জ্যৈষ্ঠ মাসের গরম বিকেল। হাওড়া থেকে সকালবেলার ট্রেনে চেপে ধীরে ধীরে পৌঁছেছিলাম এক অদ্ভুত গ্রামের কাছে— মলুটি। নামটা আগে বহুবার শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে জায়গাটা যেন ইতিহাসের বই থেকে উঠে আসা এক বিস্মৃত অধ্যায়।


চারদিকে শান্ত গ্রামবাংলার পরিবেশ। কাঁচা-পাকা রাস্তা, মাটির ঘর, তাল-খেজুর গাছ, দূরে ধানক্ষেত আর মাঝেমধ্যে ছড়িয়ে থাকা লাল ইটের পুরনো মন্দির। গ্রামের মানুষজন নিজেদের কাজেই ব্যস্ত। পর্যটক দেখেও অতিরিক্ত কৌতূহল নেই। সেই নির্লিপ্ত ভাবটাই মলুটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।

একসময় এখানে নাকি ১০৮টি টেরাকোটা মন্দির ছিল। এখন প্রায় ৭০–৭৫টির মতো টিকে আছে। ছোট ছোট মন্দিরগুলোর গায়ে পোড়ামাটির অসাধারণ কাজ— রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, শিকার, লোকজ জীবন— সব যেন ইটের গায়ে গল্প হয়ে জমে আছে

মলুটির ইতিহাস

মলুটি মন্দিরসমূহ এর ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। কথিত আছে, এক দরিদ্র রাখাল বসন্ত রায় বাংলার সুলতানের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি এই অঞ্চল পান এবং “রাজা” উপাধি লাভ করেন। তাঁর বংশধরেরাই পরে একের পর এক মন্দির নির্মাণ করেন।

মলুটির স্থাপত্যে বাংলার মধ্যযুগীয় টেরাকোটা শিল্পের অসাধারণ নিদর্শন দেখা যায়। বিষ্ণুপুরের মতো জাঁকজমক না থাকলেও এখানে একধরনের নিঃশব্দ, ধুলো-মাখা ইতিহাসের আবহ আছে, যা আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।

এই অঞ্চল আবার বামাখ্যাপা-র স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে। কাছেই তাঁর জন্মস্থান আটলা গ্রাম এবং তারাপীঠের প্রভাবও এই অঞ্চলের সংস্কৃতিতে স্পষ্ট।

কীভাবে যাবেন (হাওড়া থেকে)

ট্রেনে

সবচেয়ে সুবিধাজনক রুট—

  1. হাওড়া → রামপুরহাট
  2. (ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস/ গণদেবতা এক্সপ্রেস/ ময়ূরাক্ষী এক্সপ্রেস)

তারপর রামপুরহাট থেকে গাড়ি বা টোটো ভাড়া করে প্রায় ১–১.৫ ঘণ্টায় মলুটি পৌঁছানো যায়।

রামপুরহাট থেকে দূরত্ব প্রায় ৫৫–৬০ কিমি।

সড়কপথে

কলকাতা → দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে → পানাগড় → সিউড়ি → রামপুরহাট → মলুটি

নিজের গাড়িতে গেলে রাস্তার দৃশ্য খুব সুন্দর, বিশেষ করে বীরভূম অঞ্চলের লালমাটির পথ ও গ্রামীণ প্রকৃতি।

কোথায় থাকবেন

মলুটিতে এখনও বড় হোটেল সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। তাই থাকার জন্য সাধারণত মানুষ—

  1. রামপুরহাট
  2. তারাপীঠ

— এই দুই জায়গাকে বেস হিসেবে বেছে নেবেন।

তারাপীঠে বিভিন্ন বাজেট হোটেল ও লজ পাওয়া যায়। সেখান থেকে ডে ট্রিপ হিসেবেও মলুটি ঘুরে আসা সম্ভব।

কী কী দেখবেন

১. টেরাকোটা মন্দির চত্বর

প্রতিটি মন্দিরের গায়ে আলাদা কারুকাজ। দুপুরের আলো বা বিকেলের নরম রোদে এই মন্দিরগুলো সবচেয়ে সুন্দর লাগে।

২. মৌলীক্ষা মন্দির

মৌলীক্ষা মন্দির স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। অনেকে একে “গুপ্ত তারাপীঠ”ও বলেন।

৩. গ্রামের পরিবেশ

মলুটির আসল সৌন্দর্য শুধু মন্দিরে নয়, পুরো গ্রামটার আবহে। বিকেলের দিকে গরু ফেরে, দূরে শালিক ডাকে, কোথাও ধোঁয়া উঠছে রান্নাঘর থেকে— মনে হয় সময় এখানে একটু ধীরে চলে।

ভ্রমণের সেরা সময়

  1. অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে ভালো।
  2. বর্ষাকালেও সবুজ প্রকৃতি খুব সুন্দর লাগে, তবে রাস্তা কাদাময় হতে পারে।

কিছু জরুরি টিপস

  1. দুপুরের গরম এড়িয়ে সকাল বা বিকেলে ঘুরুন।
  2. পানীয় জল সঙ্গে রাখুন।
  3. মন্দিরের টেরাকোটা অংশে হাত না দেওয়াই ভালো।
  4. গ্রামটি খুব শান্ত— তাই শব্দদূষণ বা আবর্জনা এড়িয়ে চলুন।