যেখানে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা কে বারংবার সুরসুরি দিয়ে জাগিয়ে তোলে। বেড়াতে যাওয়া ইচ্ছেটাকে দমন করতে দেয় না, বরং মনের মধ্যে চির জাগরুক করে তুলতে, তাকে মনক্যামেরার মধ্যে ফ্ল্যাশ করে ফ্ল্যাসগানের মধ্যে দিয়ে। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা গানের সুর কে মনে মনে আওরানোর মতন, গরুর জাবর কাটা বা ভাঙা ক্যাসেটের মতন বাজাতে থাকে। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শুরু হয় শুটিংয়ের ফ্লাপ স্টিক দিয়ে, ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ক্যামেরা সেখান থেকেই রোল করতে শুরু করে এবং শেষ হয় ভ্রমণের যবনিকা পতনে।

বাঙালির ভ্রমণ "দিপুদা" কে ঘিরে বেশি অভিজ্ঞতার ঝাঁপি দেখা যায়। ভ্রমণপিপাসু বাঙালি অভিজ্ঞতা ঝুলি দীঘা, পুরী এবং দার্জিলিং কে ঘিরে রোমাঞ্চিত হয়। সদ্য দিঘার সাথে লেজুড় হিসেবে জুড়েছে মন্দারমনি এবং তাজপুর। ধারে কাছে এবং সহজলভ্য ভ্রমণ পিয়াসী বাঙালির মনে দীঘা বেশ ভালোই দাগ টেনেছে। দীঘায় যাতায়াতের সম্বল হিসেবে বাস একমাত্র অবলম্বন ছিল, তখন ঝরঝরে সরকারি বাস পরিবহন দীঘা যাওয়ার সঙ্গী ছিল। সময়টা তখন, আজ থেকে প্রায় ১৭-১৮ বছর আগেকার কথা বলা হচ্ছে। বাসের কোথাও সিট ভাঙ্গা, কোথাও সিটের কিছুটা নেই বললেই চলে, কিন্তু পুরো ভাড়াটা মিটিয়ে দিতে বাধ্য ছিলাম সঠিক পরিষেবা, আমরা পাই বা না পাই। বৃষ্টি হলে তো কোন কথাই নেই, গাড়ির ছাদ দিয়ে অবিরাম ধারায় বৃষ্টি ঝরছে, নয়তো কাঁচ ভাঙা জানলা দিয়ে জোরে বৃষ্টির ঝটকা যাত্রীদের অসহনীয় হলেও, নিরুপায় হয়ে সহ্য করে নিতে হচ্ছে। দীঘা যাওয়ার ট্রেন প্রায় নেই বললেই চলত সেই সময়। সস্তার দুরবস্থা বলতে যা বোঝায়, দীঘা যাওয়ার পরিনাম বাঙ্গালীদের ক্ষেত্রে দুর্ভোগ ছাড়া কোন কিছুই জুটত না। সস্তার মধ্যে ছিল হোলিডে হোম, ন্যূনতম আশ্রয়টুকু খোঁজার জন্য একমাত্র সস্তার আচ্ছাদন। এখন বিকল্প হিসেবে প্রচুর হোটেল বিভিন্ন দামে পাওয়া যাচ্ছে, স্বাচ্ছন্দ মেটাতে। তৎকালীন সময় সেটুকুও দীঘায় বাঙালির জন্য জুটত না। 

মন্দারমনির কথা নৈব নৈব চ। মন্দারমনিতে হোটেল হাতেগোনা ছিল। পর্যটন স্থল হিসেবে মন্দারমনি সে সময় ভূমিষ্ঠ শিশু হিসেবে গড়ে উঠছিল। ইলেকট্রিসিটি পর্যন্ত হোটেল গুলিতে ছিল না, জেনারেটার সাহায্যে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আলোর ব্যবস্থা করা হতো হোটেল গুলিতে। মন্দারমনিতে হোটেল বুক করা খুব দুরূহ ব্যাপার ছিল। দূরবীন দিয়ে মন্দারমনিতে হোটেল খুঁজতে হতো। খাবারদাবারের দাম অসম্ভব দামী ছিল। দিঘা ছিল মন্দারমনির সাপ্লাই লাইন, এই কারণে চড়া দামে হোটেল গুলিতে খাবার পরিবেশন করা হতো। মন্দারমনিতে চাউলখোলা থেকে যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল ভ্যান গাড়ি। ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে কোনক্রমে মন্দারমনিতে পৌঁছানো হতো। তাজপুর তখন দুরস্ত তার দুচোখ পর্যন্ত প্রস্ফুটিত হয়নি। 



পুরীতে আগস্ট মাসে বেড়াতে গিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলাম সমুদ্রের পাড়ে মানুষের প্রচুর বর্জ্য পদার্থ পড়ে রয়েছে। এরা সবাই শ্রাবণ মাসের জল ঢালার হুজুগে চলে এসেছিলেন এবং হোটেল বা আস্তানা বিহীন অবস্থায় সমুদ্রের পাড়ে আশ্রয় নিয়ে সেখানেই তাদের বর্জ্য পদার্থ ত্যাগ করেছিলেন এবং সামুদ্রিক এলাকাটিকে বিষাক্ত করে তুলেছিলেন। আগস্ট মাসে পুরীতে যাওয়ার আরেকটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সারাদিন ধরে ওঝড় ধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছিল এবং আমরা রাত্রের আহার না সেরেই অভুক্ত অবস্থায় শুয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। সে যাত্রায় অবশ্য জগন্নাথ ধামের খাজা আমাদের শেষ রক্ষা করেছিল ডান হাতের কাজ মেটাতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং পেটে গামছা বেঁধে নয় বরং কিছুটা খিদে মেটানোর আশ্বাসন নিয়ে, সেই রাত্রি অতিবাহিত করেছিলাম বারিধারার অবিশ্রাম এবং নিশ্চিত শ্রাবণ ধারার কল্যাণে।

দেরাদুনে গিয়ে রাত্রি বাসের জন্য হোটেলের বিছানায় যখন শুতে গেছি ঠান্ডার প্রকোপ এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল, এ পাশ থেকে ওপাশে যখন আমারই বিছানায় ফিরছি, ঠান্ডার পরশে আমার ঘুম উড়ে যাচ্ছিল। ঠান্ডা যেন ক্রমশ আমাকে জাপটে ধরেছিল এবং গায়ে যে কম্বলটি জড়িয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছিলাম, সেটা নেহাতই একটা প্রতিকি মাত্র।

দেরাদুন, হরিদ্বার,ভাইজাগে ও দার্জিলিং এ রোপওয়ে রাইড সত্যি রোমাঞ্চকারী ছিল। একদিকে পাহাড়ি সৌন্দর্য অন্যদিকে নিচে থাকা পাহাড়ি খাদের বিপদজনক উপস্থিতি টানটান উত্তেজনা তৈরি করে। দেরাদুন এর উপরের আই ড চা বাগিচার উপর দিয়ে যখন চলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে যেন সবুজ গালিচার উপরে আমরা উড়ে চলেছি। হরিদ্বারের রোপওয়ে রাইড প্যানরামিক ভিউকে মোহময়ী করে তুলেছিল। ভাইজাগের রোপওয়ে রাইড সমুদ্রের সামগ্রিক চিত্রপটকে চোখের সামনে তুলে ধরছিল।