প্রকৃতি মায়ের বুকে পরম যত্নে যুগ যুগ ধরে লালিত হয়ে আসছে তার অজস্র মূক সন্তান। গাছগাছালি থেকে নানা কীট পতঙ্গ, তাদের সবার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ভাষা আছে, সর্বোপরি নৈঃশব্দের একটা সুন্দর ছন্দ আছে.....

এই সবকিছুই হয়ত একান্ত অনুভবের বিষয়।

পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের দুয়ারসিনিতে যেন তাদের সবার সন্ধান পেলাম....

জায়গাটা ঘাটশিলা থেকে মাত্র পঁচিশ কিমি দূরত্বেই অবস্থিত....

নির্জনতা আমার ভীষণ প্রিয়। তারই খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমরা, তবে সবাই অবশ্যই পূর্ব পরিকল্পনা করেই যাবেন কারণ দুয়ারসিনিতে বনদপ্তরের বনবাংলোই কিন্তু একমাত্র ভরসা। সত্যি বলতে, খুব বেশিদিন এখানে পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়নি.....

দুর্দান্ত না হলেও পরিষেবা যথেষ্ট ভালোই বলা চলে !

আমরা যাবার পথে বুরুডি লেক ঘুরে গিয়েছিলাম বলে, পৌঁছতে দুপুর হয়ে গিয়েছিল। একটা কথা স্বীকার করতেই হবে,অরণ্যের বুকে নিশিযাপনের এমন সুন্দর অভিজ্ঞতা মনে থেকে যাবে বহুদিন......

দিনের আলো নিভে গিয়ে ঝুপ করে অন্ধকার নামতেই চারপাশ ঝিঁঝিঁর কলতানে মুখর হয়ে উঠল....

এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ ! রাস্তায় একটাও স্ট্রিট লাইট নেই....দূর দূরান্ত পর্যন্ত কোথাও কোনো আলো জ্বলছে না .... শুধু নিকষ কালো অন্ধকার!

পাহাড় আর পাহাড়ের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে বয়ে চলা ভীষণ শান্ত সাতগুরুম নদীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।  ফাগুনে পলাশ ও শিমুলের রঙে রাঙা হয় দুয়ারসিনির আকাশ। সেখানকার মানুষরাও যে প্রকৃতির মতোই নির্মল। বড্ড সহজ, সরল। সাঁওতাল, খেড়িয়া, মুন্ডা, শবরদের বাসভূমি এই দুয়ারসিনি।



জঙ্গলপথ ধরে নীচে নামলে দেখতে পাওয়া যায় সাত ধারার সেই আশ্চর্য নদীকে। স্বচ্ছ জলে ছোট ছোট মাছ খেলে বেড়াচ্ছে। এ নদীর বিভিন্ন জায়গায় নাকি বিভিন্ন নাম।

রাতে যে একেবারেই গা ছমছম করেনি, একথা বলব না। দিনের আরণ্যক পরিবেশ যতটা শান্ত, স্নিগ্ধ ,রাত নামলেতার অন্দরে বসবাসকারী প্রাণীরা ধীরে ধীরে হয়ত জেগে ওঠে । তারা তাদের অস্তিত্বের জানান দিতে চায় নানা পন্থায় !

বনবাংলোর কটেজগুলো দেখতে ধানের গোলার মতো। বাংলো কাঁটাতারে ঘেরা। কেয়ার টেকার ভদ্রলোক ভীষণ ভালো। তাঁর সঙ্গে গল্প করে জানলাম অনেক কিছু।

 জঙ্গলে হায়েনা, প্যাঙ্গোলিয়ান, বুনোশুয়োর, ময়ূর এবংনানা ধরণের পাখি আছে বলে জানতে পারলাম। মাঝে মাঝে এরা নেমে আসে ধানক্ষেতে, জল খেতে। তাই হয়ত এই কাঁটা তারের ব্যবস্থা। তিনি আশ্বাস দিয়ে বললেন

"না, না, কোনো হিংস্র জন্তুর আক্রমণের ভয় এখানেনেই, "

সে হয়ত সত্যিই নেই কিন্তু

 নিশাচর প্রাণীরা জেগে ওঠে বলেই..... রাতের জঙ্গল হয়ত দিনের মত মোহময়ী আবেশ তৈরি করেনা, সে বহন করে একটা আতঙ্কের বাতাবরণ !

***

 দুয়ারসিনিতে দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগে পর্যন্ত দু চোখ ভরে দেখে নিলাম সবুজের সমারোহ ...

এখানে জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে....

ছোট্ট ছোট্ট টিলা পাহাড় সবুজ চাদর গায়ে জড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে....

গাছেরা পরস্পরকে জড়িয়ে যেন কত গোপন কথা বলে চলেছে...

বিশাল বিশাল বৃক্ষের পদতলে এসে দাঁড়াতেই মাথা নত হয়ে এল নিজের অজান্তেই....

অনুভব করলাম, তাদের মহানুভবতা.... প্রতিনিয়ত তারা কতই না বার্তা দিয়ে চলেছে...

 নম্রতার, সহনশীলতার আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা নীরবে বলে চলেছে বারংবার....

 আমরা নিজেদের অহঙ্কার আর ঔদ্ধত্যের কারণে যে গুণাবলী গুলো হারিয়ে ফেলছি ক্রমশঃ..

 এখানে সবচাইতে সুন্দর কিন্তু সানসেট পয়েন্টটি.....সেখানে পৌঁছতে হলে কিছুটা এবরো খেবরো মাটির রাস্তা পার হয়ে যেতে হবে ! তারপর অবশ্য প্রকৃতির মোহময়ী রূপ মন ভরিয়ে দেবে , হ্যাঁ দেবেই ! চেনা অচেনা কত পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে আপন মনে খেলা করে চলেছে......বাতাস ভরে আছে কত নাম না জানামিষ্টি ফুলের গন্ধে.....

আগুনের গোলার মত সূর্যটা টুপ করে ডুবে যেতেই রক্তিম আকাশ এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল....

 কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথাই তখন একমাত্র মনে এল....

" ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা , এরই মাঝে বাংলার প্রাণ"

অবশ্যই সকলকে অনুরোধ করব, দুয়ারসিনি মন্দিরটি দেখার জন্য।

ছোট্ট সুন্দর মন্দিরের শান্ত পরিবেশ যে মনটা প্রসন্ন করে দেবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ....

পরের দিনই ফেরার পালা !

ভোর হতে না হতেই বহু নাম না জানা পাখির কল কাকলিতে জেগে উঠলাম। দেখলাম ভোরের সূর্য গাছের ডালের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে !

হাত জোড় করে প্রণাম জানালাম সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে....

মনে মনে স্মরণ করলাম কবিগুরু কে

" আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ , তাহারই মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান"