিমির ।হ্যাঁ, অনুসূয়া কে ভালো লাগতো তার ।তাই বলে বলে অনসূয়ার সঙ্গে প্রেম করার কথা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবেনি সে। তিমির বরঞ্চ ভাবতো, বিনয়ের মত দীর্ঘদেহী সুপুরুষ স্মার্ট ছেলেকে খুব মানাবে অনসূয়ার পাশে । শুধু তার অসুস্থতার সময়ে অনসূয়ার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর সেবার স্পর্শ পেয়ে নিজের বন্ধু ভাগ্যে মনটা ভরে গেছিল তিমিরের। কিন্তু তাই বলে অনসূয়ার সঙ্গে প্রেম, এটা কি করে হয় !বাড়িতে গরিব মা-বাবা অপেক্ষা করে আছে সে কবে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাবে ,এই প্রতীক্ষায়। একটা ছোট্ট বোন আছে বাড়িতে ।গ্রামের স্কুলে ফাইভে পড়ে। তার লেখাপড়া করার ভীষণ ইচ্ছে ।
তার ভালো রেজাল্টের জন্য একটা এনজিওর কাছ থেকে প্রতিমাসে বৃত্তি পায় তিমির। এছাড়া ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টিউশনি করে রোজগার করে। আর এই টাকার একটা মোটা অংশ পুরুলিয়ায় বাবার কাছে পাঠায় সংসার চালাবার জন্য ।বাকি টাকায় কোনমতে মাস চালায় সে। তাই অনসূয়ার মুখে সমস্ত কথা শোনার পর চুপ করে থাকে সে ।
অনসূয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, কি হলো তিমির, তুমি চুপ করে আছো কেন?
---' কি বলবো বুঝতে পারছি না অনু!
----মানে ?
-----তোমার মতো সুন্দরী মেয়ের ভালবাসা পাওয়া আমার মত ছেলের কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মত !কিন্তু ......
------কিসের কিন্তু?
---- তুমি তো সেই কলেজে ভর্তি হবার প্রথম দিন থেকেই জানো যে ,আমার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেই ভালো নয়।
---- তো ?
-----ইদানিং বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় চাষবাসের কাজ ঠিকমতো করতে পারেন না ।তুমি হয়তো জানো না যে ,আমার টিউশনির রোজগারের একটা বড় অংশ আমি বাড়িতে পাঠাই সংসার চালাবার জন্য ।
-----,আমি সব জানি, বিনয় সব বলেছে আমাকে।
----- তাহলে বল এমন অবস্থায় আমার কি প্রেম করা মানায় তোমার সঙ্গে?
----- কেন নয় ?
-----আমিতো চেহারা, অর্থকৌলিন্য -কোন দিক দিয়েই তোমার যোগ্য ন ই। বরঞ্চ বিনয় ....
----ওর কথা থাক।
------ না ,বলতে দাও আমাকে ।বিনয় ধনী, ,সুপুরুষ ,বিনয়.....
---- থামো! এবার কিন্তু আমাকে অপমান করছ তুমি।
-- অপমান?
--- নিশ্চয়ই! তোমরা মেয়েদের কি ভাবো বলতো? তাদের কি মন বলে কিছু নেই? তারা কি শুধু অর্থ কৌলিন্যের পিছনে ছোটে ?
---আমি তা বলিনি অনু ।আমি .....
---দেখো, লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই আমরা চাকরি পেয়ে যাব আশা করি ।আর তখন তোমার বাবা মা আর বোনকে কলকাতায় আমাদের কাছে এনে রাখবো। তাহলে তো তোমার সব সমস্যার সমাধান হবে। কি, তাইতো?
---- কিন্তু ?
-----আর কোন কিন্তু নয়, এবারে শুধু প্রেম ,চুটিয়ে প্রেম ।
কথা শেষ করেই আচমকা অনসূয়া তিমিরের ঝাঁকড়া চুলের মুঠি ধরে নিজের দিকে হেঁচকা টান মেরে তিমিরের ঠোঁট টেনে নেয় নিজের ঠোঁটের ফাঁকে।
ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষায় অনসূয়া first-class পেল আর তিমির হল ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। একটা কলেজে চাকরি নিল অনুসূয়া ।কিন্তু কিছুতেই চাকরি করতে দিল না তিমির কে। অনসূয়ার জেদাজেদি তে পিএইচডি তে এডমিশন নিল তিমির ।উভয় পরিবারের সম্মতি নিয়ে বিয়ে হল দুজনের ।বিয়ের মাস তিনেকের মধ্যেই হঠাৎ তিনদিনের জ্বরে ভুগে মারা গেলেন তিমিরের বাবা। তিমিরের মা ও বোনকে কলকাতায় নিয়ে এলো অনসূয়া। ননদকে ভর্তি করে দিল কলকাতার স্কুলে ।কিছুদিন পরেই হঠাৎ বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়ে স্ট্রোক হলো তিমিরের মায়ের। অনসূয়া প্রাণপণ সেবাযত্ন করল শাশুড়ীর। কিন্তু মাসখানেকের মধ্যেই মারা গেলেন তিনি। সদ্য মাতৃহারা ননদকে সন্তানস্নেহে বুকে টেনে নিল অনুসূয়া। পিএইচডি কমপ্লিট করে স্কলারশিপ নিয়ে জেএনইউ তে জেনেটিক্স নিয়ে হায়ার স্টাডির জন্য গেল তিমির ।ফিরে এসে বরানগরে একটা নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিল সে। কিন্তু চাকরির থেকেও তার বেশি আগ্রহ ছিল গবেষণায় ।তাই গড়িয়াতে নিজের বাড়িতে গবেষণার সমস্ত সরঞ্জাম এনে কাজ করতে শুরু করলো সে ।গবেষণার বিষয় ছিল' জীবদেহে হরমোনের প্রভাব'।
ওদিকে বিনয় কলকাতা থেকে ফিরেই ডাক্তারি পড়তে নেপালে গেল। এম বি বি এস ,এম এস কমপ্লিট করে সে চাকরি নিল সিকিমে । অনসূয়া এসব খবর পেয়েছিলো কলেজ জীবনের পুরনো বন্ধুদের কাছ থেকে। কলকাতা ছেড়ে যাবার পর বিনয় কোনরকম যোগাযোগ রাখেনি অনসূয়া বা তিমিরের সঙ্গে ।তিমির ওর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া কোন সাড়া পায়নি অপরপক্ষের। কলেজের পুনর্মিলনী উৎসবে আবার মিলিত হল ওরা তিনজন ।প্রায় চল্লিশের অনসূয়া আরো ব্যক্তিত্বময়ী ও আকর্ষণীয় হয়েছে। ওর পাশে তিমির কে দেখে বিনয়ের পুরনো ক্ষত থেকে রক্তপাত শুরু হয়। কিন্তু মনের ভাব গোপন করে তিমির ও অনসূয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই কথাবার্তা বলে বিনয় । তিমির লক্ষ্য করে যে, বিনয় একটু যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে । কারণ জিজ্ঞাসা করায় বিনয় জানায় যে, সিকিমে চাকরি করার সময় একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল তার। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ডান পা। ওটা সম্পূর্ণ সারেনি। কথা শেষ করেই এটাও জানায় যে, এক্সিডেন্ট এর পর সিকিম গভমেন্ট থেকে মোটা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে সে। আর সেই টাকা দিয়ে পাহাড় নদী জঙ্গলে ঘেরা এক অপরূপ পরিবেশে বাড়ি বানিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছে । বেশ কয়েকটা নামি নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত আছে সে। খুব শিগগিরই নিজের নার্সিংহোম খোলার পরিকল্পনা আছে শিলিগুড়িতে।
নর্থ বেঙ্গল থেকেই কলকাতার হোটেল বুক করে এসেছিল বিনয় ।কিন্তু তিমিরের একান্ত পীড়াপীড়িতে সেই অগ্রিম বুকিং ক্যানসেল করে তিমিরের গড়িয়ার বাড়িতে এসে ওঠে বিনয়। তিমিরের বোন তখন বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার জন্য শান্তিনিকেতনে ছিল ।তবে এসব খবর তাকে ফোনে জানিয়ে ছিল তার বৌদি অনসূয়া । তিমিরের বাড়ি দেখে একটু অবাক হয়েছিল বিনয়। গড়িয়ার মতো জায়গায় এতটা জায়গা নিয়ে সুদৃশ্য ফুল বাগান- সুইমিং পুল - রঙিন মাছের অ্যাকোয়ারিয়াম দিয়ে সাজানো এত বিশাল বাড়ি তিমির করলো কি করে? কত টাকা রোজগার করে সে?
এই কথা ভেবে বাড়ি ঘুরে দেখতে দেখতে এক সময় বিনয় বলেই ফেলল, বাবাঃ! বিশাল বাড়ি বানিয়েছিস তো তিমির!
---- বাড়ির আমি কিছুই করিনি ভাই।
--- মানে?
---- এর পুরো ক্রেডিটটা অনুর ।
----মানে?
----জায়গা কেনা থেকে শুরু করে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করা, বাড়ি তৈরি করা, বাড়ি ডেকোরেট করা, ফুলের বাগান করা- সমস্তটাই অনু করেছে। আমাকে কিছুই করতেহয়নি।
----- ও!
আবার রক্তাক্ত হয় বিনয়ের হৃদয়। নতুন করে জ্বালা ধরে মনে ।হোটেলের বুকিং ক্যানসেল না করলে বিনয় হয়তো হোটেলে ফিরে যেত। কারণ তিমিরের বাড়ি অসহ্য লাগছিল তার। প্রত্যেক মুহূর্তে তাঁর মনে হচ্ছিল যে, সে হেরে গেছে। হেরে গেছে একটা গেঁয়ো আনস্মার্ট কালো কুৎসিত ছেলের কাছে। তার ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করেছে অনসূয়া। একদা সে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে গেছিল প্রতিষ্ঠা পেতে। আজতো সে একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। আজ অনসূয়া তিমিরের সুখের সংসার দেখে আবার সে ফিরে যাবে উত্তরবঙ্গে ?না হলে এত বছর বাদে জীবনের মধ্যাকাশে এসে কি বা করতে পারে সে? তবে একটা ব্যাপারে সে স্যাটিস্ফায়েড। বিয়ের এত বছর পরেও আজও তিমির ও অনসূয়া নিঃসন্তান ।আর তার স্ত্রী বনানী তাকে একটা ছেলে উপহার দিয়েছে। তবুও.....!
সেদিন রাতেই ফোন আসে অনসূয়ার বাপের বাড়ি বেলপাহাড়ি থেকে। অনসূয়ার বাবা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সেই খবর পেয়ে পরদিন ভোরে অনসূয়া বেরিয়ে যায় বেলপাহাড়ি যাওয়ার জন্য ।যাওয়ার আগে বারবার করে অনুরোধ করে বিনয়কে, আরো কয়েকটা দিন থেকে যাওয়ার জন্য।
বিনয় শুধু বলে, দেখি কদিন থাকতে পারি ।তুমি সাবধানে যাও।
পিত্রালয় থেকে দিন পাঁচেক পরে সন্ধ্যাবেলায় কলকাতায় ফেরে অনসূয়া ।বাবা অসুস্থ থাকায় কলকাতার চিন্তা তার মাথায় ছিল না। কিন্তু গতকাল বিকেলের পর থেকে তিমিরের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে না পারায় খুব চিন্তিত ছিল সে। রেললাইনে 'ব্লক' নেওয়ায় সকালে বেলপাহাড়ি থেকে বেরিয়ে কলকাতায় আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায় তার। কিন্তু সদর দরজায় তালা বন্ধ দেখে খুবই অবাক হয়ে যায় অনসূয়া। প্রতিবেশীদের বাড়িতে খোঁজ করেও কোনো খবর পায়না সে। বাধ্য হয়ে লোক ডেকে সদর দরজার তালা ভেঙে বাড়িতে ঢোকে। সারা বাড়িতে সব ঘরের দরজা খোলা ।কোথাও কোন জিনিসের বিশেষ নড়চড় হয়নি। শুধু তিমিরের গবেষণাগার কেমন যেন এলোমেলো ।মাঝের ঘরের বড় আলমারি টা খোলা। সেখান থেকে তিমিরের বেশ কিছু জামা প্যান্ট উধাও ।আর নেই একটা বড় ট্রলি ব্যাগ। তিমিরের মোবাইলে বহুবার চেষ্টা করেও চেষ্টা করেও একই কথা শোনা যাচ্ছে 'আউট অফ নেটওয়ার্ক সার্ভিস'। বিনয়ের মোবাইল নাম্বার সে নেয়নি। কাজেই তার কাছ থেকে খবর নেওয়ার কোন প্রশ্নই ছিল না ।রাত বাড়ে, তিমির ফেরে না। সারারাত বিনিদ্র কাটিয়ে ভোরেই লোকাল থানায় যায় অনসূয়া ।
তারপর দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আর বাড়ি ফেরেনি তিমির।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আগে শুয়ে পড়েছিল নীলা। বাড়ি থেকে আসার সময় পিসিমা নিজের হাতে তৈরি গাওয়া ঘিয়ের পরোটা আর আলুর তরকারি করে টিফিন বক্সে ভরে নীলাকে বারবার করে বলে দিয়েছিল মনে করে খেয়ে নিতে। প্রৌঢ়া ও মেয়ের বাড়ি থেকে আসার সময় লুচি, মোহনভোগ, সন্দেশ নিয়ে এসেছিলেন। শকুন্তলা নিয়ে এসেছিল কেক, বিস্কুট আর কিছু স্ন্যাক্স। সমস্ত খাবার মৃন্ময়ী মাসিমা নিজের হাতে ভাগ করে গুছিয়ে সবাইকে খেতে দিয়েছিলেন। খুব ভাল লেগেছিল ইন্দ্রের। তার মনে পড়ে যাচ্ছিল, বহুদিন আগে কোথায় যেন সে পড়েছিল, ইন্ডিয়ার রেলের কামরা ভারতবর্ষের এক ক্ষুদ্র রূপ। আজ কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস এর একটা বগির ক্ষুদ্র অংশে সে অতিথিবৎসল বাংলা কে খুঁজে পেল।
রাত অনেকটা হয়েছে। কামরার সবাই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। শকুন্তলা তখনও নিচে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে।
ইন্দ্র জিজ্ঞাসা করে, আপনি ঘুমাবেন না ? শকুন্তলা বলে, আমি বসে থাকায় আপনার শোয়ার অসুবিধা হচ্ছে, তাই না? আমি এক্ষুনিউপরে উঠে যাচ্ছি।
--- আরে না না ,আপনি সারা রাতভর থাকলেও আমার কোন অসুবিধা নেই।
---মানে?
-- আমি ট্রেনে ঘুমোতে পারি না।
--- আরে আমিও তো তাই। আর সেই জন্যই তো উপরের বার্থ বুক করেছি।
-- মানে ?
----মানে ঘুম আসবে না আমার। তাই সাইডের ছোট লাইটটা জ্বালিয়ে সারারাত জেগে বই পড়বো, কারো ডিস্টার্ব হবে না।
--- ও ।একটা কথা জিজ্ঞাসা করি যদি কিছু যদি মনে না করেন ।
-----জিজ্ঞাসা করুন না যা ইচ্ছে! অযথা ফর্মালিটির দরকার নেই। প্লীজ.....
----সোমা বিশ্বভারতী থেকে এমএ করে ওখানেই বিএড করেছিল শুনেছি। আপনি?
----- আমিও তাই ।আর তাইতো সোমা আমার প্রিয় বান্ধবী ।
-----কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।
----কি?
------আপনি এই কোয়ালিফিকেশন নিয়ে নর্থ বেঙ্গলের ইন্টরিয়ার এলাকায় চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন কেন? কলকাতা বা তার ধারে কাছে কোন চাকরি পাননি? পেয়য়েছিলাম, কিন্তু করিনি।
---- কেন ?
--- আমাকে যে নর্থ বেঙ্গল যেতেই হবে।
---কেন?
---সে অনেক কথা ।অত কথা শোনার ধৈর্য আছে আপনার ?
----আপনি বলেই দেখুন না।
এরপর শকুন্তলা বলেছিল বিনয় তিমির আর অনসূয়ার সুদীর্ঘ কাহিনী ।
তারপর বলেছিল, তিমির রায় আমার দাদা। আমি তার হতভাগ্য বোন, শকুন্তলা। আমাকেই সন্তানস্নেহে বড় করেছে আমার অনসূয়া বৌদি। অথচ দাদা হারিয়ে যাওয়ার পর কিছুই করতে পারিনি বৌদির জন্য। গত দু'বছর ধরে থানা- পুলিশ -সংবাদপত্র- ইলেকট্রনিক মিডিয়া- সোশ্যাল মিডিয়া ,সর্বত্র ছোটাছুটি করে ও দাদার কোনো খোঁজ না পেয়ে বৌদি এখন প্রায় জীবন্মৃত ! সহকর্মীদের সহানুভূতি আর কলেজ কর্তৃপক্ষের সহৃদয়তার কোনরকমে চাকরিটা টিকে আছে। দাদা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে বৌদি আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরেছে আমাকে । বাড়ি ফিরতে কোন দিন দেরি হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বৌদি। অথচ আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে যে, দাদার বন্ধু ডাক্তার বিনয় বিশ্বাসকে খুঁজে পেলেই দাদার খোঁজ পেয়ে যাব। তাই দাদাকেখোঁজার কথা না বলে শুধু চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাব বলে বৌদির কাছে অনুমতি নিয়ে নর্থ বেঙ্গল যাচ্ছি ।উদ্দেশ্য বিনয় বিশ্বাসকে খুঁজে বের করা।
সোমাকে খুব ভালোভাবে চেনে বৌদি ।তাই ওদের বাড়িতে যাব বলায় কোনরকম আপত্তি করেনি। তাছাড়া বৌদির মা এখন কলকাতায় আছেন ।থাকবেন কিছুদিন। তাই এই সুযোগটা কাজে লাগালাম আমি ।
আর স্কুলের ইন্টারভিউ, ওটা কি মিথ্যে?
-- না না, ওটা মিথ্যা নয়। সত্যি ইন্টারভিউ আছে আমার।
--- গুড লাক ফর অল!
---- থ্যাংকস !
একটু পরেই উপরের বার্থে উঠে গেছিলো শকুন্তলা।
জানালার কাঁচেরভিতর দিয়ে বাইরের জ্যোৎস্নালোকিত দ্রুত পরিবর্তিত পটেসর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ইন্দ্র ভাবছিল তিমির আর অনসূয়ার কাহিনী। শকুন্তলা কী খুঁজে পাবে ডাক্তার বিশ্বাসকে ?ওকি ফিরে পাবে ওর দাদা তিমির রায় কে?
প্রায় চল্লিশ মিনিট লেটে 'কাঞ্চনকন্যা' পৌঁছলো নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মের গায়ে সিঁড়ি ভেঙে অনেকটা উপরে উঠে বিশাল লম্বা ওভার ব্রিজ পেরিয়ে ওপাশে পৌঁছয় ইন্দ্র, নীলা, শকুন্তলা, মৃন্ময়ীদেবী আর চিন্ময় বাবু।
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে এই প্রথম এল ইন্দ্রনীল। তাই এত লম্বা ওভারব্রিজ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে সে বলল, ও বাবা এত লম্বা ওভারব্রিজ !
চিন্ময় বাবু বললেন, রেলস্টেশন হিসেবে নিউ জলপাইগুড়ির দারুন কদর। উত্তর বাংলার প্রবেশদ্বার এই স্টেশন। কারণ এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে শিলিগুড়িতে পৌঁছালেই পাওয়া যাবে উত্তর-পূর্ব ভারতে যাবার সড়ক যোগাযোগ । নেপাল ,ভুটান, চীন, মায়ানমার, সিকিম ,অসম, মেঘালয় ,অরুণাচল ,নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরারপথ বেরিয়েছে শিলিগুড়ি থেকে।এমনকি দুটো আন্তর্জাতিক সড়ক যাচ্ছে শিলিগুড়ি হয়ে।
--- ও বাবা, এত তো জানতাম না মেসোমশাই !বিস্মিত নীলা মন্তব্য করে।
স্টেশন চত্বরেরঠিক বাইরেই অসংখ্য ট্যাক্সি আর প্রাইভেট কারের ভিড় ।সৌমেন্দু আর সোমা দাঁড়িয়েছিল ঠিক সিঁড়ির মুখেই ।ইন্দ্রদের দেখতে পেয়ে সহাস্যে এগিয়ে এলো ওরা ।ইন্দ্র কে বুকে জড়িয়ে ধরল সৌমেন্দু। সোমা আর শকুন্তলা ও জড়িয়ে ধরল পরস্পরকে ।
তারপর নীলার কাছে এসে সোমা বলে, তুমি নিশ্চয়ই নীলা বৌদি।
নীলা ঘাড় নেড়ে বলে , হুঁ।তুমি তো সোমা।
---ঠিক বলেছ।আমি ননদিনী রায়বাঘিনী।
-- ধুত! তুমি আমার বন্ধু। হেসে নীলা বলে ।
মৃন্ময়ী নীলাকে বলেন, এবার তাহলে আসি রে মা নীলা। তোরা আমাদের ওখানে অবশ্যই বেড়াতে আসবি কিন্তু।
----- নিশ্চয়ই! জবাব দেয় নীলা।
নীলার সঙ্গে প্রৌঢ়ার কথাবার্তা শুনে বিস্মিত সৌমেন্দু বলে, ইন্দ্র, ওনাদেরকে তো ঠিক চিনলাম না।
ইন্দ্র উত্তর দেওয়ার আগেই প্রৌঢ় বলেন,
আমি চিনময় সেনগুপ্ত আর আমার পাশে ইনি আমার স্ত্রী মৃন্ময়ী। আমরা ঝালং এ থাকি।
---ঝালংয়ে! মানে জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায়?
---- হ্যাঁ, চিন্ময় মেশোমশাই ওখানকার ইঞ্জিনিয়ার। নীলা বলে ।
হাতজোড় করে নমস্কার করে সৌমেন্দু বলে, আপনারা ওখানে যাবেন কিভাবে?
---- আমার অফিস থেকে গাড়ি আসবে আমাকে নিতে ।
ইন্দ্রের ভ্রু কুঁচকে যায় ।মনে মনে সে ভাবে, ওনারা তো কলকাতায় গেছিলেন মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে, কোন অফিশিয়াল ডিউটি বা সরকারি কাজে যাননি। তাহলে ওদের নিতে সরকারি গাড়ি কেন আসবে ?
ছি!এভাবে সরকারের কোষাগার থেকে কত পয়সা যে প্রতিদিন বাজে খরচ হয় কে জানে। অথচ এটাই অলিখিতসরকারি নিয়ম , এটাই সিস্টেম।
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে চিন্ময়বাবুদের জীপ আর সৌমেন্দূর বোলেরো গাড়ি একসঙ্গে ছাড়লো। হিলকার্ট রোড এসে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল সৌমেন্দুর গাড়ি। চিন্ময় বাবুদের গাড়িটাও দাঁড়ালো পিছনে ।গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে সৌমেন্দু। চিন্ময় বাবু মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হলো ?
----আমার বন্ধু আর তার স্ত্রী প্রথম শিলিগুড়ি এল তো তাই ওদের 'হীরালাল ঘোষের' দোকানের দই আর ক্ষীরের সিঙ্গারা খাওয়াবো ভাবছি।
--- বাহ! আমি অবশ্য ও দু টো বস্তুই 'সৃষ্টিধর' এর দোকানেই কিনি। চিন্ময় বাবু বলেন।
--- ওটাও ভালো সৌমেন্দু বলে ।
ইন্দ্রনীল জানালার কাঁচের মধ্য দিয়ে দেখে, গাড়ি যেখানে দাঁড়িয়েছে সেই দোকানটার নাম 'জলযোগ মিষ্টান্ন ভান্ডার'।
সৌমেন্দু বলে, কি হলরে ইন্দ্র ,নেমে আয় ।
---কেন ?
----দাদা বোধ হয় তোমাদের 'জলযোগে' ক্ষীরের সিঙ্গারা আর দই খাওয়াবে। সোমা বলে।
----এই সকালবেলায় দই-মিষ্টি কি ঠিক ..…
নীলা কথা শেষ করার আগেই সোমা বলে, ঠিক বলেছ নীলা বৌদি ।মিষ্টি আমিও ভালোবাসি না। অথচ দাদা শিলিগুড়িতে এলেই এই দোকান টা থেকে দই আরক্ষীরের সিঙ্গারা কিনে নিয়ে যাবেই। আসলে আমার মা খুব দই খেতে ভালোবাসে আর বাবা ভালোবাসে ক্ষীরের সিঙ্গারা।
সৌমেন্দু আবার তাগাদা দেয়, কি হলো রে সোমা, নেমে আয় তোরা ।
---এই সক্কালবেলায় কেউ মিষ্টিমুখ করতে চাইছে না রে দাদা ।তুই বরঞ্চ বাড়ির জন্য কিছুটা কিনে নে।
শকুন্তলা বলে, খাই বা না খাই, নিচে নেমে সোম দা কে সঙ্গ দেওয়া উচিত।
গাড়ির দরজা খুলে রাস্তায় নামে শকুন্তলা। ইন্দ্রনীল নিচে নামে । চিন্ময় বাবু গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলেন, সৌমেন্দু বাবু, আপনি মিষ্টি কিনুন, আমরা ততক্ষণে এগোই ।অনেকদিন অফিসে নেই তো অনেক কাজ জমে আছে নিশ্চয়ই ।
সোম বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ, এগিয়ে যান আপনারা ।আমাদের একটু সময় লাগবে ।মিষ্টি না খাক, ব্রেকফাস্ট তো করতেই হবে। আসুন না আপনারা।
--- না না, আমরা কিছু খাব না। আমরা এগোচ্ছি।
মৃন্ময়ী মাসিমা মাথা বাড়িয়ে ইন্দ্রকে বলে, তোমরা ঝালং এ আমাদের ওখানে অবশ্যই এস কিন্তু।
ইন্দ্র সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে।
বোলেরো থেকে হাত নাড়ে নীলাঞ্জনা। মৃন্ময়ী মাসিমাও হাত নাড়েন। এগিয়ে যায় সরকারি গাড়ি।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর সীমান্তে তরাই অঞ্চলের নাম ডুয়ার্স ।পাহাড়- নদী -ঝর্ণা -গভীর অরণ্য -দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ চা বাগান -ভেষজ গুল্মের অফুরন্ত ভান্ডার -অসংখ্য পাখি -প্রজাপতি- কীটপতঙ্গ আর বনচর জীবজন্তুর সাম্রাজ্য এই ডুয়ার্স।1895- 96 সালে এই অঞ্চল জরিপ করেছিলেন ডি এইচ ই সেন্ডার সাহেব। তার ওই সার্ভে রিপোর্ট ডুয়ার্স বিষয়ে একটি মূল্যবান দলিল ।সাহেব শুধু জমি জরিপ করেই ক্ষান্ত হননি, ,ডুয়ার্সের প্রকৃতি জীবজন্তু মানুষ সবকিছুর বিবরণ তিনি দিয়েছেন ওই সার্ভে রিপোর্টে ।তিনি তাঁর রিপোর্টে লিখেছেন----" ডুয়ার্সের জঙ্গলের প্রকৃষ্ট তম ধারণা পাওয়া যায় বছরের যে কোন সময়ে আলিপুরদুয়ার- বক্সা রাস্তাটি ধরে গেলে। দুদিকে দীর্ঘকায় শাল সিজ চাপ সিদা ইত্যাদির ছায়ায় ঢাকা থাকে । ওই রাস্তা দিয়ে জংলি মুরগি খাবার খুঁজে বেড়ায়। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাস্তা ভরে ওঠে বর্ণাঢ্য প্রজাপতির মেলায় ।হঠাৎ হরিণ, বাঘ হাতিরও দেখা মিলতে পারে"।
এই বর্ণনার সঙ্গে আজও মিল খুঁজে পাওয়া যায় ডুয়ার্সের ।ডুয়ার্সের ব্যাকগ্রাউন্ড ভুটান পাহাড়। অতীতের কামতাপুর মানে আজকের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার সীমান্তে ৪৭৫০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে এই ডুয়ার্স । এর মধ্যে আছে ১৫২ টি চা বাগিচা আর বারোশো পঞ্চাশ কিলোমিটার বনভূমি। ডুয়ার্সের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা- তোর্সা -জলঢাকা -রায়ডাক- কালচিনি - মূর্তি -ডায়না -জয়ন্তী ....আরও অসংখ্য ছোট-বড়-মাঝারি নদী ।জলদাপাড়া -গরুমারা -_চাপড়ামারি এই তিন বিখ্যাত অভয়ারণ্য ছাড়াও 'মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফস্যাংচুয়ারি', 'চুকচুকি পক্ষী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র', বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট, ,খট্টিমারি জঙ্গল ও ছোট-বড় অসংখ্য অরণ্য শোভিত ডুয়ার্স।
একটানা ডুয়ার্সের বিবরণ দিয়ে থামে সৌমেন্দু ।নীলা বলে, সোমদা ,আপনি যেভাবে ডুয়ার্সের কথা বললেন তাতে মনে হলো যে পুরো এলাকাটার একটা ছবি যেন ভেসে উঠলো চোখের সামনে। আপনি কি লেখালেখি করেন? হো হো করে হেসে উঠে সোমা ।বিস্মিত নীলা বলে, কি হলো, তুমি হাসছো কেন?
--- ওই যে তুমি বললে না, দাদা লেখালেখি করে কিনা -সেটা শুনে হাসি পেল আমার।
--- কেন ,এতে আবার হাসির কি আছে?
নীলার কণ্ঠে ক্ষোভ ।
সোমা হেসে বলে ,লেখালেখি করার সময় কোথায় দাদার? সারাদিন তো ছুটে বেড়াচ্ছে। কি যে সরকারি চাকরি করে বুঝিনা বাপু।
--- তোর কি মনে হয় যারা সরকারি চাকরি করে তারা সবাই ফাঁকিবাজ?
শকুন্তলা কথাটা বলতেই নীলা বলে, সেই রকমই তো শোনা যায়।
সোমা বলে, এই বিতর্ক থাক এখন। আমার দাদা খুব ভালোবাসে ডুয়ার্সকে।তবে একটা কথা দাদা, তোর বর্ণনা খুব সুন্দর হলেও একটু অসম্পূর্ণ আছে।
---মানে ,কি বলতে চাস তুই ?
---অনেক কিছুই বাদ দিয়েছিস তুই ।
--যেমন ?
----সারা ডুয়ার্স জুড়ে ছড়িয়ে আছে অনেক ছোট-বড় পাহাড় টিলা আর আছে রংবেরঙের অজস্র পাখি, চিত্র-বিচিত্র অগুনতি প্রজাপতি ,হাতি ,বাঘ ,হরিণ ইত্যাদি অনেক জীবজন্তু ।এদের কথা তো বললি না তুই।
গাড়ি এসে দাঁড়ালো একটা মোড়ে। সৌমেন্দু বলল ,এটা হল চালসা ।এখান থেকে ১৮কিলোমিটার দূরে সামসিং।
নীলা জিজ্ঞাসা করে ,সোম দা, ঝালং কোন দিকটায় ?
সৌমেন্দু হাত বাড়িয়ে দূরে নির্দেশ করে একটা রাস্তা দেখিয়ে বললো, ওই যে রাস্তাটা-- ওটা ধরে খুনিয়া মোড় হয়ে চাপড়ামারি জঙ্গল পেরিয়ে পৌঁছনো যায় ঝালং আর বিন্দু।
-- বিন্দু?
-- হ্যাঁ, ঝালং থেকে 12 কিলোমিটার দূরে ভুটানের টেন্ডু পাহাড়ের গায়ে ভারতের শেষ জনপদ বিন্দু। পাহাড়-নদী অরণ্য ঝরনা সব মিলিয়ে অপরূপা বিন্দু ।
---আমরা ঝালং গেলে বিন্দু দেখব কিন্তু। ইন্দ্রের দিকে তাকিয়ে নীলা বলে।
ইন্দ্র কোন মন্তব্য করে না ।সে এখন সৌমেন্দুর সমস্যাটা জানার জন্য উদগ্রীব ।সৌমেন্দু মিষ্টি কিনছে, গল্প করছে ,অথচ মূল সমস্যার কথা একবারও বলছে না ।তবে কি ও যে সমস্যাটায় পড়েছে সেটা শুধু ইন্দ্রকে বলতে চায়? এখানে ড্রাইভার আছে বলে মুখ খুলছে না? হয়তো তাই।
চালশা মোড়ে গাড়ি থেকে নেমে চা খেয়ে একটু ঘোরাঘুরি করে ওরা।
আবার গাড়ি ছেড়ে মিনিট কুড়ি মত চলার পর একটা জমজমাট জনপদে গাড়ি দাঁড় করায় ড্রাইভার ।
সৌমেন্দু বলে ,এটাই মেটেলি।এখানেই শকুন্তলার স্কুল ।
----- ইন্টারভিউ দিয়ে আগে সিলেক্ট হই, তারপর আমার স্কুল হবে ।শকুন্তলা হেসে বলে ।
---তোমার মত ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে সিলেক্টেড হবেই আমার বিশ্বাস ।
----ধন্যবাদ সোমদা।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে ।রাস্তার দু'ধারে দিগন্তবিস্তৃত চা বাগান অপরূপ সবুজ ।দূরে শাল আর পাইনের হাতছানি ।বেশ কিছুক্ষন চলার পর গাড়ি থেমে গেল একটা বড় দুতলা কাঠের বাড়ির সামনে। বাড়ির চারদিকে বিশাল বিশাল শাল সেগুন শিমুল আরো কত মহীরুহ ।নীলাঞ্জনা বলে ,দারুন! এটাতো জঙ্গলবাড়ি সৌমেন্দু দা । এই জায়গাটা কি সামসিং?
--- না ,এই জায়গাটার নাম তিতিরহাট। খুব বেশি লোকজন নেই এই গ্রামে।
এখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে সামসিং।ওই যে দূরে একটা নদী আছে, চলো, একটু ঘুরে আসি ওখান থেকে। ভালো লাগবে।
---তাইচলুন, একবার দেখে আসি নদীটাকে কাছ থেকে । শকুন্তলা সায় দেয় সোমের কথায়।
গাড়ি দাঁড়িয়ে রইল। ওরা নদীর দিকে গেল ।নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সৌমেন্দু বলে, এটাই মূর্তি নদী। এই নদীতে আগে উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত বরোলা মাছ পাওয়া যেত। সেই মাছ ধরার জন্য কয়েক ঘর জেলে বহু বছর আগে বাস করতে শুরু করেছিল এখানে। ইংরেজ আমলে এক সাহেব মূর্তি নদীর কাছাকাছি এই কাঠের বাড়িটা তৈরি করিয়ে বাস করতে শুরুকরেছিলেন। ওই সাহেবের সামসিং এ কয়েকটা কমলালেবুর বাগান আর এলাচের বাগান ছিল ।অনেক মজুর কাজ করত সেখানে ।সাহেব সস্ত্রীক সামসিং এ থাকতেন ।সাহেবের স্ত্রী গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা এইএলাকা।একদিন জেলেদের বস্তিতে গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন টাটকা বরোলা মাছ কিনবেন বলে। ঘুরতে ঘুরতে মূর্তি নদীর তীরে বৃক্ষ ছায়াবৃত এই নির্জন জায়গায় এলেন ।জায়গাটা খুব ভালো লেগে গেল তার। মেম সাহেবের অনুরোধে সাহেব এখানে ঐ কাঠের বাড়িটা তৈরি করেন আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে। সাহেব নিঃসন্তান ছিলেন ।সাহেবের খুব শখ ছিল শিকার করা ।শিকার করতে গিয়ে একদিন বন্য বরাহের পালের মধ্যে পড়ে অকালে প্রাণ হারান তিনি। মেম সাহেব এই বাড়ী, কমলা বাগান সব বিক্রি করে দিয়ে দেশে ফিরে যান ।
---ও, তখন বুঝি এই বাড়ি কিনে নিন আপনারা? জিজ্ঞাসা করে নিলা।
--- হ্যাঁ, আমার বৃদ্ধ প্রপিতামহ
চন্ডীদাস চক্রবর্তী ছিলেন ওই সাহেবের কমলালেবু ও এলাচ বাগানের ম্যানেজার। চন্ডীদাস ছিলেন সৎ কর্মনিষ্ঠ নির্লোভ মানুষ ।এ সাহেব ও মেম সাহেব কে ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে বহু পরামর্শ দিয়ে অনেক ভুল ধরিয়ে দিয়ে অনেক বার অনেক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন চন্ডীদাস চক্রবর্তী ।তাই সাহেব ও মোসাহেব খুব বিশ্বাস করতেন চন্ডীদাস চক্রবর্তীকে। সাহেবের মৃত্যুর পর মেমসাহেব দেশে ফিরে যাবেন বলে স্থির করেন। বাড়িঘর বাগান সব বিক্রি করে দিতে চাইলেন ।কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ক্রেতা জোগাড় করা গেল না ।শেষ পর্যন্ত তিনি চন্ডীদাস চক্রবর্তীকে সম্পত্তি প্রায় জলের দামে বিক্রি করে দিয়ে গেলেন ।চন্ডীদাস সম্পত্তির দাম এর সব টাকা একবারে দিতে পারেননি। মেম সাহেব দেশে ফিরে যাবার পর মাস মাসে টাকা পাঠিয়ে প্রায় তিন বছর সময়ে তিনি সমস্ত পাওনা টাকা মিটিয়ে দেন ।পরে চন্ডীদাস চক্রবর্তী আরো কমলা বাগান চা বাগান ইত্যাদি কেনেন।
---মেম সাহেব আপনার বৃদ্ধ প্রপিতামহ কে খুব বিশ্বাস করতেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। নীলা বলে।
--- তুমি একদম ঠিক কথা বলেছো বৌদি ।সোমা সায় দেয় নীলার কথায়।
কথা বলতে বলতে ওরা ফিরে আসে সেই কাঠের বাড়ির কাছে। বাড়ি থেকে একটু দূরে সাধারন পোষাক পড়া দুজন লোক সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছের নিচে। ওদের দেখে দ্রুত পায়ে ওদের দিকে এগিয়ে যায় সৌমেন্দু ।ইন্দ্র লক্ষ্য করে, লোক দুটো হাত-পা নেড়ে খুব উত্তেজিত ভাবে কি যেন বলছে সোম কে ।সৌমেন্দুর চোখেমুখেও উত্তেজনা। সৌমেন্দূর শেষ কথাটা শুনতে পায় ইন্দ্র ।
সৌমেন্দু লোকগুলোকে বলে, আমার বাড়িতে গেস্ট এসেছে ।তোমরা এগোও, আমি একটু পরে যাব। আর হ্যা, দেখো কেউ যেন ওটাকে নষ্ট করতে না পারে কোনোভাবেই।
--- না রেঞ্জার সাহেব, আমরা দেখব।
লোকদুটো সাইকেল নিয়ে চলে যায় ।সৌমেন্দু ফিরে এসে ইন্দ্রকে বলে, সরি তোদের একটু দেরী করে দিলাম বন্ধু ।
---ইটস ওকে!
সবাইকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে যায় সৌমেন্দু। সৌমেন্দুর মা দোতালায় ছিলেন ।
হাসিমুখে নিচে নেমে এসে বলেন ,সোমা, ওদের ঘরে বসতে দে। আমি ওদের জন্যে চা জলখাবার নিয়ে এক্ষুনি আসছি।
ইন্দ্র এগিয়ে এসে সৌমেন্দুর মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে, কাকিমা, আমি ইন্দ্র, সোমের বন্ধু ।আমাদের জন্য একদম ব্যস্ত হবে না !কাকাবাবু কোথায়? উনি কি বাইরে কোথাও গেছেন?
ইন্দ্রের মাথায় হাত দিয়ে সোমের মা বলেন, সুখে থাকো বাবা ,ভালো থাকো। তোমার কাকাবাবু সামসিং গেছেন ।একটু পরেই চলে আসবেন। সোম বলে, আমি একটু বাইরে যাব মা।
--- কোথায় যাবি ?
----এই কাছেই একটা গ্রামে যাব। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরে আসবো।
---- কেন, আবার কি কোনো সমস্যা হয়েছে?
--- হ্যাঁ। সমস্যা তো লেগেই আছে মা আমাদের চাকরিতে।
---- জলখাবার খেয়ে বেরোস বাবা ।
---রাস্তায় খেয়ে এসেছি মা। এখনো কিছু খেতে পারব না।
ইন্দ্র বলে, সোম, আমি কি যেতে পারি তোর সঙ্গে?
-----যাবি !তুই এইতো এলি এতটা জার্নি করে !------আমার কিচ্ছু হবে না ।তোর প্রবলেম টা শুনি নি এখনো, তাই খুব টেনশনে আছি।
একটুক্ষণ কি যেন চিন্তা করে সোম।তারপর বলে, বেশ চল। তুই জলখাবার খেয়ে নে তারপর বেরোবো দুজনে।
--- নারে, আমার পেট ভর্তি। শিলিগুড়িতে যা খাওয়ালি ! এখন কিছু খেতে পারব না কাকিমা। আমি যাচ্ছি সোমের সঙ্গে।
----সাবধানে যেও বাবা।
--- কোন চিন্তা করবেন না কাকিমা, আমিতো সোমের র সঙ্গে আছি।
বোলেরোটা নয়, একটা পুরনো মিলিটারি শক্তিমান জিপ নিয়ে বেরোলো সোম ।ড্রাইভার সোম নিজে ।ইন্দ্রনীল পাশের সিটে ।সৌমেন্দু বলতে শুরু করে, আমার সমস্যাটা খুবই অদ্ভুত। আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারন মনে হলেও বেশ জটিল ।মেটেলি থেকে সামসিং পর্যন্ত এলাকায় ছোট ছোট অনেকগুলি গ্রাম আছে।রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোক ওরাও মুন্ডা রাভা ইত্যাদি ইত্যাদি উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকের বাস।কিছু নেপালি গোর্খা ইত্যাদি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক বাস করে ওই গ্রামগুলোতে। কিছু দরিদ্র বর্ণহিন্দু ও আছে ওই গ্রামগুলিতে ।চাকুরীজীবী মানুষের সংখ্যা খুব কম। ওদের অধিকাংশের জীবিকা নিজেদের সামান্য জমিতে অল্পস্বল্প কৃষি কাজ করা আর সুযোগ সুবিধা মত চা বাগিচা কমলালেবুর বাগানে মজুর খাটা।ত ছোটখাটো ব্যবসা করে কেউ কেউ। তবে এদের প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতেই কিছু ছাগল ভেড়া ইত্যাদি গবাদি পশু এবং প্রচুর মুরগি আছে ।আরে মুরগিগুলো উন্নত প্রজাতির মুরগি ।প্রায় সারা বছর ধরে ডিম পাড়ে। বিভিন্ন সময়ে সরকারি স্কিমে ব্লক বা পঞ্চায়েত থেকে মুরগির বাচ্চা বিলি করা হয়েছিল গ্রামবাসীদের মধ্যে ।উদ্দেশ্য- ডিম মুরগি ইত্যাদি বিক্রি করে ডিম ওদের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন। আমিও গ্রামে দেখেছি ওই মুরগি মুরগি গুলো কে ।বেশ হৃষ্টপুষ্ট। প্রচুর ডিম পাড়ে বলে শুনেছি।
--- সমস্যাটা কি?
--- মাস সাতেক আগে থেকে এক অদ্ভুত উপদ্রব শুরু হয়েছে ওই গ্রামগুলোতে ।রাত্রে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ওদের মুরগির ঘরের দরজা ভেঙে মুরগি বা গোয়াল ঘর থেকে ছাগলের বাচ্চা এসব চুরি হয়ে যাচ্ছে। সকালবেলায় গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে মাঠের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় বা জঙ্গলে মুরগি বাচ্চা ছাগল শিশুর অর্ধভুক্ত দেহাবশেষ পাওয়া যাচ্ছে টুকরো-টুকরো অবস্থায়। সব থেকে মজার ব্যাপার হলো এই যে, যখন কোন গ্রামের গ্রামবাসীরা সবাই মিলে তাদের গ্রামে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করে সেইদিন ওই গ্রামে চুরি না হয়ে চুরি হয় একটু দূরবর্তী গ্রামে ।চুরি কিন্তু প্রত্যেক দিনই হয় এলাকার কোন না কোন গ্রামে।
----- খুবই চালাক বলতে হবে অজানা ওই ই জন্তু।
--- হ্যাঁ ,তাই মনে হয়। কারণ, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে লোক লাগিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও নিকটবর্তী জঙ্গলে এমন কোন জন্তুর হদিস পাওয়া যায়নি ।তবে কোন কোনো গ্রামবাসী মহিলা গভীর রাতে প্রাকৃতিক কৃত্য সম্পন্ন করতে বাড়ির বাইরে এসে এক অদ্ভুত জন্তু কে দেখতে পেয়েছে ।
---কিরকম জন্তুটা ?
-- ঠিক কেমন তা ওরা বলতে পারেনি।তবে যারা যারা ওই জন্তুটাকেদেখেছে ,তাদের বর্ণনা শুনে মনে হয়েছে যে ,ওটা একটা কালো নেকড়ে । কালো নেকড়ে !নেকড়ে তো কালো হয় বলে শুনিনি কখনো ।ডুয়ার্সে কি কালো নেকড়ে আছে নাকি ? অন্তত আমার জানা নেই তবে আমার মনে হয় ওই মহিলারা ওই মহিলারা ভাল্লুক বা ওই জাতীয় কোন জন্তু দেখেছে ।
---ভালুক কিভাবে ছাগল বা মুরগি রাখার ঘরের দরজা ভেঙে মুরগি বা ছাগলের বাচ্চা ধরে খাবে? ওরা তো ছাগল মুরগি খায় বলে শুনিনি কখনো ।
---ওই হিসাবটাই মেলাতে পারছি না ।কিন্তু অজানা রহস্য সমাধান না করতে পারায় ওই এলাকায় গ্রামের গ্রামবাসীরা প্রচন্ড আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ।ব্যাপারটা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে জেলা প্রশাসন এবং সেখান থেকে কলকাতায় উপরমহল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সমস্যার সমাধান করার ভার করেছে আমার উপরে। কিন্তু আমি এই কালো নেকড়ে রহস্যের সমাধান আজও করতে পারিনি ।
---দেখ সোম,যদিও এই বিপুলা পৃথিবীর জীবজগতের অপার রহস্যের সবটুকু আজও জানি না আমরা তবু কালো নেকড়ের কথা গল্প-উপন্যাসে পড়েছি, বাস্তবে কখনো ,....
----মানে?
--- বিখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মহাশয় প্রায় বছর কুড়ি বাইশ আগে একটা নামকরা সাহিত্য পত্রিকার পূজা সংখ্যায় রহস্য উপন্যাস লিখেছিলেন ।আমার যতদূর মনে পড়ে সেখানে একটি কালো নেকড়ের কথা ছিল ।কিন্তু পরে প্রমাণিত হয়েছিল যে, সেটি ছিল আসলে একটি হিংস্র কালো কুকুর। এখানে আবার সেরকম কোন গল্প নেই তো ?
--কুকুরের পক্ষে কি গোয়াল ঘরের দরজা ভেঙে, তালা ভেঙে ভেড়ার বাচ্চা ছাগলের বাচ্চা মুরগি ধরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব?
----- না অসম্ভব ।ভেবে দেখ, সেটা কি নেকড়ের পক্ষেও সম্ভব? আর কোন তথ্য আছে?
---- বছর দুয়েক আগে এরকম একবার নেকড়ে সমস্যায় পড়েছিলাম ।
----কিরকম? বছর দুয়েক আগে মূর্তি নদীর পাড়ে জঙ্গলে মাত্র পনের দিনের ব্যবধানে পাওয়া গেছিল পরপর দুটো নেকড়ের মৃতদেহ ।-----কোন চোরাশিকারির কাজ নয় তো?
হতেই পারে ।তবে ওই মৃত নেকড়ে দুটোর মাথা ছিল না।
--- স্ট্রেঞ্জ!
--- হ্যাঁ, কিন্তু শরীরের বাকি অংশ অবিকৃত ছিল ।কোথাও কোনো আঘাত বা গুলির দাগ ছিল না ।দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন খুব ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথাটা কেটে নিয়েছে।
--- ভারী অদ্ভুত তো !
----এখানেই শেষ নয়। বছর খানেক বাদে আবারো ওই ঘটনা।
---আবার নেকড়ে?
------- না, এবার নেকড়েনয় ,বানর ।
----বানর?
--- এক বিশেষ ধরনের বানর পাওয়া যায় অসমের জঙ্গলে ।সাধারণের চেয়ে আকারে অনেকটা বড় ও লম্বা। দেখে এদের হনুমান বলে ভ্রম হতে পারে। ওই বানরগুলো প্রচন্ড বুদ্ধিমান আর শক্তিশালী ।
---ওদের কি শুধু অসমে পাওয়া যায় ?
---সেটাই জানি ।তবে ভুটানের জঙ্গলে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। প্রায় এক বছর আগে হঠাৎ সামসিং থেকে সান্তালিখোলা যাবার পথে এক কমলালেবুর বাগানে পাওয়া গেল দুটো বানরের দেহ ।ঠিক নেকড়ের মতোই ওদের ও মাথাটা কেটে নেওয়া হয়েছিল ।তবে ওই ঘটনার মাস তিনেকের ব্যবধানে দুবার হয়েছিল। আর দুবার একজোড়া করে বানরের দেহ মিলেছিল ।পুলিশ ও বন দফতরের কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে অনেক চেষ্টা করেও ওই রহস্যের সমাধান সূত্র খুঁজে পায়নি। শেষে ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে যায় ।আর এখন নেকড়ে রহস্যের সমাধান করতে না পারলে কর্তৃপক্ষ হয়তো সুন্দরবনেই বদলি করে দেবে আমাকে।
--- এখন কোথায় যাচ্ছি আমরা ?
---মেটেলির কাছে কাছে গিরিবাস নামে একটা ছোট্ট গ্রাম আছে ,সেখানে যাচ্ছি।
---কেন ?
---একটু আগে আমাদের বাড়িতে সাইকেল নিয়ে যে দুজন লোক এসেছিল, ওদের মধ্যে লাল জামা পরা লোকটা কে লক্ষ্য করেছিলি?
--- হ্যাঁ, দেখেছি।
ও অমর ,অমর বর্মন। ও আমাদের ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। চুক্তিভিত্তিক নিযুক্ত ফরেস্ট গার্ড ।ও যে খবরটা দিলো সেটা শুনেই ছুটে যাচ্ছি
ওই গিরিবাস গ্রামে।
-- কেন, কি খবর দিয়েছে ও ?
---আমরা প্রায় চলে এসেছি গ্রামে ।এখানে নিজের চক্ষু কর্ণের বিবাদ মিটিয়ে সমস্ত প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবি।
গাড়ি একটা গ্রামে ঢুকলো। কিছুটা চলার পরে টিনের চাল ওয়ালা একটা বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অমর বর্মন। সৌমেন্দুর সঙ্গে ইন্দ্রনীল কে দেখে ও বোধয় একটু অবাক হয়ে যায় ।একটু অদ্ভুত চোখে তাকায় । সৌমেন্দু বলে, ও আমার বন্ধু ইন্দ্রনীল সেন ।খুব বড় গোয়েন্দা। ও কলকাতা থেকে আজ ই এসেছে ।তাই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম ।এখন চলো, আমরা যাই সেই বাড়িটাতে ,যেখানে কাল রাতে নেকড়ে আর ওই জীবটা এসেছিল।
-- স্যার ,একটু চা এর ব্যবস্থা করেছি ।দয়া করে যদি একটু বসেন।
--- ওসব পরে হবে অমর। এখন চলো।
--- হ্যাঁ স্যার ।
-----যে জিনিসটা জোগাড় করতে বলেছিলাম, পেয়েছো?
-- হ্যাঁ স্যার ।গাড়ি নিয়ে যাবেন তো স্যার?
--- কদ্দুর ?
---কাছেই স্যার। হেঁটে মিনিট ছয়েক লাগবে ।---------তাহলে চলো হেঁটেই যাই ।ওই জিনিসটা ও সঙ্গে নিয়ে নিও ।
---ঠিক আছে স্যার ।
ঘরের ভেতর থেকে একটা ব্যাগ নিয়ে এসে হাঁটতে শুরু করে অমর। ইন্দ্রনীল ও সৌমেন্দু অনুসরণ করে ওকে ।গ্রামের এক দল ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে চলতে শুরু করে ওদের পিছু পিছু। অমর ওদের খেদিয়ে দিতে চায় ।আপত্তি করে সৌমেন্দু।
ছয় মিনিট নয় ,প্রায় মিনিট আটেক হাঁটার পরে একটা খোলার চাল আধা পাকা ঘরের সামনে এসে দাড়িয়ে অমর বলে ,এই বাড়িতে কাল কালো নেকড়ে আর ইয়েতি ।
চমকে উঠে ইন্দ্র বলে,!ইয়েতি! এখানে?
সৌমেন্দু বলে ,অমর আমাদের নিয়ে চলো ঐ জায়গাটায় ।
--হ্যাঁ স্যার।
ওদের কথাবার্তা মধ্যেই ঘরের ভিতর থেকে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এসে হাতজোড় করে নমস্কার করে বলে, নমস্কার রেঞ্জার সাহেব।
---নমস্কার । কি নাম আপনার?
--আজ্ঞে আমি গোপাল, গোপাল রাভা ।
-----আপনি কি মুরগি পালন করেন? ছাগল ভেড়া ?
---আজ্ঞে হ্যাঁ, উই নিয়েই তো বেঁচে আছি দুই বুড়োবুড়ি। গতকাল রেতে কালো নেকড়ে সব্বনাশ করে দিলে আমার।
কপাল চাপড়ে কাঁদতে শুরু করল বৃদ্ধ।
---আপনি কান্না কাটি করবেন না ,আমি দেখছি কি করা যায় ।অমর,ওনার কোন ছেলে মেয়ে নেই?
--- আগে একটা ছেলে ছিল স্যার !সুনীল। খুব ভালো ছেলে ।গোপাল খুড়ো বিয়েও দিয়েছিল তার ।ছেলেটা সামসি তে গ্যারেজ মালিকের ট্রাক চালাতো। একদিন কালিম্পং থেকে সামসি ফেরার পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ।বাড়িতে ওর বউটা তখন গর্ভবতী ছিল। তা সেও একটা মেয়ের জন্ম দিয়ে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। মাস দুয়েক পরে মারা যায় সেও ।গোপাল খুড়ো আর আর ওর বউ ওই নাতনি টাকে এখন চোখের মণি করে আগলে রেখেছে।
ওদের সংসার চলে ঐ মুরগির ডিম বিক্রি আর ছাগল ভেড়ার বাচ্চা বিক্রি করে।
---হ্যাঁ বাবু আমার সর্বনাশ হয়ে গেল।
অমর জিজ্ঞাসা করে, নেকড়েতে তোমার কটা মুরগি নিয়ে গেছে গো খুড়া?
--নেতো গেছে চার পাঁচটা আর ঘরের মধ্যে মেরে রেখেছে কম করে দশটা ।একটা ছাগলের বাচ্চাও নে গেছে।
---ও বাবা, তাইলে তো তোমার মেলা লোকসান হয়ে গেল গো খুড়া!
-- তবে কি আর করব বাপ, সবই আমার পোড়া অদ্দেষ্ট!
সৌমেন্দু হিপ পকেট থেকে একটা মানিব্যাগ বের করে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করে বৃদ্ধেরদিকে এগিয়ে বলে, গোপালবাবু যদি কিছু মনে না করেন তো এটা রাখুন ।
---না না ছার, আপনি কেন ...?
---দয়া করে টাকাটা নিন। এটা দিয়ে কয়েকটা মুরগি কিনে নেবেন। পরে চেষ্টা করে দেখি, সরকারের তরফ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি কিনা।
সরকারি আধিকারিকের এই মানবিক মুখ দেখে খুব ভালো লাগলো ইন্দ্রের ।বন্ধু গর্বে মনে মনে গর্বিত হল সে।ইন্দ্র ও পকেট থেকে হাজার টাকা বের করে গোপাল রাভার হাতে দিয়ে বলে, এটা দিয়ে একটা ছাগল কিনে নেবেন।
--- না না, আর দরকার নেই বাবু ।
---আপনি টাকাটা নিলে আমার ভালো লাগবে। বৃদ্ধের কথার জবাবে ইন্দ্র বলে। হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিতে দরিদ্র বৃদ্ধের দুচোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে ।হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে সে ।অমর দুই হাতে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলে ,কেঁদোনা গো গোপাল খুড়া, আমাদের মতো গরীবদের জন্য ঈশ্বর ঠিক আছেন ।এখন সারদের বলতো কাল রাতে ঠিক কি হয়েছিল। কী দেখেছিলে তুমি ?
সোম বলে, হ্যাঁ গোপাল বাবু, সবটা খুলে বলুন আমাদের।
একটু সময় চুপ করে থেকে বৃদ্ধ বলতে শুরু করে, কাল তখন অনেক রাত। মুরগিদের চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল আমার। ইদানিং এ এলাকার গাঁ গুলোতে রেতের বেলায় একটা কালো নেকড়ে এসে মুরগি ও ছাগল
ধরে নিয়ে যাচ্ছে, এটা জানতাম বাবু । তাই কাল রাতে হঠাৎ মুরগীগুলোর চিৎকার শুনে গোয়াল ঘরের দিকে ছুটে গেলাম । হাতে একটা লাটি নিলাম। তখন মাঝ আকাশের থিকে চাঁদ টুকুন হেলে পড়েচে পচ্চিমে। গাছ গাছালির ফাঁক দে আলো আসচিল বাবু।সেই দেখলাম, আমার গোয়াল ঘরের দরজাটা খোলা। দরজার সামনে মানুষের মত কে যেন দাঁড়িয়ে আচে দুপায়ে। বেশ লম্বা। মনে মনে ভাবলাম, মানুষ তো এ্যাত্তো
লম্বা হয় না ।এ যে প্রায় হাতপাঁচেক লম্বা ।তাহলে কি ওটা ?নতুন কোন জন্তু ? ভালো করে ঠাওরকরে দেখি বাবু জন্তুটার সারা দেহে বড় বড় লোম। তাহলে কি বড় কোনো ভালুক? কিন্তু এত লম্বা হয় কি করে? হঠাৎ দেখি গোয়াল ঘরের ভেতর থেকে দুটো মুরগি মুখে করে নিয়ে বেরিয়ে আসছে একটা বিশাল কালো নেকড়ে। বাইরে আসতেই ওই জন্তুটা হাতে ধরে নিল মুরগিগুলান। আবারনেকড়েটা ঢুকে গেল ভেতরে। আবার মুখে করে নিয়ে এলো মুরগী টুকুন পরে। ভয়ে আমি নড়তে পারছিলাম না বাবু। হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে চীৎকার বেরিয়েঁ গেল। জন্তুটা ঘুরে আমার দিকে তাকালো। চাঁদের আলোয় দেখলাম, ওর মুখটা মানুষের মতোই।হ শুধু সারা মুখটা হনুর মতো লোমে ভর্তি । নেকড়ে টাও আবার বেরিয়ে এসেছিল মুরগী মুখে নিয়ে। হঠাৎ নেকড়েটার ঘাড়ের কাছে টপ করে একটা লাল আলো জ্বলে উঠলো ।আর বাঁশির মত আওয়াজ এল ভেসে। দেখি নেকড়ে আর ওই দু পে' জন্তুটা দৌড়ে পালাচ্ছে। বাবু আমিও ভয় কাটিয়ে ছুটলাম ওদের পেছু পেছু। গতকাল সাঁজবেলাতে বিষ্টি হয়েছেল। আমার গোয়াল ঘরের পেছনে কাঁচা ডেরেনে হঠাৎ এই জন্তুটার পা পড়ে গেল ।হঠাৎ কেমন ঘাবড়ে গেল জন্তুটা।
কালো নেকড়েটাও থমকে দাড়িয়ে গেল। আমাকে দেখে ওই জন্তুটা লাফিয়ে উঠে জোর ছুট লাগালো । চলে গেল নদীর ওই পারে জঙ্গলের দিকে। তারপর আজ সকালে উঠে দেখি বাবু, ভেজা মাটিতে একটা বিশাল পায়ের ছাপ ।অবেকল মানুষের মতোই মনে হলো ।কিন্তু খুব বড়। আমি এক ছুটে অমরের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এসে দেখালাম ওটা।
----- হ্যাঁ স্যার ওটা দেখে আপনার কাছে গেছিলাম তিতির হাটে ।অমর বলে।
----চল অমর, আমরা ওটা দেখে আসি।
অমর ইন্দ্র ও সোমকে নিয়ে উঠোন পেরিয়ে বাঁ দিকে ঘুরল যেখানে, তার পাশেই একটা ছোট্ট নিচু টালির চালের ঘর।
অমর বলল ,এই ঘরটা গোপাল খুড়ার গোয়াল ।এর ভিতরেই থাকে ওর মুরগি ছাগল আর বকনা বাছুর ।
----সেকি ভিতরে বাছুর ও ছিল ?
---- হ্যাঁ স্যার ,তবে মনে হয় ওদের বড় শিং দেখে নেকড়ে এটা ওদের কিছু করে নাই ।অমর বলে। গোপাল রাভার গোয়ালের পিছনে একটা হাতখানেক চওড়া কাঁচা নালার সামনে এসে ইন্দ্র ও সৌমেন্দু কে দাঁড় করালো অমর।
তারপর একটু দূরে একটা লম্বা পায়ের ছাপের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলল, ওই দেখুন স্যার, ওর পায়ের ছাপ ।পরপর দুটো পায়ের ছাপ ।ইন্দ্রনীল ও সৌমেন্দু খুব ভালোভাবে বিভিন্ন দিকে ঘুরে ফিরে পরীক্ষা করলো পায়ের ছাপ দুটো। সত্যি! এ তো অবিকল মানুষের পায়ের ছাপ। তবে বেশ লম্বা প্রায় 11-- 12 ইঞ্চি হবে। ইন্দ্র অমর কে জিজ্ঞাসা করে ,আপনি এটাকে কেন ইয়েতির পায়ের ছাপ বলছেন?
----- কদিন আগে টিভিতে দেখাচ্ছিল স্যার ইয়েতির পায়ের ছাপ ।হিমালয়ের ওদিকে কোথায় নাকি পাওয়া গেছে। মিলিটারিরা খুঁজে পেয়েছে ।পেপারেও দিয়েছিল স্যার ।
---হ্যাঁ, কিন্তু ওটা প্রমাণিত হয়নি। তাছাড়া অত দূর থেকে এখানে আসবে কি করে? তাছাড়া লোকালয় দিয়ে চলাফেরা করলে কেউ না কেউতো দিনের বেলাতে ওকে দেখতে পেত। -----------যদি রাতে রাতে এসে থাকে স্যার !
ইন্দ্রনীল হাসতে গিয়েও পরিস্থিতির কথা ভেবে নিজেকে সামলে নেয় ।
এরপর সৌমেন্দু অমর কে জিজ্ঞাসা করে, অমর, , ওটা এনেছো?
--- হ্যাঁ স্যার। যাও গোপাল বাবুর ঘর থেকে এক ঘটি জল আরেকটাগামলা জাতীয় কিছু নিয়ে এসো ।
কি করবি সোম? ইন্দ্র কৌতূহলী।
--- ভাবছি প্যারিস অফ প্লাস্টার দিয়ে ঐ পায়ের ছাপ টা তুলে নেব ।গোপাল বাবুর সরকারি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য ওটা খুব জরুরী।
---- বাহ! ভেরি গুড আইডিয়া ।
অমর তার ব্যাগের ভেতর থেকে প্লাস্টার অফ প্যারিস এর প্যাকেট বার করে।
সৌমেন্দু বলে, চল ইন্দ্র, আমরা এদিক ওদিক ঘুরে দেখি কোন ক্লু পাই কিনা।
---হ্যাঁ চল্।
প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে বিশাল পায়ের ছাপের ছাঁচ তৈরি করার পর অমর কে নিয়ে গিরিবাস গ্রামের পাশাপাশি আরো দুই তিনটা গ্রাম ঘুরে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ওই কালো নেকড়ে সম্পর্কে আরও তথ্য যোগাড় করে দুই বন্ধু যখন তিতির হাটে সৌমেন্দু দে বাড়ি ফিরল তখন প্রায় বিকেল ।সৌমেন্দুর বাবা তখন বাড়ি ফিরে এসেছেন ।সৌমেন্দু বেশ লম্বা ।5 ফুট 10 ইঞ্চি ।সৌমেন্দূর বাবা আরো লম্বা। ছয় ফুটের উপরে ।গায়ের রং ফর্সা। সারাদেহে কোথাও একফোঁটা বাড়তি মেদ নেই। প্রথম দর্শনেই ইন্দ্রের মনে হলো উনি এক স্থিতধী পুরুষ। গলার আওয়াজটা ও ভারী চমৎকার। ইন্দ্র ভাবল, একেই কি কম্বুকণ্ঠ বলে ?
দেরী করে বাড়ী ফেরার জন্য সৌমেন্দুর মা যখন বকাবকি করছিলেন ছেলেকে, উনি মৃদু হেসেধীরে ধীরে বললেন, ওকে বকছ কেনো অপর্ণা? ওতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে গিয়েছিল। নিজের ভালো-মন্দ বোঝার মত বয়স হয়েছে ওর। তাছাড়া ও একটা দায়িত্বপূর্ণ সরকারী পদে চাকরি করে ।এই পুরো জঙ্গল এলাকার মানুষদের কোন ক্ষতি হলে তার নৈতিক দায়িত্ব তো ওর। ওকে ওর কাজ করতে বাধা দিও না । সৌমেন্দুর মা অভিমানী কণ্ঠে বলেন, করুক না কাজ যত খুশি, আমি কেন বাধা দেবো? কিন্তু কাজ করতে গেলে শরীরটা ঠিক রাখতে হয় ।আর শরীর ঠিক রাখতে হলে সময় করে খেতে হয় । সেদিকে তো বাবুর কোন হুশ নেই। সেই কখন গেছে আর ফিরল বিকেল করে। সঙ্গে আরেকটা ছেলেকে নিয়ে গেছে। আরে, ছেলেটা তো কাল সারারাত ট্রেন জার্নি করে এসেছে ।ওকে তো একটু ওকে তো একটু বিশ্রাম দেওয়া দরকার নাকি!
সৌমেন্দু এগিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ,লক্ষী মামনি, রাগ কোরোনা ।আমার অন্যায় হয়ে গেছে ইন্দ্র কে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ।আর কখনো করবোনা ।এই কান মলছি ।
কথা শেষ করে সৌমেন্দু সত্যি সত্যি নিজের কানে হাত দেয়। অপর্ণা দেবী ছেলের পিঠে আলতো করে একটা থাপ্পড় মেরে বলে, আর ঢং করতে হবেনা। যা হাত পা ধুয়ে আয় , খেতে দিচ্ছি। এত বেলায় আর ভাত খেতে হবে না। গরম গরম লুচি ভেজে দিচ্ছি।
--- সোনা মা আমার! বলে মাকে দুইহাতে জড়িয়ে ধরে সৌমেন্দু ।ইন্দ্রনীলের চোখ অশ্রুসজল হয়।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে সোম ইন্দ্রকে দোতলার একটা ঘরে নিয়ে আসে। ঘরটা বেশ বড়সড় ।বেশ গোছানো, টিপটপ
সৌমেন্দু বলে, কিরে ইন্দ্র তোর কি মনে হয় ওটা ইয়েতির পায়ের ছাপ? ইন্দ্র জবাব দেবার আগেই ঘরের ভিতরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে নীলা, সোমা আর শকুন্তলা।
সৌমেন্দু বোনকে বলে, ,কিরে বোন, ওদের ঘুমোতে না দিয়ে এখানে নিয়ে এলি কেন? ---আমায় কিছু বলিস না দাদা !গত কয়েক মাস যাবত এই এলাকায় যা যা ঘটছে সেটা শুনে ওরা খুব এক্সাইটেড। তাই তোরা গ্রামে গিয়ে কি দেখলি বা কি কি হলো ওখানে, সেটা তোদের মুখ থেকে শোনার জন্য ওরা খুব উদগ্রীব। ওরাই আমাকে জোর করে ধরে এখাননিয়ে এলো ।
ইন্দ্রের মুখের দিকে তাকায় সোমেন্দু ।
ইন্দ্র বলে ,সমস্তটা বলা যেতে পারে ।তবে শর্ত আছে একটা।
--- কি শর্ত ইন্দ্র দা ?সোমা জিজ্ঞাসা করে।গিরিবাস গ্রামে গিয়ে আমার একটা কথা মনে হলোসোম ।
---কি ?
----ওই জন্তু দুটো অর্থাৎ কালো নেকড়ে আর দু'পেয়ে জীবটা যারা গতরাত্রে গোপাল রাভার বাড়িতে এসেছিল, তারা গোপাল রাভার চিৎকার শোনার পরেই কোন একটা সংকেত পেয়েছিল। সেই সংকেত এসেছিল রিমোটের মাধ্যমে। আর তাই কালো নেকড়ের ঘাড়ের কাছে লাল আলো জ্বলে উঠেছিল। আর গোপাল রাভা শুনতে পেয়েছিল বাঁশির আওয়াজ ।অর্থাৎ, ওই দুটো জন্তু ছাড়াও তৃতীয় কেউ একজন ছিল দৃষ্টির আড়ালে। যদি তাই হয় তাহলে কে সে? পুরো ব্যাপারটা ভেবে কূলকিনারা করতে পারছি না। সোমা বলে, ওসব কথা পরে ভেবো।এখন আমাদের বল গিরিবাস গ্রামে কি কি দেখেছ তোমরা?
--- বলছি ।তার আগে একটা শর্ত আছে বলেছি। ---হ্যাঁ, শর্তটা বল ।
----দেখো সোমা, এই সমস্যাটা মেটেলি থেকে সামসিং পর্যন্ত যেসব গ্রাম আছে সেখানেই ছড়িয়ে আছে এখনো পর্যন্ত। ওই গ্রামের গরিব গ্রামবাসীরা মুরগি পুষে, ছাগল ভেড়া পালন করে সংসার চালায় কাজেই এই সমস্যাটার সমাধান করতে না পারলে ওদের প্রচুর লোকসান হবে ।অর্থনৈতিক সংকট হবে। এইসব ভেবে আর কালো নেকড়ের ভয়ে ওরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ।কাজেই ওদের মনে ভয় দূর করতে হলে ওই গ্রামগুলোতে ঘুরে ঘুরে ওদের মনে সাহস যোগাতে হবে। পাশাপাশি গ্রামের লোকেদের অরগানাইজ করে নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে ।তাতে সমস্যার সমাধান পুরোপুরি না হলেও সাময়িকভাবে কিছুটা আটকানো যেতে পারে ।কারণ, ওই জন্তুগুলো চোখের সামনে আসুক এটা কেউ একজন চায়না ।আমি তার মধ্যেই যথাসাধ্য চেষ্টা করব এই রহস্য সমাধান করার।
একটানা কথাগুলো বলে চুপ করে ইন্দ্র ।
সোমা বলে, সবই তো ঠিক আছে ইন্দ্র দা। কিন্তু আসল কথাটা কি , মানে ওই শর্তটা?
----দেখো যে কাজটার কথা বললাম ওটা আমি এবংসোম দুজন মিলে করতে পারবো না। তাই আমি তোমাদের সাহায্য চাই ।সোডম যদি অ্যারেঞ্জ করতে পারে ,তাহলে ওদের ডিপার্টমেন্টের কর্মীদের নিয়ে তোমরা তিনজন টিম তৈরি করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে যে কাজটা বললাম, সেটা করার ব্যবস্থা করো ।
----রাজি রাজি, আমি রাজি !সোমা চিৎকার করে ওঠে। তার সঙ্গে গলা মেলায় নীলা ও শকুন্তলা। শকুন্তলা বলে ,এ তো পাঁচজন মিলে পান্ডব গোয়েন্দা হয়ে গেলো। সো
সোমা বলল, মোটেই না। প্রথমত ,পান্ডব গোয়েন্দার দলে তিনটা মেয়ে থাকে না ।দ্বিতীয়তঃ, ওদের পঞ্চু আছে, আমাদের নেই ।বাদ দে ওসব। সোমদা,ওই গিরিবাস গ্রামে ঠিক কী দেখলে বল? এনিথিং নিউ? শকুন্তলা বলে।
-- হ্যাঁ তা বলতে পারো ।ইন্দ্র, তুই বলবি না আমি ?তুই বলনাসোম।
গিরিবাস গ্রামে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সোম তা সবিস্তারে বলে। রুদ্ধশ্বাসে শোনে সবাই। সব টা শোনার পরে সোমা বলে, এটা নিশ্চয়ই কোন দুষ্টু লোকের কাজ। ইয়েতি বলে কিছু নেই। তুমি কি বলো ইন্দ্রদা ?
---দেখো এই ব্যাপারটায় আমার মনে সংশয় আছে বহু।
--- মানে? সংশয় কেন ?
----দেখো ইয়েতি বা স্নোম্যান সম্পর্কে হিমালয়ের স্থানীয় মানুষদেরমধ্যে নানা কথা-বার্তা চালু আছে ।হিমালয়ের তুষারাবৃত এলাকায় পর্বত অভিযানে গিয়ে কেউ কেউ নাকি বিশাল পদচিহ্ন দেখেছে বলে দাবি করেছছ।
শুধু এই প্রাণীটার খোঁজেই বহুবার হিমালয় অভিযান হয়েছে ।বেশকিছু স্বনামধন্য পর্বতারোহী ওই প্রাণীর অস্তিত্ব খোঁজার জন্য বহুবার হিমালয় অভিযান করেছেন। 1954 সালে একটি নামী ইংরেজি খবরের কাগজের স্পনসর্শিপ এ জ্যাকসন সাহেবের নেতৃত্বে ওই প্রাণীর সন্ধানে হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয় ।1960 সালে হিলারি ইয়েতির সন্ধানে অভিযান চালিয়েছিলেন ।এই বিষয়ে অবশ্য পথিকৃৎ লেফটেন্যান্ট কর্নেল চার্লস হাওয়ার্ড বেরি ।1921 সালে তাঁর নেতৃত্বে এক বিশেষ অভিযান হয়। ওই অভিযানে প্রায় 21 হাজার ফুট উঁচুতে লাকপা- লা গিরিবর্ত্মে
দু-পেয়ে মানুষের বৃহৎ পদচিহ্ন দেখতে পান। ওনার সঙ্গী শেরপারা অবশ্য জানিয়েছিল যে, ওটা নাকি ইয়েতির পায়ের ছাপ।
--- তাহলে কি সত্যিই কী ইয়েতি বলে কিছু আছে? সোমা দ্বিধাগ্রস্ত।
---- থাকতেই পারে। তবে এতদিন পর্যন্ত তার পদচিহ্ন দেখা গেছে হিমালয়ের তুষার এলাকায়। কিন্তু এখানে মানে এই সামসিং এলাকায় তার আগমন টা ঠিক মেনে নিতে পারছি না। ইন্দ্র বলে। শকুন্তলা বলে ,ইন্দ্র বাবু আমি একটা কথা ভাবছিলাম।
---- কি?
---- ভুটানের জঙ্গল থেকে যদি কোনো প্রাগৈতিহাসিক জীব নেমে এখানে আসে- সেটা কি অসম্ভব?
ইন্দ্র বলে, প্রথম কথা এরকম কোন জীবের কথা ভুটান এলাকায় আছে বলে কখনো শোনা যায়নি। যদিও ইদানিং পৃথিবীর কোন কোন দেশের কিছু বিজ্ঞানী জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্যে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া জীবদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। --
--কিভাবে? সোমা জিজ্ঞাসা করে।
---ওই যে বললাম না জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্যে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং হল একটা কোষ থেকে থেকে নির্দিষ্ট জিন নিয়ে অন্য কোষে ঢুকিয়ে দিয়ে উন্নত কোষ তৈরি করা। জিনের মধ্যেই তো লুকিয়ে থাকে সেই জীবের স্বভাব, পছন্দ ,আচার-আচরণ ইত্যাদি ।আর এভাবেই পরীক্ষাগারে উন্নত প্রজাতির প্রাণী বা উদ্ভিদ তৈরি করা যায়।
--- তার মানে আবার কি ফিরে আসতে পারে ট্রায়াসিক বা জুরাসিকযুগের প্রাণীরা ?আবারো কি...... নীলা আতঙ্কিত।
----- অত ভয় পাবার কিছু কিছু নেই। কারণ, ওই ভাবে হারিয়ে যাওয়া জীবকে ফিরিয়ে আনতে গেলে প্রয়োজন হয় সেই জীবটির রক্ত বা শরীরের বিশেষ কোনো অংশ, যেখানে ওই জীব টির জিনগত বৈশিষ্ট্যের হদিশ মিলবে ।আর সেটা ভীষণ কঠিন।
---------- আর যদি কোন বিজ্ঞানী ওই পদ্ধতিতে কিছু করে ওই দু-পেয়ে জন্তুর তৈরি করে থাকেন তো?
--- এটা সম্ভব কিনা সেটা আলোচনা করার জন্য একজনের খুব প্রয়োজন।কিন্তু আমি জানিনা এই মুহূর্তে তিনি কোথায় আছেন।
----- কার কথা বলছিস ইন্দ্র ?সোম জিজ্ঞাসা করে।
---- শকুন্তলার দাদা বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানীরা তিমির রায়ের কথা বলছি।
---- ঠিক বুঝলাম না ।শকুন্তলা, আপনি বলবেন না আমি?
--- আপনি তো সবটাই জানেন। আপনি বলুন না, প্লিজ। আমার বলতে খুব কষ্ট হবে।
--- বেশ, আমি বলছি।
নীলাঞ্জনা খুব অবাক হয়। শকুন্তলার দাদার সম্পর্কে ইন্দ্র জানলো কি করে ?'কখন শকুন্তলা ওসব কথা ওকে জানালো? তবে কি কাল সারারাত ট্রেনে ঘুমায় নি?ওরা সারারাত কথা বলেছে? আচ্ছা আচ্ছা ,শোনাই যাক না ইন্দ্র কী বলছে।
শকুন্তলার মুখে শোনা বিনয় তিমির আর অনসূয়ার পুরো কাহিনী টা বলে ইন্দ্র ।এমনকি এখানে শকুন্তলার এখানে চাকরি করতে আসার আসল কারণটা বলে।
শকুন্তলা বলে, আমার বিশ্বাস ওই ডাক্তার বিনয় বিশ্বাসকে খুঁজে পেলেই আমার দাদার খোঁজ পাব।
সোমা বলে, দাঁড়া দাঁড়া ,আমাদের এখানে একজন ডাক্তার বিনয় বিশ্বাস আছে ।উনি একটু খুঁড়িয়ে হাঁটেন।
--- কি বললি? উত্তেজিত শকুন্তলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
---- কুল কুল কুল! প্লিজ বসুন, প্লিজ ।এই ডাক্তার বিনয় বিশ্বাস যে আপনার দাদার বন্ধু সেই বিনয় বিশ্বাস সেটা আগে প্রমাণিত হোক। আপনি আপনার দাদার বন্ধু বিনয় বিশ্বাসের ছবি দেখেছেন শকুন্তলা?
--- না ।
---তাহলে সোমা যে ডাক্তার বিনয় বিশ্বাসের কথা বলল তার একটা ফটো চাই ।
---কি হবে ?
----ওটা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেবো আপনার বৌদির কাছে। উনি আইডেন্টিফাই করতে পারলেই যদি বোঝা যায় যে, এই ডাক্তার বিনয় বিশ্বাস সেই ত্রিমূর্তির বিনয় বিশ্বাস, তাহলেই আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব ।
----কিন্তু এই বিনয় বিশ্বাসের ছবি কি করে পাব ইন্দ্র ?সৌমেন্দু জিজ্ঞাসা করে।
--- কেন দাদা? ওনার চেম্বারে গেলেই ওনার ফটো পেয়ে যাব ।উত্তর দেয় সোমা।
ইন্দ্র বলে, না, সেটা সম্ভব নয়। আচ্ছা সোম, ওই ডাক্তারবাবু কি বাইরে কলে যান?
--- হ্যাঁ তা তো যান ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট রমেনের মোটর বাইকের পিছনে বসে।
--- কেন?
---- পায়ের অসুবিধার জন্য উনি মোটরবাইক চালাতে পারেন না ।
---বেশ তাহলে আগামীকাল আমি অসুস্থ হব ।তুই ডাক্তারবাবুকে কল দিবি সোম ।শকুন্তলা আপনি আড়াল থেকে ডাক্তার বিশ্বাসের একটা ফটো তুলতে পারবেন তো ?
---পারবো ।পারতেই হবে আমাকে ।শকুন্তলা আত্মবিশ্বাসী ।
-----সবই ঠিক আছে ইন্দ্র কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে, আমরা আমরা বোধহয় ঠিক পথে এগোচ্ছে না ।সোমার কন্ঠে সংশয়।
---এরকম মনে হওয়ার কারণ কি ?
----দেখ ইন্দ্র, তুইতো ডাক্তার বিশ্বাস কে চিনিস না ।আলাপ পরিচয় হলে বুঝতে পারবি যে, উনি একজন নিপাট ভদ্রলোক ।তাছাড়া ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত জীবন খুবই সমস্যাবহুল।
--- কিরকম ?
মাস সাত আট আগে ওনার একমাত্র ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায়। আর সেই শোকে ওনার স্ত্রী পাগল হয়ে যান ।ভদ্রমহিলা শিলিগুড়ির কাছে কোন একটা মেন্টাল হসপিটালে চিকিৎসাধীন আছেন এখন।
ডাক্তারবাবু থাকেন কোথায়?
--- মেটেলিতে। ওনার বাড়ীটা যেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ ।সোমা বলে।
-- মানে?
--- চারিদিকে বিশাল উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বেশ বড় বাগান বাড়ি। বাড়ির দরজার সামনে সিকিউরিটি গার্ড। সে ভালো করে যাচাই না করে কাউকে ভিতরে ঢুকতে দেয় না।
--- তাহলে ওনার পেশেন্টরা ওনাকে দেখায় কি করে?
--- না, এটা ওনার বসতবাটির কথা বললাম ।ওনার চেম্বার মেটেলি বাজারে। সেখানে উনি নিয়ম করে প্রতিদিন সকাল ন'টায় বসেন বেলা বারোটা সাড়ে বারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরে যান।আবার বিকেল পাঁচটা নাগাদ বসেন রাত আট টা পর্যন্ত থাকেন ।
---তুমি এতসব কি করে জানলে সোমা? ইন্দ্র জিজ্ঞাসা করে।
--- আমাদের স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওনার বাড়িতে গেছি ইনভাইট করতে ।তখন দেখেছি, উনার বাড়ির সামনে নেপালি দারোয়ান ।--------------ভদ্রলোক কতদিন আছেন এখানে ?
-----শুনেছি ভদ্রলোক নাকি আগে সিকিম গভমেন্টের চাকরি করতেন। বছর আটেক আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে মেটেলিতে এসে প্র্যাকটিস শুরু করেন। মেটে লিতে একটা পুরনো বাড়ি কিনে সেটা সারাই করে বসবাস করতে শুরু করেন।
--- বুঝলাম ।একটা কথা সোম।
---- কি ?
----লোকাল থানার সঙ্গে তোর সম্পর্ক কি রকম? --ভালোই।
---- গুড গুড! তা না হলে আমাকে আবার লালবাজারে ফোন করে ব্যবস্থা করতে হত।---- ------কেন?
----- এক্ষুনি স্থানীয় পুলিশকে বলে গোপাল রাভার সিকিউরিটির ব্যবস্থা করতে হবে ।
---কেন ?
---আমার ধারণা যেকোনো সময়ে গোপাল রাভার জীবন বিপন্ন হতে পারে ।
----এরকম কেন মনে হচ্ছে তোর ?
-----দেখ গোপাল রাভাই একমাত্র ব্যক্তি যে ওই জন্তুটাকে সামনাসামনি দেখেছে। আর এটা চোখের আড়ালে থাকা তৃতীয় কোন ব্যক্তি দেখেছিল বলেই সে রিমোটের সাহায্যে সংকেত পাঠিয়ে ঐ কালো নেকড়ে আর দু-পেয়ে জন্তু জন্তুটাকে সরিয়ে নিয়েছিল। কাজেই সে সাক্ষী গোপাল রাভাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
---- বেশ, আমি এক্ষুনি থানার সঙ্গে কথা বলছি। -----কুইক সোম, কুইক। প্লিজ !
ইন্দ্রনীল অসুস্থতার অভিনয় করে সৌমেন্দু কে দিয়ে ডাক্তার বিনয় বিশ্বাসকে কল দিয়ে আনিয়ে ও বিশেষ কিছুই সুবিধা করতে পারলো না । বরঞ্চ রহস্যের তল খুঁজে না পেয়ে আরো চিন্তিত হয়ে পড়ল। শকুন্তলা আড়াল থেকে বিনয় বিশ্বাসের ছবি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছিল ওর বৌদিকে ।কিন্তু অনসূয়া দেবী জানিয়ে দিয়েছেন, লোকটার অ্যাপিয়ারেন্স বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি অনেকটা 'ত্রিমূর্তি'র বিনয়ের মতো হলেও এই লোকটা সেই বিনয় নয় ।কারণ এর ফেসটাই তো আলাদা। তবে একটা বিষয় ইন্দ্রনীলের চোখ এড়ায়নি। ইন্দ্রকে দেখতে এসে সৌমেন্দুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে কালো নেকড়ে প্রসঙ্গ আসে। আর তখনই সৌমেন্দু কথায় কথায় গতকাল গিরিবাস গ্রামে গোপাল রাভার বাড়ীতে ইয়েতির হানার গল্প বলে। চোখের ইশারায় সৌমেন্দু কে ওই প্রসঙ্গ না বলার জন্য ইন্দ্র চেষ্টা করেও বিফল হয়। ইন্দ্রের ইশারা বুঝতে না পেরে সৌমেন্দু প্রায় পুরো ঘটনাটাই ডাক্তার বিশ্বাসকে খুলে বলে। আর সেটা শোনার পরেই হঠাৎ ডাক্তার বিশ্বাস কেমন যেন অন্যমনষ্ক হয়ে যান ।আর তারপরেই একটু তাড়াহুড়ো করেই বেরিয়ে যান ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট রমেনের মোটর বাইকের পিছনে বসে।
আরো তিনটে দিন কেটে যায় ।হঠাৎ করেই কালো নেকড়ের উপদ্রব একটু যেন কমে যায় ।এই তিন দিনের মধ্যে একদিন সামসিং এর পাশে ছোট্টো পাহাড়ি গ্রাম সান্তালায় হানা দিয়েছিল কালো নেকড়ে ।এই বিষয়টা নিয়েই ইন্দ্র আলোচনা করছিল সৌমেন্দুর সঙ্গে ।সোমা, নীলা আর শকুন্তলা চুপচাপ শুনছিল ওদের কথা ।ইতিমধ্যে শকুন্তলা মেটেলির স্কুলে ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছে এবং সিলেক্টেড হয়েছে। কিন্তু ও একমাস পরে চাকরিতে জয়েন করবে বলে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ওর মত ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষিকাকে হাতছাড়া করতে চায়না বলে এক মাস জয়েনিং টাইম এলাউ করেছে। আসলে মেটেলির ডাক্তার বিশ্বাসের ফটো দেখে অনসূয়া বৌদি আইডেন্টিফাই না করতে পারায় খুব মুষড়ে পড়েছে শকুন্তলা। ইন্দ্রনীল ও খুব চিন্তিত । মেটেলি থেকে সামসিং পর্যন্ত গ্রামগুলোকে সোমা, নীলা, শকুন্তলা আর সৌমেন্দু দের অফিসের ফরেস্ট গার্ড রা ঘুরে ঘুরে গ্রামের লোকেদের নিয়ে টিম তৈরি করে পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থা করায় আপাতত কালো নেকড়ের উপদ্রব কমেছে।তবে আবার যেকোনো সময় তা বাড়তে পারে বলে ধারণা ইন্দ্রের।
প্রত্যেক বুধবার মেটেলিতে হাট বসে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে হাট ।সেই হাটে শাকসবজি, ফলমূল এর পাশাপাশি বিভিন্ন রকম গৃহপালিত পশু পাখির বাচ্চা, মুরগি ,মুরগির ডিম ইত্যাদিও বিক্রি হয় ঢালাও। কমলা লেবু, আদা আর আনারস এর পাইকারি বাজার বসে। দূরদূরান্ত থেকে ট্রাক নিয়ে ব্যাপারীরা আসে আদা, কমলালেবু, আনারস ইত্যাদি কিনতে । এছাড়া ওই হাটে শাড়ি, বাচ্চাদের জামা -প্যান্ট, মশারি, গৃহস্থালির বিভিন্ন রকম টুকিটাকি জিনিস বিক্রি হয়। ওই হাটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস হল, স্থানীয় আদিবাসীদের তৈরি হাতের কাজ এবং বিভিন্ন শিল্পকর্ম,যা হাটকে বর্ণময় করে তোলে। যে সমস্ত স্থানীয় মেয়েরা ওইসব কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সরকারের তরফ থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ব্লক অফিসে ।
সৌমেন্দুর বাড়ির কাজের লোক ভীম, ভীম মুন্ডা। ।ওর বাবা-মা কাজ করতো সামসিং এ সৌমেন্দুদের কমলা বাগানে।ভীম এর বয়স যখন বছর আটেক তখন এক রাতে সাপের কামড়ে মারা যায় ওর বাবা ও মা। মা বাবাকে একসঙ্গে হারিয়ে খুব অসহায় হয়ে পড়েছিল ছেলেটা ।ওদের গ্রামের মোড়লের অনুরোধে সোমের বাবা মহেশ্বর চক্রবর্তী ছেলে টাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে তোলেন ।সোম ও সোমা তখন ভীম এর চেয়ে ও ছোট ছিল। ওরা খেলার সাথী হিসেবে পেয়ে গেল ভীমকে। সেই থেকে ভীম রয়ে গেছে এ বাড়িতে। মহেশ্বর বাবু ওকে লেখাপড়া শেখানোর অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি। ঘরের কাজে হাত লাগাতে শুরু করে ও। ধীরে ধীরে অপর্ণা দেবীর অপরিহার্য সহকারি হয়ে উঠেছে ভীম। সকালে মেটেলির হাটে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো ভীম। হঠাৎ নীলা বলে, সোমা, চল না আমরা একটু হাট থেকে ঘুরে আসি। এক কথায় রাজি হয়ে গেল সোমা। শকুন্তলাকে ও রাজী করায় ওদের সঙ্গী হতে। অগত্যা ড্রাইভারকে খবর দিয়ে গাড়ি বের করা হয় ।ওরা চলে যায় হাটে । মহেশ্বর বাবু ভোরবেলাতেই সামসিং এ কমলা লেবুর বাগানে গেছেন ।সৌমেন্দু মোটর বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেছে অফিসের কাজে। অপর্ণা দেবী ব্যস্ত রান্নাঘরে। সঙ্গে আছে তার হেলপার, কাজের মেয়ে কুর্চি।
এখনো পর্যন্ত নেকড়ে রহস্যভেদের তেমন কোনো সূত্র খুঁজে না পেয়ে ইন্দ্রনীল খুব চিন্তিত ।অন্যমনস্কভাবে দোতলার ঘরগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে ইন্দ্র এসে দাঁড়ায় বারান্দার শেষ প্রান্তে সৌমেন্দুর বাবা মহেশ্বর বাবুর ঘরের সামনে। ঘরে ঢুকে যায় ইন্দ্র ।বিস্মিত হয়। ও বাবা! এ যে এক বিশাল লাইব্রেরী। ঘরের চারদিকে স্টিলের বড় বড় তাক আর অনেকগুলো আলমারি ।সেখানে সাজানো অসংখ্য বই ।বঙ্কিম রচনাবলী ,রবীন্দ্র রচনাবলী, নজরুল -মানিক -বিভূতিভূষণ- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইয়ের পাশাপাশি নাটকের বই, ছোটদের বইআছে ।ঘুরতে ঘুরতে একটা অপেক্ষাকৃত ছোট আলমারির কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায় ইন্দ্র ।এ আলমারিটা কাঠের পাল্লায় কাঁচ লাগানো ।কিন্তু একি !পুরো আলমারিটা মেডিকেল বুকস এ ভর্তি ।সৌমেন্দুর মুখে ইন্দ্র আগেই শুনেছিল যে, ,মহেশ্বর বাবু তাঁর কমলালেবুর বাগানে, এলাচের বাগানে কর্তব্যরত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন ।বিনি পয়সায় ওষুধ বিতরণ করেন ।তাই আলমারিতে একাধিক মেটেরিয়া মেডিকার বই দেখে অবাক হয়না ইন্দ্র । কিন্তু বাংলায় এ্যানাটমী ,ফিজিওলজি, প্যাথলজি, প্র্যাকটিস অব মেডিসিন এসব গুলো দেখে একটু বিস্মিত হয় সে ।তারমানে সোমের বাবা শুধু শখের ডাক্তারি করেন না, রীতিমত পড়াশোনা করেন ।নিতান্ত কৌতুহলের বশে এ্যানাটমী ও ফিজিওলজি বই দুটো টেনে নেয় ইন্দ্র ।ওরা হাট থেকে না ফেরা পর্যন্ত বসে বসে পড়া যাক বই দুটো।
প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ ফিরে আসে ওরা হাট থেকে। এত দেরি করার জন্য ভীমকে বকাবকি করেন অপর্ণা দেবী । ভীম বলে, আমায় বকছো কেন ? ওই দিদিমনিরাই তো হাটে ঘুরে ঘুরে দেরী করিয়েঁ দিলে ।
----দেখছি তোর দিদিমণিদের !
সোমা ঝটিতি জবাব দেয় , আমি কিচ্ছু জানি না মা ।যত দেরি হোলো নীলা বৌদির জন্য।
জিনিস কেনা আর শেষ হয় না! পারলে পুরো হাটটাই বুঝি কিনে আনত।
---- ঠিক আছে ঠিক আছে, এখন হাত মুখ ধুয়ে খেতে বস তো সবাই ।
----দাদা এলেই একসঙ্গে খাব মা ।
কথা শেষ করতে না করতেই মোটর বাইকের আওয়াজ আসে।
শকুন্তলা বলে, ওই বোধহয়এলো সোমদা।
সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। আজকের হাটের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করছে নীলা আর সোমা। মাঝে মাঝে মন্তব্য করছে সৌমেন্দু। ইন্দ্র চুপচাপ খাচ্ছে। একটু আগে ফিজিওলজি বইয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি চ্যাপ্টারটা পড়ে অনেক প্রশ্ন ঘুরছে ওর মাথায়। অপর্ণা দেবীকে খাবার পরিবেশনের কাজে সাহায্য করছে ভীম ।ভীম বলে ,জানো মা আজ হাটে একটা মজার ব্যাপার হয়েছে ।
----কি হয়েছে ?
-----সুবল জ্যাঠার সঙ্গে দেখা হলো হাটে।
----- কোন সুবল ?
---ওই যে গো মা, আমাদের গাঁয়ের সুবল জ্যাঠা। ওই যে গো বিনয় ডাক্তারের বাড়িতে যে কাজ করে।
---বুঝেছি ।তা কী করেছে সুবল? এটা আবার মজার কী হলো?
------ আহা শোনো না মা !সুবল জেঠা একটা লোককে নিয়ে বাজারেএসেছিল ।লোকটা একটা মস্ত বড় বস্তায় গুচ্ছের সবজি, ফল ভরে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছিল। সুবল জ্যাঠা একটা সাইকেলের রোডে গোটা বিশেক মুরগির ঠ্যাং এ দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে নিজের মনে কী যেন গজর গজর করতে করতে বাড়ি ফিরছিল
আমি তারে শুদোলাম,ও সুবল জেঠা, এত মুরগি সবজি ফলমূল কিনেছ কেনেগো?বাড়িতে কি কোন ভোজ আছে ?
---;ভোজ তো এখন রোজ ই হয় ,নেকড়ে আর বাঁদরের ভোজ !
--- কী বলছো তুমি ?
হঠাৎ করে সুবল জ্যাঠা কেমন যেন থমকে যায় ।তারপর একটু রেগে গিয়ে বলে ,তোর এত খপরে কী দরকার?
বলেই দ্রুত পায়ে হাটতে শুরু করে সুবল জ্যাঠা। আর তার পিছনে বস্তা মাথায় সেই লোকটা ।
আমি একটু চিৎকার করে বলি, ও জেঠা, নেকড়ে আর বানরের গল্প টা কী বলছিলে ,বলে যাও গো!
---- না, আমি কিছু বলিনি রে। তুই ঘর যা এখন !-------সেকি গো! এইতো একটু আগে তুমি বলতে ছিলে নেকড়ে আর বানরের কথা ।
কথাটা শুনে কেমন যেন ভয় পেল সুবল জ্যাঠা।
---- আমি কিছু বলি নাই,আমি কিছু বলি নাই।বলতে বলতে হাট ছেড়ে তাড়াতাড়ি চলে গেল জেটা ।
ভীমের কথা শেষ হতে না হতেই ইন্দ্রনীল জিজ্ঞাসা করে , তুমি ঠিক বলছ তো ভীম ? তোমার সুবল জ্যাঠা ঠিক ওই কথাটাই বলেছিল তো ?
----বিশ্বাস যান বাবু ,আমি এক্কেরে সত্যি কথাই বলছি।
ইন্দ্র হঠাৎ কেমন যেন উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ায়।
সোম বলে, কী হল ইন্দ্র, উঠলি কেন ?
---আমার পেট ভরে গেছে ।আচ্ছা সোম, তোদের এখানে কোন ভালো লাইব্রেরী আছে ?
---ভালো লাইব্রেরি বলতে তো সেই শিলিগুড়ি ।কী বই চাই তোর ,আমি আনিয়ে দেব।
---- আজ শিলিগুড়িতে কতক্ষণ লাইব্রেরী খোলা থাকবে?
---- রাত আটটা পর্যন্ত। ওখানকার অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইব্রেরিয়ান আমার বিশেষ পরিচিত ।
---তুই কি আজকে এখনই আমাকে শিলিগুড়ি লাইব্রেরীতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারবি ?---নিশ্চয়ই পারবো। তবে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। ----তা হোক । তুই শুধু তোর ড্রাইভারকে বল আমাকে শিলিগুড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে।
ঘরের সবাই উদগ্রীব হয়ে ওদের কথাবার্তা শুনছিলো।
অপর্ণা দেবী বলেন, ইন্দ্র, কাল সকালে শিলিগুড়ি গেলে হতো না বাবা?
--- না কাকিমা, আজকেই যেতে হবে । কাল সকালের ফ্লাইট ধরে কলকাতা যাব, শকুন্তলার বৌদির কাছে।
বিস্মিত শকুন্তলা জিজ্ঞাসা করে, আমার বৌদির কাছে?
-- হ্যাঁ, বিশেষ দরকার আছে। আপনি যেতে পারলে ভালো হয় ,না পারলে আমাকে একটা ইন্ট্রো লেটার দিয়ে দেবেন
---আমি যাব ।
---বেশ, তাহলেআপনার ফ্লাইট এর টিকিট কিনে নেব।
সোমাকে নিয়ে নীলা এসেছে ঝালং এ চিন্ময় সেনগুপ্তের কোয়ার্টারে। ভোরবেলা ফ্লাইট ধরতে বেরিয়ে গেছিল ইন্দ্র আর শকুন্তলা। ওদের পৌঁছে দিতে গেছিল সৌমেন্দু ।একটু বেলা হতেই ফিরে এসেছে সে। ইন্দ্রের সঙ্গে বিয়ে হবার পর থেকে নীলা দেখেছে কাজের প্রয়োজনে হঠাৎ হঠাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে ইন্দ্র। কোথায় যাচ্ছে বা কেন যাচ্ছে এটা সে নীলাকে তো নয়ই এমনকি পিসিমাকেও বলে না ।এই ব্যাপারটায় নীলা অভ্যস্ত হয়ে গেছে ।আজও নিশ্চয়ই সেরকম কোনো জরুরি কাজের প্রয়োজন হয়তো কলকাতা গেল। আর এবারে তো শকুন্তলার বৌদির কাছে গেছে। নিশ্চয়ই শকুন্তলার হারিয়ে যাওয়া দাদার সম্পর্কে কোনো কথাবার্তা বলতে গেছে।সেজন্য অবশ্য শকুন্তলাকে সঙ্গে না নিয়ে গিয়ে একটা চিঠি নিয়ে গেলে পারতো। না, ইন্দ্রকে সে মোটেই সন্দেহ করে না। তবে হ্যাঁ, শকুন্তলা মেয়েটা কেমন যেন গায়ে পড়া আর একটু গেছো আছে ।এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মুড অফ করে বসেছিল নীলা।
সৌমেন্দু বাড়িতে ফিরে এসে বলে, একি নীলাঞ্জনা ,ইন্দ্র নেই বলে বলে কি তুমি মুখ গোমড়া করে বসে থাকবে ?
---,মোটেই না ।
---তাহলে কি শরীর খারাপ ?
---না না ,শরীর ঠিক আছে।
-- তাহলে?
-- একটা কাজ করো ,"সোমাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এসো কোথাও থেকে। আমি ড্রাইভার কে বলে দিচ্ছি, ও নিয়ে যাবে তোমাদের বেড়াতে ।যাবার কথা শুনেই নীলাঞ্জনার ঝালং এর কথা মনে পড়ে যায় ।
সে বলে ,সোমদা, ঝালং এখান থেকে কত দূর ?---খুব দূরে নয় ।তোমার সেই মাসিমার কাছে যাবে বুঝি?
-- সোমা যদি যায় তাহলে যাব।
--- সোমা নিশ্চয়ই যাবে, আমি বলে দিচ্ছি ।কিছুক্ষণের মধ্যেই সোমা আর নীলা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঝালং এর দিকে।
নীলাকে দেখেই হইহই করে ওঠেন মৃন্ময়ী দেবী ।নীলাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, এতদিনে মনে পড়ল আমাকে? তোমার তিনি কোথায়? তাকে দেখছি না কেন?
---ও তো জরুরী কাজে আজ সকালের ফ্লাইটে কলকাতা গেছে ।
ঝালং জায়গাটা সত্যি ভারী সুন্দর । ঝোলুং ও জলঢাকা নদীর সঙ্গমে পাহাড়ে ঘেরা ঝালং ছবির মতো সুন্দর ।একটা বৌদ্ধ মঠ আছে এখানে ।অপূর্ব !ঝালং বনবাংলো ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে রংবু নদী। হাজার হাজার পাখির কলকাকলিতে মুখরিত ঝালং। অগুনতি অর্কিড আর রং-বেরংয়ের অজস্র ফুলে ঝালং সত্যি অপরূপা ।ওরা কমলালেবুর জঙ্গলে ঘেরা প্যারেন গ্রাম পেরিয়ে ভারতের শেষ জনপদ বিন্দু দেখতে গেল ।ভুটান থেকে বিন্দু নদী এসে মিশেছে জলঢাকায় ।দুই নদীর সঙ্গম এ বাঁধ দেওয়া হয়েছে ।গড়ে উঠেছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ।চিন্ময় বাবু ওদের ঘুরিয়ে দেখালেন প্রকল্প এলাকা ।জলঢাকা প্রকল্পে তৈরি হয় জলবিদ্যুৎ ।সেই বিদ্যুতের ভাগ পায় ভুটান। কারণ জলঢাকার জলে যে ভাগ রয়েছে তাদের। সারা এলাকা জুড়ে উদাল ,শিমুল, ময়না ,পানি সাজের আরণ্যক পরিবেশে ঘুরে ওরা অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশে সারাটা দিন কাটলেও নীলাঞ্জনা স্বচ্ছন্দ হতে পারছিল না ।আসলে বিয়ের পর থেকে ইন্দ্রকে ছেড়ে কোথাও একা কখনো ঘুরতে যায় নি সে।
বিকেল হয়ে আসতেই গাড়ির ড্রাইভার পবন বারবার তাগাদা দিচ্ছিল ফিরে যাবার জন্য ।কিন্তু মৃন্ময়ী মাসিমর কথা যেন আর ফুরোয় না শেষ অব্দি ঝালংথেকে বের হতে অনেকটা দেরি হয়ে গেল ।বেশ জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল পবন।
সোমা বলে, অত জোরে গাড়ি ছোটাচ্ছে কেন পবন দা?
-- সন্ধ্যার আগে চাপরামারি না পেরোলে প্রবলেম হতে পারে দিদি।
--বেশ, সাবধানে চালাও গাড়ি।
--- হ্যাঁ দিদি ।
পবনের আশঙ্কা ই সত্যি হলো। সন্ধ্যার মুখে চাপরামারি জঙ্গল এলাকায় কিছুটা যেতেই ওরা দেখল, রাস্তা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে এক পাল হাতি। ওরা রাস্তা পার হচ্ছিল । পবন গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে হেড লাইট অফ করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। অন্ধকারে ওদের চোখ সয়ে গেছিল। ওরা দেখছিল ,হাতিগুলো রাস্তা পার হয়ে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকছে দুলকি চালে।
হঠাৎ রাস্তার উল্টো দিক থেকে হেডলাইট জ্বালিয়ে হর্ন বাজাতে বাজাতে আসছিল একটা ছোট লরি।বোধহয় ঝালং এ যাবে।
পবন খুব আস্তে বললো, ওঃ! হর্ন টা এখনো কেন যে বাজাচ্ছে! হেড লাইট টা অফ করছে না কেন? ড্রাইভারটা নতুন মনে হয় এ রাস্তায় । পবনের কথার মধ্যে একটা যেন আশংকা প্রকাশ পাচ্ছিল।হাতির দল দাঁড়িয়ে পড়েছিল ।লরিটা কিন্তু লাইট জ্বালিয়ে রেখেছিল তখনও আর সমানে বাজিয়ে যাচ্ছিল হর্ন টা। হঠাৎ ওই হাতির দলের ভেতর থেকে দুটো বিশাল আকৃতির দাঁতাল হাতি এগিয়ে গেল লরিটার দিকে ।তারপর লরি টাকে মাথা দিয়ে ঠেলে রাস্তার পাশে নিয়ে গিয়ে উল্টে দিলো। লরি টা পড়ে গেল রাস্তার পাশে একটা গর্তে। পবন ফিসফিস করে বলল, সব্বনাশ হয়ে গেল ।
নীলাঞ্জনা আর সোমা আতঙ্কে দম বন্ধ করে মনে মনে ঠাকুরের নামজপ করছিল।
লরিটার একটা লাইট তখনো জ্বলছিল। আর সেই আলোতে ওরা দেখল হাতি দুটো ফিরে আসছে নিজের দলের দিকে। দাঁতাল দুটো চারিদিক কাঁপিয়ে হঠাৎ খুব জোরে চিৎকার করল। যেন যুদ্ধ জয়ের উল্লাস । বাকি হাতিগুলো চিৎকার করে গলা মেলালো। মুহূর্তে সম্মিলিত বৃংহনে কেঁপে উঠল জঙ্গল।
ভয়ার্ত হল বাতাস । যেন কিছুই হয়নি এরকমভাবে দুলে দুলে চলতে চলতে হাতি দুটো নিজের দলে ফিরে এসে যোগ দিল ।একটু পরেই হাতির পুরো দলটা অদৃশ্য হয়ে গেলো জঙ্গলের গভীর অন্ধকারে ।আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে গাড়ি স্টার্ট দিলো পবন ।
সোমা বললো, পবন দা, চলো দেখি গাড়ির ভিতরে যারা ছিল তাদের কী অবস্থা!
নীলাঞ্জনা বলে, কী দরকার ঝামেলার? ঠাকুরের কৃপায় আমরা কোনমতে বেঁচে গেছি।
খুব ভয় করছে আমার !চলো পবনদা,বাড়ী ফিরে যাই।
পবন বলল ,তা হয় না দিদি ! জঙ্গল এলাকায় কোন ড্রাইভার বিপদে পড়লে তাকে ফেলে যেতে পারি না ।
নীলা কিছু বলে না। পবন গাড়িটা স্পটে নিয়ে যায় ।পকেট থেকে টর্চ বের করে আলো ফেলে দেখে লরির ভিতরে দুজন আছে। একজন সম্ভবত অজ্ঞান হয়ে গেছে, অপরজন কাতরাচ্ছে। ওর মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। পবন ওই লোকটাকে বলে, দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে?
লোকটা কাতরাতে কাতরাতে জবাব দেয়, পারব। পবন অনেক চেষ্টা করার পর গাড়ির দরজা টা খুলতে পারল ।লোকটা খুব কষ্ট করে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলো।তারপর পবনের ঘাড়ে ভর দিয়ে কোনমতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে রাস্তার উপরে বসে পড়লো । কিন্তু অন্য লোকটাকে গাড়ির ভিতর থেকে কিভাবে বের করবে সেই কথাটা ভাবছিল পবন।
সোমা গাড়ি থেকে নেমে এসে পবনকে জিজ্ঞাসা করে, পবনদা, গাড়ির ভিতরে আর কেউ ছিলনা? --আছে দিদি আরেকজন। কিন্তু ও বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেছে ।ওকে কিভাবে বের করবো বুঝতে পারছিনা ।
---চলো ,আমি সাহায্য করবো তোমাকে ।
--আপনি পারবেন দিদি?
-- ঠিক পারবো, চলো।
খোলা দরজার ভেতর দিয়ে শরীরের অর্ধেকের বেশি ঢুকে ঢুকিয়ে পবন আস্তে আস্তে টেনে আনলো অজ্ঞান হয়ে যাওয়া লোকটাকে। তারপর সোমার সাহায্যে ওকে গাড়িতে তোলে । রাস্তার উপরে বসে থাকা লোকটাকেও পবন ধরে নিয়ে এসে গাড়িতে বসিয়ে দিলো ।
ওদের হাসপাতালে ভর্তি করে পবন গাড়ি নিয়ে তিতিরহাটে যখন পৌছালো তখন অনেক রাত ।সোমা পুরো ঘটনাটা ফোনে জানিয়েছিল সৌমেন্দু কে । তবুও ওরা না ফেরা পর্যন্ত খুব চিন্তায় ছিল সবাই ।ওরা হাসপাতাল থেকে ফিরলে পবনের মুখে পুরো ঘটনাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেন মহেশ্বর বাবু। খুব খুশি হলেন তিনি ।
পবনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, থ্যাংক ইউ পবন ,খুব ভালো কাজ করেছো তুমি।
সৌমেন্দুর মোবাইল বেজে উঠল ।ফোন করেছে ইন্দ্র, শিয়ালদা থেকে ।আজ রাতের ট্রেন ধরে ও ফিরে আসছে। সৌমেন্দু কে গাড়ি নিয়ে নিউ জলপাইগুড়ি যেতে বললো।
পরদিন ভোরে গাড়ি নিয়ে ইন্দ্রকে আনতে বেরিয়ে গেল সৌমেন্দু ।
দেখা হতেই ইন্দ্র বলে, সোম, গাড়িতে ফুয়েল ভরে নে ।
-- ঠিক আছে। কোথায় যাবি এখন?তোর সঙ্গে শকুন্তলা এলো না কেন ?
--- শকুন্তলা আগামীকাল ফ্লাইটে ওর বৌদিকে নিয়ে আসবে। এখন কালিম্পং যাব।
---ত এখন হঠাৎ কালিম্পংয়ে কেন, বেড়াতে না কোন বিশেষ কাজে ?
---আরে না না ,বেড়াতে নয়, খুব বিশেষ দরকারি কাজের ।কালিম্পং-এ একটা মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি হয়ে আছেন ডাক্তারবিনয় বিশ্বাসের স্ত্রী বনানী বিশ্বাস ।
--ওনার সঙ্গে কী দরকার তোর ?উনিতো খুব অসুস্থ শুনেছি ।
--উনি কোন দিনই অসুস্থ হন নি। ওনার সঙ্গে কথা বলার খুব দরকার।
--মানে ?
--ওনাকে পাগল সাজিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে রাখা হয়েছে ।
--কে দিল খবরটা ?
--- ভীমের সুবল জ্যাঠা। মানে, বিনয় ডাক্তারের রাঁধুনী কাম বাজার সরকার
--- কিভাবে, মানে ওর সঙ্গে যোগাযোগ হলো কিভাবে?
-- পরে বলব। আপাতত 'মিশন কালিম্পং'!
গাড়ি ছুটছে কালিম্পং এর পথে ।
সৌমেন্দু বলে, কিন্তু একটা চিন্তা আমার হচ্ছে বন্ধু। কালিম্পং এর যে হসপিটালে বিনয় বিশ্বাস তার স্ত্রীকে পাগল সাজিয়ে ভর্তি করে রেখেছেন সেখানের কর্তৃপক্ষ বনানী বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে দেবে কেন ?
---সেই ব্যবস্থা আমি করে এসেছি বন্ধু। লাল বাজার থেকে ফোন করে দিয়েছে লোকাল থানা কে। তারাই সাহায্য করবে আমাকে।
বনানী বিশ্বাসের সঙ্গে প্রায় ঘন্টাখানেক কথা বলার পর বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখায় ইন্দ্রকে। সৌমেন্দু জিজ্ঞাসা করে , কী বললেন উনি ?
----চল ,রাস্তায় রাস্তায় যেতে যেতে সব বলবো ।সোম তোদের এখানে লোকাল থানা কোথায় ?-----মেটেলি ,আই মিন মাটিয়ালিতে।
-- বাড়ি ফেরার আগে ওদের সাথে দেখা করতে হবে ।আগামীকাল সাহায্য লাগবে পুলিশের ।আশাকরি আগামীকাল সব রহস্যের অবসান হবে।
-- মানে?
-- আগামীকাল সকালে বনানী বিশ্বাসকে মানসিক হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে পুলিশ নিয়ে আসবে এখানে ।আগামীকাল শকুন্তলা আর ওর বৌদিও আসবেন এখানে ।তারপরেই শুরু হবে 'অপারেশন মন্দাকিনী'।
-- মন্দাকিনী টা আবার কে ?
--বিনয় বিশ্বাসের বাড়ির নাম ।ওর বাড়ির মেইন গেটের ওপরে লেখা আছে। দেখিস নি বুঝি?
--অত দেখিনি।
বাড়িতে ফিরে সারা দুপুরটা রিলাক্স মুডে কাটাল ইন্দ্র ।হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে একটা ফোন পেয়ে উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করতে লাগলো। সোম ইন্দ্র কে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল দেখে তাকে হাত তুলে থামিয়ে দেয় নীলা। ও জানে ,কোন বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা করলে ইন্দ্র এরকম দ্রুত পায়ে পায়চারি করে।
মিনিট পাঁচেক এভাবে পায়চারি করার পর হঠাৎ ই ইন্দ্র সৌমেন্দুর সামনে এসে দাঁড়িয়েবললো, সোম, তোকে মুরগি বিক্রি করার ব্যাপারে যা বলেছিলাম ,সেটা..
--সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন হচ্ছে বন্ধু ।গত চার পাঁচ দিনমেটেলি থেকে সামসিং পর্যন্ত যে গ্রামগুলো আছে ,কোথাও কোন মুরগি বিক্রি হয়নি।
-- আর পাহারা?
-- প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামবাসীরা ফরেস্ট গার্ড এর সঙ্গে মিলে সারারাত গ্রাম পাহারা দেয় ।আর কালো নেকড়ের হামলা হয়নি কোথাও ।
--এক্ষুনি তোর ডিপার্টমেন্ট থেকে কতগুলো গার্ড পাওয়া যেতে পারে?
সৌমেন্দু একটু চিন্তা করে বলল ,জনা চার হবে।
----উইথ আর্মস?
----হ্যাঁ।
-------তাহলে ওদের রেডি হয়ে চলে আসতে বল। আজ রাত্রে বেরোতে হবে ।
--কোথায় যাবি?
-- সান্তালা গ্রামে। আমার অনুমান ওই গ্রামে আজ রাতে কালো নেকড়ের হামলা হবে ।হাতেনাতে ধরতে হবে ওদের ।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই চলে আসে ফরেস্ট গার্ড রা ।ওদের নিয়ে বেরিয়ে যায় সৌমেন্দু ও ইন্দ্র।
সান্তালা গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা বিশাল মুরগি খামার। এই খামারটা স্থানীয় আদিবাসী যুবকেরা দেখাশোনা করে।এটা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত খামার। মুরগির খামারের পরেই শুরু হচ্ছে একটা বড় জঙ্গল। জঙ্গল শেষ হয়েছে নদীর কাছাকাছি গিয়ে ।ওই নদীতে রাতে জল খেতে আসে বনচর জীবজন্তু।
মুরগির খামারে চারিদিকে ছোট ছোট ঝোপ। সেই ঝোপের আড়ালে পজিশন নিয়ে বসল ওরা ছ'জন। ইন্দ্র সবাইকে সতর্ক করে দিল কোন কারণেই যেন কেউ গুলি না ছোঁড়ে।
চতুর্দশীর চাঁদের আলোয় চারদিকে মায়াবী জোৎস্না ।
ধীরে ধীরে রাত গভীর হয় ।দূর থেকে ভেসে আসে বুনো জন্তুর ডাক।আওয়াজ করে মাথার উপর দিয়ে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায় রাত জাগা পাখি ।গ্রামের কুকুরগুলো চিৎকার করে ওঠে। হঠাৎ শোনা যায় মোটর বাইকের আওয়াজ ।বাইক এগিয়ে আসছে।কিন্তু একি! গাড়ি কে চালাচ্ছে আর বাইকের পিছনেই বা কে বসে ?বাইকের পাশে পাশে ছুটতে ছুটতে যে এলো-- সে কে ?
ইন্দ্র ফিসফিস করে আবার সবাইকে সতর্ক করে দেয়, কেউ নড়াচড়া করবে না ।
ওরা সবিস্ময়ে দেখে ,গাড়ি চালাচ্ছিল যে জীবটা, সেটা একটা বীভৎস চেহারার ভাল্লুক ।বাইকের পিছনে থেকে নামল দৈত্যাকৃতি একটা দু-পেয়ে জীব। মুখটা তার অনেকটা মানুষের মতো হলে হলেও সারা শরীরটা লোমে ভর্তি।বিশাল বিশাল দুটো হাত দুই পাশে ঝুলিয়ে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে ও। ওর পায়ের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে কালো নেকড়ে টা ।ভাল্লুকটা দাঁড়িয়ে আছে বাইকের কাছেই ।মুরগির খামারের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল কালো নেকড়ে আর ওইদু-পেয়ে জীবটা। ওই দুপেয়ে জীবটা অনায়াসে ভেঙে ফেলল মুরগির খামারের দরজার শক্ত তালাটা ,কব্জির মোচড়ে।তারপর লাথি মেরে ভেঙে ফেলল মুরগির খামারের দরজাটা। খামারের ভিতরে ঢুকে গেল নেকড়েটা।মুরগিগুলো শুরু করেছে পরিত্রাহি চিৎকার ।সেই চিৎকারে আকৃষ্ট হয়েই বুঝি চিৎকার করতে করতে ছুটে এলো এক পাল গ্রামের কুকুর। ওদের মধ্যে একটা কুকুর হঠাৎই কামড়ে ধরল বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দুপেয়ে জীবটার পা। ওই জীবটা তীব্র যন্ত্রণায় অনেকটা মানুষের মতই চিৎকার করে উঠলো। গর্জন করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এল কালো নেকড়ে ।ততক্ষণে কুকুরের ডাক বা মুরগীগুলোর সম্মিলিত চিৎকার শুনে হয়তো ঘুম ভেঙেছিল গ্রামের ছেলেদের। ওরা চিৎকার করতে করতে ছুটে আসতে লাগল এদিকে। আর তখনই হঠাৎ কালো নেকড়েটার ঘাড়ের কাছে একটা লাল আলো জ্বলে উঠলো দপ করে ।আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শোনা গেল বাঁশির মত একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ। কালো নেকড়ে আর দুপেয়ে জীবটা ছুটতে শুরু করলো মোটরবাইক টার দিকে। ততক্ষনে সেই ভালুকটা স্টার্ট দিয়েছে মোটরবাইকে। দু-পেয়ে জীবটা লাফিয়ে উঠে পড়েছে মোটর বাইকের পিছনে ।মোটরবাইক এগোতে শুরু করেছে। পিছনে ছুটতে শুরু করেছে কালো নেকড়ে ।ওরা যাচ্ছেজঙ্গলের দিকে ।সৌমেন্দু চিৎকার করে উঠলো, ওরা পালাচ্ছে ইন্দ্র ,কিছু কর।সমস্ত ঘটনার আকস্মিকতায় ইন্দ্র হঠাৎ যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল ।সৌমেন্দুর চিৎকারে সম্বিত ফিরল তার ।ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে বাইক লক্ষ্য করে ছুটতে শুরু করলো ,পিছনে বাকিরা ।কিন্তু না ,চালক জঙ্গলের সরু রাস্তা দিয়েই বেশ জোরে চালাচ্ছে মোটরবাইক।এঁকেবেঁকে ।বাধ্য হয়ে মোটর বাইকের চাকা লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে ইন্দ্র ।বাইকের চাকা পাংচার হয়। বাইক থেকে নামে চালক ভাল্লুক আর ওই বিশালাকৃতির জীবটা। ওরা ছুটতে শুরু করে সামনের দিকে ।ওদের পিছনে ছুটছে কালো নেকড়ে। ইন্দ্র ওদের পেছনে ধাওয়া করছিল। সৌমেন্দু বাধা দিয়ে বলে, এত রাতে গভীর জঙ্গলের ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে না রে ইন্দ্র ।
--কিন্তু ...
--আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা কর, প্লিজ । নদীতে রাত্রে জল খেতে আসে অনেক জীবজন্তু। এই সময়ে ওদের ফেস করা খুব মুশকিল ।
ইন্দ্র দাঁড়িয়ে যায়। মিনিট কয়েক পরেই জঙ্গলের দিক থেকে ভেসে আসে কোন জন্তুর চিৎকার। সৌমেন্দু বলে , বন্য বরাহ। হঠাৎই শোনা যায় নেকড়ের চিৎকার। দুই পশুর গর্জনে মুখর হয়ে ওঠে জঙ্গল ।আর একটু পরেই শোনা যায় প্রায় মানুষের কন্ঠে কে যেন চিৎকার করে উঠল-- বাবা -বাবা !তারপরেই শোনা যায় পরপর দুটো গুলির শব্দ আর বেশ কিছুক্ষণ পরে আরো একবার । বন্য বরাহ আর নেকড়ের গর্জন ভেসে আসছে ,ভেসে আসছে কারুর কাতরানির শব্দ।
ইন্দ্র বলে, সোম ,গাড়ি নিয়ে আমাদের এক্ষুনি মেটেলি যেতে হবে।
--- কেন রে?
-- ডাক্তার বিশ্বাসের বাড়িতে এক্ষুনি যেতে হবে ।যাওয়ার পথে মেটেলি থানা হয়ে যাবো।
সঙ্গে সশস্ত্র পুলিশ দেখে ডাক্তার বিনয় বিশ্বাসের বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড মৃদু প্রতিবাদ করলেও বিশেষ বাধা দেবার সাহস পেল না। বিশাল বাড়ি। ভিতরে ঢুকতেই একটা ঘরে গিয়ে দেখা গেল ভীমের সুবল জ্যাঠা শুয়ে আছে ।তাকে ডেকে তুললো ইন্দ্র। তারপর বলল, আমাদের নিয়ে চলুন তিমির বাবুর কাছে।
-- কিন্তু ওরা?
-- আসবেনা!
বাড়ির পিছন দিকে একটা পুরনো গ্যারেজ ঘরের পাশ দিয়ে গিয়ে গ্যারেজের পিছনে একটা দরজার তালা খুলল সুবল। একটা সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিয়ে বলল, আসুন আমার সঙ্গে। সামনে সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে। ওরা সুবল এরপিছুপিছু সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছালো একটা আন্ডারগ্রাউন্ড ঘরে একটা দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে আছে ময়লা ছেঁড়া জামা আর পাজামা পরা একটা লোক ।লোকটার উস্কোখুস্কো চুল ,সারা মুখ ভর্তি দাড়ি। সারা ঘরে বিভিন্ন সাইজের বোতলে ভরা লাল বর্ণের তরল ।স্পিরিট ল্যাম্প, টেস্টটিউব, মাইক্রোস্কোপ আরো অনেক যন্ত্রপাতি ।পুরো ঘরটা যেন একটা ল্যাবরেটরি। ইন্দ্র বলে, সৌমেন্দু ওনাকে ধরে বাইরে নিয়ে আয়।
-- কে উনি ?
--উনি শকুন্তলার দাদা, বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী ডঃ তিমির রায় ।সৌমেন্দুর মুখ দিয়ে কথা সরে না।
সকালবেলাতে দলবল নিয়ে ইন্দ্র পৌঁছায় সান্তলা গ্রামের জঙ্গল পেরিয়ে নদীর পাড়ে ।প্রত্যক্ষ করে এক বীভৎস দৃশ্য। একটা বড় বন্য বরাহ আর কালো নেকড়ের নিথর ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে ।পাশাপাশি ।একটু দূরে বিশালাকৃতি সেই জীবটা মরে পড়ে আছে ।তার সারা শরীরে প্যাঁচানো এক বিশাল শঙ্খচূড় সাপ। ।শঙ্খচূড়ের মাথাটা ছিন্নভিন্ন ।সম্ভবত গুলিতে। একটু দূরেই পড়ে আছে ডাক্তার বিশ্বাসের দেহ। তার হাতে ধরা রিভলবার। কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত জমে কালো হয়ে গেছে। সম্ভবত বন্য বরাহের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মারা গেছে কালো নেকড়ে ।শঙ্খচূড়ের ছোবলে প্রাণ গেছে দুপেয়ে দৈত্যাকৃতি জীবটার। আর বিনয় বাবুর গুলিতে মারা গেছে শঙ্খচূড় ।সবটাই অনুমান করে ইন্দ্র। একটু পরেই পৌঁছায়বিশাল পুলিশবাহিনী ।আর তাদের সঙ্গে বনানী বিশ্বাস ।শকুন্তলা আর অনসূয়া দেবীও পৌঁছান ।ততক্ষনে গোঁফ দাড়ি কামিয়ে পরিষ্কার জামা প্যান্ট পরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে তিমির রায় কে।
তিমির বাবুকে দেখতে পেয়েই ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠেন অনসূয়া দেবী ।দাদা বৌদিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে শকুন্তলা।
সৌমেন্দু বলে ,এবার সব টা খুলে বল ইন্দ্র ।ই ন্দ্র শুরু করে, মানুষের মাথার পিছনে ব্রেনের বেসে থাকে পিটুইটারি নামে একটা গ্রন্থি ।ওই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় বিভিন্ন প্রকারের হরমোন। ওই হরমোন গুলির প্রভাবে মানব শরীরের গ্রোথ, মেটাবলিজম, ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ, প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ, যৌন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের বিভিন্ন রকমের কাজ হয়। এরমধ্যে গ্রোথ হরমোন কম বা বেশি হলে সারা দেহে বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায় ।পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত সোমাটোট্রফিক বা বৃদ্ধির হরমোন বেশি কাজ করলে দেহ দৈত্যাকৃতি হয় আর কম কাজ করলে দেহ হয় বামনাকৃতি ।পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন মানবদেহে দাড়ি গোঁফ এবং মানব দেহের মত পশুদের দেহ ও তার চেহারা ,আকার স্বভাব কে নিয়ন্ত্রণ করে।
।এই হরমোন নিয়ে গবেষণা করছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ডঃ তিমির রায় অর্থাৎ অনসূয়া দেবীর স্বামী ৌ ।ওকেই অপহরণ করেছিল বিনয় বিশ্বাস ।
---কিন্তু ফটো দেখে তো ওকে আইডেন্টিফাই করতে পারেননি অনসূয়া দেবী।
--তিমির বাবুকে অপহরণ করার পর প্রচুর খরচ করে নামি সার্জেন্ট কে দিয়ে অপারেশন করিয়ে মুখের চেহারায় পরিবর্তন এনেছিল ডাক্তার বিনয় বিশ্বাস ।
--কিন্তু কেন ?কেন এই অপহরণ ?
--সে বড়ই অদ্ভুত কাহিনী। কলেজের পুনর্মিলন উৎসবে দেখা হবার পর বন্ধু বিনয়কে বাড়িতে নিয়ে যায় তিমির। সেখানেই একদিন কথাপ্রসঙ্গে বন্ধুকে তিনি জানান যে ,মানব দেহের হরমোন কে ভেঙে যে যে উপাদান পাওয়া যায় তাতে কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে মানুষের যৌবন কে দীর্ঘস্থায়ী করা যায় ।আর সেই উপাদান পাওয়া যেতে পারে জীববিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী মানুষ যে স্তন্যপায়ী গ্রুপের, মানে Primates গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত সেই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত অন্য প্রাণী যথা লেমুর বানর ইত্যাদি প্রাণীর দেহের হরমোন থেকেও। অন্যান্য জীবজন্তুর দেহের হরমোনে পরিবর্তন এনে তাদের যৌবন ও ধরে রাখা যায় ।
তিমির বাবু, এরপরে আপনি বলুন কিছু।
তিমির বাবু খুবধীরে ধীরে বলতে শুরু করেন, ,আমার মুখে এই কথাটা শুনে বিনয় বলেছিল, বাহ !তাহলে তো এভাবে কোন হরমোন নিয়ন্ত্রক ওষুধ তৈরি করে মানুষের যৌবন কেও ধরে রাখা যেতে পারে।
-- হ্যাঁ পারে ।
--তাহলে তো সেই ওষুধ দিয়ে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা রোজগার করা সম্ভব।
-- হয়তো !
আমি তখন বুঝিনি যে বিনয় মনে মনে কী প্ল্যান করছে। পরদিনই অনসূয়ার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় ও বেলপাহাড়ি চলে যায় ।তিন দিন পরে বিনয় ওর ড্রাইভার আর ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট রমেনের সাহায্যে আমাকে অজ্ঞান করে নিয়ে আসে নর্থ বেঙ্গলে।তোলে মেটেলিতে, ওর বাড়িতে ।আমাকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে যৌবন নিয়ন্ত্রক নিয়ন্ত্রক ওষুধ তৈরি করার জন্য। ।আমি রাজি না হওয়ায় আমাকে ভয় দেখায় যে, ওর কথানা শুনলে ও অনসূয়াকে বাঁচিয়ে রাখবে না। আমি ওকে অ্যাভয়েড করার জন্য বলি, পরীক্ষাটা আগে অন্য কোন জীবের উপরে প্রয়োগ করে দেখতে হবে ।ও বলে, বেশ তো আমার ছেলে চন্দনের একটা প্রিয় কুকুর আছে। ওটা বুড়ো হয়ে গেছে। ও ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না, নড়াচড়া করতে পারেনা। ওর যৌবন ফিরিয়ে দাও ।
আমি বললাম,এটা করতে গেলে ওর গ্রুপের মানে Carnivorous গ্রুপের উন্নত কোন প্রাণীর দেহ চাই। যেমন, নেকড়ে ভাল্লুক ইত্যাদি ।
ও বলেছিল হয়ে যাবে ।আর সত্যিই কয়েক দিন পরেই ও একটা গোটা নেকড়ে ধরে নিয়ে এলো। প্রাণীটা অজ্ঞান অবস্থায় ছিল । সার্জারির ছুরির সাহায্যে ওর মাথায় অপারেশন করে হরমোন নিয়ন্ত্রক গ্রন্থির সিক্রেশন কালেক্ট করা হলো ।সেটা প্রিজার্ভ করা হলো। একবার নয়, পরপর দুবার ।ওই সিক্রেশন থেকে তৈরি ওষুধ খাওয়ানোতেই হঠাৎ যেন যৌবন ফিরে পেল চন্দনের পোষা প্রিয় বুড়ো কুকুরটা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই চেহারা আকৃতিতে অনেক পরিবর্তন হল ওর।শুধু তাই নয়, স্বভাবটাও পাল্টে গেল ।কুকুরটার গলার আওয়াজে পরিবর্তন এলো, অনেকটা নেকড়ের মতই আওয়াজ হোলো।বিশাল চেহারার ওই কালো কুকুরটাকে দেখে সবাই কালো নেকড়ে বলে ভয় পেত ।
---কিন্তু তিমির বাবু, ও রাত্রিবেলায় ওরকমভাবে ঔৌমুরগি ধরে বেড়াতো কেন ?সৌমেন্দু জিজ্ঞাসা করে ।
আমি বলবো বাবু সে কথা? সুবল বলে ।
--হ্যাঁ সুবল দা ,তুমি বলো ।তুমি তো সব জানো। সুবল শুরু করে, সে এক মজার কিসসা বাবু ।ওই কুকুরটা সন্ধ্যা হলেই খুবচিৎকার করত ।বাবু বিরক্ত হতেন। খোকাবাবু তার প্রিয় কুকুরটাকে ঠান্ডা করার জন্য খুব চেষ্টা করতো। কিন্তু পারত না ।শেষে হঠাৎ একদিন খোকাবাবু ফ্রিজ থেকে কাঁচা মুরগির মাংসের একটা টুকরো কুকুরটাকে দিতেই ও চুপ করে যায় ।খোকাবাবু অল্প অল্প করে পুরো মুরগীটা ওকে দেয়। ও সাবড়ে ফেলে পুরো টা।
-- কিন্তু ওই দুপেয়ে বিশাল জীবটা কে ?
সুবল বাবু হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে ।সুবল একটু পরে কাঁদতে কাঁদতেই বলে,ওটা পাপের শাস্তি ।
--মানে?
--- আমি বলছি ।তিমির বাবু বলেন।
---- আপনার শরীর খারাপ লাগছে না তো? ইন্দ্র জিজ্ঞাসা করে।
-- না, আমি ঠিক আছি।
--- বেশ তাহলে বলুন।
-- কুকুরের উপরে পরীক্ষা করে সফল হবার পর বিনয় আমাকে চাপ দিতে শুরু করলো মানুষের যৌবন ফেরাবার উপযোগী হরমোন নিয়ন্ত্রক ওষুধ তৈরি করার জন্য। এবার আমার বোনের ক্ষতি করার ভয় দেখিয়ে বাধ্য করলো কাজ করতে ।এবার মারা পড়লো বানর। এক বিশেষ প্রজাতির বানর অসমের জঙ্গলে পাওয়া যায়। ওদের কিভাবে যে বিনয়ে জোগাড় করল ,সেটা সঠিক জানিনা ।ওদের ব্রেন থেকেও হরমোন কালেক্ট করে ওষুধ তৈরি করে ল্যাবরেটরি তে দুটো বোতলে ভরে রেখে ছিলাম ,আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য।
আমার ঘরের দরজার তালা খুলে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ,সিঁড়ি দিয়ে মাটির নিচে অন্ধকার ঘরে এসে আমাকে খাবারদিয়ে যেতো সুবল দা ।এরকমই একদিন মাটির নিচে নামার সময় দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছিল।ও খেয়াল করেনি যে ,ছেলেমানুষি কৌতূহলে ওকে ফলো করে নিচে নেমে এসেছে বিনয়ের দশ বছরের ছেলে চন্দন ।ছেলেটা সিঁড়ি দিয়ে চুপিচুপি নেমে আমার অন্ধকার ঘরের ল্যাবরেটরীতে কাঁচের বোতলে ভরা সেই হরমোন ওষুধ নিয়ে চুপিচুপি উঠে যায় উপরে ।আসলে আমার খাওয়া শেষ হলে এঁটো থালা বাসন নিয়ে একবারে উপরে উঠে যেত সুবল দা ।তাই আমার খাওয়া শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করছিল ও। এই ফাঁকে চন্দন কখন যে নিচে নেমে এসেছে আবার উপরে উঠে গেছে হরমোন ওষুধ ভরা শিশিগুলো নিয়ে, তা আমরা কেউ খেয়াল করতে পারিনি ।ওই হরমোন ওষুধ গুলোর রং ছিল টুকটুকে লাল আর গন্ধ ছিল খুব মিষ্টি ।তাই হয়তো ওগুলো ওকে আকৃষ্ট করেছিল বলে ও উপরে উঠে গেছিল ।আর অঘটনটা ঘটলো তারপরই ।ছেলেমানুষি খেয়ালে চন্দন একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলল।
সর্বনাশটা বুঝতে পারল বিনয়। ও আমার হাতে-পায়ে ধরলো ওটার অ্যান্টিডোট তৈরি করার জন্য । আবার নিয়ে আসা হয় একজোড়া বানর। কিন্তু ব্যর্থ হই আমি ।
ধীরে ধীরে চন্দনের চেহারায় পরিবর্তন আসতে শুরু করলো ।মাস তিনেকের মধ্যেই ও হয়ে গেল বিশাল বানর আকৃতি দুপেয়ে জীব। কিন্তু কালুর মত ওর গলার আওয়াজে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে সন্ধ্যা হলেই ছটফট করত কালুর মতই। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এলো ওর ।ও মাছ মাংস ডিম খেতে চাইত না। পরিবর্তে ফলমূল খুব পছন্দ করত ।কিন্তু মুশকিল হয়ে গেল কিছুদিন পর থেকেই কুত্তাটার মাংসের চাহিদা দিন দিন বাড়তে লাগলো। মুরগির মাংসে পোষাচ্ছিল না। সন্ধ্যা হলেই ছটফট করতো।
-- তারপর ? বিস্মিত সৌমেন্দু জিজ্ঞাসা করে। সুবল বলে, তারপর থেকে রোজ রাতে খোকাবাবুকে মোটরসাইকেলের চাপিয়ে বেরোতে শুরু করলো বাবু। ছুটতে ছুটতে ওদের পিছুপিছু যেত নেকড়ে কুকুরটা ।বেরোবার আগে বাবু ভাল্লুকের মুখোশ আর ভাল্লুকের চামড়া দিয়ে তৈরি জামাটা পড়ে নিতো ।কুকুরটাকে নিয়ে ওরা যেত গ্রামে কোন মুরগির খামারে বা কারুর গোয়াল ঘরে। খোকাবাবুর গায়ে খুব জোর হয়ে গেছিল। ও মুরগির ঘরের দরজা ভেঙে দিত ।কুকুরটা ভিতরে ঢুকে মুরগি আনতো। তারপর ওরা ঢুকে যেত জঙ্গলে ।খোকাবাবু গাছে চেপে মনের আনন্দে ফলমূল খেতো, লাফালাফি করতো।কুকুরটা কয়েকটা মুরগি বা ছাগলের বাচ্চা খেয়ে নিত ।কয়েকটা মুরগি খোকাবাবু ঘরে নিয়ে আসতো ওর বন্ধু কুকুর কালুর জন্য। গ্রামে পাহারা ব্যবস্থা করার পর তাই হাট থেকে মুরগি কিনে আনতাম ।কিন্তু সেগুলো ফুরিয়ে যাওয়া তে আর কোন গ্রামে ঘুরে ঘুরে ও মুরগি না কিনতে পাওয়ার জন্য গতকাল রাতে ওরা বেরিয়ে ছিল সান্তালা গ্রামের মুরগির খামারে যাবে বলে। আমি হাজার বার বারণ করেছিলাম, কিন্তু ওরা কথাশোনেনি।
বাবু বলেছিল ,ওখানে কোন পাহারা নাই। মুরগি নিয়েই ফিরে আসবে। হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে সুবল।
ইন্দ্র জিজ্ঞাসা করে ,সুবল দা ,চন্দনের মা মানে বিনয় বাবুর স্ত্রী বনানী দেবী পাগল হলেন কিভাবে ?
--উনি পাগল নয়কো বাবু। তিমির বাবুকে ধরে আনার পর থেকে উনি পেত্যেকদিন স্বামীকে বারণ করেছেন এই সব্বনাশা খেলা না খেলতে। কিন্তু বাবু কোন কথা শোনেনি। বৌদি মণি সব সময় বাবুকে বলতো,দেখো, তুমি একদিন ধরা পড়ে যাবে ।শেষে বাবু অপারেশন করে নিজের মুখটাই বদলে দিলে।
কুকুরটা নেকড়ে হবার পর থেকে দাদাবাবু আর বউদিমনির প্রায়ই ঝগড়া লাগতো।খোকাবাবু যেদিন সব্বনাশ টা ঘটিয়ে ফেলে সেদিন বৌদি মনি যেন পাগল হয়ে গেল। চিৎকার করে বলতে লাগল, আমি থানায় গিয়ে সব জানিয়ে দেবো ।আর সেদিনই বৌদি মণিকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে পাগল সাজিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলো বাবু।
সৌমেন্দু জিজ্ঞাসা করে ,সুবল দা তুমি জানো, এই সমস্ত চিতা বাঘ ,বানর কিভাবে জোগাড় হয়েছে?
-- জানি বাবু ।রাতের আঁধারে ওগুলো দিয়ে গেছিল দুটো লোক। মেলা টেকা নিয়েছিল বাবুর কাছ থেকে ।
---এত টাকা উনি পেলেন কোথায়?
---- গাঁজা আর আফিমের চোরা ব্যবসা ছিল বাবুর । রাতের বেলায় মেলা লোক আসতো বাড়িতে ।
--তাই কি এত পাহারার ব্যবস্থা?
-- হ্যাঁ বাবু।
পুলিশের লোক নাগপাশ থেকে ওই দুপেয়ে দৈত্যাকৃতি জীব মানে চন্দনের দেহটা নিয়ে এসে নামিয়ে রাখলো নদীর পাড়ে। বিনয় বিশ্বাসের দেহটাও এনে রাখলো অনতিদূরে। এতক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে প্রস্তর মূর্তিবৎ বসেছিলেন বনানী বিশ্বাস । চন্দনের দেহটা নিয়ে আসতে উনি একছুটে ওই নর-বানরের মৃতদেহের উপর আছাড় খেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন---- -খোকা...!
পুত্রহারা মায়ের সেই বুকফাটা আর্তনাদ কুলকুল করে বয়ে চলা মূর্তি নদীর বুকে আছাড় খেয়ে প্রতিধ্বনি' হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ডুয়ার্সের আকাশে বাতাসে।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।