বাঙালীর শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসব এই উৎসবের ইতিহাস খুব একটা সরল নয়। পূজার স্থান কাল পাত্র নিয়ে রয়েছে বিবাদ। পূজার আচার আচরণ রীতিনীতির পরিবর্তন, উৎসব, দেখনদারী থেকে তোষামোদ, আরাধনা থেকে প্রতিযোগিতা, রীতি থেকে সংস্কৃতি বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে এই উৎসবের বিবর্তন হয়েছে। ক্ষুদ্র ঘট থেকে বিশালাকার দশভুজা প্রতিমা হয়ে ওঠার ঘটনা। নানান মোড় নিয়েই আজ গড়ে উঠেছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব 'দুর্গোৎসব'।
ভবিষ্যপুরাণ অনুযায়ী অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গের আদিবাসী এবং নিম্ন বর্ণের মানুষরাই দুর্গা পূজা করত।বাঙলায়৫০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত পাথরের মূর্তিতেই মহিষাসুরমর্দিনীর আরাধনা হয়েছে।সব মূর্তিগুলো তেই 'লক্ষী', 'সরস্বতী', 'গণেশ', 'কার্তিক' অনুপস্থিত।
বাংলায় দুর্গাপূজো পদ্ধতি সম্বন্ধে জানার অন্যতম আকর গ্রন্থ রঘুনন্দনের (১৫০০-১৬০০ শতক) 'তিথিতত্ত্ব',গ্রন্থটি। নবদ্বীপের এই স্মার্ত পণ্ডিতের লেখা গ্রন্থটিতে দুর্গাপূজার যাবতীয় বিধান রয়েছে। অবশ্য এই সব বিধান তিনি নিজে সৃষ্টি করেননি।আগের পুরাণ ও স্মৃতিশাস্ত্র থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে পূজাপদ্ধতি লিখেছেন। কোনো কোনো বিধানের পৌরাণিক প্রমাণ দিতে পারেননি। একে তিনি বলেছেন আচার, দেশাচার বা কুলাচার। স্মার্ত রঘুনন্দনের দেওয়া স্বীকৃতি দেখলে মনে হয়, দুর্গাপূজার যাবতীয় রীতিনীতি বহু বছর আগে থেকেই বাংলায় প্রচলিত ছিল। সম্ভবত, প্রাচীন দুর্গাপূজাকে রঘুনন্দন তাঁর গ্রন্থের মাধ্যমে একটি সুসংবদ্ধ রূপ দিয়েছিলেন।
'বিদ্যাপতির ১৩৭৪-১৪৬০) 'দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী থেকে সমকালীন ' বাংলায় প্রচলিত দুর্গাপূজা সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা যায়, শূলপাণির (১৩৭৫-১৪৬০) 'দুর্গোৎসববিবেক', দুর্গোসব, বাসন্তি বিবেক, দুর্গোৎসব প্রয়োগ নামে তিনটি লেখা। তিনি লেখার তথ্যগুলো সংগ্রহ করেছিলেন প্রাচীন স্মার্ত পণ্ডিত জীকন ও বালকের লেখা থেকে। শূলপাণির সমসায়িকজীমূতবাহনের (আনু. ১০৫০-১১৫০) 'দুর্গোৎসবনির্ণয়', গ্রন্থে মাটির প্রতিমার দুর্গাপুজার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। প্রাচীনকালে শুধু খড় মাটি নয়, কাঠ, ধাতু বা পাথরের প্রতিমাতেও দুর্গাপূজা হত। কৃত্তিবাস ওঁঝার (আনু. ১৩৮১-১৪৬১) 'রামায়ণ', বাচস্পতি মিশ্রের (১৪২৫-১৪৮০) 'ক্রিয়াচিন্তামণি' প্রভৃতি গ্রন্থে দুর্গাপূজার বিস্তৃত বর্ণনা থাকায় ধারণা করা হয় যে, দশম অথবা একাদশ শতকেই বঙ্গদেশে দুর্গাপূজা প্রচলিত ছিল; দ্বাদশ শতাব্দির প্রথম ভাগে রচিত রাজা রামপালের রাজকবি সন্ধাকর নন্দি রচিত ' রামচরিত' কাব্য থেকে জানা যায়, উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভুমিতে[প্রাচীন কট্রলী] বিশাল আয়োজনে উমাপূজা হত (দুর্গার অন্য একটি নাম।
একাদশ-দ্বাদশ শতকে পাল-সেন আমলে বঙ্গদেশে একাধিক দুর্গা প্রতিমা পাওয়া গেছে। সমকালে মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি সর্বাধিক খ্যাত ছিল। দ্বিভুজা থেকে অষ্টাদশভুজা একাধিক দেবী মূর্তি এই যুগে পাওয়া গেছে, এর মধ্যে চতুর্ভুজা ও দন্ডায়মান মূর্তির সংখ্যাই বেশি।
দশম-একাদশ শতকে সম্রাট মহীপালের সময় পালরাষ্ট্রের উপাস্য মাতৃকা ছিলেন মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা। মহীপাল মাতৃকা উপাসক ছিলেন তার আর একটা প্রমাণ এই যে মহীপালের মুদ্রায় স্ফীতোদর জগজ্জননী মাতৃকার মূর্তি থাকত কেবল, সেখানে এমনকি সম্রাটেরও প্রতিকৃতি নেই। পালরা ধর্মে হিন্দু নন, বজ্রযানের অনুসারী ছিলেন।
মহীপালের সময় দুর্গাপুজো পালরাষ্ট্রের উদ্যোগে শুরু হওয়ার বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। পালযুগের আগের দুর্গামূর্তির তুলনায় এই ষড়ভুজা মূর্তির গঠনশৈলী বেশি প্রাচীন, দশম শতকে পালদের সাথে দাক্ষিণাত্যের ভালো সম্পর্ক থাকায় এই দুর্গামূর্তি দেখতে বেশ প্রাচীন, আর দক্ষিণা প্রভাব আছে।
শারদীয়া পূজার উল্লেখ কালিকাপুরাণে (৬৫, ১) পাওয়া যায়। রামচন্দ্র কর্তৃক দেবীর অকালবোধনের কাহিনী বাল্মীকি রামায়ণে নেই, কৃত্তিবাসের বাংলা রামায়ণেই তা সবিস্তারে উল্লিখিত আছে। কালিকাপুরাণ কৃত্তিবাসের পূর্ববর্তী, কাজেই কৃত্তিবাসের পূর্বেই শারদীয়া দুর্গোৎসবের প্রচলন ছিল। এটা অনুমান করে নেওয়া যায়।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে প্রথম দুর্গা আরাধনার উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাসী রামায়নে। এর আগে মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে , বসন্ত ঋতুতে রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি দুর্গাপূজার প্রথম প্রচলন করেছিলেন, যা অনুষ্ঠিত হত বসন্ত কালে। কিন্তু মা দুর্গার অকালবোধনের ধারণা কৃত্তিবাসী রামায়ণের পূর্বে ছিলনা। বাল্মিকি রামায়নে বা তুলসী দাসের রামচরিতে রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার উল্লেখ না থাকলেও কৃত্তিবাসী রামায়নের লঙ্কাকাণ্ডের 'রাবণ বধের জন্য শ্রীরামের প্রতি দেবীর আদেশ ও দশমী পূজা সমাপন' অংশে অকাল বোধনের উল্লেখ রয়েছে–
অকালবোধনে পুজা কৈলে তুমি দশভুজা /
বিধি মতে করিলে বিন্যাস /
লোকে জানাবার জন্য আমারে করিতে ধন্য /
অবনীতে করিলে প্রকাশ /
রাবণে ছারিনু আমি বিনাস করহ তুমি /
এত বলি হইলা অন্তরধান নাচে গায় কপিগণ প্রেমানন্দে নারায়ণ /
নবমী করিলা সমাধান /
দশমীতে পূজা করি বিসর্জিয়া মহেশ্বরী /
সংগ্রামে চলিলা রঘুপতি ।/আদেশ পাইয়া রাম সিদ্ধ কৈল মনস্কাম ।।
অনেকেই মনে করেন কবি কৃত্তিবাসকৃত রামের এই দুর্গাপূজার তত্ত্ব কালিকাপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ থেকেই সংগ্রহ করেছিলেন যা বাল্মিকী রামায়নে স্থান পায়নি।
লোকমতে সর্ব প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন দিনাজপুরের রাজা গণেশ, পঞ্চদশ শতকে যিনি ইয়াশ শাহী বংশের রাজত্বের সমাপ্তি ঘটিয়ে বাংলার শাসন ক্ষমতা দখল করেছিলন। প্রতি বছর শরৎকালে মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করে দুর্গাপূজা করে তা বিসর্জন দেওয়ার রীতি তিনিই প্রথম চালু করলেছিলেন বলে মনে করা হয়।
অবশ্য অনেকে মনে করেন বাংলায় দূর্গাপূজার সূচনা হয় কোন্নগরের ঘোষাল বংশের আশুতোষ ঘোষালের দুর্গাপূজার মধ্যে দিয়ে । উল্লেখ্য, কনৌজ-এর পাঁচ কুলীন ব্রাহ্মণের এক ব্রাহ্মণ সুধানিধির বংশকে 'ঘোষাল' উপাধি প্রদান করেছিলেন লক্ষণ সেন। পরে আকবরের আমলে এঁরা জমিদারি লাভ করেছিলেন। এই ঘোষাল বংশের আশুতোষ ঘোষাল কোন্নগরে আসেন ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে। আর ঘোষাল বংশের পারিবারিক নথি থেকে জানা যায়, কোন্নগরের বাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু হয়েছিল ১৪৫৪ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর বাংলায় দক্ষিণ ২৪ পরগণার সোনারপুরের কাছে মালঞ্চ গ্রামের জনৈক চামু (বাগচী) ব্রহ্মচারী ১৪৯১ খ্রিষ্টাব্দে দুর্গাপূজা করে ছিলেন।চৈতন্যপার্ষদ নিত্যানন্দ প্রভুও [১৪৭৪-১৫৩২] অধুনা উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার খড়দহে স্বগৃহে প্রতিমায় দুর্গোৎসব করতেন। তাঁর বংশধরেরা আজও বেঁচে আছেন এবং তাঁরাও সেই দুর্গোৎসবের ধারা বজায় রেখেছেন ১৫০৭ খ্রিষ্টাব্দে চন্দননগরের খলিসানির বসু বাড়িতে দুর্গাপূজার প্রবর্তন করে করুণাময় বসু। এরপর দেখা যায়, ১৫২২ খ্রিষ্টাব্দের শরৎকালে চন্দননগরের কমললোচন বসুর বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়েছিল। ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে হাওড়া আমতার রসপুরের যশচন্দ্র রায় বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়েছিল বলে জানা যায় এরপর বড় করে দুর্গাপূজা করে খ্যাতি লাভ করেন নদীয়ার তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ ।
সম্রাট আকবর বাংলা-বিহারের দেওয়ান নিযুক্ত করেন রাজা কংসনারায়ণকে। তবে বয়সের কারণে কংসনারায়ণ দেওয়ানি ছেড়ে রাজশাহীর তাহেরপুরে এসে আত্মনিয়োগ করেন ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে। আহ্বান করেন তাহেরপুরে এসে তাঁর জমিদারির ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের মহাযজ্ঞের জন্য। ওই সময় নাটোরের বাসুদেবপুরের ভট্টাচার্যরা ছিলেন বংশানুক্রমে তাহেরপুর রাজাদের পুরোহিত। এদের মধ্যে ছিলেন রমেশ শাস্ত্রী নামের একজন বাংলা-বিহারের বিখ্যাত পন্ডিত রাজা কংস নারায়ন ছিলেন মনুসংহিতার টীকাকার কুল্লুক ভট্টের পুত্র। রাজা কংসনারায়ণ প্রাচীন রাজাদের মতো যজ্ঞ করতে চেয়ে ছিলেন। রমেশ শাস্ত্রী বললেন, বিশ্বজিৎ, রাজসুয়, অশ্বমেদ ও গোমেধ—এই চারটি মহাযজ্ঞ রয়েছে। বিশ্বজিৎ ও রাজসুয় নামক মহাযজ্ঞ শুধু সম্রাটরা করতে পারবেন। অশ্বমেধ ও গোমেধ যজ্ঞ দুটিও নিষিদ্ধ। একমাত্র দুর্গোৎসব ছাড়া অন্য কোনো মহাযজ্ঞ করা সঠিক নয়। রাজা রামচন্দ্রের বিধানে ভক্তিসহ দুর্গোৎসব করলে সর্বযজ্ঞের ফল লাভ করা সম্ভব বলে মতপ্রকাশ করেন রমেশ শাস্ত্রী। উপস্থিত অন্য পণ্ডিতরাও ওই মতের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন। আর রাজা কংসনারায়ণ সে মতেই পূজার বিশাল আয়োজন করেন। ওই সময় সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে রাজকীয় পরিবেশে দুর্গোৎসব শুরু করেন তিনি। আর এই বিশাল পূজার পূরোহিত ছিলেন পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী। আর এখান থেকেই শুরু হয় মহাধুমধামে দুর্গোৎসব। এই মহাযজ্ঞে আনন্দ, ধুমধাম ও উৎসাহে সবাই মোহিত হয়েছিলেন সেই সময়। পরের বছর থেকে এ অঞ্চলের অনেক সামন্ত রাজা ও ধনী ব্যক্তি দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু করেন রমেশ শাস্ত্রীর পদ্ধতি অনুসারে।
এই সময়েই ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহের প্রতিষ্ঠিত 'দুর্গাবাড়ি' বা 'দেবীবাড়ী'র দুর্গাপূজা অন্যতম প্রসিদ্ধ হয়ে ছিল।
অনেকে মনে করেন আরো পূর্বে খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দীতে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজা জগৎমল্ল প্রথম মৃন্ময়ী দুর্গার প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু তা একটি আঞ্চলিক দেবী রূপেই প্রচলিত থাকে সার্বিক প্রচার তেমন হয়নি।
দেবী মৃন্ময়ী ছিলেন মল্লভূম রাজ্যের রাজরাজেশ্বরীমল্ল রাজবংশের কুলদেবী। মল্লরাজ জগৎমল্ল ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে এই পূজার প্রবর্তন করেন। সেই পূজাপদ্ধতি বাংলায় প্রচলিত দুর্গাপূজার থেকে অনেকটাই আলাদা; কিছুটা আলাদা দুর্গাপ্রতিমার গড়নও। মৃন্ময়ী দেবী সপরিবার বটে, কিন্তু লক্ষ্মী-গণেশ ও কার্তিক-সরস্বতীর স্থানবদল করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, লক্ষ্মীর স্থলে গণেশ ও গণেশের স্থলে লক্ষ্মী এবং কার্তিকের স্থলে সরস্বতী ও সরস্বতীর স্থলে কার্তিক। এই রূপে দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের রীতিকে জগৎমল্ল-প্রথা বলা হয়। বাঁকুড়া জেলার অনেক প্রাচীন পরিবারেও পূজিত হয় জগৎমল্ল-প্রথায় নির্মিত দুর্গামূর্তি। তা ছাড়া মল্ল রাজবাড়ির পূজায় দেবীপটের যে ব্যবহার দেখা হয়, তা অনেকটাই স্বতন্ত্র প্রকৃতির। বাংলার সাধারণ দুর্গাপূজায় এমন পটের ব্যবহার দেখা যায় না।
মৃন্ময়ী দুর্গাপূজার প্রচলনে বর্তমান যে রূপে দুর্গোৎসব পালন করা হয় তার নিশ্চিত কৃতিত্ত্ব ছিল নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের। অষ্টাদশ শতকে শরৎকালে তিথি মেনে বাংলা চলার দুর্গা প্রতিমার পূজা করেন, এবং এই প্রতিমাপূজা সমাজে খ্যাতি লাভ করে। কেবল দুর্গা পূজাই নয় শক্তি আরাধনায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করেছিলেন। দুর্গাপূজার পাশাপাশি জগদ্ধাত্রী ও শাক্তরাস প্রচলনের কৃতিত্ত্বও তাকেই দেওয়া হয়। তাঁর সভায় শাক্তপদাবলী, অন্নদামঙ্গলের ন্যায় মাতৃ আরাধনার বিভিন্ন সাহিত্য রচিত হয়।
বাংলায় পারিবারিক দুর্গাপূজার প্রচলন মোটামুটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বড়িশার সাবর্ন রায়চৌধুরী বাড়ীর পূজা আয়োজনের মাধ্যমে। সেই জমিদার বাড়ীর লক্ষীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের পুজো তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। যদিও অন্যমতে পারিবারিক দুর্গা পুজার সূচনা হয় ১৬০৯ সালে কাশীশ্বর দত্ত চৌধুরীর হাত ধরে। তখনও দুর্গাপূজা ছিল পুরোপুরি জমিদারের বাড়ীতেই ।
১৭৫৭-র পলাশীর যুদ্ধ। নবাব সিরাজুউদৌল্লার পরাজয় এবং ইংরেজ শক্তির আধিপত্যের সূচনা। " এই ঘটনাকে স্মরণীয় করার উদ্দেশ্যে নবকৃষ্ণদেব দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধে জয় লাভের পর রবার্ট ক্লাইভ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সিরাজউদৌল্লার কলকাতা আক্রমনে শহরের একমাত্র চার্চ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তখন ক্লাইভের মুন্সি নবকৃষ্ণদেব তাকে দেবীর কাছে প্রার্থনা করার জন্য দুর্গাপূজায় আহ্বান জানান। অনেকে অবশ্য মনে করেন নবকৃষ্ণদেব নিজের প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্য এইরূপ গল্প-কাহিনীর প্রচার করেছেন। যাইহোক, ওই বছর শোভাবাজার রাজবাড়িতে মহা ধুমধামে দুর্গাপূজা করা হয়।
শরৎকালীন দুর্গাপূজার সর্বোচ্চ প্রসার ও প্রচার লাভ করেশোভাবাজার রাজবাড়ীর পূজা আয়োজনের পর থেকেই।
নবকৃষ্ণদেবের দেখাদেখি এই প্রথা ততকালিন অভিজাত সমাজের মুল মন্ত্র হয়ে যায়। শরতের মনোরম আবহাওয়ায় রকমারি মরসুমি ফুল-ফল আর মিষ্টি দিয়ে সাদা চামড়ার ইংরেজ অধিকর্তাদের আপ্যায়ন করা সমকালীন অভাজত জমিদারদের মূল উদ্দেশ্য দাঁড়ায়। ইংরেজ অধিকর্তাদের খাতির যত্ন করে তাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন, তাদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা অর্জন, সামাজিক প্রতিপত্তি লাভের জন্য রায়বাহাদুর উপাধির লোভ প্রভৃতি বিভিন্ন কারনে সাহেব খাতির চলত। শাস্ত্রাচার এই সব পূজায় গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যে পূজায় যত বেশি সংখ্যক আমন্ত্রিত ইংরেজ অতিথি উপস্থিত হতেন, সেই পূজার মর্যাদা ততই বাড়ত। দেবীপ্রতিমার সম্মুখেই মুসলিম বাইজি নাচের আসর বসত। ইংরেজরা এসে নাচগান করতেন, তাদের জন্য উইলসন হোটেল থেকে গোরু ও শূকরের মাংস আনানো হত এবং মদ্যপানের আসরও বসত। এই ধারা চলেছিল ১৮৪০ সাল পর্যন্ত কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বিত্তশালীদের এই পূজায় সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। কেবলমাত্র সমাজের গণ্যমান্য অতিথিরাই নিমন্ত্রিত হিসেবে এ পূজায় আসতেন। অতিথি ছাড়া সাধারণ জনগণের পূজায় শরিক হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
এর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন রানী রাসমণি।তার জানবাজারের বাড়িতে যে দুর্গা পূজার আয়োজন হতো সেখানে ইংরেজ অতিথিদের বিনোদনের পরিবর্তে তার প্রজাদের বিনোদনের জন্য যাত্রাপালা এবং কবিয়াল গানের আসর বসাতেন। এই পূজাতে তার প্রজাদের অবাধ যাতায়াত ছিল।
বারোয়ারি শব্দটির উৎপত্তি 'বারো' অর্থাৎ ১২ সংখ্যা ও 'ইয়ার' বা বন্ধু (উর্দুতে বন্ধুকে বলা হয় ইয়ার) শব্দদুটি থেকে। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারো জন ব্রাহ্মণ বন্ধু মিলে দুর্গাপূজা করবেন বলে মনস্থ করেন। প্রতিবেশীদের থেকে চাঁদা তুলে আয়োজিত হয় সেই পূজা। এইভাবেই বাংলায় যে সর্বজনীন পূজানুষ্ঠানের সূচনা হয় তা লোকমুখে 'বারোয়ারি পূজা' নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গুপ্তিপাড়ার এই পূজার প্রচলন দেখে বল্লভপুর, কোন্নগর, উলা, চাকদাহ, শ্রীপুর প্রভৃতি স্থানেও বারোয়ারি পূজার প্রচলিত হয়।
বিংশ শতাব্দীতে বারোয়ারি পূজা আর বারোজনের উদ্যোগ থাকেনা, তা পরিণত হয় সর্বজনীন উৎসবে। ১৯১০ সালে ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডে ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার পক্ষ থেকে বারোয়ারি দুর্গাপূজা আয়োজিত করা হয়। এরপর একে একে ১৯১১ সালে শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীন, ১৯১৩ সালে শ্যামবাজারের শিকদারবাগান, ১৯১৯ সালে নেবুবাগান অর্থাৎ বর্তমান বাগবাজার সর্বজনীন এবং ১৯২৬ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতির বারোয়ারি দুর্গাপূজা শুরু হয়। এই বারোয়ারি পূজা ব্যাপক প্রচলনের মধ্য দিয়ে বনেদি বাড়ির পুজো গুলির জৌলুশ ম্লান হতে শুরু করে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই সার্বজনীন পূজা গুলির প্রতিযোগিতা আজকের দিনে দুর্গাপূজাকে দিয়েছে এক অন্যমাত্রা।
শুরুর দিকে বাড়ির পূজাগুলোতে একটি কাঠামোয় দুর্গা প্রতিমা নির্মাণের প্রচলন ছিল। এই এক কাঠামো দুর্গা ঠাকুরকে একচালা দুর্গা ঠাকুর বলা হতো। যৌথ পরিবারের নির্দশন ছিল এই একচালার ঠাকুর। বেশ কয়েক দশক আগে অবধি দেবীর অবস্থান ছিল একচালায়। মাঝে দেবী দুর্গা। তার দু'পাশে লক্ষ্মী সরস্বতী এক পা সামান্য বাঁকিয়ে পদ্মের বা বাহনের উপর দাঁড়ানো। ঠিক নিচেই গণেশ ও কার্তিক।
কিন্তু পরবর্তীকালে দুর্গার একচালা ভেঙে পাঁচচালার প্রচলন করেন গোপেশ্বর পাল নামের একজন প্রতিমা শিল্পী। ১৯৩৩ সালে কুমারটুলি অঞ্চলের এক সর্বজনীন দুর্গা পূজায় তিনি প্রথম একচালা কাঠামো ভেঙে পাঁচচালার দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করেন। এই পাঁচচালা কাঠামোর এক-একটি কাঠামোতে দুর্গা ও তার পরিবারের সদস্যদের আলাদাভাবে স্থান দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে জাগ্রত প্রতীক হিসেবে দেবী মা দুর্গা প্রজ্জ্বলিত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগ্রত করতে এর সর্বজনীন পূজা ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল সেই পরাধীন দেশেই। দেবী দুর্গা কে আরাধ্য করেই ভারতমাতার জাগ্রত চেতনা মূর্তিরূপ লাভ করে। বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম' কিংবা অবনীন্দ্রনাথের 'ভারতমাতা' প্রতিরূপ দেবী দুর্গার বন্দনা গীতের আরেকটি প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতাকামী অসংখ্য যুবকের অফুরন্ত প্রাণশক্তির সম্মিলিত উপাদান আর শক্তি ও সুন্দরের অসীম ভান্ডার যে দেবী দুর্গার মধ্যে নিহিত তা স্পষ্ট করে প্রকাশিত হয়েছিল ঋষি অরবিন্দের সেই বিখ্যাত 'দুর্গাস্তোত্র' তে। ১৯০৯ সালে নিজের সম্পাদিত 'ধর্ম' সাপ্তাহিক পত্রিকায় সেটি প্রকাশ পায়। ১৯০৫ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সহিংস ধারার গুপ্ত সংগঠনের, 'অনুশীলন' ও 'যুগান্তরের' এর হাজার হাজার যুবকের 'জীবন মৃত্যু কে পায়ের ভৃত্য' করা প্রেরণার উৎস ছিলেন অসুরনাশিনী মা দুর্গা। মৃত্যুকে তুচ্ছ করা এইসকল অজেয় বীর বিপ্লবীরা মা দুর্গা অথবা কালী মূর্তির সামনে আত্ম বলিদান শপথ গ্রহণ করতেন। কাজী নজরুল ইসলামকে দুর্গা মাতার শক্তি বন্দনার মাধ্যমে সহিংস বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করার কারনে ইংরেজ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সর্বজনীন দূর্গা পূজার সঙ্গে যুক্ত থাকার ইতিহাস পাওয়া যায়।
স্বাধীনতা উত্তর ভারতে এই পূজার প্রচার ও বিস্তার আরও ব্যাপকতা লাভ করেছে। একসময়ে জমিদার বনেদি বাড়ী কিংবা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালীদের পূজা ক্রমে সর্বসাধারণের হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে প্যান্ডেল-আলো- থিম- বিনোদন সর্বস্ব হয়ে ওঠে আজকের আয়োজন।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।